বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২০

তিনটি কবিতা

একটি রহস্যময় কবিতা


মাটি থেকে ছ’ইঞ্চি উঁচুতে পা

লোকটার বুকে স্টেথো বসিয়ে ডাক্তার আঁতকে উঠলেন

তারপর বললেন, আপনি বেঁচে রয়েছেন কী করে মশাই

আপনার তো হৃদয়ই নেই!

এতে অবশ্য লোকটা ঘাবড়াল না

ওই অবস্থাতেই শূন্যে গটগট গটগট করে হেঁটে গেল

অসুবিধে কিছু হচ্ছে বলে তো মনেই হল না।

একদিন দেখলাম জটলার মধ্যে মাইক্রোফোনের সামনে তর্জন-গর্জন

করছে লোকটা।

দেখে মনে হল কোনও এক রাজনৈতিক দলের নেতা

আমি খেয়াল করে দেখলাম মাটি থেকে ঠিক ছ’ইঞ্চি ওপরে

শূন্যে ভেসে রয়েছে লোকটার পা।

তারপর আর একদিন বলখেলার মাঠে লোকটার সঙ্গে দেখা

তিন-তিনটে ‘ম্যান’কে এমন ড্রিবল করল মনে হল

লোকটা মারাদোনা।

তবে মারাদোনার ছিল ভগবানের হাত

আর লোকটার অশরীরী পা, মাটিতে পড়ছে না।

তারপর একদিন দেখলাম ইংরেজিতে খুব ফুকো, লাকাঁ, দেরিদা

কপচাচ্ছে লোকটা

আর সামনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে জনা বিশেক ছেলেমেয়ে

সবার শেষে কাঁচুমাচু মুখে জীবনানন্দ দাশ

থার্ড সেমেস্টারে তাঁর পাশ মার্কস জোটেনি।

আমি তাকালাম লোকটার পায়ের দিকে

হ্যাঁ, এবারও মাটি থেকে ঠিক ছ’ইঞ্চি ওপরে ওর পা।

আমি ভয় পেলাম।

বললাম, আপনি কে? জিন? দত্যি? দানো?

লোকটা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘পুনরাবৃত্তি’তে

আমাকে রাক্ষস সাজতে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠিক

কিন্তু আমি জিন নই, দত্যি নই, দানো নই, রাক্ষসও নই

ইংরেজির অধ্যাপক।



এই যে শুনছেন


আমরা যতখানি বাঙালি ততখানিই ভারতীয়

কিন্তু আপনি আমাদের ভারতীয় থাকতে দিচ্ছেন না।

আপনার এত সাধের আধার আপনি নিজেই কেজি দরে

বিক্রি করে দিচ্ছেন কাগজওয়ালার কাছে

জেলখানায় যে লোকগুলোর থাকার কথা তারা

বিদেশে গোলা পায়রা ওড়াচ্ছে

আর একদিন সকালে আপনি ম্যাজিশিয়ানের মতো

আমাদের বানিয়ে দিতে চাইছেন কেবলই বাঙালি

পুরে দিতে চাইছেন ডিটেনশন সেন্টারে।

আপনার কান্ড-কারখানা দেখে হাসছে নদী, হাসছে বাতাস

পাখিদের কলকাকলি

যাকে আপনি মনে করছেন সঙ্গীত, তা আসলে ধিক্কার

আপনি শুনতে পাচ্ছেন না

আপনার চক্ষু অন্ধ, কর্ণ বধির, হৃদয় পাষাণ

আপনি আমাদের ভারতীয় থাকতে দিচ্ছেন না।

ম্যাজিক দেখিয়ে একজন বিধায়কের নাম আপনি কেটে দিয়েছেন

একজন খেলোয়াড়ের নাম আপনি কেটে দিয়েছেন

বর্ডার সামলেছেন যে সৈনিক

এমনকি তার নামও আপনি কেটে দিয়েছেন

কিন্তু শিল্পপতিদের সামনে আপনার ম্যাজিক কাজ করছে না

তখন আর শার্দূল নন, আপনি নেহাতই মার্জার।

শুনুন আপনি হ্যারি পটার নন, পি সি সরকার নন

ম্যানড্রেকও নন।

ম্যাজিক দেখাতে যাবেন না।

একবার ইতিহাস বইয়ের পাতা উলটে দেখুন

ইংরেজদের আমরা ঘোল খাইয়ে ছেড়েছি, আপনি তো কোন ছার

আমরা ক্ষুদিরামের জাত, মাস্টারদা সূর্য সেনের জাত

বিনয়-বাদল-দিনেশের জাত

সুভাষচন্দ্রের জাত

বিপদ হবে, খুব বড় বিপদ

আমরা যতখানি বাঙালি ততখানিই ভারতীয়

আমাদের কেবল বাঙালি বানাতে যাবেন না

আমরা কিন্তু আপনার চেয়েও বড় ম্যাজিশিয়ান।



মা


লাস্ট দশ বছর ধরে

পাড়ার মোড় থেকে কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর পর্যন্ত

সব জায়গায়

আমার বিরুদ্ধে ও যা ইচ্ছে তাই বলেছে

আমার প্রোমোশন আটকে গেছে

এমনকী পিনুদার বোন আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে

রাস্তায় থুতু ফেলেছে একদিন

লাস্ট দশ বছর ধরে

আমি মনকে বুঝিয়েছি

ব্যাপারটা কিছুই নয়

চিনে রাখো—বন্ধুর মুখোশ এঁটে থাকা ওই

তোমার এক নম্বর শত্রু

কেলোর দলটাকে একরাত্রে

বাংলা নয়, একটু দামি বিলিতি দিয়ে বলেছিলামঃ পুরো মারবি না

তবে তিনমাস যেন হাসপাতালে থাকে শূয়োরটা

তিনমাস ন’দিন পরে

শিশুমঙ্গল থেকে ও ট্যাক্সি চড়ে বাড়ি ফেরে

আজ

যখন ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের মতো ঝকঝক করছে সকাল

দেখলাম

দুই হাতে দুই ভারি থলে

যেন আর পারছেন না এত আস্তে

বাজার থেকে ফিরছেন ওর মা

ঠিক ওইরকম সাদা হতে থাকা চুল

ঠিক ওইরকম ফাঁকা সিঁথি

ঠিক ওইরকম বোবা চাউনি

যেন বাবা মরে যাওয়ার পর রাস্তা পার হচ্ছে

আমার মা

মনে হল—ছুট্টে গিয়ে বলিঃ মা, ভাইয়ে ভাইয়ে ওরকম একটু আধটু হয়

দিন থলি দুটো দিন, চিন্তা করবেন না

সিঁড়ির ঠিক সামনে আপনাকে ছেড়ে

আমি ফিরে আসব

ভেতরে ঢুকব না