রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

তিমির তীর্থ, দ্বিতীয় ভাগ

ওদের সকলের বিছানা এক-ই ঘরে ।

এক বড় বিছানায় মা আর সন্তানেরা শোয়। আর একটি বিছানাতে প্রহ্লাদ একা শোয়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ বই পড়ার অভ্যাস আছে ললিতার। কিন্তু আজ বিছানাতে পড়েই আলো বুজিয়ে দিল। কতক্ষণ নীরবে পড়ে রইল। অল্প পরে গভীর ঘুমে মানিক মুনমুনের শ্বাস নেবার শব্দ পাওয়া গেল। প্রহ্লাদ মনে মনে এক মৃদু আতঙ্ক অনুভব করল।এতক্ষণ ধরে যা নিয়ে সে ভয় করছে তা নিশ্চয় আর কয়েক মুহূর্তে ঘটবেই। ললিতা তাকে জিজ্ঞেস করবে,“সন্ধ্যাবেলা যে লোকটা এসেছিল সে সত্যিই কী বলে গেছে, বল।” সাধারণত প্রহ্লাদ এই সময়ের জন্যে সারাদিন জুড়ে মধুর আশায় পথ চেয়ে থাকে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঘুম না আসা অব্দি দু-জনে একথা ওকথা কয়ে থাকে। প্রহ্লাদ ললিতাকে শোনায় সারাদিনের তার অভিজ্ঞতার কথা---কার সঙ্গে কোথায় দেখা হল,কে তাকে কী বলল,কোথায় কার সম্পর্কে কী শুনতে পেল—এই সব।

ললিতাও তাকে বলে দিনটাতে সে কী কী করল,দুপুর বেলার খাবার পর কী বই পড়ল,ঘরে কে কে এসেছিল,পাড়ার প্রতিবেশীদের সম্বন্ধে নতুন কী কী কথা কানে এল ইত্যাদি। দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা যখন ফুরিয়ে যায় তাদের মন তখন উড়ে যায় কখনও বা অতীতের বুকে, কখনও বা ভবিষ্যতে। তাদের মনে পড়ে বিয়ের আগের প্রেম পর্বে এক অরণ্যে ঘুরতে গিয়ে চুমু খেতে যাচ্ছে,তখনই এক কাঠবেড়ালি ঝোপের থেকে বেরিয়ে কেমন তাদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।এক পূর্ণিমা রাতে দু-জনে হাত ধরাধরি ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার বেলা হঠাৎ এক অপার্থিব, অনির্বচনীয় অনুভূতি কেমন করে এক পলকা বাতাস যেমন হঠাৎ এসে গাছের পাতা,তৃণের ডগা দুলিয়ে দিয়ে যায়---তেমনি তাদের দুটি শরীর কাঁপিয়ে দিয়ে গিয়েছিল।একবার অভিমান করে ললিতা এক সপ্তাহের জন্যে প্রহ্লাদের কাছে আসে নি। চিঠিও লেখেনি। তাতে সে ব্লেড দিয়ে কেমন করে আঙুল কেটে রক্ত দিয়ে ললিতাকে চিঠি দিয়েছিল।যৌবনের সেই সব উন্মাদ দিনগুলোর সুধাময় কথা-কণিকাগুলো একটা একটা করে ওরা স্মরণ করে।আর পুরো অতীতের জীবনটা যেন আরও একবার যাপনে ফিরে আসে। দুজনেরই মনে এমন বিস্ময়কর এক ক্ষমতা আছে যে জীবনের জমা কিছুই অতীতের অতল গর্ভে হারিয়ে যেতে দেয় নি। ইচ্ছে করলেই স্মৃতি থেকে সত্তায়,সত্তার থেকে স্মৃতিতে এরা অবাধে বিচরণ করতে পারে। মাঝে মধ্যে এরা স্বপ্নের বুকেও এক একবার অভিযান করে আসে।স্মৃতি-সত্তা-স্বপ্নে,অতীতে বর্তমানে ভবিষ্যতে এখনও হাত ধরাধরি করে আরণ্যক ভ্রমণ করে রোজ রাতে।এখনএই সময়ে।অনেক রাত অব্দি জেগে এখনও এরা আকাশে কুসুম ফোটায় ꠩ কেমন করে আশ্রমের মতো ছোট্ট এক ঘর করবে,তাতে ফুলের কী কী গাছ রুইবে।অল্প টাকা জমাতে পারলেই কী করে পুরিতে ঘুরতে যাবে আর সমুদ্রের গর্জন কানে নিতে নিতে দু-জনে পরস্পরের দেহের সমুদ্রে,হৃদয়ের সমুদ্রে ডুব দেবার প্রয়াস নেবে ইত্যাদি। কিন্তু স্মৃতি যেমন আনন্দে উত্তেজনায় এদের সঞ্জীবিত করে তুলে,স্বপ্ন তেমন পারে না।মুখ ফুটিয়ে বলতে না পারলেও মনে মনে দু-জনেই জানে যে তাদের এই নিরাকার স্বপ্ন কোনোদিন সাকার চেহারা নিয়ে ধরা দেবে না। কিন্তু অন্যে যদি ব্যথা পায় তাই নিজ হৃদয়ের নিরাশা দু-জনের কেউই মুখে প্রকাশ করে না।

আজ বিছানাতে পড়ে প্রহ্লাদ নিজে কোনও কথা শুরু করলই না।বরং সে জোরে শ্বাস টেনে ঘুমিয়ে পড়ার ভান করল। স্বামীর কাজ কারবার আজ ললিতাকে যে বেশ হতবুদ্ধি করে তুলেছে তাতে সন্দেহ নেই।ললিতার সাড়া না পেয়ে একদিকে প্রহ্লাদ যেমন স্বস্তি অনুভব করল,ললিতা মনে মনে অস্থির হয়ে উঠল।তাদের জীবনে যেন হঠাৎই এক ছন্দপতন হতে শুরু করল।কান খাড়া করে প্রহ্লাদ ললিতার শ্বাসের শব্দ শোনার চেষ্টা নিল।ললিতা তার উপরে অভিমান করল না রাগ করল?তখনই সে অনুভব করল যে কেউ তার মশারি তুলে ধরছে।কী হচ্ছে ভালো করে বোঝার আগেই সে দেখল ললিতা তার পাশে শুয়ে দুই হাতে জোরে জড়িয়ে ধরেছে।কখন যে সে নেমে এল,এত চুপি চুপি নেমে এলোই বা কী করে তার কিছুই প্রহ্লাদ টেরই পেল না।

মুখে কোনও কথা না বলে অসীম মমতায় প্রহ্লাদ ললিতার মাথাটা পিষে দিতে শুরু করল।ললিতার এই কাজের অর্থ সে বুঝে।যখনই ললিতা বুঝে যে কোনও এক দুঃশ্চিন্তা বরকে পীড়ন করছে,মানুষটা হঠাৎ নীরব হয়ে পড়েছে,দূরে সরে গিয়ে নিজের নিঃসঙ্গতার খোলাতে লুকিয়ে পড়ছে---তখনই সে নিজের বিছানা ছেড়ে এসে বরের বিছানায় আশ্রয় গ্রহণ করে।এরকম সমযে সে বোধহয় অনুভব করে যে এখন আর মুখের কথা যথেষ্ট নয়,এখন কেবল সারা শরীরের ভাষাতে সে হৃদয়ের গভীর সহানুভূতিটুকু ব্যক্ত করতে পারে বা বরকে দূরে সরে যাবার থেকে বাধা দিতে পারে।প্রহ্লাদও ভালো বুঝতে পারে এ ললিতার দেহের প্রয়োজন নয়।এ তার দেহের প্রয়োজন।স্বামীর সঙ্গে নিবিড়তম ঐক্য স্থাপন করবার প্রয়োজন।কিন্তু আজ সে এমন ভান করল যেন ললিতার এই উঠে আসবার অর্থ সে বুঝেইনি।বলল,“তোমার হয়েছে কী ললিতা? ঘুম পাচ্ছে না?”

আদর করে স্বামীর বুকের মধ্যে মুখটা বেশি করে গুঁজে দিয়ে ললিতা বলল,“তার আগে তোমার কী হয়েছে সে কথা বল না কেন?তোমার যে আজ কিছু একটা হয়েছে সে কথা আমি বুঝতে পারিনি বলে মনে করেছ কি? তোমাকে চিনতে আমার বাকি আছে?”

প্রহ্লাদ তার নগ্ন বুকে ললিতার ঠোঁটের কোমল ছোঁয়া আর নাকের গরম নিঃশ্বাস তার পুরো শরীরে এক মধুর পুলকের শিহরণ জাগিয়ে তুলল।কিছু সময়ের জন্য সে মনের সব দুশ্চিন্তা এবং অস্বস্তি ভুলে গেল।তার হঠাৎ মনে হল--- কালো মেঘের বুক চিরে রোদের একফালি সোনালি কিরণ যেমন হঠাৎ বেরিয়ে আসে,ঠিক তেমনি এই সব বিরল মুহূর্তের মধ্য দিয়েও যেন জীবনের দুর্লভ সুধার দুই একটা কণিকা গলে পড়ে। দশবছরের বিবাহিত জীবনে প্রহ্লাদকে একটা কথা শিখিয়েছে যে প্রেমপূর্ণ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দান হল নিঃসঙ্গতার থেকে মুক্তি।সে নিঃসঙ্গতা শুধু মনের নয়,দেহেরও।গভীর কৃতজ্ঞতায় সে ললিতাকে জোরে জড়িয়ে ধরল।আর আলতো করে ঠোঁটে একটা চুমু খেল।প্রহ্লাদের চুমার মাধুর্য লেহন করে করে ললিতা কিছু সময় নীরবে রইল।তার পর আবার সেই আগেকার প্রশ্নে ঘুরে এল,“তুমি আজ আসল কথাটা আমাকে বল না কেন?তুমি বুঝে পাও না যে তুমি যতই আমাকে কথাটা ভোলাবার চেষ্টা করছ ততই আমার কৌতূহল বেড়ে যাচ্ছে।”

প্রহ্লাদ শেষঅব্দি হার মেনে নিয়ে বলল,“ললিতা জীবনে কখনও কোন কথা তোমার থেকে গোপন করেছি,বলতে পার?”একটা কথা ঠিক,আজ আমি এক ভীষণ বড় বিষয় মনে মনে ভাবছি।কিন্তু এখন অব্দি চিন্তাটা আমার নিজের মনেই সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে উঠেনি। কথাটা আমি নিশ্চয় তোমাকে বলব। কিন্তু আগে পুরো কথাটা আমাকে ভেবে নিতে দাও। তোমাকে এখন শুধু এইটুকুই বলে রাখি কোনও ভয়ের কথা নয়,দুশ্চিন্তা করার কথা নয়।বরংএ আমাদের জন্যে এক বড় সৌভাগ্যের পূর্বসংকেত। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই দিন শুরু করার আগে কথাটা তোমাকে বলব।এখন তুমি নিশ্চিন্ত মনে শুয়ে থাকো। আমি তোমার গা মাথা আস্তে আস্তে টিপে দিচ্ছি। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।

বুকের থেকে প্রকাণ্ড পাথর যেন গড়িয়ে পড়ে গেল।বরকে অবিশ্বাস করার মতো কখনও কোনও কারণ ঘটেনি। ললিতার এক প্রচণ্ড স্বস্তির ভাবে শিথিল হয়ে এল।হাঁটু মুড়ে প্রহ্লাদের দু-পায়ের ফাঁকে ভর দিয়ে সে ঘুমোবার জন্যে তৈরি হল। বাবা যেমন ছোটো মেয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করে প্রহ্লাদও ললিতার সঙ্গে সেভাবেই করতে শুরু করল।দশ মিনিটের মধ্যে গভীর ঘুমে ললিতা ডুবে গেল।

নিদ্রিতা প্রেয়সীকে বুকের মাঝে নিয়ে প্রহ্লাদ আরও কিছুক্ষণ জেগে কাটাল।

মানুষের জীবনে এমন এক একটা মুহূর্ত আসে যখন দুই বা ততোধিক পথের মধ্যে একটা বেছে নিতে হয়।গড় কাপ্তানি রাস্তার মতো জীবনের রাস্তাতেও কোনও পথ নির্দেশ লেখা থাকে না,অন্য কেউও এক্ষেত্রে বিশেষ সাহায্য করতে পারে না। দুটি কর্তব্যের মধ্যে যখন শুধু একটিকে বেছে নিতে হয়---মহাভারত যাকে বলেছে ধর্ম সংকট---তেমন সংকটের সময় বিবেকবান মানুষ পুরো একা হয়ে পড়ে। প্রহ্লাদের জীবনে আজ হঠাৎ তেমন এক মুহূর্ত এসে হাজির।

জগন্নাথ চৌধুরী এম–এল –এ-কে প্রহ্লাদ ব্যক্তিগতভাবে চেনে না।অসমের রাজনীতিতে সে একজন ধুরন্ধর ব্যক্তি। পর্দার আড়ালে থেকে সে অসমের রাজনীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে।এমন একটা লোক হঠাৎই তার ঘরে এসে উপস্থিত হওয়াতে সে বেশ অবাক হয়েছিল।সে নিশ্চয়ই প্রহ্লাদের ঘরে চা-পান খেয়ে আড্ডা দিতে আসেনি।মতলব একটা থাকতেই হবে।কিন্তু সেটি কী? সে মানুষের সঙ্গে খুব একটা গলাগলি করে না।কেউবা উপযাচক হয়ে ঘনিষ্ঠতা করতে এলেও সে খুব একটা প্রশ্রয় দেয় না।জগন্নাথ চৌধুরী তার সঙ্গে আলাদা কী কী বিষয়ে উত্থাপন করতে পারে খুব দ্রুত তার কয়েকটি সে মনে মনে অনুমান করে নিল। আর মানসিক মানসিক ঢাল-তলোয়ারে সুসজ্জিত হয়ে তার মুখোমুখি হবার জন্য প্রস্তুত হল।

জগন্নাথ চৌধুরীও চতুর লোক।তিনি বোধহয় ঠিক করেই নিয়েছিলেন যে প্রহ্লাদের মতো মানুষের সঙ্গে ধানাই পানাই করে বেশি কথা বলে লাভ নেই।বেশি ভূমিকা বা বাগাড়ম্বর করলে বরং তার মনে সন্দেহ জাগারই সম্ভাবনা।আসন গ্রহণ করেই তিনি আরম্ভ করলেন,“কোনও দিন না আসা মানুষটা আজ আপনার ঘরে এসেছি।অতএব বুঝতেই পারছেন কোনও একটা গরজে এসেছি। এটাও বুঝতে পারছেন নিশ্চয় গরজটা আপনার নয়,আমার।অবশ্য শুধু আমার বললেই ভুল হবে,গোটা দেশের গরজ। আশা করছি আপনি আমাকে নিরাশ করবেন না।”

নিজের মুখটাকে প্রশ্নবোধক চিহ্ন একটার মত করে প্রহ্লাদ জগন্নাথ চৌধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি আশা করেছিলেন তাঁর কথা শুনে প্রহ্লাদ যারপর নাই কৌতূহলী হয়ে পড়বে এবং মুখ খুলে সেই কৌতূহল প্রকাশ করবে।কিন্তু সেসব কিছু না করে নীরব হয়ে থাকতে দেখে তিনি সামান্য হতাশ হলেন।কিছুক্ষণ থেমে থেকে তিনি আবার আরম্ভ করলেন,“দেশের উন্নতির জন্য সরকারের যেভাবে কাজ করা উচিত সেভাবে করতে পারে নি।এ কথাটা আপনার চেয়ে ভালো আর কেই বা বুঝে? জীবনভর আপনি অন্যায় অবিচার অকর্মণ্যতার বিরুদ্ধে লড়ে এলেন।শাসন যন্ত্রের আনাচ-কানাচ আপনি খুব ভালো চেনেন। কিন্তুকথা একটা হল কি জানেন প্রহ্লাদ বাবু,ভালো কাজ করবার আমাদের সরকার বা নেতাদের সদিচ্ছার যেমন অভাব সুদক্ষ লোকের।বেশি ভালো কাজ যে শুধু সদিচ্ছার অভাবেই খারাপ হয় তাই নয়--- যে কাজে যেমন মানুষকে দিতে হয় তেমন মানুষ না পাওয়াও আমাদের ব্যর্থতার প্রধান কারণ।আমাদের সবচে’ বড় অভাব হল দক্ষতার অভাব যোগ্যতার অভাব।Pursuit of excellence যে কথাটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের মূল মন্ত্র হওয়া দরকার সেটি আমাদের দেশে একেবারেই নেই। তারচে’ও দুঃখের ব্যাপার—যাদের কিছু যোগ্যতা আছে,কাজ করবার তুখোড় সামর্থ্য ও বুদ্ধিবৃত্তি আছে---তাঁরা নিজে দায়িত্ব নিতে এগিয়ে না এসে শুধু বাইরে থেকে সমালোচনা করেন। আপনি কী বলেন?”

প্রহ্লাদ একটা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলল,“এখন অব্দি আপনার ভূমিকাটাই শুনলাম।আসল কথা শুনি নি।আপনি যেটি বলবার জন্যে আমার এখানে এলেন সে কথাটি একসঙ্গে বলে ফেলুন।”

“বলব, বলব! বলব বলেই তো এসেছি।” ছোট্ট কাশি একটা তুলে জগন্নাথ চৌধুরী আসল কথাটা বলবার জন্য তৈরি হলেন,“আপনার কথাই ধরুন। আপনার মতো যোগ্যতা আর বুদ্ধিবৃত্তি থাকা লোক অসমে ক’টা আছে?আপনার অর্থনীতি নিয়ে যে জ্ঞান আর ক্ষুরধার বিশ্লেষণী শক্তি সেটুকু যদি শুধু সমালোচনার কাজে ব্যবহৃত না হয়ে গঠনমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়,তবেই দেশের উন্নতিতে বেশি কাজে আসবে বলে আপনি মনে করেন না কি?আপনি যদি রিপোর্টার না হয়ে একটা কাগজের সম্পাদক হতেন তবুও একটা কথা ছিল।তখন একটা সান্ত্বনা থাকত যে যোগ্যতা একটা স্বীকৃতি পেল।সমাজে তার প্রাপ্য স্ট্যাটাস পেল। কিন্তু ঠাকুর ঘরের বাতির মতো আপনার মতো একজন মানুষ শুধু মাত্র রিপোর্টার হয়েই জীবনে অজ্ঞাত,অখ্যাত থেকে যাবেন—এর চে’ দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে! আর, সে কথা নয় যেতেই দিন।আমি আপনাকে যে কথা বলতে এসেছি সেটিই শুনুন।অসম সরকারের দেখুন হঠাৎ একটা সুমতি হয়েছে,তাঁরা একটা ‘অর্থনৈতিক গবেষণাকেন্দ্র’ শুরু করতে চাইছেন। এই কেন্দ্রের কাজ হবে অসমের অর্থনীতির বিষয়ে নানা রকম সমীক্ষা আর গবেষণা করে সরকারকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করতে সাহায্য করবে।অবশ্য বিষয়টা যদিও সরকার শুরু করবে—এ একটা সরকারি বিষয় হয়ে থাকবে না।অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ স্বায়ত্ত শাসিত হবে।কিন্তু সরকার অনুষ্ঠান একটা শুরু করলেই তো হল না।তাকে চালাবার জন্য উপযুক্ত লোকের দরকার পড়বে। যোগ্য লোকের হাতে না পড়লে এও আর দশটা অনুষ্ঠানের মতো আবর্জনার স্তূপে পরিণত হবে।এখন যোগ্য লোকের সন্ধানে পুরো দশ চষে বেড়ানো হচ্ছে।দিন দুই আগে গেছিলাম মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটা কাজে।তখন কথা প্রসঙ্গে কথাটা উঠল।আমার চট করে আপনার কথা মনে পড়ল। মুখ্যমন্ত্রী বললাম,“আপনারা সবসময় লোক নেই নেই বলে থাকেন।কিন্তু প্রতিভা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন না।আমাদের মধ্যে গণ্ডায় গণ্ডায় প্রতিভাশালী লোক নেই বটে,কিন্তু খুঁজতে জানলে দু-একজন যে কোত্থাও বেরোবে না এও সত্য নয়।ছাইচাপা সোনার মতো আমাদের কাছেই কোথাও কোথাও প্রতিভা লুকিয়ে আছে।”তারপরেই আপনার কথাটা তুললাম।আমার ভয় ছিল,আপনার নাম শুনে তিনি ঝ্যাং করে উঠবেন।আপনি তো আর অসমের কংগ্রেস সরকারকে এমনি ছেড়ে দেন নি,কাপড়ে চোপরে ন্যাংটো করে রেখেছেন।কিন্তু আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর একটা ব্যাপার স্বীকার করতেই হবে,শত্রু হলেও গুণীর গুণ স্বীকারে তিনি কখনও পেছন পা হাঁটেন না।আপনার নাম শুনে তিনি ভীষণ আগ্রহ প্রকাশ করলেন।সঙ্গে শুধু অল্প সন্দেহ প্রকাশ করলেন---আপনার মতো স্বাধীনচেতা মানুষ সংবাদপত্রের কাজ ছেড়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান একটার দায়িত্ব নিতে আসবেন কি না?আমি তাঁকে বললাম,‘আপনি সে ভার আমাকে দিন।আমি যেভাবেই পারি প্রহ্লাদবাবুকে নিয়ে আসছি।আমাদের লোক বেশি নেই;যে দুই চারজন আছেন তারাও যেচে দেওয়া সুযোগ আর দায়িত্ব পরিহার করে এরকম মাথা লুকিয়ে থাকতে পারেন না...’এইমাত্র আমার কথা।মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ফুটানি মেরে বড় আশাতে আমি আপনার কাছে এসেছি। এখন আপনি যা বলেন।”

সঙ্গে সঙ্গেই কিছু না বলে কিছুক্ষণ প্রহ্লাদ জগন্নাথ চৌধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।তাঁর দীর্ঘ কথাগুলো শুনে মনের ভেতরে তার একটা আলোড়ন যদিও উঠল বারে সে নির্বিকার দেখাবার চেষ্টা করল।সত্যি বলতে,এমন প্রস্তাব শোনার জন্য সে সামান্যও প্রস্তুত ছিল না।বেশিরভাগ মানুষও আসে কোনও খবর দিতে।সবাই যে সমাজ বা দেশের স্বার্থেই খবরগুলো দেয় তাও নয়।ক্ষমতার রাজনীতি একটা দলের ভেতরেই নানা মানুষকে পরস্পরের শত্রু করে তুলে।বহু লোকে ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর বিরুদ্ধেও প্রহ্লাদকে নানান খবর দেয় উদ্দেশ্য গায়ের ঝাল মেটানো কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করে নিজের পথ সুগম করা। রাতের আঁধারের আড়াল রেখে বহু মন্ত্রীর আগমনও তার এ ঘরে হয়ে থাকে--- আর বহু চমকপ্রদ খবর সে মন্ত্রীদের থেকেই পেয়েছে।আরেকদল লোক আসে নিজেদের স্বার্থ হানিকর খবরের প্রকাশ বন্ধ করতে।এরা হাতজোড় করে অনুরোধ করে, নতুবা পুরস্কারের লোভ দেখায়--- তাতেও কাজ না হলে কেউবা ভীতি প্রদর্শনও করে থাকে।এমনই কিছু একটা উদ্দেশ্য নিয়ে জগন্নাথ চৌধুরীও এসেছেন---প্রথমটা সে এরকমই ভেবেছিল।কিন্তু তাঁর মুখে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত অন্য একটা কথা শুনে সে এত অপ্রস্তুত হল যে কী উত্তর দেবে তাই না ভেবে পেয়ে কিছুক্ষণ চুপ রইল।

প্রহ্লাদকে চুপ করে থাকতে দেখে জগন্নাথ চৌধুরীই আবার বললেন,“ অহো! আপনাকে আসল কথাটাই বলা হয় নি। কত মাইনে পাবেন তাও নিশ্চয় আপনার জানা উচিত। মুখ্যমন্ত্রী এখন পনেরোশ’ দেবার কথা ভাবছেন।অবশ্য আপনি চাইলে দুই আড়াইশ’বাড়িয়ে দেওয়া এমন কঠিন কাজ হবে না।... আমি তা’লে আজ উঠি।মুখ্যমন্ত্রীকে বলব,আপনার সম্মতি রয়েছে।”

“আমি তো বলিনি আপনাকে,আমি সম্মত।” প্রহ্লাদ হঠাৎই রূঢ়ভাবে বলে উঠল,“আপনি বরং মুখ্যমন্ত্রীকে বলবেন যে তাঁর অফারটার জন্য ধন্যবাদ।কিন্তু গ্রহণ করতে না পেরে আমি দুঃখিত।”

জগন্নাথ চৌধুরী প্রায় উঠেই যাচ্ছিলেন।প্রহ্লাদের কথাতে আবার বসে পড়লেন।আহত কণ্ঠে বললেন,“বলুন তো দেখি মশাই,এই সুবর্ণ সুযোগটা হাতে পেয়ে হারাচ্ছেন।সরকার তো আপনাকে একটা চাকরি নিতে বলছে না।নিজের প্রতিভাকে যাতে দেশের কাজে লাগাতে পারেন তার জন্যে একটা সুযোগ হে দিতে চাইছে।আপনি বরং কথাটা আরেকবার ভেবে দেখুন, প্রহ্লাদবাবু।আমার মনে হচ্ছে, অফারটা না নিলে আপনি একটা বড় ভুল করে বসবেন।”

ঘরটা অন্ধকার হয়ে এসেছিল।তবু উঠে গিয়ে আলো জ্বালবার কথা না ভেবে প্রহ্লাদ বলল, “দেখুন চৌধুরীবাবু্‌ আমি গরিব মানুষ।টাকার খুবই দরকার।মাসে পনেরোশ’ মাইনে আমার জীবনের অনেক কথাই পালটে দেবে ঠিক।আমার যে লোভ হচ্ছে না তাও বলব না।তবুও পদটা গ্রহণ করতে আমি অক্ষম।কারণ আমার মনে হয় আপনার অর্থনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের কাজ করবার জন্য দুই একজন উপযুক্ত মানুষ খুঁজলে অবশ্যই পেয়ে যাবেন।কিন্তু আমি যে কাজটা এখন করছি তার জন্য দ্বিতীয় লোক পাওয়া দুষ্কর। কথাটা আমার অহংকার বলে ভাববেন না। যা সত্য তাই বললাম।”

জগন্নাথ চৌধুরী তবুও নিরাশ না হয়ে বললেন,“দেখুন প্রহ্লাদ বাবু,বয়সে আমি আপনার চেয়ে বড়।বোধ হয় আপনার বাবার বয়সীই হব।জীবনে অভিজ্ঞতারও নিশ্চয়ই দাম আছে।আপনার বয়স তো বোধহয় এখনও চল্লিশের ঘাট পেরোয় নি। যৌবনের উৎসাহ আর আদর্শবাদীতার কিছু অবশেষ এখনও আপনার হাতে জমা আছে।তার জোরেই ভাবছেন যে পৃথিবীটা শুধু আপনার কাঁধেই দাঁড়িয়ে আছে।কিন্তু এ ভাবনাটা বড় ভুল।বলদ একটার গায়ে মাছি একটা বসেছিল।বলদটা কান-মাথা ঝাঁকাচ্ছে দেখে মাছিটা ভাবছিল যে তার ভার সইতে না পেরেই বোধহয় বলদটা এমন ছটফট করছে।কিন্তু বলদটা যে তার অস্তিত্বই টের পায় নি মাছি বেচারা তা আঁচ পর্যন্ত করতে পারে নি।আমরা বেশিরভাগ লোকই এই ভুলটা করি।যৌবনের শ্রেষ্ঠ বছরগুলো আপনি সমাজের জন্য উৎসর্গ করলেন।এখন আপনার নিজের কথাও ভাবার সময় হল।নিজের স্ত্রী সন্তানের কথাও ভাবতে হবে। সমাজের প্রতি যেমন আপনার কর্তব্য আছে স্ত্রী সন্তানের প্রতিও একটা কর্তব্য কি নেই?আমি জানি,আজ অব্দি আপনার এক টুকরো মাটি নেই। বাড়ি একটা নেই। যা উপার্জন করেন তাতে স্ত্রী সন্তানের পেট ভালো করে ভরাতে পারবেন না। আজ হয়তো আদর্শের নেশাতে এসব কথা ভাববার আপনার সময় নেই।কিন্তু দিন একটি আসবে—যখন আপনি বুড়ো হবেন, দুর্বল হবেন,যে সমাজের জন্যে আপনি জীবনপাত করলেন---সেই সমাজ আপনার খবর নেওয়া দূরে থাক,আপনার ত্যাগগুলোর স্বীকৃতিটুকুও দেবে না।তখন অতীতের দিকে তাকিয়ে আপনি শুধু অনুভব করবেন এক বিশাল শূন্যতা।তখন আপনার অভিমান হবে,অনুতাপ হবে--- কিন্তু করবার কিছু থাকবে না।পৃথিবীতে হাজার হাজার লোকের এ দশা হয়েছে।আপনার না হয়ে কখনও থাকবে না। আমি বুড়ো লোক।শুনতে খারাপ দেখালেও আরও একটা কথা বলে রাখি,শুনুন।অনেক মানুষ জীবনে সুযোগ এলেও তাকে পায়ে ঠেলে দেয়।তার কারণ কিন্তু শুধু আদর্শ নিষ্ঠাই নয়।আসল কারণ অহংকার।কী জানি লোকে বাজে ভাবে নেয়,কী জানি ইমেজ নষ্ট হয়—এই ভয়।অনেক লোক নিজের রক্ত নিংড়ে এই অহংকারকে লালন করে আর তিলে তিলে মৃত্যু বরণ করে। মানুষ হয়ে জন্ম নেবার এক এক বড় যন্ত্রণা।থাক,সে কথা থাক।বুড়ো মানুষের এই একটা বড় দোষ—একবার মুখ খুললে আর বন্ধ হবার নাম নেয় না।আপনি এখনই আমাকে কথা দিতে হবে না।পুরো কথাটা ভালো করে ভেবে দেখুন।স্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলুন। তার পর আমাকে জানান।দুদিন পরে আবার আসব। আজ শুধু এইটুকুই বললাম যে দেশের ভালোর জন্যেই এ পদটাতে আপনাকে আমরা চাইছি।


(ক্রমশ:...)