রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

জ্বলছে বাংলা, নিরাপত্তাহীন চিকিৎসক -সমাজ


লোক সভার ভোট শেষ হলো । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যাকাশ থেকে সরলো না মেঘের ঘনঘটা । বরং কালো মেঘ ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিচ্ছে ক্রমশ । গণতন্ত্র ও মানবিকতা হারিয়ে ফেলছে পরিভাষা । দল প্রতিদলের গুন্ডাবাজি রূপান্তরিত হচ্ছে মব ভায়লেন্সে । রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর গা-জোয়ারিহিটলারি শাসন আগুনে ঘি পড়ে । জেগে উঠে সাধারণ মানুষ ।

উত্তেজনা শুরু হল এনআরএস হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে৷৮৫ বছরের এক বৃদ্ধের মৃত্যুতে উত্তেজিত হয়ে ট্রাকে করে ২০০ লোকের এন আর এস হাসপাতাল চত্বরে অনুপ্রবেশ করে কর্তব্যরত জুনিয়র ডাক্তারদের মারধরে অরাজকতা সৃষ্টি করে । পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ও রাজ্যর মুখ্যমন্ত্রীর একপেশে গোয়ার্তমি ( গুন্ডাবাজিকে প্রশ্রয় দান ) ঘৃতাহুতি দেয় । চিকিৎসকগণ গণতন্ত্রের আধারে নিরাপত্তা চেয়েধর্নায় বসে । ‘দলীয় রাজনৈতিক গুণ্ডা লাগিয়ে শান্তিপ্রিয় ধর্নাকে তছনছ করতে চেষ্টাকরে সরকার’ – এমনি মন্তব্য আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের । একদিকে জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলন অন্যদিকে পরিষেবা চালুর দাবিতে বেশ কিছু বহিরাগত তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয় হাসপাতালে৷ পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, হাসপাতালের গেট বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ৷

পরিষেবা চালুর দাবিতে বহিরাগতরা তীব্র বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে৷ জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বহিরাগতদের হাতাহাতি লেগে যায়৷ গোটা এনআরএস চত্বরে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে৷ অভিযোগ, বোতল ছুড়ছে বহিরাগতরা৷ তারা গেট দিয়ে জোর করে ঢুকে জুনিয়র ডাক্তারদের উপর হামলা চালাতে আসে৷চিকিৎসকদের দাবি, তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাঁরা পরিবারের একমাত্র সদস্য যাঁরা রোজগার করেন। তাঁদের যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে পরিবারের দায়িত্ব কে নেবেন?

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আন্দোলন উঠিয়ে নিতে সময় দিয়েছিলেন বিকেল ৪ টে পর্যন্ত। তার মধ্যে গোটা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ডাক দিয়েছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু বিকেল ৪ টে নাগাদ পরিস্থিতি সুষ্ঠু হওয়া তো দূরের কথা, এনআরএস ঘিরে পরিস্থিতি কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিতে শুরু করেছে । এদিকে, সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের খবর পৌঁছতেই সেখানে গণ হারে ইস্তফা দেওয়া শুরু হয়ে যায়।রাজ্যের সীমা ছাড়িয়ে জুনিয়র ডাক্তারদের পাশে এসে দাঁড়ালো ভারতের সব চিকিৎসক সমাজ । আগামীকাল ৪০ লক্ষ চিকিৎসক এন আর এস এর জুনিয়র ডাক্তারদের সমর্থনে এগিয়ে এলেন । মুখ্যমন্ত্রী সময় বেঁধে দিয়েছিলেন , ৪ ঘন্টার ভিতরে আন্দোলন না উঠালে তিনি বরখাস্ত করবেন । তাঁর এই মন্তব্যের প্রতিবাদে জুনিয়রদের পাশাপাশি আন্দোলনের সমর্থনে সিনিয়র ডাক্তারগণও ইস্তাফা দিতে আরম্ভ করেন । ডাক্তার নিগ্রহ নিয়ে এনআরএস হাসপাতালে চলতি অচলাবস্থার মধ্যেই সংকট আরও তীব্র হল। হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেন্ডেন্ট ও ভাইস প্রিন্সিপাল সৌরভ চট্টোপাধ্যায় এবং প্রিন্সিপাল শৈবাল মুখোপাধ্যায় দুজনেই সরকারের কাছে ইস্তফাপত্র পাঠিয়ে দিলেন।
ডিরেক্টরেট অব মেডিকেল এডুকেশনের কাছে দেওয়া ওই ইস্তফা পত্রে তাঁরা দু’জনেই বলেছেন, তাঁদের দায়িত্ব থেকে যেন অবিলম্বে অব্যহতি দেওয়া হয়। কারণ, সরকার তাঁদের যে দায়িত্ব দিয়েছে তা পালন করতে তাঁরা অপারগ।
সূত্রের খবর, কাল শুক্রবার এনআরএস হাসপাতালের আরও ষোলো জন সিনিয়র ডাক্তার ইস্তফা দিতে পারেন। ফলে এনআরএস মেডিকেল কলেজের সংকট শুধু যে তীব্র হল তা নয়, সরকারের শীর্ষ আমলারা এ ঘটনার পর আরও বড় বিপদের আশঙ্কা করছেন। তাঁদের আশঙ্কা এই ঘটনা সংক্রমণের মতো ছড়াতে পারে দক্ষিণ থেকে উত্তরবঙ্গের সরকারি হাসপাতালগুলিতে। কারণ, তাঁরা ইতিমধ্যেই খবর পেয়েছেন যে আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকরা ইতিমধ্যে বৈঠকে বসেছেন। শুক্রবার গণ ইস্তফার পথে হাঁটতে পারেন তাঁরা। ইতিমধ্যে মালদা সরকারি হাসপাতালে গণ সত্যা শুরু হয়ে গেছে ।ইতিমধ্যেই রাজ্যের জুনিয়ার চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছেন এইমস-এর চিকিৎসকরা। শুক্রবার তাঁরা ধর্মঘটে যাচ্ছেন। অন্য দিকে, জুনিয়ার চিকিৎসকের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনও। এ দিন প্রেস বিবৃতি দিয়ে নিজেদের মতামত জানায় আইএমএ। আইএমএ প্রসিডেন্ট তথা তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ড. শান্তনু সেন ও জেনারেল সেক্রেটারি ড. আর ভি অশোকনের তরফে এই বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বাংলায় এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে জুনিয়র চিকিৎসকদের উপর হামলা ও তার জেরে ড. পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় তাঁরা চিন্তিত। এই অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। আর তাই শুক্রবার ‘অল ইন্ডিয়া প্রোটেস্ট ডে’ পালন করবেন গোটা দেশের চিকিৎসকরা।

এবার পাশে থাকার বার্তা এল টোকিও থেকে। সেখানে চলা এক সম্মেলনে হাজির ওয়ার্ল্ড মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-এর দুই কর্তা এক ভিডিও বার্তায় রাজ্যে চলা জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, চিকিৎসকদের নিরাপত্ত চিকিৎসার স্বার্থেই প্রয়োজন। একজন চিকিৎসক যদি নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন তবে তিনি কখনওই তাঁর সেরাটা দিতে পারেন না। একই সঙ্গে বিক্ষোভ প্রতিবাদে চিকিৎসা পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেলে রোগীদের দুর্ভোগ হয়। সুতরাং, চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টাকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। তবেই সুষ্ঠু চিকিৎসা পরিষেবা মিলবে। লন্ডনেও আগামীকাল কালো ব্যাজ পরিধান করবেন চিকিৎসকগণ ।

এনআরএস কাণ্ডে অশান্ত পরিস্থিতি রুখতে পদক্ষেপ রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর ৷ সর্বদল বৈঠক থেকে সম্প্রীতি বজায় রাখার আবেদন জানালেন রাজ্যপাল ৷ তিনি বলেন, ‘কী করলে ভাল হয় ৷ জুনিয়র ডাক্তাররাই বলতে পারবেন ৷’

বৃহস্পতিবার সর্বদল বৈঠক থেকে কেশরীনাথ ত্রিপাঠী বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীর আগেই সর্বদল বৈঠক ডাকা উচিত ছিল ৷ এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের আগে উদ্যোগী হওয়া উচিত ছিল ৷ তা হলে এই পরিস্থিতি এড়ানো যেত ৷’ পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘কী করলে ভাল হয় ৷ জুনিয়র ডাক্তাররাই বলতে পারবেন ৷’