রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

জমাট বাঁধা রক্ত, পর্ব -৬

ছয়

কিছুক্ষণ আগে পিয়ন এসে পবিত্রের নামে একটা চিঠি দিয়ে গেছে। পবিত্র বিছানায় শুয়ে শুয়ে একটা বই পড়ছিল। ঠিক তখনই বোন সাবিত্রী এসে চিঠিটা দিল। অনিমেষের চিঠি।অক্ষর গুলি দেখেই পবিত্র চিনতে পারল। পবিত্র অনিমেষের কাছ থেকে এই কয়েকদিন একটা চিঠি আশা করেছিল। নিজে লিখব লিখব বলে ভেবে লেখা হয়ে উঠছিল না। দুবেলাতেই তার সঙ্গের কেউ না কেউ আসে। স্কুল স্থাপন করার কাজটি তাকে বড় ব্যস্ত করে রেখেছে। তাছাড়া তার নিজের অজান্তে তার মনের মধ্যে অঞ্জনা কীভাবে ঢুকে পড়েছে সে নিজেই জানে না। মাঝেমধ্যে কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে তার কিছুটা ভয় হয়। এই ধরনের দুশ্চিন্তাকে সে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। জীবনে কোনো মেয়ের সঙ্গে তার কোনো মানসিক সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। তাই সে এই সম্পর্কটা ঠিক কী ধরনের বুঝতে পারেনা । অঞ্জনা তাকে ছোট ছেলের মতো ব্যবহার করতে চায় । সেই কথাটা তার পৌরুষে আঘাত করে। ইতিমধ্যে সে আর ও একদিন গিয়ে অঞ্জনার সঙ্গে দেখা করে এসেছে। সেদিনও তার সঙ্গে অনেক দূর অঞ্জনা পায়ে হেটে এসেছিল। অঞ্জনা তাকে বলেছিল,-'আমি একটা শর্তে মাস্টারনি হতে পারি।সেটা হল তুমি যতদিন এখানে থাকবে,ফেরার পথে আমাকে বাড়িতে রেখে যেতে হবে। যাবার সময় আমি গরুর গাড়িতে যাব আসার সময় কিন্তু পায়ে হেঁটে ফিরব। তুমি এতটা পথ হাটতে পারবে? প্রশ্নটা শুনে পবিত্র বলেছিল,'এই কথাটা আমারই তোমাকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল। ৭/৮ মাইল পায়ে হেঁটে আমাদের স্কুলে যেতে হত। তোমার পক্ষে কি চার মাইল রাস্তা পায়ে হাঁটা সম্ভব হবে?' অঞ্জনা বলল,' আমার পায়ে হাঁটতে ভালো লাগে। সঙ্গে যখন তুমি থাকবে নিশ্চয়ই আমার ক্লান্ত লাগবেনা।'

সেদিন অঞ্জনার কথায় পবিত্র সম্মত হয়েছিল। পবিত্র বলেছিল,'তোমাকে একদিন আমাদের গ্রামে নিয়ে যাব। আমার মুখে তোমার কথা সবাই শুনেছে, তোমাকে দেখেনি।'

অঞ্জনা আসবে বলে কথা দিয়েছিল। কিন্তু পবিত্র গিয়ে নিয়ে আসার সময় করে উঠতে পারছিল না।

এই ব্যস্ততার মধ্যে পবিত্র অনিমেষকে চিঠি লেখার কথা যে ভাবেনি তা নয়। ভেবেছিল। কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি।

তাই চিঠিটা পেয়ে পবিত্রের ভালো লাগল। বড় আগ্রহের সঙ্গে,আনন্দের সঙ্গে চিঠিটা পড়তে শুরু করেছে যদিও ধীরে ধীরে সমস্ত কিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। পবিত্রের কথাগুলি বুঝেও না বোঝার মত লাগল। অনিমেষ লিখেছে:'... আসার পরে বাবার বাংলোটাতে একা একা থেকে আমি একটা বড় সিদ্ধান্তে এলাম। আমরা আর এভাবে এই অবস্থায় থাকলে হবে না। সময় তো অপেক্ষা করে থাকে না। হয়তো তুই বলবি পড়াশোনা শেষ করে নেওয়া হলে ভালো ছিল। কিন্তু এ ধরনের পড়াশোনার কি কোন অর্থ আছে বরং এই শিক্ষার পরিবেশের মধ্যে আর কিছুদিন থাকলে হয়তো আমাকে বাবার মতো ম্যানেজার অথবা কেরানি- এই দুটোর একটা হতে হবে। এটা আমি নিজেকে কোনো সেক্রিফাইস করেছি বলে গৌরব বোধ করতে চাইছি না। যে দেশে হাজার হাজার গরিব-দুঃখী দুবেলা-দুমুঠো খেতে পায়না সেই দেশে আমার মতো একটি মানুষ তথাকথিত জীবন থেকে হারিয়ে গেলে হয়তো বিশেষ কোনো ক্ষতি হবে না। আমি এই কয়েকদিন রাতে শ্রমিকদের বস্তির মাঝেমধ্যে ঘুরেছি ।' ম্যানেজার সাহেবের ছেলে' বলে ওরা আমাকে সম্মান করে। কিন্তু ওরা আমাকে নিজের বলে গ্রহণ করতে পারছে না। এর কারণ নিশ্চয় কিছু সময় এবং প্রথম প্রয়োজন হবে বাবার সঙ্গে জড়িত আমার পরিচয়টা সম্পূর্ণ মুছে ফেলা। এইজন্যই আমি একটা সিদ্ধান্তে এসেছি যে আমাকে এখান থেকে যেতে হবে। এত ভোগ বিলাস, সুখ স্বাচ্ছন্দ‍্য আমি আর উপভোগ করতে পারব না।... এই চিঠিটা যখন তোর কাছে পৌঁছাবে তখন বর্তমানের ঠিকানায় আমি আর থাকব না। এই ঠিকানার মোহ চিরদিনের জন্য ছিঁড়ে আমি বেরিয়ে যেতে চলেছি...।'

পবিত্র চিঠিটা কয়েক বার পড়ল। অনিমেষের সমস্ত কথা তার কাছে স্পষ্ট হল না। পবিত্র জানে- অনিমেষ কিছুদিন থেকে একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। কয়েকদিন সে অনেক রাত করে হোস্টেলে ঢুকে ছিল। একই রুমে থাকে যদিও অনিমেষ নিজে কিছু বলতে না চাওয়ায় পবিত্র নিজে থেকে জিজ্ঞেস করাটা উচিত হবে না বলে ভেবেছিল। আজকাল কলেজে যথেষ্ট রাজনৈতিক চিন্তা চর্চা হয়- প্রত্যেকেই স্পষ্ট ভাবে সামাজিকভাবে এই সমস্ত কথা বলে। এই ধরনের সভা এবং আড্ডায় কয়েকবার নিজে এসে যোগ দিয়েছে। কিন্তু অনিমেষরা কী করে সে কিছুই জানেনা। তার সঙ্গে আর কারা আছে সেটাও জানেনা। এমনকি তার খোঁজে কেউ কোনোদিন হোস্টেলে আসেনি।

পবিত্র ভাবল অনিমেষ যদি সত্যিই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সে কোথায় যেতে পারে। একদিন কথা প্রসঙ্গে অনিমেষ বলেছিল 'আমাদের দেশের হাজার হাজার গ্রামেই হবে আমাদের ভবিষ্যতের কর্মস্থল।'

পবিত্র তার কথায় হেসেছিল। গ্রাম সে দেখেনি বলে গ্রামের প্রতি এখনও সে রোমান্টিক হয়ে আছে বলে বলেছিল। কিন্তু যখন বাস্তবের সম্মুখীন হবে তখন তার সেই রোমান্টিক ধ্যান ধারণা খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাবে বলে তাকে সাবধান করে দিয়েছিল।সেদিন অনিমেষ ভীষণভাবে তর্ক করেছিল।অনিমেষ বলেছিল,তার প্রতি থাকা এই ভ্রান্ত ধারণা খুব দ্রুত সে শেষ করে দিতে সমর্থ হবে।

পবিত্র ভাবল অনিমেষ কি সত্যিই তার চিঠিতে লেখার মতো চিরদিনের জন্য বাড়ি থেকে চলে গেল নাকি? সে কোথায় যেতে পারে ? আমাদের মতো গ্রামই কি তার কর্মস্থল হতে পারে?

কিন্তু আমাদের মতো গ্রামে এসে সে কী করবে? তার মতো শিক্ষা বিস্তারের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করবে, হাসপাতাল করবে, রাস্তা বানাবে নাকি অন্য কিছু ? স্কুল প্রতিষ্ঠা করার জন্য তো এভাবে চুপিচুপি পালিয়ে আসার দরকার হয় না। বিপ্লব করবে? কিন্তু কার বিরুদ্ধে আর কাকে নিয়ে করবে এই বিপ্লব? গ্রামের মানুষদের বেশিরভাগই তো নিজেদের গ্রামের মানুষদের মতো। এই মানুষগুলি কি বিপ্লব কি জিনিস জানে? তাছাড়া দুবেলা-দুমুঠো ভাতের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে ওদের দিন পার হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে যে সমস্ত কথা তার মতো শিক্ষিত ছেলে একটা বুঝতে সক্ষম হয়নি সেই সমস্ত কথা গ্রামের এতগুলো অশিক্ষিত মানুষ কীভাবে বুঝবে?

সমগ্রদেশের কৃষক-শ্রমিকদের একদিন মুক্তি দিতে হবে- অনিমেষ তাকে একদিন বলেছিল। সেই মুক্তির জন্যই অনিমেষ গ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছে নাকি? পবিত্র ভাবল। পবিত্র তার গ্রামের মানুষগুলির কথা একবার চিন্তা করল। এই মানুষগুলির সমস্যা কি? সেও তো একজন কৃষকের ছেলে, সে কী থেকে মুক্তি পেতে চায়? যুগেশ্বর, গোলাপ, মন্টুরা মুক্তি চায় কি? কিন্তু প্রশ্ন হল- কীসের থেকে মুক্তি ? সেই প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পেল না।

ন-পাম গ্রামীণ সমস্যা গুলি কী কী পবিত্র এক দিক থেকে ভেবে গেল। এই গ্রামের সবাই দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগাড় করতে সক্ষম নয়। এই গ্রামে বিদ্যুতের আগমনের কথা তো বাদই, গ্রামের পাশ দিয়ে একটা বাস ও চলাচল করে না। রাস্তাটা বর্ষার দিন গুলিতে এক হাঁটু কাদায় ডুবে থাকে। গো-পথ দিয়ে পাকা রাস্তায় পৌঁছাতে পাঁচ মাইল পথ পায়ে হেঁটে যেতে হয়। অঞ্চলটিতে ধান হয় ঠিকই, মানুষগুলিও কষ্ট করে। কিন্তু ওদের মতো দুটি ঘরের মানুষ ছাড়া কারও বছরের জন্য খাবার থাকে না। প্রায় মানুষই আধপেটা খায়। কষ্টের অর্ধেক ফল দণ্ডেশ্বর মৌজাদার এবং ছবি লাল মহাজন' পায়। এই দুজন মানুষ ধানক্ষেতে বছরে মাত্র একবারই যায়-সেটা হল ধান কাটার সময়। ওদের মানুষ ধান কাটার সময় মাঠে থাকে যাতে কেউ ফাঁকি দিয়ে বেশি করে ধান নিতে না পারে। তাছাড়া বিপদে-আপদে পড়ে এই দুইজন মানুষের কাছ থেকেই গ্রামের মানুষ টাকা ধার করে, ধান আনে। তার সুদ পরিশোধ করে ও তারা ধান নেয় । কখনও এরকম হয় আধির ধান এবং সুদের জন্য ধান দেবার সময় সমস্ত কষ্টের চার ভাগের তিন ভাগ ফল বিনা পরিশ্রমে এই দু'জন মানুষ লাভ করে।

তার মানে ছবিলাল মহাজন' এবং দণ্ডেশ্বর মৌজাদার ওদের শত্রু নাকি? এই দুটো মানুষের শোষণের থেকে মুক্ত করলেই আমাদের গ্রামের মানুষগুলির মুক্তি আসবে কি?

দেশের আইন আদালত আছে । পুলিশ এসে গ্রামের মানুষগুলিকে একসঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে যাবেনা এমন কথা বলা যায় না। তাছাড়া আমার পিতা আমাকে পড়ানোর জন্য ছবিলালের ওখানে যেভাবে ধান বিক্রি করতে বাধ্য ঠিক সেভাবে গ্রামের মানুষ গুলি ছবি লাল মহাজন' এবং দণ্ডেশ্বর মৌজাদারের অনুগ্রহে বেঁচে আছে। এই দুটি মানুষ না হলেও তার জায়গায় অন্য দুটি ছবি লাল এবং দণ্ডেশ্বর মৌজাদারের সৃষ্টি হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে?

সরকার জনগণের কাছ থেকে নিজের ধান কেনার জন্য একবার ব্যবস্থা করেছিল। একটা সমবায়ও খুলেছিল। সমবায়ের মাধ্যমে ধান বিক্রি করবে। কিন্তু সেই সমবায়েরও সভাপতি হল দণ্ডেশ্বর মৌজাদার। ধান রাখতে হল ছবিলাল মহাজনের গুদামে। জনগণ সমবায়ের মাধ্যমে ধান বিক্রি করে অধিক পয়সা পাবে বলে বলায় সমবায় অফিসার,দণ্ডেশ্বর মৌজাদার এবং ছবি লালের গুদামে তাঁত-বাতি করে থেকে বিরক্ত হয়ে দণ্ডেশ্বর মৌজাদার এবং ছবি লাল মহাজন শেষে যা দিল তাতে সন্তুষ্ট থাকল। সরকারি পয়সা পাওয়ার জন্য তাদের ধৈর্য ছিল না। যতই ওরা দুজন শোষণ না করুক কেন গ্রামের জনগণের জন্য এই দুটি মানুষ এই বিপদে ত্রাণকর্তা। তাই এই দুজন মানুষের বিরুদ্ধে গ্রামের জনগন হাত তোলে না । পবিত্র নিজের মনে কল্পনা করতে লাগল- অনিমেষ এসে যেন ওদের গ্রামেই রয়েছে । গ্রামের মানুষ গুলির মধ্যে প্রচার চালাচ্ছে। শত্রুকে মিত্র কে সেকথা জনগণকে চিনিয়ে দিচ্ছে। ছবিলাল মহাজন' এবং দণ্ডেশ্বর মৌজাদার যে তাদের ঘোর শত্রু বুঝিয়ে দিচ্ছে। জনগণ যেন এই দুটো মানুষের শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একত্রিত হয়েছে।

পবিত্র কখন ঘুমিয়ে পড়ল বুঝতে পারল না। হঠাৎ সাবিত্রীর ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসল।সাবিত্রী বলল তার সঙ্গে দেখা করার জন্য মন্টু এসেছে।

পবিত্র বলল,'ওকে এখানে পাঠিয়ে দে। পারিস যদি কিছুক্ষণ পরে দু কাপ চা নিয়ে আসিস।'সাবিত্রীর সঙ্গে সঙ্গে মন্টু তার ঘরের ভেতর চলে এল। সাধারণত আজকাল সঙ্গীরা এলে একসঙ্গে আসে।একা কেউ আসে না। তাই মন্টুকে একা দেখে সে কিছুটা অবাক হল।

' কী হল, একা এলি দেখছি? যোগেশ্বররা কোথায়?'- পবিত্র জিজ্ঞেস করল।

মন্টু প্রথমে কোনো উত্তর দিল না। সে যেন কিছু একটা দুশ্চিন্তায় পড়ে গম্ভীর হয়ে আছে, পবিত্রের দেখে ঠিক তেমনি ধারণা হল।

' কী হল, কথা বলছিস না যে ?'পবিত্র জিজ্ঞেস করল, 'এত গম্ভীর হয়ে আছিস কেন?'

' তোর সঙ্গে একটা বড় গোপন আলোচনা করতে এসেছি। তুই যদি কথা দিস কাউকে বলবিনা ,তাহলে বলব, না হলে যেভাবে এসেছি ঠিক সেভাবেই চলে যাব।'

' বল বল, আমি কাউকে বলব না' পবিত্র কিছুটা হেসে সহজ করে নিল,' কী আর এমন গোপন কথা বলবি ,কী কাউকে পালিয়ে নিয়ে এসেছিস নাকি ?'

'সেসব হলে তো ভালোই ছিল,কিন্তু সেই সমস্ত কাজের জন্য তোর সাহায্যের প্রয়োজন নেই ...আমি একটা অন্য বিপদে পড়ে এসেছি। তুই বা ব্যাপারটা কীভাবে নিবি সেটা…'

' ভূমিকা বাদ দে, বল তো কী হয়েছে ?তুই বললে তবেই তো বুঝতে পারব তোর বিপদে কতখানি সাহায্য করতে পারব…'

' গতকাল আমাদের গ্রামে একটা মিটিং ছিল’ মন্টু কিছু সময় অপেক্ষা করে বলতে শুরু করল। মিটিংটা আমরা করতে চাওয়া স্কুলটা নিয়েই…'

' খুব ভালো কথা,' পবিত্র বলল,' তোরাও যে চিন্তা করছিস এটা খুব ভালো খবর,এতে চিন্তা করার কী আছে…'

' চিন্তার কথা আছে পবিত্র',মন্টু বলল,'শহরের জীবাণু এসে গ্রামে প্রবেশ করেছে। অনেকে প্রশ্ন করছিল- স্কুলটাতে বাংলা ভাষা শেখাবে কিনা?'

' মানে?' অবাক হয়ে পবিত্র জিজ্ঞেস করল,' যে প্রাইমারি স্কুলে তুই আর আমি পড়েছিলাম, যে প্রাইমারি স্কুলে তোর ভাই বোন পড়েছে- সেই স্কুল নিয়ে এতদিনে একটা প্রশ্ন উঠল না। আজ হঠাৎ হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এরকম একটা প্রশ্ন উঠল কেন? তুই কি বললি?'

' আমি কী বললাম সেটা পরে শুনবি' মন্টু বলল,' কিন্তু প্রশ্নএকটা উঠেছে যখন প্রশ্নটা তুই বাদ দিতে পারিস না.... কেবল হাইস্কুলটা নিয়েই নয়, প্রাইমারি স্কুলটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি কেউ কেউ বাংলা মাধ্যমে একটি এলপি স্কুল স্থাপন করার কথাও ভাবছে। ওরা বলছে এই সময়ে যদি আমরা বাংলা মাধ্যমের একটি স্কুল চাই সরকার দিতে বাধ্য- তাছাড়া ছবিলাল মহাজন' নাকি কারও কারও কাছে বলেছে,যদি বাংলা মাধ্যমের এলপি স্কুল করতে পারি, সেই নাকি একহাজার টাকা চাঁদা দেবে- কথাটা অনেক কে উৎসাহিত করেছে।'

মন্টুর কথা শুনে পবিত্র একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। পবিত্র জীবনে ন-পাম গ্রামে এরকম একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে বলে কোনোদিনও ভাবেনি। যে গ্রামের একপাশে অসমিয়া মানুষেরা এবং অন্য পাশে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষেরা এতদিন ধরে মিলেমিশে একসঙ্গে ছিল,যে মানুষদের ভাষা সংস্কৃতি অসমিয়া মানুষের ভাষা সংস্কৃতির সঙ্গে বিলীন হয়ে গিয়েছিল,যে গ্রামে মন্টুদের মতো যারা বাংলা ভাষার চেয়ে অসমিয়া ভাষা শুদ্ধ করে বলতে এবং পড়তে পারত সেই মানুষগুলি হঠাৎ নিজের ভাষা এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণের জন্য এভাবে আবেগিক হয়ে পড়ল কেন? এদের মনে কে সাম্প্রদায়িকতার বিষ এভাবে ছড়িয়ে দিল ?

' তাছাড়া আরও একটি কথা' মল্টু বলল,' কারও কারও মনে ভয় ঢুকেছে তোরা আমাদের আক্রমণ করতে পারিস, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে পারিস- তাই আত্মরক্ষার জন্য সবাই চিন্তা করছে' …'

' কী পাগলের মতো কথা বলছিস মন্টু' পবিত্র ধৈর্য হারিয়ে চিৎকার করে উঠল,' এতদিন আমরা একসঙ্গে বসবাস করলাম, এর আগেও অসমের বিভিন্ন জায়গায় বহু সাম্প্রদায়িক লড়াই হয়ে গেছে, কোনোদিন তো আমাদের গ্রামে এই সমস্ত বিবাদ নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠে নি। কিন্তু আজ হঠাৎ একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে যাওয়ায় কী উদ্দেশ্যে একটি বাংলাভাষী স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য ছবিলাল মহাজন' ১০০০ টাকা দিতে চাইছে সে কথা একবারও ভেবে দেখেছে…?'

' তুই এত চিৎকার করে কথা বলছিস কেন?' মন্টু বলল,' কথাগুলি তো আমার নয়। তোর উপরে থাকা আস্থার জন্যই তোকে আমি কথাগুলি বলছি যাতে কারও প্রলোভনে আমরা ভাতৃঘাতী সংঘর্ষে লিপ্ত না হই ... তুই এখনই এই সমস্ত কথা কাউকে বলার দরকার নেই।

তোকে মাত্র সাবধান করে দেওয়ার জন্য এলাম। তুই ভেবেচিন্তে যা করার করবি... আমি এখন আসছি…'

' দাঁড়া দাঁড়া এক কাপ চা খেয়ে যা', পবিত্র এবার জোরে চিৎকার করে উঠল,' সাবিত্রী ...।'

পবিত্রের চিৎকারটা শেষ হতে না হতেই সাবিত্রী দুই কাপ চা এবং একটা থালায় নারকেলের কয়েকটি নাড়ু নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।


ক্রমশ