মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯

নয়াদিল্লিতে বাউলমেলা

মহানগরী দিল্লি এক অভূতপূর্ব বাউলমেলার সাক্ষী হয়ে রইলো । বিপুল জনসমাবেশের মধ্যে অসংখ্য বাউলের আকুল করা গীতে মুখরিত হয়ে রইলো দিল্লির আকাশ ।

--- দিল্লি থেকে চৈতালি দাস

5dc9374ba96ad.jpg

"আউল বাউল দরবেশ সাঁই,
সাঁইয়ের উপরে আর নাই । "
সত্যি কথা বলতে কি এই গানের কলি কার লেখা কি সুর কিছু জানিনা। ছোট থেকে শুনে আসছি তিন রকম সুরে। তবে একটা কথা পরিষ্কার যে বাউল সমাজ লালন সাঁই কে ভগবানের স্থানে বসিয়েছে,। মানুষ বলতে বাউল রা যা বোঝে তা মানব নয় । মানুষ কে যে স্থান দেয় বাউলরা,
তা হলো ভগবান' এর জন্য রাখা। " ওরে এই মানুষের আছে রে মন যারে কয় মানুষ রতন।" বাউলরা মানুষকে যে স্থানে বসিয়েছে তাইতে আমরা দেখি মানুষ ভগবানের ইমেজ নয়, ভগবানই মানুষের ইমেজ।
বাউলকোন ধর্ম নয়, এএকপ্রকার সাধনা।অতএব এই সাধনার সাধকরা হিন্দুও হতে পারেন আবার মুসলমানও হতে পারেন, কিন্তুতাঁদেরমুখে যার কথা গান হয়েশোনা যায় তিনি হলেন মনের মানুষ।অন্তরে যার বাস।এইদেহেই তার সঙ্গে মিলন হয়।

" মিলন হবে কতদিনে , আমার মনের মানুষএর সনে"

বাউল ফকিরদের সম্পর্কে জানার কোনো শেষনেই।বই পড়ে আর কতটা জানা যায়! দুটোগোটাদিন যদি তাদের সঙ্গে ( ৬৫জনবাউল) কাটানো যায় তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও জানা যেতে পারে। অন্তত বাউল সঙ্গ হতে পারে । মহানগরীর কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে তাও কী কম !
৯ ও ১০নভেম্বর এইশনি ওরবিবার সকাল ন’টা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত আয়োজন করেছেন বেঙ্গলএসোসিয়েশানদিল্লি।সহযোগিতায় আছে সঙ্গীত-নাটক-আকাদেমিও বাংলা নাটক ডট কম।রবীন্দ্রভবনের পাশেই মেঘদূত থিয়েটার।সেখানেই গত নয় এবং দশ নভেম্বর দিল্লির রবীন্দ্রভবন মেঘদূত মুক্তমঞ্চে বাউল ফকির মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল।

দুদিন ব্যাপী এই‌ মেলায় পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ এবং নদীয়া থেকে মোট ৬৫ জন বাউল এবং ফকির অংশগ্ৰহণ করেছিলেন। এই বাউল ফকির মেলার যৌথ আয়োজক ছিলেন বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন, নিউ দিল্লি, সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি এবং বাংলা নাটক ডট কম।

5dc93731abe9c.jpg

এই দুদিনই মেলা শুরু হয়েছে সকাল সাড়ে দশটা থেকে । সকাল সাড়ে দশটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত চলেছে বাউল ফকিরদের আখড়া। মেলা প্রাঙ্গনে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন আখড়ায় বাউল ফকিরেরা তাঁদের গান এবং নাচের সঙ্গে সঙ্গে বাউল দর্শন ,তত্ত্ব, বাউল গানের ইতিহাস ,মুর্শিদী গান ইত্যাদি আলোচনা করেছেন। এই আখড়ায় দর্শকদের সঙ্গে বাউলদের কথোপকথন ,আলাপচারিতার মাধ্যমে আদান প্রদান ঘটেছে। এই পর্যায়ে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত আন্তরিক ছিলো। গানের জন্যে কোনো মাইক ছিলনা বাউল-ফকির এবং শ্রোতা দর্শকেরা খুব সহজেই মিলে মিশে একাত্ম হতে পেরেছিলেন ।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্যায়টি শুরু হয় বিকেল চারটে থেকে মেঘদূত মূল মঞ্চে। এই পর্যায়ের গান বাজনা সবটাই ছিল আনুষ্ঠানিক।একে একেবাউলদের নাম ডেকে তাদের নিজের নিজের গান গাইবার জন্য আহ্বান জানাচ্ছিলেন শ্রী অমিতাভ ভট্টাচার্য, যিনি বাংলা নাটক ডট কমের পুরোধা। গত ১৯-২০ বছর ধরে যিনি বাংলার লোক শিল্পীদের নিয়ে কাজ করে চলেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন আঙ্গিকের বাউল গানের সঙ্গে শুনলাম অত্যন্ত অল্পশ্রুত বাংলা কাওয়ালি এবং সুফি গান। এই গানের নেতৃত্ব দিলেন গুরু আরমান ফকির এবং বাবু ফকির।

প্রথমদিনের অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন হলো বাউলমেলার। অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন করলেন বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শ্রী দীপক ভট্টাচার্য। একটি চারাগাছে জল দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন হলো।

দ্বিতীয় দিনে একইভাবে শুরু হলো সকালের আখড়া। দুপুরবেলায় মধ্যাহ্নভোজন এবং বিশ্রামের বিরতি । বিকেলে মূল মঞ্চের অনুষ্ঠানে বাউলরা গাইলেন এক এক করে।

অনুষ্ঠানে বাউলদের সঙ্গে কলকাতা থেকে আগত দুই শিল্পীও বাউল এবং ধামাইল শোনালেন অনুষ্ঠানে। শিল্পীরা হলেন শ্রীমতি দীপান্বিতা আচার্য এবং শ্রীমতি দেবলীনা ভৌমিক।

দুদিনের সমগ্ৰ অনুষ্ঠানটির পরিচালনা, সঞ্চালনা এবং সংযোজনার দায়িত্বে ছিলেন শ্রী অমিতাভ ভট্টাচার্য। তাঁর নিপুণ এবং তথ্য সম্বৃদ্ধ সঞ্চালনায় দুদিনের এই অনুষ্ঠানের মানবর্দ্ধন হয়েছে।

দুদিনের এই বাউল ফকির মেলায় রবীন্দ্রভবন স্থিত মেঘদূত মুক্ত মঞ্চে ঢল নেমেছিল দর্শকদের। দিল্লির মাটি ছেয়ে গেছিলো বাংলার মাটির গন্ধে। বীরভূমের জয়দেব কেঁদুলীর মেলার ছবি ফুটে উঠেছিল দিল্লির বুকে।

দ্বিতীয় দিনের সমাপ্তি অনুষ্ঠান ঘোষণা করে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন ,নিউ দিল্লির সাধারণ সম্পাদক শ্রী তপন সেনগুপ্তঅংশগ্রহণকারী সমস্ত বাউল-ফকির এবং দর্শকবৃন্দদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং সেই সঙ্গে বাউলগুরুদের স্মারক প্রদান করে সম্মান জানান।

অনুষ্ঠানের একেবারে শেষে সমস্ত শিল্পীরা একসঙ্গে গাইলেন রাধা কৃষ্ণের মিলনের গান। শিল্পী এবং দর্শক সুরের এবং ভাবের এই মিলনমেলায় আবদ্ধ হলেন একে অপরের সঙ্গে।