বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৮, ২০২১

তিমির তীর্থ ভাগ-৯, সমাপ্ত পর্ব

প্রহ্লাদকে নীরব দেখে ললিতা বলল, “এসবের মধ্যে যে তুমি এসে পড়লে কী করে?”

“কী আশ্চর্য!” প্রহ্লাদ বিষাদ মাখানো হাসিতে বলল, “আমি ভেবেছিলাম যে অল্প আগে আমি যে কটা প্রশ্ন করলাম, তোমার মনেও সেই একই প্রশ্নের উদয় হবে,আর তুমি আমার থেকে সেগুলোর উত্তর চাইবে।তা না করে তুমি কিনা শুধোলে আমি এসবের মধ্যে এলাম কী করে?নিজের স্বার্থের প্রশ্ন যখন এসে পড়ে,তখন বেশিরভাগ মানুষের জন্যই জীবনের আর সব বড় বড় কথা অতি তুচ্ছ হয়ে যায় না? আরও শোন।আমার আজ সব কথা তোমাকে বলতেই হবে।দেশের আরও অনেক জায়গার মতো আমাদের এখানেও নিউ গুয়াহাটি স্টেশনের রেলওয়ে ইয়ার্ডে বছরের পর বছর ধরে এই দিনে ডাকাতি চলে আসছে। দেশের নানা জায়গা থেকে শতশত ওয়াগন এসে এখানে জমা হয়। সেগুলোতে গম,চাল,চিনি,মিঠাতেল,ডালডা আদি নানা খাদ্যসামগ্রী থাকে।এক সুসংগঠিত চোর আর ওয়াগন ব্রেকারের দল নিয়মিতভাবে সেখান থেকে সেগুলো বিক্রি করে কিছু ব্যবসায়ীকে বিক্রি করে।কিন্তু কখনওই তারা ধরা পড়ে না।কাগজে সবিস্তারে খবর বেরোলেও কোনও কাজ হয় না।পুলিশকে খবর দিলেও কোনও তদন্ত হয় না।তোমার মনে আছে কি আজ প্রায় বছর দেড়েক আগে যখন গুয়াহাটির খোলা বাজারে চালের দাম কিলোতে তিনটাকা হয়েছিল তখন একদিন একজন বিহারি মহিলা মাথায় একটা চালের বস্তা নিয়ে আমাদের ঘরে চাল বিক্রি করতে এসেছিল?দাম চাইছিল মাত্র দেড় টাকা?তোমার মনে কোনও প্রশ্ন জাগেনি?কিন্তু আমার জেগেছিল।কারণ অস্বাভাবিক কিছু একটা দেখলে প্রশ্ন করা আর উত্তর খোঁজাই আমার জীবিকা।আমি একজন সত্যান্বেষী সাংবাদিক।কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে এল।জানলাম, রেলওয়ের জিনিস চুরি করা ছোটো ছোটো চোরগুলো অনেক গরিব মহিলাকে কমিশন দিয়ে সেই চোরাই মাল বিক্রিতে নিয়োগ করে।কিলোতে দেড়টাকা দামে চাল বিক্রি করে পঞ্চাশ পয়সা সে মহিলাকে কমিশন দিলেও চোরগুলোর লোকসান কিছু নেই।কারণ তার জন্য তাদের পকেট থেকে একটা পয়সাও যায় নি।কিন্তু এগুলো হল খুচরো চোর। কোটি কোটি টাকার লেনদেন করা আসল বড় চোরগুলো তাদের চুরির মাল বিক্রি করে গুয়াহাটির অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীকে। কিন্তু তারা কখনোই ধরা পড়ে না।কারণ,কোটি কোটি টাকার এই পাপ ব্যবসার অংশীদার অনেকে।এ অংশীদারগুলো হল চোরের দল,ওয়াগন ব্রেকারের দল,রেল-কর্মচারী,রেলওয়ে প্রটেকশন ফোর্স,অসামরিক পুলিশ আর দেশের হর্তাকর্তা অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতা।দেখেও না দেখার ভান করে থাকার জন্য পুলিশ কমিশন পায় ওয়াগন ব্রেকার আর ব্যবসায়ীর থেকে।সেই পুলিশের মধ্যে যদি বা দুএকটা ব্লেকশিপ বেরোয়—যেমন ইন্সপেক্টর দয়াল হাজরিকা।যেসব মানুষ বিবেক নামের এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভোগে,তাদের নিজের দুঃসাহস আর স্পর্ধার মূল্য চুকোতে হয় নিজের প্রাণ দিয়ে।সরকার সব জেনে শুনেও কেন নীরব আর নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকে? কারণ সরকারের এই চোরাই মালের ব্যবসা করে কোটিপতি হয়েছে এমন ব্যবসায়ীর বেতনভোগী এজেন্টরা হচ্ছে সরকারের ভিত্তি।মানুষ ভাবে যে দেশ চালায় সে সরকার।কিন্তু সরকারকে চালায় কে? সরকার চালায় এই ব্যবসায়ীরা।এক এক জন ধনি ব্যবসায়ী এক দেড়শ নেতা-পালিনেতাকে পোষে। সংসার চালাবার খরচ থেকে আরম্ভ করে নির্বাচন খরচ পর্যন্ত, মাসে বিমানে দিল্লি যাওয়া আসার খরচ থেকে শুরু করে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, বিয়ের খরচ পর্যন্ত ---- আমাদের বেশিরভাগ দেশ নেতার সমস্ত আর্থিক দায়িত্ব বহন করে এ ব্যবসায়ীরা।কোনও কোনও সমাজবাদী দেশনেতার ছেলে কোন ব্যবসায়ীর ধনে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে এসেছে সে কথাও আমরা জানি।আমাদের বাইরেও হয়তো অনেকে জানে।কিন্তু একটা কথা বেশির ভাগ জানে না যে কোনও ব্যবসায়ীই সৎ উপায়ে অর্জন উপার্জন করা ধন এমন পরার্থে ব্যয় করে না।ভাড়াটে রাজনৈতিক দালাল পোষে রাখতেও ব্যয় করে না।চুরি-ডাকাতি করে উপার্জিত কালোটাকাতেই এরা দেশের শাসকদের কিনে রাখে।এ এক vicious circle বা দুষ্টচক্র।রাজনীতিকদের ব্যবসায়ীকে দরকার নিজেদের পরিবার চালাবার জন্য,ইলেকশন খেলার জন্য,রাজনীতি করবার জন্য।ব্যবসায়ীর রাজনীতিককে দরকার আইনের চোখে ধুলো দেবার জন্য,ধরা না পড়ে অবাধে পাপ ব্যবসা চালাবার জন্য।নিউ গুয়াহাটি রেলওয়ে ইয়ার্ডে চলা দিনে ডাকাতি কোনও দিন ধরা না পড়বার কারণ এটাই।এই দিনে ডাকাতি বাধা দেবার বা ধরার দায়িত্ব যাদের উপর সমাজ ন্যস্ত করেছে তাদের প্রত্যেকেই--- রাজনীতিক,সরকারি আমলা,পুলিশ—প্রত্যেকেই ওয়াগন ব্রেকার আর কালোবাজারির থেকে কমিশন পায়।এই পাপচক্রের প্রধান অস্ত্র দুটি --- টাকা আর হত্যা।তুমি যদি টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট না হও,তবে একমাত্র বিকল্প হল তোমাকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।কারণ মরা মানুষ কখনও কথা বলে না।দয়াল হাজরিকা মুর্খামি করে টাকাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিল।ফলে আজ তার হাড়ে ঘাস জন্মাচ্ছে।যেভাবে এ হত্যাকাণ্ডগুলো হয় সেগুলো ধরবারও কোনও উপায় নেই।কারণ এসব আকস্মিক মৃত্যু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বন্দুকের গুলি বা ছুরির আঘাত থাকে না।তুমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে,সাইকেলে বা স্কুটারে যাচ্ছ।হঠাৎ প্রচণ্ড বেগে ট্রাক একটা এসে তোমাকে পিষে গুড়িয়ে একটা মাংসপিণ্ডেপরিণত করে চলে গেল।”

ললিতা একটু নড়ে চড়ে দুহাতে প্রহ্লাদকে জোরে জড়িয়ে ধরল।

“এখন নিশ্চয়ই তুমি বুঝেছ।” প্রহ্লাদ বলে গেল, “আজ একই দিনে দেশনেতা জগন্নাথ চৌধুরী আর ‘নিনাও সর্দারে’র চিঠি দুটো আসার অর্থ কী? গত ছয় মাস ধরে আমি অবিরাম তদন্ত করে এই সমগ্র পাপচক্রের সমস্ত গোপন তথ্য উদঘাটন করেছি।আমার রিপোর্ট আমাদের প্রকাশ তো করলই না,বরং সেই কথা জগন্নাথ চৌধুরীকে জানিয়ে দিল।আমাদের কাগজে এই সব ভয়ঙ্কর তথ্য প্রকাশ হতে পারে বলে জগন্নাথ চৌধুরী এখন মোটেও ভয় করে না। তবুও সাবধানের মার নেই।আমার হাতে এই সব তথ্য থাকা পর্যন্ত সে বা তার অংশীদারেরা কখনও পুরো নিশ্চিন্ত হতে পারে না।আমি কৌশল করে অন্য কোনও কাগজে এই সব তথ্য প্রকাশ করবার ব্যবস্থা করতে পারি।জগন্নাথ চৌধুরীকে ব্লেকমেইল করতে পারি।তাই চিরদিনের জন্য আমার মুখ বন্ধ করতে তারা এক সঙ্গে দুদিক থেকে অস্ত্র শানাচ্ছে।একটা হল লোভনীয় চাকরির প্রলোভন।অন্যটা হল ‘সর্দারে’র চিঠির ভীতি প্রদর্শন।”

ললিতার সারা গায়ের উপর দিয়ে একটা ভয়ের শিহরণের ঢেউ খেলে গেল।সে প্রহ্লাদের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে আতঙ্কিত গলায় বলল,“ কিন্তু তুমি যে বললে,---তারা পুলিশ ইন্সপেক্টর দয়াল হাজরিকাকে হত্যা করছে।তুমি যদি জগন্নাথ চৌধুরীর প্রস্তাবে সম্মত হয়ে চাকরিটা না নাও,তুমি যদি চুপচাপ থাকো...।”

“তবে তুমি একদিন খবর পাবে যে তোমার স্বামী প্রহ্লাদ হাজরিকা পথে লরি চাপা পড়ে মাংসপিণ্ডে পরিণত হল।” প্রহ্লাদ এক তিক্ত নির্মম হাসি হাসল।

দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল।

ললিতার ভয়ে কেঁপে উঠা রুগ্ন বুকের ঢুক ঢুক শব্দগুলো প্রহ্লাদের কানে পড়তে শুরু করল। কিন্তু হঠাৎ সে ললিতার প্রতিও নির্মম হয়ে উঠল।ওর যতগুলো দুঃখ পাবার আছে একসঙ্গেই পাক।একটু একটু করে পেয়ে কী লাভ? সে আবার বলতে শুরু করল,“শোন ললিতা,কথা শেষ হয় নি। আরও কথা আছে।গেল কদিন ধরেই শুনছি আমাদের কাগজটা যেকোনও দিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।কাগজটা অনেক লোকসানে চলছে।সার্কুলেশন দ্রুত কমে আসছে।সম্পাদক সরকারের সঙ্গে একটা গোপন চুক্তি করেছে।আগামী ছয়মাসের মধ্যে রাজ্যসভাতে অসমের এক আসন শূন্য হবে।এই ছয়মাসের মধ্যে আমাদের সম্পাদক সরকারের এমন একটা উপকার করে দেবে যে --- আমার রিপোর্টটা প্রকাশ না করে ইতিমধ্যেই একটা উপকার তো করেইছে--- তাঁকে রাজ্যসভাতে কংগ্রেসের মনোনয়ন দেওয়া হবে।কাগজের মালিককে প্রেসটা বড় করবার জন্য সরকার একটা বড় রকমের ঋণ দেবে।খবরের কাগজের লোকসানি ব্যবসা ছেড়ে সে সরকারের বড় বড় কাজের ঠিকা পাবে। মরবে তবে কে? তোমার স্বামীর মতো কয়েকটি হতভাগা। তোমার সামনে এখন জীবন মরণ সমস্যা।একদিকে হত্যার হুমকি আর কর্মচ্যুত হবার নিশ্চিত সম্ভাবনা।অন্যদিকে জগন্নাথ চৌধুরীর এগিয়ে দেওয়া পনেরোশ টাকা মাইনের চাকরি।গোটা জীবন আদর্শের কথা বললে। আমিও বললাম।তথাকথিত আদর্শের নামে সর্বস্ব ত্যাগ করেও আর চরম দুঃখব্রত বরণ করে নিয়েও কারও থেকে একদিনের জন্যও কোনও স্বীকৃতি পাইনি।একটা প্রশংসারউক্তি শুনি নি।বরং জীবন জুড়ে শুনতে হয়েছে নিন্দার শরাঘাত।পান করতে হয়েছে ঈর্ষা আর সন্দেহের হলাহল।সেসবও সহ্য করতাম,যদি দেখতাম যে সমগ্র জীবন ধরে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে করা যুদ্ধে একটাও অন্যায়ের প্রতিকার করতে পেরেছি।বরং আমার সমস্তআঘাত হাতির পিঠে অঙ্কুশের মারের থেকেও নিষ্ফল আর অসার প্রতিপন্ন হয়েছে।তবুও আমার একটা সান্ত্বনা ছিল।অন্যে যে যাই বলুক আমি নিজে বিশ্বাস করি যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,অন্যায়ের প্রতিকার করতে না পারলেও বা অন্যায়কারীকে শাস্তি দিতে না পারলেও প্রতিবাদ যে করে তার মনটা অন্তত মহৎ হয়ে থাকে।এ তার নৈতিক জীবনকে বলবান করে তুলে।মানুষের হৃদয়ে প্রতিবাদের তুষের আগুনটুকু জ্বালিয়ে রাখে। অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে একদিন তার থেকেই দাবানল জ্বলে উঠবে।সেই আগুন নিশ্চয় একদিন পুঞ্জিভূত পাপ আর অন্যায় অবিচারকে পুড়িয়ে ছাই করবে।আর কিছু করতে না পারলেও আমি এই তুষের আগুনটা জ্বালিয়ে রেখেছিলাম। ‘মানুষের আত্মাকে রক্ষা করতে না পারলেও তাকে রক্ষা করবার জন্য যোগ্য করে রেখেছিলাম।’ কিন্তু আজ তো আমার চরম সর্বনাশ উপস্থিত। আর এক সপ্তাহ বা এক মাসের পর আমি হয় সপরিবারে পথের ভিখিরি হব অথবা ‘সর্দারে’র লরির তলায় চাপা পড়ে পথের কুকুরের মতো মৃত্যু বরণ মৃত্যু বরণ করব।কিন্তু এখনও আমার হাতের মুঠোয় আছে জগন্নাথ চৌধুরীর পনেরোশ টাকা মাইনের চাকরির প্রস্তাবটা।ললিতা,আমার সহধর্মিণী,আমার জীবনের এই ধর্ম সংকটের সময় তুমি আমাকে কী করতে উপদেশ দাও?”

ললিতা অনেকক্ষণ নীরব থেকে পরে বলল,“জীবনে কোনোদিনই তোমাকে উপদেশ দেবার ধৃষ্টতা আমার হয়নি। আজও হবে না।তুমি কখনও ভুল করনা—এই বিশ্বাসই আমার জীবনের ধ্রুবতারা। ... আমি বুঝতে পারছি, আমাদের জীবনে এক বড় পরীক্ষার সময় উপস্থিত হয়েছে।সে পরীক্ষার ফলাফল পৃথিবীর কাউকে স্পর্শ করবে না।কারও জীবনে তিলমাত্র ক্ষতিবৃদ্ধি ঘটাবে না।কিন্তু আমাদের এ ছোট্ট গরিব পরিবারটার জন্য এ জীবন-মরণ সমস্যা। ... তুমি নিজে কী করবে বলে ভেবেছ?”

প্রহ্লাদ হঠাৎ বিছানার থেকে উঠে গিয়ে লাইটটা জ্বালাল আর টেবিলে পড়ে থাকা দুটো চিঠি তুলে নিয়ে পরম ঘৃণায় টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল।ললিতা মশারির ফাঁক দিয়ে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চিরকালের পরিচিত মানুষটাকে হঠাৎ আর খুব অচেনা যেন লাগল।প্রহ্লাদের মুখের থেকে এমন এক জ্যোতি বেরোতে শুরু করেছে যা সে এর আগে কোনও দিন দেখেনি।প্রহ্লাদ লাইটটা নিভিয়ে আবার বিছানায় এল।কিছুক্ষণ চুপথেকে বলল – নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের ভেতর থেকে ওর স্বর যেন গলার থেকে না বেরিয়ে বহু উপরের কোনও অশরীরী কণ্ঠের থেকে বেরোচ্ছে যেন মনে হল,“ললিতা এমন এক সংকট আমার জীবনে কোনও দিনই আসে নি।অতীতেও হাজারো মানুষের জীবনে এসেছিল। ভবিষ্যতেও হাজারো মানুষের জীবনে আসবে।প্লেটোর রিপাবলিকে আডিমেণ্টাস দুজন মানুষের জীবনের ছবি এঁকেছেন। একজন ভয়ঙ্কর পাপী আর শয়তান। কিন্তু তার জীবন অতিবাহিত হল পরম সুখে।মৃত্যুর মুহূর্তেও সে লাভ করল সমস্ত মানুষের শ্রদ্ধা আর সম্মান।অন্যজন সারাজীবন অশেষ দুঃখ বরণ করে সৎ পথে থেকেও সবার থেকে পেল শুধু নিন্দা,অপবাদ আর ধিক্কার।কেবল তাই নয়,শেষ অব্দি তাকে ক্রুশে বিঁধে হত্যা করা হল।এ দুজনের নমুনা দেখিয়ে আডিমেণ্টাস প্লাটিনাসকে জিজ্ঞেস করলেন,‘তুমি এই দুয়ের মধ্যে কোন জীবনটা বেছে নেবে?’ প্লাটিনাস উত্তর দিল, ‘যে মানুষ শুধু সততার জন্যই সৎ জীবন বেছে না নেয়, অর্থাৎ কোনও পুরস্কারের আশাতে সৎ জীবন কামনা করে,তেমন মানুষ আসলে কখনোই সৎ জীবন কামনাই করে না।’

কিছু সময় পরেই প্রহ্লাদ গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল।তার নাক দিয়ে মৃদু ঘর্ঘরধ্বনি বেরোতে শুরু করল।ললিতার চোখে অনেকক্ষণ ঘুম এল না।অনাগত অনাহার আর দুঃখ কষ্টের দিনগুলো ওর চোখের সামনে ভাসতে শুরু করল।কিন্তু কী আশ্চর্য! সে সামান্যও ভয় পায়নি।প্রহ্লাদের দেহের ছোঁয়াতে যেন কী এক অমৃত ছিল, সেই অমৃত তার মনটাকে অভয় আর আনন্দে ভরিয়ে তুলল।সুপ্ত সন্তানের চুমো খাবার মতো সে প্রহ্লাদের ঠোঁটে আলতো করে একটা চুমো খেল।তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে সেও নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে গেল।



সমাপ্ত



(অনুবাদের কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল প্রায় আঠারো বছর আগে ২৬ জানুয়ারি, ২০০৩-এ। এখন সম্পাদনা সংশোধনী সহ প্রকাশিত হল মাত্র)