বুধবার, নভেম্বর ২০, ২০১৯

জয়া চৌধুরীর অনুবাদ


আজ ২৮মে অনুবাদক,কবি,নাট্যশিল্পী জয়া চৌধুরীর জন্মদিন। স্বজন জয়া চৌধুরীকে অন্যদেশ পরিবারের শুভেচ্ছা।


মার্গারিটা কিংবা ওষুধের ক্ষমতা

Margarita O el poder de la farmacopia

আদোলফো বিখয় কাসারেস (আর্জেন্টিনা) /অনুবাদ- জয়া চৌধুরী

ঠিক মনে নেই কোন প্রসঙ্গে আমার ছেলে এই অনুযোগটা করেছিলঃ
তোমার তো সবকিছুই ভাল হয়।

ছেলে বাড়িতেই থাকত আমার সঙ্গে। ওর বউ আর চারটে বাচ্চা নিয়ে। বড়টা এগারো আর ছোট মার্গারিটার দুবছর বয়স। একথাগুলো বলার সময় ওর গলায় বিরক্তি ফুটে উঠেছিল। ক্বচিৎ কখনো বউয়ের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতো। তাকে বললঃ
একথাটা তুমি অস্বীকার করতে পারো না প্রতিটা জয়েই কিছু না কিছু ন্যক্কারজনক ব্যপার থাকে।
বউমা উত্তর দিল- প্রাকৃতিকভাবেই জয় ব্যাপারটা হল ভাল কাজের ফল।
কিন্তু সবসময়ই তার মধ্যে কিছু নোংরামি থেকে যায়।
জয় নয়- মাঝখান থেকে বলে উঠলাম আমি- জয়ের ইচ্ছে। ‘জয়’ বিষয়টাকে দোষ দেওয়া আমার কাছে বাড়াবাড়িরকমের রোম্যান্টিসিজম। বিবেচনাহীনদের পক্ষেই এরকম সুবিধাবাদী কথা বলা সম্ভব।

বুদ্ধিমতী হওয়া সত্ত্বেও, বউমা আমাকে তার যুক্তি বোঝাতে পারল না। এর পর দোষ খুঁজতে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম যে জীবনটা আমার পুরোপুরি কেমিস্ট্রি বই আর ওষুধ তৈরির ল্যাবরেটরিতেই গেছে। আমার ‘জয়’ বলে যদি কিছু হয়েই থাকে সেটা হয়তো বিশ্বাসযোগ্য কিন্তু অসামান্য কোন ব্যাপার নয়। এটা বলা যেতে পারে আমার কেরিয়ার সম্মানজনক। ল্যাবরেটরির হেড হয়েছি। একটা নিজস্ব বাড়ি আছে আর সেটা বেশ ভালগোছেরই। এটা ঘটনা যে আমার তৈরি মৌলিক ফরমূলা, মলম, রঞ্জন যা দিয়ে ব্যথা কমানো যায় ইত্যাদি কিছু জিনিষ আছে। এলাকায় যে সব ওষুধের দোকান আছে তাদের তাকে সেগুলো সাজানো। লোকে বলে তা দিয়ে যতজনকে উপশম করা যায় তার সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। তবু নিজেকে আমি সন্দেহ করবার অনুমতি দিয়েছি। কারণ মানুষ ও তার অসুখের মধ্যে যে সম্পর্ক সেটা আমার কাছে যথেষ্ট রহস্যময়। যাই হোক আমি যখন আমার টনিক ‘ইয়েররো প্লাস’টা সামনে দেখতে পেলাম ভেতরে একটা অস্থিরতা দেখা দিল। একটা ‘জয়ের’ নিশ্চিন্ততা এল। যেখানে সেখানে বুক ঠুকে বলতে শুরু করলাম যে ফার্মেসি আর মেডিসিন-এর লোকেরা যেন আমার কথাই শোনেন। ‘মুখ ও মুখোশ’ ম্যাগাজিনের পাতায় এর সপক্ষে সাক্ষ্যও প্রকাশিত আছে। অতীতে মানুষ অন্তহীনভাবে টনিক খেয়েই চলত যতক্ষণে না ভিটামিন-এ রা তাদের ঝেঁটিয়ে সাফ করে দিল। যেন আগে সব ঠগ জিনিষ চালু ছিল। ফলাফল তো চোখের সামনেই। তারপরে ভিটামিনেরও অযোগ্যতা প্রমানিত হলো। সেটা অনিবার্যও ছিল। এখন দুনিয়াসুদ্ধ লোক তাদের দুর্বলতা আর ক্লান্তি দূর করতে টনিক কিনতেই দোকানের সামনে ভিড় জমায়।

এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু বউমা তার ছোট কন্যার অ-খিদে ভাব নিয়ে দুশ্চিন্তা করত। এর ফলস্বরূপ বেচারী মার্গারিটা, সোনালি চুল আর নীলাভ চোখ আর ফ্যাকাশে রঙের ক্লান্ত খুকী গম্ভীর হয়ে উঠছিল দিনদিন…মার্কামারা ঊনিশ শতকের স্ট্যাম্প যেন। প্রথামাফিক দেবতাদের সঙ্গে মিলিত হবার জন্যই যেন সে নিয়তিবদ্ধ হয়ে আছে।

ওষুধ বানানোর ব্যাপারে আমার দক্ষতা ছিল ওই… “কখনোই না বানানো” পর্যন্ত। কিন্তু নাতনির জন্য উদ্বেগ আমার মধ্যে তাড়ার কাজ করল। একটু আগে যে টনিকটার কথা বললাম অতএব সেটা আবিষ্কার করা গেল। ওটার কার্যকরী ক্ষমতা দারুণ, অলৌকিক। বদলে ফেলার জন্য চার টেবিলচামচই যথেষ্ট। হপ্তাকয়েকের মধ্যেই মার্গারিটা গাবলুগুবলু ফুটফুটে ফর্সা বাচ্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিশ্চিত করে বলতে পারি তাকে দেখলে একটা আগ্রাসী তৃপ্তি আসে। সোজা হয়ে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে খাবার খোঁজে ও। কেউ যদি দিতে না চায় রাগ করে সেখান থেকে চলে আসে। রোজকার মত আজ সকালেও সাঙ্ঘাতিক একটা কিছু ঘটবে ভেবে খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছিলাম। যা ঘটল আমি কখনো ভুলতে পারব না। মেয়েটা টেবিলের মাঝখানে দুহাতে দুটো আদ্ধেক ক্রসেন্ট নিয়ে বসে আছে। খেয়াল করলাম লালচুলো পুতুলের মত বাচ্চাটার গালও যথেষ্ট লাল, রক্ত আর মিষ্টিতে রীতিমত মাখামাখি। ঘরের এক কোণে পরিবারের বাকিরা একে অন্যের গায়ে মাথা ঠেকিয়ে অবসন্ন বসে আছে। আমার ছেলের দেহে তখনও প্রাণ আছে। শেষ কথাটা যাতে বলতে পারে তার জন্য শক্তি প্রয়োগ করল।
মার্গারিটার কোন দোষ নেই।
সাধারণতঃ এমন তীব্র স্বরে সে শুধু আমার সঙ্গেই কথা বলে থাকে।




নিশাচর

খুলিও কোর্তাসার

অনুবাদ- জয়া চৌধুরী

আমার আছে এই রাত, কালো হাত, আর ঘামতে থাকা হৃৎপিণ্ড

ঠিক যেন ধোঁয়ার কেন্নো দিয়ে লড়াইয়ের পর ভুলে যাওয়া পর্যন্ত।

ওখানে সবকিছু রয়ে গেছে; বোতলেরা, জাহাজ,

জানি না আমাকে ওরা ভালোবাসত কি না। আদৌ আমাকে দেখবার জন্য খেলছিল কি না।

বিছানার ওপরে রাখা সস্তার ডায়রির পাতায় ওরা ডিপ্লোম্যাটদের সঙ্গে দেখা হবার কথা বলে,

একটা অনুসন্ধান মূলক রক্তমোক্ষণকে চার প্রস্থে আনন্দ করে ফেটিয়ে তোলে।

অনেক উঁচুতে থাকা একটা জঞ্জাল শহরের মাঝখানের এই বাড়িটার চারপাশ ঘিরে রাখে,

আমি জানি, আমি অনুভব করি যে কোন এক অন্ধ শহরের উপান্তে মারা যাচ্ছিল।

আমার বউ ওঠা নামা করে ছোট ছোট সিঁড়ি ভেঙে

যেন অর্ণব পোতের ক্যাপ্টেন কোন নক্ষত্রদের যে অবিশ্বাস করে।

রাত এগারোটার সময় ওখানে এক পেয়ালা দুধ রাখা আছে, কাগজও।

মনে হয় বাইরে হাজার হাজার ঘোড়া এগিয়ে আসছে সেই জানলাটার দিকে

আমি যার দিক পিঠ ফিরিয়ে বসে আছি।

কবি পরিচিতি - খুলিও কোর্তাসার

তর্ক সাপেক্ষে আর্জেন্টিনার সর্ব কালের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক খুলিও কোর্তাসার ১৯১৪ সালে বেলজিয়ামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা তখন সেই দেশেই আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত পদে নিযুক্ত ছিলেন। কবি, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক কোর্তাসার ছিলেন স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্যে বুম জুগের অন্যতম অগ্রপথিক। আর্জেন্টিনারই নোবেল জয়ী সাহিত্যিক খোরখে লুইস বোরখেসের ভাবশিষ্য ছিলেন তিনি। যদিও তাঁকে নোবেল পদক না দেওয়া নোবেল পুরস্কারেরই মান খোয়ানো বলে মানা হয়। কার্লোস ফুয়েন্তেস তাঁর অসামান্য লেখনীর জন্য মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বলেছিলেন ‘আধুনিক ছোটগল্পের মাস্টার’ আর ‘উপন্যাসের সিমন বলিভার’। ফরাসী ভাষার অনুবাদক হিসাবে তিনি ইউনেস্কোর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। এডগার এলান পো-র রচনাবলী ফরাসী ভাষায় তাঁর কৃত অনুবাদকেই সর্ব শ্রেষ্ঠ মানা হয়। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘রাইউয়েলা’ বা ‘এক্কাদোক্কা’কে স্প্যানিশ ভাষার বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলা হয়। মৃত্যুর অব্যবহিত আগে প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থ “সালভো এল ক্রেপুসকুলো” বা ‘সন্ধ্যা ব্যতিরেকে’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্য কীর্তি। প্রবল রোগভোগে ১৯৮৪ সালে মারা যান তিনি।