বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০২০

প্রণব মুখোপাধ্যায় – শেষ হল একটি যুগ

অন্যদেশ ডেস্ক , ৩১ আগস্ট,২০২০

তখন তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রী । সফলতার শীর্ষে, মনমোহন সরকারের দুই নং মন্ত্রী । উত্তরপূর্বের দায়িত্বে ছিলেন ও তিনি।‘ অন্যদেশ’ থেকে সাক্ষাৎকারের জন্য অনুরোধ ছিল । তিনি ডেকে পাঠালেন । তিনি তখন ভারতের অর্থমন্ত্রী । শুভা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এঁর আগেই পরিচয় ছিল । এমন স্নেহপ্রবণ গুণবতী মহিলা খুব কম-ই দেখেছি । সাংস্কৃতিক মহলে ‘গীতাঞ্জলি’-নিয়ে খ্যাত ছিলেন ঠিকই , এ ছাড়াও কত মানুষের যে তিনি মা ছিলেন তার ইয়ত্তা নাই ।

বসে ছিলেন অফিস ঘরে । আমার চোখের সামনে দিয়ে তাঁর সাক্ষাৎ করে বের হয়ে গেলেন , অনিল আম্বানী । আমি অপেক্ষায় ।

ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক শক্তির মূল কেন্দ্রের শীর্ষে বসে আছেন এই বাঙালি । ছোট খাটো মানুষটির মুখে সর্বদাই থাকে কঠিন গাম্ভীর্য । তিনি নাকি হাসেন কম । সেই দিন কিন্তু হাসিমুখই দেখেছি তাঁর । উত্তরপূর্ব নিয়ে বহুবিধ প্রশ্ন নিয়ে তাঁর মুখোমুখি বসলাম । অফিসে হেলান দিয়ে বসেছিলেন । হাতে একটি বই । উঁকি দিয়ে দেখলাম ।

এমার্জিং ডাইমেনশনস অফ ইন্ডিয়ান ইকোনমি’- লেখক প্রণব মুখোপাধ্যায় । দুইবার তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়ে কভার স্টোরি করেছে অন্যদেশ ।

বীরভূমের কীর্ণাহারের গ্রামের মেঠো পথ, ভাঙা সাঁকো পেরিয়ে সোজা রাষ্ট্রপতি ভবন, এক দীর্ঘ বর্ণময় জীবন রেখে গেলেন কীর্ণাহারের মুখার্জি পরিবারের ছেলে ।

আদর করে যাঁকে পল্টু । জন্ম ১৯৩৫ সালে ১১ ডিসেম্বর। বাবা কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের বিধান পরিষদের সদস্যও ছিলেন। সেই সূত্রেই প্রণবের রাজনীতির হাতেখড়ি ঘর থেকেই।

‘একটি যুগের অবসান’, প্রণববাবুর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ রাষ্ট্রপতি শোকপ্রকাশ করেছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দও।

টুইটারে তিনি বলেন, ‘প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর খবরে শোকাহত। তাঁর মৃত্যুতে একটি যুগের অবসান হল। তাঁর পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং দেশের সব মানুষের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাাচ্ছি।’

শোক বার্তা আসছে গোটাবিশ্ব থেকে ।

এক নজরে প্রণব মুখোপ্যাধায় –

ব্যক্তিজীবন –

১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের বীরভূম জেলার মিরাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। বাবা কামদাকিঙ্কর ছিলেন সক্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী। স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের বিধান পরিষদের সদস্য হন তিনি। শিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে স্নাতক হন তিনি। এর পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন পাশ করেন।

কর্মজীবনের শুরুতে কলকাতায় ডাক বিভাগের কারণিক পদে যোগ দেন তিনি। ১৯৬৩ সালে বিদ্যাসাগর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসাবে কাজ শুরু করেন। ‘দেশের ডাক’ নামে একটি সংবাদপত্রে কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছিলেন তিনি।

১৯৬৯ সালে মেদিনীপুর উপ-নির্বাচনে তাঁর রণনীতিতে জয়লাভ করেন নির্দল প্রার্থী। এতেই ইন্দিরা গান্ধীর নজরে পড়েন তিনি। প্রণববাবুকে দলে যোগদান করান ইন্দিরা। সেই বছরই রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। এর পরও ৪ বার রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছেন তিনি।

সংসদীয় রাজনীতিতে যোগ দিয়েই ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বস্ত সৈনিকে পরিণত হন প্রণব। যার ফলে ১৯৭৩ সালে মন্ত্রিসভায় জায়গা পান তিনি। তাঁকে শিল্পোন্নয়ন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী করা হয়। জরুরি অবস্থাতেও ইন্দিরার পাশে ছিলেন প্রণব। ১৯৮২ সালে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফিরলে অর্থমন্ত্রী হন প্রণববাবু। ১৯৮০ সালে রাজ্যসভায় কংগ্রেসের দলনেতা হন প্রণববাবু।

ইন্দিরাগান্ধীর হত্যার পর রাজীবের সঙ্গে মতানৈক্যের পর তাল কাটে। কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হয় প্রণবকে। সেই সময় রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে একটি দল গঠন করেন তিনি। তবে তা তেমন সাফল্যের মুখ দেখেনি। ১৯৮৯ সালে ফের কংগ্রেসে যোগ দেন তিনি। কংগ্রেসের সঙ্গে বিলয় ঘটান তাঁর দলের।

১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধীর হত্যার পর কংগ্রেসে ফের সক্রিয় হন প্রণব। তাঁকে প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিংহ রাও। পরে তাঁর মন্ত্রিসভায় যোগ দেব প্রণব মুখোপাধ্যায়। নরসিংহ রায়ের মন্ত্রিসভায় বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলান তিনি।

১৯৮৫ সালে প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি হন প্রণববাবু। ২০০০ সালে তাঁকে ফের এই পদ গ্রহণ করতে হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন তিনি। যদিও কংগ্রেস নেতাদের একাংশের মতে রাজ্যের রাজনীতিতে উৎসাহ ছিল না প্রণব মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর মন পড়ে থাকত দিল্লিতে।

5f4d108b1bd0a.jpg

২০০৪ সালে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর আসন থেকে জিতে প্রথমবার লোকসভায় যান প্রণব মুখোপাধ্যায়। কংগ্রেসের লোকসভার নেতা নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৪ সালে কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হবেন না বলে ঘোষণা করলে প্রণববাবুর নাম নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়। যদিও শেষ মুহূর্তে মনমোহন সিংয়ের নাম ঘোষণা করেন সোনিয়া।

মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছেন প্রণববাবু। অর্থ, প্রতিরক্ষা ও বিদেশ মন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ২০১২ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর ঘোষণা করেন প্রণব। এর পর কংগ্রেসের তরফে রাষ্ট্রপতি হিসাবে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয়। ২০০১২ সালের ২৫ জুলাই প্রথম বাঙালি হিসাবে ভারতের রাষ্ট্রপতি হন প্রণব মুখোপাধ্যায়। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৯ সালে তাঁকে ভারতরত্নে ভূষিত করে কেন্দ্রীয় সরকার।

মনমোহন সিংহের দ্বিতীয় সরকারে প্রণব মুখোপাধ্যায় পুনরায় অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব পান। উল্লেখ্য, ১৯৮০-এর দশকে তিনি এই মন্ত্রকেরই দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০০৯ সালের ৬ জুলাই তিনি সরকারের বার্ষিক বাজেট পেশ করেন। এই বাজেটে তিনি কয়েকটি কর সংস্কারের প্রস্তাব রাখেন। যেমন, 'অস্বস্তিকর' ফ্রিঞ্জ বেনেফিট ট্যাক্স ও কমোডিটিজ ট্র্যানজাকশান ট্যাক্সের অবলোপন ইত্যাদি। এছাড়া তিনি ঘোষণা করেন যে অর্থমন্ত্রক শীঘ্রই গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স নামে একটি কর চালু করবে। এই করের কাঠামোটির প্রশংসা করেন বিভিন্ন কর্পোরেট কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদগণ। এছাড়াও তিনি কয়েকটি সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পে অর্থবরাদ্দ করেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান সুনিশ্চিতকরণ আইন, শিশুকন্যাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা ইত্যাদি। এছাড়াও অর্থবরাদ্দ করেন জাতীয় সড়ক উন্নয়ন কর্মসূচি, বিদ্যুদয়ন প্রকল্প, এবং জওহরলাল নেহেরু জাতীয় নগরোন্নয়ন মিশনের মতো পরিকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলিতেও তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন ।

প্রচুর পড়াশোনা করতেন প্রণব বাবু । বই লিখেছেন রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক ।

বইগুলি

  • -- মিডটার্ম পোল
  • বিয়ন্ড সারভাইভ্যাল
  • এমার্জিং ডাইমেনশনস অফ ইন্ডিয়ান ইকোনমি
  • অফ দ্য ট্র্যাক, সাগা অফ স্ট্রাগল অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
  • চ্যালেঞ্জ বিফোর নেশন.

৫০ বছরেরও বেশি সময় সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা প্রণব মুখোপাধ্যায়কে ২০১৯ সালে ভারত রত্ন সম্মানে ভূষিত করা হয়৷ ১৯৯৭ সালে তিনি সেরা সাংসদ পুরস্কার পেয়েছিলেন৷ ২০০৮ সালে পদ্মবিভূষণ সম্মান পান তিনি৷

মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। দিল্লির বাসভবনে পড়ে মাথায় চোট পান তিনি। যার জেরে মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধে। অস্ত্রোপচার প্রয়োজন বলে জানান চিকিৎসকরা। অস্ত্রোপচারের আগে জানা যায় তিনি করোনা আক্রান্ত। তার পরও অস্ত্রপচারের সিদ্ধান্ত নেন দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের সেনা হাসপাতালের চিকিৎসকরা। অস্ত্রোপচারের পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থা ছিল সঙ্কটজনক। ভেন্টিলেশনে রাখা হয় তাঁকে। কিন্তু ক্রমশই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন তিনি।

তাঁর প্রয়াণে অন্যদেশ গভীর মর্মাহত ।