মঙ্গলবার, এপ্রিল ২০, ২০২১

প্রসঙ্গ ‘এন-আর-সি’ : কিছু কথা, কিছু জিজ্ঞাসা, দ্বিতীয় ভাগ

পৃথিবীর ভাষার ইতিহাসে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির অবস্থান যে উজ্জ্বল স্তম্ভের মতোই, অসমিয়া ভাষাসংস্কৃতি যে কখনোই হারিয়ে যাবার নয়, অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির পরিধি যে ক্রমশ বাড়ছে সমাজ-বিজ্ঞানের নিজস্ব নিয়মেই-- এই তথ্যগুলি সাধারণ অসমিয়া সমাজ জানে না, প্রচারিত হয় না। কিন্তু যখনই তাদের জানানো হয় যে, তাদের অতি আদরের এই অসমিয়া ভাষাসংস্কৃতি বিপদের মুখে।

এবং বিপদের কারণ বাঙালি। তখনই ওরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিশ্বাস করে ফেলে কথাটি। এবং বাঙালিদের প্রতি পুরানো অসহিষ্ণুতাবোধটি আবার কেঁচেগণ্ডূষ হয়ে ওঠে। ন্যস্ত স্বার্থের উদ্দেশ্য সিদ্ধি হয়। কিন্তু নীরবে যে অসমিয়া জাতিটির ক্রমশ বৃদ্ধি ঘটছিল তার বিঘ্ন ঘটে।এরকম বার বার বিঘ্ন ঘটেছে। বিঘ্ন ঘটছে ন্যস্ত স্বার্থে আচ্ছন্ন কুটিল এই রাজনীতির জন্যেই। এবং সব সময়েই এই রাজনীতির ট্রাম্পকার্ড হয় ও হচ্ছে বাঙালিরাই, বিশেষ করে ওপার থেকে আসা ছিন্নমূল বাঙালিরাই ।যদি উল্টোটা হতো তাহলে সুযোগ সুবিধে মতো অসমিয়া জাতিটা ‘গেলো গেলো’ রব তুলে রাজনীতি করা যেত না। আর সে-রাজনীতির মিঠে ফলও ভোগে আনা যেত না।যদি এই কুটিল রাজনীতি না করে সবদিক সঠিকভাবে নিরীক্ষণ করে, অত্যন্ত আবেগিক না হয়ে, সহানুভূতিশীল হয়ে ভাবা হতো যে, এতগুলো অসহায় মানুষ, যারা নিষ্ঠুর রাজনীতির বলি, তারা যাবে কোথায়? বাঙালি বলে ওদের প্রতি বিদ্বেষ আর অসহিষ্ণুভাব যদি পোষণ না করা হত, এইসব বিপদগ্রস্ত বাঙালিদের আবার ছিন্নমূল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত না নিয়ে যদি ভালোবেসে কাছে টেনে নেওয়া যায় তাহলে বুঝি সব সমস্যারই সমাধান হয়ে যায়। অসমিয়া জাতিটারও শ্রীবৃদ্ধি হয়।খিলঞ্জিয়া অখিলঞ্জিয়া ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে হয় না। যেখানে আশ্রয় পাবে,যেখানে ভালোবাসা পাবে সেখানকার ভাষা-সংস্কৃতি গ্রহণ করতে তাদের অন্তর থেকে সততই সাড়া উঠবে ।(ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় গত শতকের শেষার্ধ থেকে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি নিশ্চয় পরিলক্ষিত হবে)।জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। জোর করে চাপিয়ে দিলে প্রতিপক্ষ জেদি হয়ে ওঠে। আসলে, অসমিয়া জাতিটাকে সততই ধাওয়া করে একটি যন্ত্রণাদায়ক অতীত ইতিহাস।কী সেই ইতিহাস? ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার(বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি)অধীনে এসে ১৮৩৬ থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত এই ৩৭ টা বছর অসমে সরকারি কাজকর্মে ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল বাংলা ভাষাকে। এই সময়সীমাটি অসমিয়া ভাষা-সাহিত্যের ইতিহাসে কালো অধ্যায় বলে আজও বিবেচিত। তৎকালীন অসমিয়া সাহিত্যের ইতিহাসকাররা প্রচারও করেছেন এই বলে যে, ওই প্রয়োগের পেছনে রয়েছে বাঙালিদেরই ষড়যন্ত্র। তখন থেকেই পুরুষানুক্রমে বাঙালিদের প্রতি সাধারণ অসমিয়া সমাজের বিদ্বেষ ও সন্দেহ আজও বিরাজমান।প্রসেনজিত চৌধুরী ও শিবনাথ বর্মণের মতো অসমিয়া পণ্ডিতরা বিভিন্ন তথ্যাদিসহ প্রমাণ করেছেন যে, ওইসব উগ্র-জাতিয়তাবাদী ইতিহাসকারদের ধারণা অমূলক ও মিথ্যা।কিন্তু একদল শক্তিশালী ন্যস্ত স্বার্থান্বেষী থলুয়া ও ছলুয়া ওই মিথ্যেটাকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পল্লবিত করে ঢুকিয়ে দিচ্ছে সাধারণ অসমিয়া সমাজের শঙ্কার জগতে যে,অসমিয়ারা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে, বাঙালি আবার আগের মতো অসমটাকে অধিকার করে নেবে। যদি তাই হয় তাহলে তো পুরো বরাক উপত্যকাটিকে, যেখানে বাংলা ভাষার প্রচলন সুদূর অতীত কাল থেকেই, যেখানে প্রব্রজনও হয়েছে, আলাদা রাজ্য হিসেবে ভাগ করে দিলেই তো তাদের সব শঙ্কা দূর হয়ে যায়।কিন্তু সেটা করলে তো বাঙালিদের নিয়ে রাজনীতি করা যাবে না !রাজস্বেও টান পড়বে। সম্প্রতি অসমিয়া সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরেকটি ফোবিয়া ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই বলে যে , অসমটা ত্রিপুরা হয়ে যাবে। এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইতিহাসকে জেনে অথবা না জেনে।ইতিহাস বলছে, ১২৮০ সালের আগে তৎকালীন বঙ্গদেশের পাল রাজবংশের অধীনে এই ত্রিপুরা রাজ্যটি শ্রীভূমি নামে পরিচিত ছিল।ত্রিপুরার বিখ্যাত ‘ঊনকোটি’র ভাস্কর্যসমূহ খোদিত হয়েছিল ওই পাল রাজত্বের সময়েই।এরপর ৫৪৭ বছরের ত্রিপুরি রাজবংশের গতিধারায় বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে ওতপ্রোতভাবে,ঐতিহ্যানুসারেই। ত্রিপুরি মাণিক্য রাজবংশের প্রথম রাজা ( ত্রয়োদশ শতাব্দী) ধন্য মাণিক্যের সময়েই ত্রিপুরা রাজ্যে বাংলা ভাষাচর্চার গতি অত্যন্ত বেগবান ছিল


চলবে...