বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৮, ২০২১

তিমির তীর্থ ভাগ-৮

আট

প্রহ্লাদ রাত করে ঘরে ফিরে দেখে ছেলেমেয়েরা শুয়ে গেছে। ললিতা বিছানায় বসে ওর ছেঁড়া পেটিকোট একটা সেলাই করছে। সেলাই থেকে মাথা না তুলে প্রহ্লাদকে জিজ্ঞেস করল, “এত দেরি হল কেন?”

ললিতার এত শুকনো ঠাণ্ডা গলা প্রহ্লাদ অনেকদিন শোনেনি।গায়ের কাপড় খুলতে খুলতে সে চুরি করে দু-একবার ললিতার দিকে তাকাল।অনেকদিন রোগে ভোগে এই মাত্র উঠে বসা মানুষের মতো তাকে ক্লান্ত রোগা আর দুর্বল দেখাচ্ছিল। আজ নিশ্চয়ই ওর শরীর মনের উপর দিয়ে ধকল একটা গেছে---প্রহ্লাদ মনে মনে ভাবল। সে শান্ত গলাতে বলল,“এই আজ দেরিই হয়ে গেল।অনেকদিন পর প্রভাতের ওখানে গেছিলাম। ওখানে কথা বলতে বলতেই...”

তার কথা ফুরোতে না দিতে ললিতা মাঝপথেই বলল,“কোনও ভাবে জানছিলে যে আজ ঘরে চাল নেই,আমার হাতে পয়সা একটাও নেই,আজ ঘরের মালিকও ভাড়া খুঁজতে আসবে, তোমার সেই জগন্নাথ চৌধুরী না কাকতি লিডারটাও তোমার সন্ধানে আসবে---সে জন্য সব আপদ আমার উপর ঠেলে বন্ধুর ঘরে পালিয়ে বেড়ালে।”

কিছুক্ষণেরে জন্যে প্রহ্লাদ স্তব্ধ হয়ে গেল।অনেকদিন ললিতার মুখে এমন রূঢ় কথা শুনেছে বলে তার মনে পড়ে না। আজ পুরো দিনটাই তার উপর কোন কুগ্রহ চেপেছে বুঝি?বাইরে বেরিয়ে গেল--- প্রফেসর চৌধুরীর মুখে শুনতে পেল সেই বুকের রক্ত জল করা কথা কটি। কষ্টেসৃষ্টে বাড়ি ফিরে এল তো চির মমতাময়ী মৃদুভাষিণী স্ত্রীর মুখে শুনতে হল কখনও না শোনা রূঢ় কথা।মিথ্যে অভিযোগ।হঠাৎ এক বিরাট অবসাদ তাকে গ্রাস করতে শুরু করল।সেখানেই বসে পড়বার ইচ্ছে হল। কোনোক্রমে দাঁড়িয়ে থেকে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাল।আবিষ্কার করবার চেষ্টা করল রাগটা কৃত্রিম অর্থাৎ কেবল অভিনয় কি না। কিন্তু সে হতাশ হল।ললিতার শীর্ণ শুকনো মুখটাতে সত্যি সত্যি এক যন্ত্রণা আর ক্রোধের আভা ফুটে উঠেছে।হঠাৎই নিজেকে সে ভীষণ নিঃসঙ্গ অনুভব করল।তার শেষ আশ্রয়ও যেন ভেঙে চুরমার হবার জোগাড়।সেও ভারি গলায় বলল,“জগন্নাথ চৌধুরী কিছু বলে গেছে কি?”

ললিতা বলল,“চিঠি একটা লিখে রেখে গেছে। সেটি টেবিলের উপরে আছে।”

চিঠিটা দেখবে বলে সে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।কিন্তু টেবিলে চোখ পড়ার আগেই পড়ল ললিতার মুখের দিকে। ললিতার কথাগুলো যেন এখনও সে বিশ্বাস করতে পারে নি।কাছে থেকে আলোতে ললিতার মুখের দিকে ভালো করে তাকালে তার নজরে পড়ল---অস্বাভাবিক লাল দেখাচ্ছে।কপালের ডান দিকে রগ একটা ফুলে রীতিমত নাচছে।চিঠির কথা ভুলে সে ললিতার কপালে হাত দিল।জ্বরে মুখটা ওর পুড়তে শুরু করেছে।সে এক অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠল,“ইস!ললিতা!তোমার দেখছি মস্ত জ্বর উঠেছে।”

“জ্বরই উঠল বোধহয়।” ললিতা আগের চে’ কোমল গলায় বলল,“জ্বর থেকেও মাথার ব্যথা আরও কাহিল করেছে। আমি সেই কখন শুয়ে পড়তাম।তোমার পথ চেয়ে শুধু বসে আছি।কিছু একটা অল্প রেঁধে রেখেছি।তুমি খাও।আমি আর আজ খেতে পারব না।”

ললিতা শুয়ে পড়তে তৈরি হল।

প্রহ্লাদ জগন্নাথ চৌধুরীর চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল,“প্রিয় প্রহ্লাদবাবু,আপনার সিদ্ধান্তটা জানতে এসেছিলাম। মুখ্যমন্ত্রী বড় তাগাদা দিচ্ছেন।তা আমারই দুর্ভাগ্য যে আপনাকে পেলাম না।এক জরুরি সামাজিক অনুষ্ঠানে আমি কাল শিলং যাচ্ছি।দিন তিনেক পরে ফিরে আসব।এসেই আপনার সঙ্গে দেখা করব।আশা করি,দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে আপনি আমাদের নিরাশ করবেন না।”

প্রহ্লাদ রান্নাঘরে গেল।টেবিলে তার ভাত ঢাকা।ঢাকনা তুলে দেখে---ভাত,অল্প ডাল আর সামান্য আলু ভাজা। কিছুক্ষণ সে চেয়ারটাতে এমনি বসে রইল।তারপর ভাত ক’টা আবার ঢেকে রেখে বেরিয়ে গেল।মানিক-মুনমুনদের কাল সকাল বেলা যদি খাবার কিছু না থাকে তবে এ ভাতগুলোই কাজে আসবে।

সে বিছানাতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ললিতা বলল,“আজ তোমার এত তাড়াতাড়ি খাওয়া হয়ে গেল?”

প্রহ্লাদ বলল,“কেন,যেটুকু সময় লাগে,সেটুকুই তো লাগল।” অনেকক্ষণ দুজনে নীরব আর নিশ্চল হয়ে পড়ে রইল। নীরবতা এর গম্ভীর হয়ে পড়েছিল যে ললিতার বুকের ধুকপুক শব্দটাও প্রহ্লাদ যেন শুনতে পাচ্ছিল।এমনটা ওর মনে হচ্ছিল। হঠাৎ সে অনুভব করল এ নীরবতা দুজনের মাঝে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।জীবনে এতটা নিঃসঙ্গ সে কক্ষনো অনুভব করে নি। তার পুরো শরীরে একটা গোপন ভয়ের শিহরণ ঢেউ খেলে গেল।সবাই তাকে ত্যাগ করেছে।সংসার ত্যাগ করেছে।আদর্শ ত্যাগ করেছে।যৌবন ত্যাগ করেছে।শেষ আশ্রয় ছিল ললিতা।শেষ অব্দি সেও না ত্যাগ করছে।সে হাতটা মেলে ললিতার কপালটা ছুঁল। জ্বরে ওর শরীর পুড়ে যাচ্ছে যেন।অপুষ্টি আর হাড়ভাঙা খাটুনি মানুষটাকে অকালে বুড়ি আর বেমারি করে ফেলেছে।জীবনে অনেকবার মুখোমুখি হওয়া প্রশ্নটা আবার একবার তার মনে জেগে উঠল।জীবনের ঠিক কী আদর্শের বেদীতে সে তার ভালোবাসার মেয়েটিকে বলি দিচ্ছে?চেখভের ‘আঙ্কল ওয়ানিয়া’ নাটকের সেই অক্ষম আত্মপ্রতারক লেখকের কথা আরও একবার তার মনে পড়ল।বেচারি স্ত্রীটি ভাবছিল তার স্বামী মস্ত বড় লেখক,সমস্ত জীবন সে এক মাস্টারপিস লেখার কাজে উৎসর্গ করেছে।এ ধারণার বশবর্তী হয়ে সে তার স্বামীর জন্যে পুরো জীবনপাত করল।পরে জীবন সন্ধ্যায় এসে দেখা গেল যে স্বামীটির বিন্দু মাত্র প্রতিভা ছিল না।এক দুঃসাধ্য নিষ্ফল কাজে সে নিজের জীবনটা তো অপচয় করলই সঙ্গে স্ত্রীর জীবনটাও সমূলে ধ্বংস করল।সে কি নিজেও আজ ঠিক তাই করছে না?ললিতার জ্বরতপ্ত কপালে হাত বুলিয়ে প্রহ্লাদ ডাক দিল,“ললিতা!”

প্রহ্লাদের আর কিছু বলতে হল না।ললিতা বলে ডাক দেবার সঙ্গে সঙ্গে ও তার মনে জমা হওয়া সব কথা যেন বুঝে নিল।মান-অভিমান সব ভুলে সে স্বামীর বুকের কাছে চেপে এল আর দু-হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,“আমার আজ বড় ভয় হচ্ছে,ভয়ে আমার জ্বর উঠে গেছে।”

“ভয়?” প্রহ্লাদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,“কীসের ভয়?” ললিতা বুকের মধ্যে থেকে চিঠি একটা স্বামীকে দিয়ে বলল,“এই চিঠিটা পড়ে দেখ।তুমি বেরিয়ে যাবার পরে পরেই পিয়ন দিয়ে গেল।কী ভেবে যেন চিঠিটা আমি খুলে পড়লাম, বলতে পারব না।কিন্তু এখন ভাবছি পড়ে ভালোই করলাম।না হলে এ চিঠিটার কথা তুমি নিশ্চয়ই আমার কাছে বলতে না চেপে যেতে।” বিস্ময়ে প্রহ্লাদ কিছুক্ষণ প্রহ্লাদ হতভম্ব হয়ে রইল।তারপর কম্পিত বুকে বিছানার থেকে উঠে এল।আলো জ্বেলে চিঠিটা পড়তে শুরু করল।

প্রিয়

প্রহ্লাদ হাজরিকা,

আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী।সে জন্যই আপনাকে সময় থাকতে সাবধান করে দিতে চাইছি।আপনি কারও কথা না শুনে যে তদন্তে নেমেছেন,সে তদন্ত এই চিঠি পাবার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করুন।অন্যথা আগামী দুমাসের মধ্যে আপনার পত্নী অকাল বিধবা হবে।এ সাবধানবাণীকে স্রেফ এক ঠাট্টা ভেবে যদি আপনি উড়িয়ে দিতে চাইছেন তবে একটা কথা আপনার মনে পড়িয়ে দেই।আপনার নিশ্চয় মনে আছে,আজ প্রায় দুমাস আগে পুলিশ ইন্সপেক্টর দয়াল হাজরিকার একটা স্কুটার দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়। আমাদের সাবধানবাণী না শোনার জন্যেই বেচারার এমন করুণ মৃত্যু হতে পারল। যে কোনও মুহূর্তে এমন আরও এক দুর্ঘটনা হতে পারে।গুয়াহাটির পথে এমন দুর্ঘটনায় কত মানুষ মরে কেবা তার খবর রাখে?এমনকি পুলিশের লোক দেখানো তদন্ত একটাও হবে না।আপনাকে আমাদের এই প্রথম আর শেষ সাবধানবাণী।আপনার পত্নী অকালে বিধবা হয়ে পথের ভিখারি হোন, এ আমরা চাই না।

ইতি

আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী

‘সর্দার’

চিঠিটা পড়ে শেষ করে প্রহ্লাদ আরও একবার পড়ল।ললিতার কথা একেবারে ভুলে গিয়ে সে কিছুক্ষণ থমকে রইল। হঠাৎ একবার ললিতার গলা শুনে সে চমকে উঠল,“তুমি বিছানায় উঠে এস।আমাকে এসে কথাগুলো বল।”

টেবিলের দেরাজে চিঠিটা রেখে সে আবার বিছানায় পড়ল।ললিতা তাকে জড়িয়ে ধরে আর্তস্বরে বলল,“মাণিক মুনমুনের শপথ নিয়ে বলছি,আমাকে সব কথা খুলে বল।একটাও কথা আমার থেকে লুকোতে পারবে না।বল,বলছি না। তাত্তাড়ি বল। বল না কেন?”

হঠাৎ সে হুক হুক করে কাঁদতে শুরু করল।

ললিতার পিঠে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে প্রহ্লাদ কিছুক্ষণ নীরব রইল।মনে মনে সে ভাবতে শুরু করল,“কী আশ্চর্য যোগাযোগ!জগন্নাথ চৌধুরীর স্বনামা চিঠি আর সর্দারের বেনামা চিঠি—দুটোই একসঙ্গে এল।দুজন নিশ্চয় পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করে চিঠি দুটো লেখেনি।অথচ দুজনের উদ্দেশ্য একই।শুধু কৌশল আলাদা।একজন ভীতি প্রদর্শন করছে,অন্যজনেপ্রলোভিত করছে।এই ভীতি প্রদর্শন যে ধোড়া সাপের ফিসফিসানি নয়,বিষধর কালান্তক শাপের দংশনোদ্যত প্রস্তুতি সে কথা আমি ভালো করেই জানি।একদিন আমি রাস্তায় হেঁটে যাবার সময় এক দ্রুতগামী লরি এসে আমাকে ধাক্কা দিয়ে পিষে গুড়িয়ে চলে যাবে,পরদিন খবরের কাগজে বেরোবে যে রাস্তায় লরি দুর্ঘটনায় সাংবাদিক প্রহ্লাদ হাজরিকার মৃত্যু।ইন্সপেক্টর দয়াল হাজরিকার মৃত্যুও এভাবেই হয়েছিল।নগরওয়ালা মামলার তদন্ত করেছিলেন যে পুলিশ আধিকারিককাশ্যপ---তাঁরও মৃত্যু এভাবেই হয়েছিল।ভারতে ফিজিক্যাল এনিহিলেশনের এই এক নয়া খেলা শুরু হয়েছে।কোনও সন্দেহ নেই যে আজ আমার বিরুদ্ধে ডেথ সেন্টেন্স,মৃত্যু দণ্ডাজ্ঞা জারি হয়ে গেল।আজ থেকে আমি ফাঁসির অপেক্ষমান কয়েদি।খুব শীঘ্রই আমাকে করণীয় কী তা ঠিক করে নিতে হবে।”

ললিতা গায়ের জোরে তাকে ঝাঁকিয়ে বলল,“তুমি চুপ করে আছ কেন?কিছু একটা আমাকে বল না কেন? মনে রেখো,আমি তোমাকে মানিক আর মুনমুনের শপথ দিয়েছি।”

প্রহ্লাদ শান্তভাবে বলল,“অধৈর্য হয়ো না ললিতা।জীবনে আমি তোমার থেকে কোনও কথা গোপন করিনি।আজও করব না।কিন্তু আমার কথাগুলো বলবার আগে জীবনে অনেকবার করা প্রশ্ন আজ আর একবার করছি।আজ আমরা দরিদ্র। কিন্তু তুমি জান,এ দারিদ্র্য আমরা স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছি।আমাদের গ্রামে থাকা লাখ টাকার পৈত্রিক জমিবাড়ি যখন আমি আমার ভূমিহীন আধিয়ারদের দান করে দেই তুমি তখন বাধা দাও নি।বরং উৎসাহ দিয়েছিলে। কেন?”

ললিতাও সমান শান্তভাবে উত্তর দিল,“পৃথিবীতে ধনসম্পত্তি থাকা মানুষ অনেক আছে।কিন্তু হৃদয় থাকা মানুষের সংখ্যা অতি নগণ্য।গতানুগতিক জীবনে ধরাবাঁধা পরিচিত পথ পরিহার করে নিজের জন্য আলাদা পথ কেটে নিয়ে পারা মানুষ খুব কম। কোটির মধ্যে কখনও বা একজন বেরোয়।আমার বাবা ছোটো থাকতে আমাদের রামায়ণ মহাভারত পুরাণ উপনিষদের অনেক সুন্দর গল্প বলে বলে নীতিশিক্ষা দেবার চেষ্টা করতেন।তারই একটা গল্প আমার ভাবপ্রবণ কোমল মনে বড় রেখাপাত করেছিল।ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য যখন তাঁর সমস্ত সম্পত্তি গরু গাড়ি দুই পত্নীর মধ্যে ভাগ করে দিয়ে স্বয়ং বনবাসী হতে যাচ্ছিলেন তখন দ্বিতীয়া পত্নী মৈত্রেয়ী তাঁকে বললেন,‘যেনাহং নামৃতস্যাম কিমহং তেন কূর্যাম’—যার দ্বারা অমৃত লাভ হয় না,তাই নিয়ে কী করব? আমি ধনসম্পত্তি চাইনি,চেয়েছিলাম তোমাকে।”

প্রহ্লাদ বলল,“সে ছিল বালিকা বয়সের ভাবপ্রবণ হৃদয়ের কথা।জীবনের একটা সময় অনেক লোকই এরকম ভাবে। প্রাণশক্তির প্রাচুর্যের মানুষ তখন পার্থিব সুখ-সম্ভোগ,ধনসম্পদকে অতি তুচ্ছ বলে গণ্য করে।এক অপার্থিব জগৎ তখন মানুষকে দু’হাত তুলে ডাকে।কিন্তু উষার ভুবনমোহিনী সোনালি আলো মানুষের মনে যে অপার্থিব আবেগ জাগিয়ে তুলে,ভর দুপুরের অগ্নিবর্ষী সূর্য সেই একই আবেগকে কখনোই জাগিয়ে তুলতে পারে না।সে বরং চোখকে দগ্ধ করে।দেহমনকে ক্লান্ত করে। জগন্নাথ চৌধুরীর মতো যে দেশসেবক একদিন যৌবনের আবেগে ব্রিটিশ সরকারের হাকিমের পথ ত্যাগ করে লৌহ শৃঙ্খল আর কারাগার বরণ করে নিয়েছিল,সমগ্র জীবন বিপন্ন করেছিল,সেই মানুষটা আজ পঞ্চায়েতের সভাপতির পদ একটাও ত্যাগ করতে পারে না।সত্য বল ললিতা,আজ তুমি যখন পেট ভরে খেতে পাও না,টাকার অভাবে রোগের চিকিৎসা করতে না পেরে তিলে তিলে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাও,সন্তানের সামান্য আশা আকাঙ্ক্ষাও পূরণ করতে পার না,আর যখন বিশেষ করে জান যে এই সমস্ত ত্যাগ আর কৃচ্ছ্রসাধন একেবারেই অর্থহীন,তা দিয়ে নিজের বা সংসারের বিন্দুমাত্র কল্যাণ হয় নি,তখনও তোমার সামান্যও অনুতাপ হয় কি না?জীবনটা নতুন করে আরম্ভ করতে,অভাবমুক্ত জীবন একটা পেতে,জীবনে সামান্য সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের মুখ দেখতে তোমার একবারও ইচ্ছে হয় না?”

ললিতা কোনও কিছু না ভেবে উত্তর দিল,“ইচ্ছে হলই বা।কিন্তু সেই সুযোগ এখন পাব কী করে? জীবনের এখন শেষ সময়। ফুরিয়ে যাবার সময় হল।এখন আর জীবনটা নতুন করে আরম্ভ করার কথা ভাবতে পারি কী করে?”

ললিতার কথাগুলোর আসল অর্থ বুঝে নিতে প্রহ্লাদ কিছু সময় নিল।তারপর খুব ধীরে ধীরে সে বলল,“তাহলে একটা সুযোগ যদি আসে তুমি নেবে?”

হঠাৎ পরিবেশ লঘু করবার চেষ্টা করে ললিতা অল্প হেসে নিয়ে বলল,“লটারিতে লাখ খানিক পেলে বুঝি?তার বাইরে তো আমাদের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনও উপায় আমি দেখছি না। ... কিন্তু দাঁড়াও!এসব গাঁজাখুরি গল্প বলে তুমি আমাকে আসল কথাটা ভোলাবার চেষ্টা কর না।আমাকে সেই চিঠিটার কথা বল।তুমি এমন কি করেছ –যার জন্য সর্দার না কি সেই লোকটা আমাকে বিধবা করেই ছাড়বে?” ওর কথায় আগের ভয় আর উৎকণ্ঠা পুরোটাই আবার ঘুরে এল।

ললিতার এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল।সে উত্তেজিত হয়ে বলল,“তুমি যে ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে দীর্ঘ ভূমিকা জুড়ছ,আসল কথাগুলো তাড়াতাড়ি বল না কেন? এমন এক চিঠি পাবার পর মেয়ে মানুষের মনের অবস্থা কী হতে পারে তুমি কল্পনা করতে পার না কি? তোমার থেকেআর কোনও কথা শুনতে চাই না।এখনই আমাকে তোমার আসল কথাটা বলতে হবে।”

প্রহ্লাদ দীর্ঘ এক শ্বাস ছেড়ে বলল,“শুনতেই যদি চাইছ তবে শোন।সংক্ষেপেই বলছি।খুব টায়ার্ড ফিল করছি।বেশি কথা বলবার শক্তি নেই শরীরে।তুমি জান যে আমাদের দেশে মাল পরিবহনের প্রধান উপায় রেলগাড়ি।রেলের এই মালগাড়ি করে যত জিনিস আনা হয় তার আধাটাই কিন্তু গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছয় না।আধা জিনিসই মাঝপথে চুরি হয়।যে দুর্বৃত্তরা কাজটা করে তাদের ওয়াগন ব্রেকার বলে।রেলের ওয়াগন ভেঙে তারা লাখ লাখ টাকার জিনিস কতগুলো অসৎ ব্যবসায়ীকে সস্তা দামে বিক্রি করে।ব্যবসায়ীরা আবার সেগুলো চড়া দামে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মুনাফা করে।এক বিশাল আর দুর্জেয় পাপচক্র দীর্ঘকাল ধরে সারা দেশে এই বেপরোয়া দিনে ডাকাতি করছে।এর ফলে কী বিপুল পরিমাণের জাতীয় ক্ষতি হয় তার হিসেব পাওয়াও দুষ্কর।জিনিসের কৃত্রিম অভাব হয়।মূল্যবৃদ্ধি হয়।কালোটাকার পাহাড় সৃষ্টি হয়।রেলওয়ের যে বিরাট আর্থিক ক্ষতি হয় তা পূরণ করা হয় যাত্রীভাড়া আর কর বৃদ্ধি ইত্যাদি করে।অথচ এসব কুকর্ম কখনও ধরা পড়ে না কেন?সরকার বছরের পর বছর ধরে এই সব ভয়ঙ্কর দিনে ডাকাতি অসহায় দর্শকের মতো চেয়ে দেখে কেন? পুলিশে খবর দিলে এই সব ওয়াগন ব্রেকার ধরা দূরের কথা,সামান্য একটা তদন্তও হয় না কেন?সশস্ত্র রেলওয়ে প্রটেকশন ফোর্সের চোখে ধুলো দিয়ে দিনে দুপুরে রেল ওয়াগন থেকে হাজার হাজার টন জিনিস পত্র উধাও হয়ে যায় কী করে?”

এক সঙ্গে অনেকগুলো কথা বলে প্রহ্লাদ বোধ হয় সামান্য ক্লান্ত হল।কিছু সময় নীরব হয়ে থেকে সে দুই একবার দীর্ঘ শ্বাস নিল তার মনে পড়ল যে আজ তার পুরো দিনটা মানসিক অশান্তি আর উত্তেজনার মধ্য দিয়ে গেছে।আজ রাতে সে ভাত খায় নি।ভাঙা শরীর আর মন নিয়ে ঘরে ফিরে এসে ললিতাকে রুগ্ন আর মৃতপ্রায় অবস্থাতে দেখে আজ তার দুঃখের পাত্র উপচে পড়ছে।কথা বলবার ইচ্ছে তার একেবারেই হচ্ছিল না,প্রতিটা শব্দ উচ্চারণে তার ক্লান্তি বাড়ছিল।তার শুধু ইচ্ছে হচ্ছিল চিরদিনের মতো সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যেতে।জীবনের সংগ্রামে চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করে নিতে। কিন্তু সে অনুভব করল,ললিতা প্রায় রুদ্ধ শ্বাস নিয়ে তার কথা শোনার জন্যে কান খাড়া করে রেখেছে।যদি সে আজ চুপ করে থাকে পুরো রাত ওর শোয়া হবে না। পুরো জীবন নীরব যন্ত্রণায় ছটফট করে মরবে।


(আগামী সংখ্যাতে শেষ)