শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

তমাবর্মণের দীর্ঘ কবিতা


আমি অন্তর্লীনা কবির নিজস্ব নারী

নক্ষত্রের নিচে দাঁড়িয়ে আলো দেখা আমি সেই মেয়ে

আমিই সেই

ফুলপাতা নন্দিত মলাটে বন্দি করে রেখেছ যারে তুমি চিরকাল কবি

বহুবার দেখা তোমার মধ্যরাত্রি আমি, ভোরের কুয়াশা চুরি করা নির্জন দুপুরে

নারী বলে যারে ডেকে নিয়েছিলে একদিন মহাজাগতিক ঘুম থেকে উঠে অতর্কিতে

কবির একরোখা খুঁড়ে দেখার স্বপ্ন বারবার আমার রূপের আদল ভেঙেছে

মানবজনমের সম্পূর্ণ সার্থকতা আমিই

চোখের জল হয়ে নেমে আসি পৃথিবীর সৈকতে

কল্পনার ডিঙিনৌকা ভাসাও ডোবাও যে শিল্পিত ভ্রমণে তোমার

আমার জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন সেখানে নেই,

ঘুঙুরের মতো আকাশে বাতাসে বেজে উঠিতবু অনন্তকাল

তোমার কবিতায় অন্তঃসারশূন্য নিজেকে একলা অন্ধকারে বসে ভুলে যাই

মুগ্ধ দেখি তোমাকে কবি !

কবিতায় তোমার এত এত মানুষের কথা!

প্রণয়কাব্যে তোমার শুধু নারী থেকে আমি কখনো মানুষ হতে পারিনি

সমস্ত উত্তাপ, অসুখের কাতরতা আমার উপেক্ষিত, একাকী।

সূদুর কোনো সাঁওতাল পরগণায় কিছুমাত্র শব্দ বাক্যে যখন হয়ে উঠি ধর্ষিতা

দহনের জ্বালা যন্ত্রণা পুড়ে তোমার লেখা সমাদর পায় মঞ্চ- মিছিলে

আমার আমি আগুন খেতে খেতে মরে যাই, দীর্ঘশ্বাস আমার পা থেকে উর্ধাঙ্গ,

ধ্যানমগ্ন ভাবসমাধি তোমার ক্লান্ত শরীরে আমার আরাম দিতে পারে না কিছুমাত্র।

তোমার দুর্দান্ত কবিতা আমার কাছে উর্বর অন্ধকারের সংলাপমাত্র কবি

পালহীন নৌকার মতো অতীত থেকে দিকভ্রান্ত ভবিষ্যৎ,

তবু আমাকেই বেছে মহাসাগরীয় অতলে ডুবতে চেয়েছ তুমি অমৃত-সন্ধানে

আমার পদ্মকুঁড়ির চোখ, নাভি, স্তনযুগল তোমার আদিম কবিতার সংসার

তুমি জানো, একমাত্র আমিই তোমার গোপন কবি ছিলাম

আজও একাধারে সম্পাদক, কবিতার রক্তমাংস, নিন্দা স্তুতি, প্রতিবাদী স্ফটিকশুভ্র মুখ,

আমিই---

ব্রথেলের দিকে হেঁটে যাওয়া তোমার আত্মখনন, নিরুপায় মৃত্যুও।

প্রেম, প্রেমের প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে জীবনের হাহাকার

রবীন্দ্ররচনাবলী থেকে খালাসিটোলা

বটতলার চটিসাহিত্য পর্যন্ত মহাকাব্য

আমার ভালোবাসায় আলোকবর্ষ পার করে যাচ্ছে তোমার বৈরাগ্যসাধন

অথচ শব্দ-বাক্য আর অক্ষরের কস্তুরি গন্ধে আমিই সন্ধানী বিষয়বস্তু

আঁধারের গায় কুপি জ্বালিয়ে দু-হাতে ধরে রাখা গুহানারী,

আমার অবাক চোখের কাছে গুপ্ত ভালোলাগা রেখে যখন দূর চলে যায় পাঠক

রত্নখচিত তাদের প্রশংসা আমার ঘুমন্ত মুখের চারপাশে গুটি বেঁধে ওঠে

আমারই জলবসন্তে ভেসে যাওয়া তখন তুমি ওদের ভালোলাগা স্পর্শে সদাজাগ্রত

একটা বিনীত প্রশ্ন আজ তোমাকে---

আর কত অফুরান হবে শব্দচাতুর্যে নারী নারী নারী?

আর কত ভোগ ও বৈরাগ্যে দ্বন্দ্বের দৈবীরূপ আঁকতে থাকবে বারেবার?

ষড়যন্ত্রের মতো কথায়, শব্দ, অর্থ ও ব্যঞ্জনায়

সৌন্দর্যবোধ ভেঙে শরীরের আড়াল নির্ভয়ে করবে চুরমার?

তাই বুঝি তুমি নিষ্ঠুর, এত সুন্দর কবি!

দৃশ্য অদৃশ্যের মধ্যিখানেউন্মুক্ত অধরা

নিজেকে বানিয়ে নাও কখনো শীর্ণ প্রেমিক কখনো আর্যপুরুষ,

বুকের উত্তেজনা ছড়িয়ে কামনায় যারে চাও স্বর্গের কাছে

তোমার কলমে বর্ণিত নিঁখুত ঘরকন্নানষ্ট করে তার অগোছালো ঘর

অমরত্বের পুণ্যলগ্নে শেষ নিঃশ্বাস নিয়ে তবু তুমিই চলে যাও চিরদুঃখের কাছে

মৃত্যুচেতনা জেগে ওঠা রাতে তারাদের কথোপকথনে মুগ্ধ করেছিল যার শরীর

জল ও বায়ুর সাথে তার সখ্যতা হয় না আর কখনো

জন্মমৃত্যুর মতো নিজেকে সেঁকে

পয়ারের পর পয়ার খোদাই করে যায় কবিতার ভাস্কর্যে

পাহাড় ফেটে নদীর মরণ যেখানে অন্তঃসলিলা,

পৃথিবী জুড়ে কালুকামিনের শক্তহাতে ঘষটে যাওয়া সেই মেয়ে

স্বর্গ ও নরক বলতে শুধুভালোবাসা বোঝে

হত্যাপ্রবন কবি ডেকেছিল যারে কোনো এক আত্মহননের রাতে কবিতায়

তার গল্প কেউ জানে না।জানবেনা।জানতে চাইবে না।

যোনির ভেতর নিঃসঙ্গ দহনকাল সে দুঃখমেয়ে

ভুবনডাঙার মাঠে বৃষ্টি এলে বুক খোলা যতই কান্না মিশিয়ে দিক

পৃথিবীর ভিন্নতর আলোর অভিসারী কবির দায় নেই সে মেয়ের হৃদয় হতে,

ধ্বক ধ্বক আগুনের ব্রহ্মাণ্ডে বিখ্যাত সব কোটেশন কবির উদ্ধৃত করে

দু-মুঠো বাতাসে মিলিয়ে যাবে সে, মিলিয়ে যাবে রূপসী কবিতা সদৃশ্য হুবহু তার রূপ।

ত্বন্বী যুবতির বন্ধনহীনতায় কবি আরও বাউণ্ডুলে হবেন

কীটস ইলিয়ট রবিঠাকুর হতে চাইবেন, খোলা চিঠির মতো কবিতা পড়তে পড়তে

আরও অনেক শ্রাবণের সর্বনাশ ডেকে নেবেন কবিতার খরায়,

তৃষ্ণার জাহান্নামে যেতে অনবিষ্কৃত মরুর দেশে/ তীব্র যন্ত্রণায় ছুঁড়ে দেবেন পলাতক বৃষ্টি

আর বৃন্দাবন সারেঙ্গীর মতো রেওয়াজ করতে থাকবেন 'শ্যাম ও রাধা '' নামক বিখ্যাত সব রূপক কবিতা !

নিধুবাবুর টপ্পা ছেড়ে উঠে আসা তোমাদের সবাইকে আমি তবু্ও দশে দশ দেবো না কবি

কাদম্বরী ফেনীব্রাউনের অত্যাচার থেকে যতদিন না রেহাই মিলবে তোমার নিজস্ব গোপন নারীর নাম।

অবহেলিতবিদ্রোহ মুক্তির নিশানায় এলে জেনে নিও---

আমার নিহত নামাক্ষর থেকে খসে পড়বে তোমারই আদ্যাক্ষর;

যাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব আমার কবরের পাশে বিঁধে আছে ত্রিশূলের মতো

আমাকে স্বীকার না করে পৃথিবীর মহাগ্রন্থ লিখে ফেলা তোমার ভুল।

ভুল

আমি অন্তর্লীনা, কবির নিজস্ব নারী তোমার রাজকীয় লাম্পট্য, প্রেম,

প্রেমিকার আকুতি কলমে বসে নিঁখুত লিখছি,

না আছে দাবি, না জীবন,

না নিজস্ব মৃত্যুর অধিকার

না সুখ না দুঃখ --- অন্ধকারে শুয়ে আছি সমান সমান কবর ও কবিতায়

কবি নই, কবির আয়ুতে ক্ষয় হতে থাকা অখ্যাত 'তৃতীয়জন'

বিশ্বাস করি তোমার কাব্যে লেখা হবে একদিন আমারই প্রার্থনার হাত