রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

বন্ধু

ছোটোবেলার এক স্কুলে এক মিষ্টি বন্ধু ছিল। চমৎকার সুন্দর ছেলে এক। দীর্ঘকালের অভিজাত পরিবারের ছেলে। ফুটবলে ডিফেন্সে দাঁড়াত, আর পায়ের তলা দিয়ে, মাথার উপর দিয়ে বল নিয়ে নিয়ে চলে যেতাম। ক্লাসের ছেলেরা ভালবাসতো দেখতে। তাতিয়ে দিত ওকে। স্কুলের কলতলায় জল খাবার সময় এসে বলতো, ঘৃণায় মুখ কুঁচকে বলতো, 'তুই কোনোদিন আমার মত ফার্স্ট হতে পারবি না'। একবার, দু-বার, চারবার বলত। আমি হাসতাম। আরো রেগে যেত। বলতেই থাকত যতক্ষণ না টিফিন শেষের ঘন্টা বাজতো। সেই স্কুলে আমার ক্লাস দুর্বল ছিল ফুটবলে। অবশ্য আমি জীবনের বেশীরভাগ সময়েই দুর্বল টিমের হয়ে ফুটবল খেলেছি। মনে আছে, স্কুলের মধ্যেকার প্রতিযোগিতায়, অন্য সেকশনকে, যারা বেশ ভাল টিম, যখন হারালাম - কী উল্লাস! একটু আধটু খেলতে পারতাম। সেই বন্ধুটিই কাঁধে তুলে নিল বাকীদের সঙ্গে। ভুলেই গেছিল আমাকে ঘেণ্ণা করে অন্য সময়। মনে করাইনি আমিও।

আবার যখন এ সব প্রতিযোগিতা ফুরিয়ে গেল, সেকশনের নিজেদের খেলা, আবার ঘেণ্ণা করতে শুরু করল। আবার বলতো সেই ফার্স্ট হতে না পারার কথা। কখনো মনে করাইনি ওকে অন্য স্কুল থেকে ফার্স্ট হয়ে, সারা বাংলার প্রতিযোগিতায় বৃত্তি পেয়েই ওখানে পড়তে গিয়েছিলাম। মনে করাইনি, সারাদিন খেলে, গল্পের বই পড়ে প্রথম দশের মধ্যে অথবা একেবারে তার কাছাকাছিই থেকে যেতাম। বলিনি, কারণ ওকে বিশ্বাস করানো সম্ভব ছিল না কেউ কেউ কখনো ফার্স্ট হবার জন্যই বাঁচে না। সারাদিন খেলা, সুযোগ পেলেই গল্পের বই পড়ার যে কী আনন্দ...! কখনো চাঁদে চলে যাচ্ছি গল্পের সঙ্গে তো কখনো কিউবার আখের ক্ষেতে দল পাকাচ্ছি বিপ্লব হবে বলে। সাঁওতাল যুবকের মত পেশী টান করে দাঁড়াচ্ছি অরণ্যে, সিধো-কানহো জঙ্গলের গর্জন তুলেছেন তাতে কন্ঠ দিতে। মাঝেমধ্যে দস্যু মোহনের মত সাহেবের লঞ্চ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিচ্ছি ফিরে আসব বলে। মধ্যিখানে হাত ধরেছি সেই ছেলেটার, যে দেওয়ালে গোল দাগ কেটে দূর থেকে সেখানেই বল মারা প্র্যাকটিস করে। ঘরে অভাব, কিন্তু ওকে ছোট দলের হয়ে জিততেই হবে মোহনবাগান-ইষ্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে। তবেই না ফুটবলার বলে মানবে সবাই!

আহা, এমন আহ্লাদ আর আনন্দের জীবন ছেড়ে কে অন্যে এগিয়ে গেল বলে দুঃখে মরবে? অথবা সবাইকে পেছনে ফেলার আনন্দে মাতোয়ারা হতে চায়? সবাই পিছনে চলে গেলে তো মানুষ তো সেই একাই। ফুটবল এগারো এগারো বাইশজনের খেলা। এগোনো-পিছোনো খেলার অঙ্গ মাত্র, শেষ নয়। জয় পরাজয়ের বাইরেও থেকে যায় ঘাসের, কাদার, মাটির দাগ, রক্ত-ঘাম-শ্রম এবং মজে থাকা। আজকাল ভাবি সেই বন্ধুটি কোথায়? আমি তো আর খেলি না ফুটবল। ওকি এখনো ফার্স্ট হতেই মত্ত? নাকি আজকাল বান্ধবীর হাত ধরে গরমে অন্তত পাহাড়ে যায়। পাইন, ফার, রডোডেনড্রনের বনে উদাত্ত কন্ঠে বলে 'পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি...'! যেখানেই থাকিস ভাল থাকিস ভাই রে! হাতে পারলে একতারাও নিস। যত প্রথম হবার দৌড় থাকুক না কেন, ফাঁকতালে গলা ছেড়ে গেয়ে নিস 'ঘরের কাছে আরশিনগর, তাতে এক পড়শি বসত করে...'। ফার্স্ট হ, কিন্তু জীবনটা চেটেপুটে নিস ভাই। নইলে সবাই একদিন মরে যাব পট করে। এমন মানব জনম আর হবে না।