রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

জমাট বাঁধা রক্ত, পর্ব -৫

(৫)

পবিত্র মনটা ঠিক করতে পারল না। স্কুল প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত নামঘরে সভা বসত। বুড়োদের ডাকেনি। যুবকেরা প্রথমে কী করা যেতে পারে তা ঠিক করে নেবার জন্য সবাই একত্রিত হয়েছিল। সবাই বলল-'তুইই যা, তুই গেলে হয়তো মাস্টার এবং মাস্টারের মেয়ে সম্মত হতে পারে।' পবিত্র কথাটা নিজেও বুঝতে পেরেছিল। সে নিজেও অঞ্জনার কাছে যাবার জন্য একটা দুর্বার আকর্ষণ অনুভব করছিল। সেই আকর্ষণ যে কী পবিত্র ঠিক বুঝতে পারল না। গ্রামে তার সমবয়সী অনেক মেয়ে আছে ।দুই একজনের বিয়ে সাদিও হয়ে গেছে। ওদের অনেকের সঙ্গে উপহাসের সম্পর্ক ও রয়েছে, বিশেষ করে সাবিত্রীর কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে। কলেজে যাওয়ার পর থেকে অসুস্থ সাবিত্রীর সঙ্গের কয়েকজন তার কাছে একটু লজ্জা বোধ করে। তার প্রতি সবারই রয়েছে কেবল কৌতুহল। সহজ করে নিতে চাইলেও ওরা তার সঙ্গে আগের মত সহজ হতে পারে না। গ্রামের মধ্যে সেই একমাত্র কলেজে যাওয়া ছেলে, গ্রামের বাকিদের মতো সে কেবল ওদের কাছে এক গৌরবের প্রতীক। পবিত্র যদি কোনো একটি বাড়িতে যায়, বাড়ির বুড়ো বুড়ি বা বড়রা এসে কথা বলে, তার সমবয়সী মেয়েটির কাজ হল পবিত্রের জন্য উনুনে চায়ের জোগাড় করা। বাক্সের ভেতরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে ঢুকিয়ে রাখা কাপপ্লেট জোড়া বের করে এনে সাবধানে ভালোভাবে ধুয়ে নিয়ে শহরের কায়দায় এক কাপ চা দেবার জন্য করা যত্নের মধ্যে ওদের সমস্ত উৎসাহ উৎকণ্ঠা এবং আকর্ষণ শেষ হয়ে যায়। কিছু একটা জিজ্ঞেস করব, কিছু একটা বলব বলে ভাবলেও ওরা যেন তা বলতে পারে না। তারচেয়েও বড় কথা হল যারা তাকে শৈশবে পবিত্র বলে ডাকত তারা আজকাল তাকে পবিত্র বলে ডাকতে কেমন যেন অসুবিধা অনুভব করে। কেউ তাকে নাম ধরে ডাকে না। সেই জন্য তাকে জিজ্ঞেস করা কথা গুলি জিজ্ঞেস করে বোন সাবিত্রীকে। সাবিত্রী সেই সব প্রশ্নের উত্তর যথাযথ দিতে চেষ্টা করে। কোনো উত্তরের প্রতি তার সন্দেহ থাকলে পরের দিন সাবিত্রী বলে-' বুঝেছ দাদা, আজ অমুক তোমার কথা এই বলে জিজ্ঞাসা করেছিল। আমি এভাবে জানালাম। উত্তরটা শুদ্ধ হল কিনা জানার জন্য সে পবিত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কখন ও সাবিত্রী দাদার বিষয়ে ওদের সঙ্গে মনগড়া কথা বলে, কী কথা বলেছে যখন তাকে এসে বলে- দাদা তাকে ধমকে উঠে। তখন সাবিত্রী চোখ ছল ছল করে বলে-' আজ থেকে তোমার কথা একেবারেই বলব না। কেউ যদি তোমার কথা কিছু জিজ্ঞেস করে, আমি তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব।' পবিত্র তখন বলে, দিবি দিবি, দিচ্ছিস না কেন? কিন্তু তার সমবয়সী মেয়েরা স্কুলে পড়ার দিন থেকেই কোনোদিন তার কাছে আসে না। সাবিত্রীর সঙ্গে কেউ এলেও তিন চারজনের দল একটা সাবিত্রীর নেতৃত্বে আসে। পবিত্র একবার ভাবল এই যে মেয়েরা, ওদের কারও সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য, কারও নৈকট‍্য লাভ করার জন্য তার ইচ্ছা হয় কি? ওহো, সে কোনো বিশেষ মেয়ের কথা মনে করতে পারল না। তথাপি কেন জানি তার হঠাৎ যোগমায়ার কথা মনে পড়ে গেল। সেই যে এলপি স্কুলের পড়ার সময় যোগমায়া চুপিচুপি তার জন্য আমলকি নিয়ে আসত,সঙ্গীদের আড়াল করে চুপিচুপি তাকে দেয়। আচ্ছা সেই মেয়েটি কোথায় হারিয়ে গেল? বাবা যোগমায়াকে খুব স্নেহ করতেন। পড়াশোনায় যোগমায়া তার চেয়েও অনেক বেশি মেধাবী ছিল। কিন্তু হাইস্কুলে কয়েক মাস যাবার পরে সে এক দিন নাই হয়ে গেল। মেয়েদের স্কুলে না যাওয়ার ব্যাপারটা এক স্বাভাবিক ঘটনার মতো সেও সহজভাবে নিয়েছিল। মাঠে যাবার সময়, কখনও বা তার বাড়িতে মায়ের সঙ্গে আসার সময় যোগমায়ার সঙ্গে তার যে দেখা হয়নি তা নয়। এতদিনে তার কথা পবিত্রের একবারও মনে পড়েনি। আজ কেন মনে পড়ছে পবিত্র ঠিক বুঝতে পারল না। সম্ভবত অঞ্জনার চোখে যে উজ্জলতা,যে বুদ্ধিদীপ্ততা আজ সে দেখেছে- তা যেন যোগমায়ার চোখেও এক দিন ছিল। আজ যদি যোগমায়া তার মতো পড়াশোনা চালিয়ে যেত –তার চেয়ে অনেক ভালো রেজাল্ট করতে পারত। সে তো শহরে দেখেছে,সাধারণ বুদ্ধি বা জ্ঞান না থাকলেও অনেক মেয়ে বছরের পর বছর ধরে কলেজে আসছে। কেন আসছে তারাও জানে না,পবিত্র ও বুঝতে পারে না। এই সমস্ত মেয়েদের চেয়ে যোগমায়া পড়াশোনা করলে হয়তো অনেক নাম করতে পারত। কিন্তু সে কোথায় হারিয়ে গেল। সে যখন স্কুলে নাইন বা ক্লাস টেন এ পড়ত –তখন যোগমায়ার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। এতদিনে হয়তো সে কয়েকটি ছেলে মেয়ের মা হয়ে গেছে। স্বামী,ছেলে মেয়ে নিয়ে হয়তো সে এখন পুরোপুরি ব্যস্ত। সে হয়তো পড়াশোনা করলে ,এই স্কুলের একজন ভালো শিক্ষক হতে পারত। কিন্তু আজ যদি তার জন্য স্কুলের প্রয়োজন তাহলে সেই স্কুল তার ছেলেমেয়ের জন্য। সে নিজে সেই স্কুলে কোনো অবদান জোগাতে পারবে না। অঞ্জনার কথা পবিত্র যতই ভাবছে –ততই শৈশবের যোগমায়ার মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। এতদিন যার কথা সে ভাবে নি ,এল পি স্কুলে দেখা হওয়া সেরকম একটি মেয়ের কথা কেন বারবার তার মনে পড়ছে সে ঠিক বুঝতে পারল না।

পবিত্রের ভালো লাগল সবাই তাকেই অঞ্জনার কাছে যেতে বলার জন্য । তার মনটাও অঞ্জনার কাছে যাবার জন্য ছটফট করছিল। কিন্তু সে কী বলেই বা যাবে,গেলে অঞ্জনা,অঞ্জনার মা বাবা কী ভাববে সেই বিষয়ে একটা উৎকণ্ঠা থাকার জন্য সে যেতে পারছিল না। সে ভেবেছিল দুদিন থাক,তারপরে যাবে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি অঞ্জনার কাছে যাবার একটা সুযোগ এসে পড়ায় পবিত্রের মনে কিছু একটা বুঝতে না পারা শিহরণ অনুভূত হল।

পবিত্র পিতার কাছ থেকে সাইকেলটা নিয়ে অঞ্জনার কাছে যাবার জন্য বের হল। গ্রামটা পার হয়েই গভীর জঙ্গল। একা যেতে খুব একটা ভালো লাগে না। কিন্তু আজ কখন সে সেই জঙ্গলটা পার হয়ে এল ঠিক বুঝতেই পারল না। স্টেশনের কাছে পৌছে পবিত্রের মনে হঠাৎ একটা প্রশ্নের উদয় হল-সে কি সত্যিই শুধু অঞ্জনার কাছে ওদের গ্রামের শুরু করতে চলা স্কুলটার মাস্টারনী হওয়ার জন্য অনুরোধ করতে এসেছে? প্রশ্নটা নিজেকে করে সে নিজেই থমকে গেল। তার স্কুলটার কথা ভাবতে গিয়ে কেন বারবার অঞ্জনার কথা মনে পড়ছিল? প্রত্যেকের মনে উদয় হওয়া সন্দেহগুলির পরেও কেন নামঘরের সভায় সে বার বার জোর করেছিল স্টেশন মাস্টারের মেয়েকে বললে স্কুলটাতে কাজ করতে রাজি হবে।

প্রশ্নগুলি উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পবিত্রের মনে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভূত হল। সেই উত্তেজনার উৎস কোথায় তা সে খুঁজে পেল না। সে যেন অনুভব করল তাঁর শরীরটা আজ একটু বেশি করে ঘামছে।চার মাইল রাস্তা আগেও সে সাইকেল চালিয়ে এসেছে। তখন তো এমন হয়নি। আজ কেন এরকম হচ্ছে সে কিছুই বুঝতে পারল না।

‘আরে পবিত্র দেখছি? এসো এসো স্টেশন মাস্টার বাড়ি থেকে ঠিক বেরিয়ে আসতে যেতেই পবিত্রকে দেখে অসমিয়া এবং বাংলা মিশ্রিত ভাষায় বললেন-‘ও মা, ওমা অঞ্জনা,এবার স্টেশন মাস্টার বাড়ির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করলেন,’দেখতো কে এসেছে’,তারপরে পবিত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন-‘থ্রি আপটা আসার সময় হয়ে গেছে ,তুমি বস।’

‘ঠিক আছে,আপনি যান’,পবিত্র বলল। স্টেশন মাস্টার কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে পুনরায় কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ায় ফিরে এসে পবিত্রকে জিজ্ঞেস করলেন,‘তোমার বিশেষ কোনো কাজ আছে?’

‘না,না পবিত্র বলল,’আমি এমনিতেই এদিকে আসছিলাম,সেইজন্য ...’

‘ভালো করেছ’,বুড়ো বললেন, এখানে অঞ্জনার কোনো সঙ্গী নেই, তোমাকে পেলে সে খুশি হবে,তুমি কিছু মনে করনা,আমি...’

‘না না ,আপনি যান’-পবিত্র বলল।

বুড়ো স্টেশন মাস্টার বেরিয়ে গেলেন।

‘কিছু মনে করনা’,বাবার মুদ্রা দোষটার প্রতি উপহাস করে অঞ্জনা পবিত্রকে বলল ,’এসো ,এসো আমার সোনার ভাই ,এসো।’

ইতিমধ্যে যে অঞ্জনা এসে পবিত্রের কাছে পৌছেছে,পবিত্র খেয়াল করেনি। সে বুড়ো স্টেশন মাস্টার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়েছিল।

‘হবে হবে’,পবিত্র বলল,বুড়ো মানুষকে উপহাস করতে লজ্জা করে না?’

‘বা বা’ অঞ্জনা বলল’,’একেবারে জামাইবাবু শ্বশুর মশাইর কথা বললে খারাপ পায় বলার মতো হল দেখছি।‘

‘হবে হবে’,পবিত্র বলল,’আমরা এই ধরনের ঝগড়াটে মেয়েকে বিয়ে না করাটাই উচিত হবে…’

‘চুপ কর’ হঠাৎ লজ্জা পেয়ে অঞ্জনা বলল,‘লজ্জা হয় না এভাবে বলতে।‘’

‘লজ্জা পেতে আমি বলেছি কি?’ পবিত্র বলল , ‘নিজে বলে নিজের কথার ফাঁদে পড়লে আমি কী করতে পারি?’

‘আমি তোমার দিদি’,চোখ বড় করে অঞ্জনা বলল,‘একটা কথা মনে রাখবে,আমাকে সম্মান করে কথা বলতে জানা উচিত।’

‘ঠিক আছে দিদিমণি,আমি কথাটা মনে রাখার চেষ্টা করব,তবে আমি তোমাকে দিদি বলে ডাকতে পারব না। আমি তো গ্রামের ছেলে,সেজন্য পড়াশোনাটা একটু দেরি করে,কে জানে বয়সে তুমি হয়তো আমার কাছ থেকে ছোট হতে পার’…’

পবিত্রের অক্ষম বাংলা বলার চেষ্টা দেখে অঞ্জনা হো হো করে হেসে উঠল।

‘হবে হবে,অসমিয়াতে বল’অঞ্জনা বলল,‘আমি বুঝতে পারব…’

‘বুঝতে পারবে না বলে আমি বলছি না’পবিত্র বলল,‘তুমি তো ভালো অসমিয়া বলতে পার,আমি তো বাংলা ভাষা বলা বা শেখার কোনো সুযোগই পাইনি। তোমার সঙ্গে কথা বলেই শিখি…’

‘বাংলা শিখতে হলে এভাবে শিখলে হবে না’,অঞ্জনা বলল,’ তোমাকে প্রতিদিন স্কুলের টিউশন নেওয়া ছাত্রের মতো আসতে হবে,আমি তোমাকে কানে ধরে পড়াব…’

‘ঠিক আছে,পবিত্র বলল, ‘আমি রাজি,তবে আমি এখানে পড়তে আসব না,তোমাকে পড়ানোর জন্য নিতে আসব…’

‘আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?’আশ্চর্য হয়ে অঞ্জনা জিজ্ঞেস করল।

‘আমি সিরিয়াসলি বলছি অঞ্জনা’পবিত্র বলল,‘আমি আমাদের গ্রামের প্রত্যেকের হয়ে তোমার কাছে একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি।সবাই আলোচনা করে আমাকেই তোমার কাছে পাঠিয়েছে…।’

একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে অঞ্জনাপবিত্রের মুখের দিকে তাকাল।সে পবিত্রের কথা কিছুই বুঝতে পারছে না।

‘আমি সত্যিই বলছি অঞ্জনা’পবিত্র বলল, ‘তুমি এভাবে তাকিয়ে আছ কেন…?’

‘আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না,আমার এখানে আসার জন্য তোমাকে গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে কেন?’

‘তোমার কাছে আসার জন্য গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে হয় না’পবিত্র বলল,‘আমি একটা বিশেষ কাজে তোমার কাছে এসেছি।’

হঠাৎ অঞ্জনা গম্ভীর হয়ে গেল।

অঞ্জনার মুখের ভাবের পরিবর্তন দেখে পবিত্র জিজ্ঞেস করল,‘কী হল একেবারে গম্ভীর হয়ে গেলে যে?’

‘এই কয়েকদিন তুমি আসবে বলে আমি রোজই পথ চেয়েছিলাম …আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার কাছে একমাত্র তোমার প্রয়োজনেই আসবে।’

‘আমিতো একমাত্র আমার প্রয়োজনেই এসেছি।আমার প্রয়োজন এবং আমাদের গ্রামের প্রয়োজনের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি না…অবশ্য এই কয়েকদিন আসব আসব বলেও আসতে না পারায় আমি দুঃখিত…আমি প্রতিদিনই ভাবি তোমার কাছে আসব বলে,কিন্তু…’

‘আচ্ছা আচ্ছা হবে’,অঞ্জনা একটু হেসে বল্ল,’তোমার এবং তোমার গ্রামের আমার কাছে এত কীসের প্রয়োজন হল? আমাকে তো তুমি ছাড়া তোমার গ্রামের মানুষ জানে না।’

‘আমার বাইরে তুমিই একমাত্র মেয়ে যে কলেজের মুখ দেখেছ।একটা হাইস্কুল না থাকার ফলে আমাকে আটমাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে হাইস্কুলে পড়তে হয়েছিল।পরে উঁচু ক্লাসে উঠার পরে বাবা সাইকেল কিনে দেয়।এত কষ্ট করে পড়ার এবং পড়ানোর সামর্থ্য আমাদের গ্রামে কারুরই ছিল না।আমার সঙ্গের যাদের পড়াশোনায় আগ্রহ ছিল তাঁরা আমাকে দেখে হয়তো ভেবেছে গ্রামে যদি একটা স্কুল থাকত ,আমার মতো তারা অন্তত কলেজে না পড়লেও স্কুলের গণ্ডিটা পার হতে পারত।ওরা পারল না তো পারল না-কিন্তু ওদের ভাই বোনেরা যাতে পড়াশোনা করতে পারে সেকথা তারা চিন্তা করছে এবং প্রত্যেকে একত্রিত হয়ে আমাকে একটি স্কুল আরম্ভ করার দায়িত্ব দিয়েছে।তাই …’

‘খুব ভালো কথা’অঞ্জনা বলল ,কিন্তু আমার কাছে এসেছ কেন?কোনো চাঁদা বা দান করতে হলে বাবা দেবে।আমার তো উপার্জন নেই।খুব বেশি বাবাকে বলতে পারি…’

‘চাঁদা বা দানের জন্য আমি আসিনি’পবিত্র বলল,আসলে তোমার কথা আমিই গ্রামের লোকদের বলেছি।আমার প্রস্তাবে আপত্তি করার প্রশ্নই হয়ে উঠে না।বলল তুই যা…’

‘কিন্তু কেন?তুমি কী এত ভূমিকা করছ’অধৈ্ররয হয়ে অঞ্জনা বলল, ‘তুমি আমার কাছে কেন এসেছ সেটা কেন বলছ না?’

‘স্কুলটা শুরু করতে হলে প্রথমে মাস্টার মাস্টারনী চাই।আমরা কোথায় পাব।তাই আমিই প্রস্তাব দিলাম ,তোমাকে প্রথম মাস্টারনী করার জন্য…’

‘মাস্টারনী!অত্যন্ত অবাক হয়ে অঞ্জনা বলল, ‘আমি মাস্টারনী হতে পারব বলে তোমার মগজে কীভাবে এল?’

‘তুমি অসম্মত হয়ো না অঞ্জনা’,ঠিক কাকুতি করার মতো পবিত্র বলল,‘ তোমার উপরে আশা করেই আমি অনেকখানি এগিয়েছি।গ্রামের প্রত্যেকেই ঠিক করেছে তুমি তো চারমাইল রাস্তা হেঁটে যেতে পারবে না।তাই তোমাকে নিয়ে যাবার জন্য প্রতিদিন একটি গরুর গাড়ি আসবে,আমাদের এখানে তো রিক্সা নেই …’

‘তুমি আমাকে বড় বিশাল একটা দায়িত্ব দিতে এলে’ অঞ্জনা বলল ,’আমি পারব কি? আমারই বা শিক্ষা কতটুকু আর,তাছাড়া কোনো ধরনের অভিজ্ঞতাও নেই…’

‘আমারও নেই,তাছাড়া কলেজ খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে চলে যেতে এখান থেকে চার পাঁচ মেইল দূরে সোনারু গ্রামে অবশ্য কলেজে দুই বছর পড়া একটি ছেলে আছে।তাকেও বলতে হবে।এই অঞ্চলটিতে আমরাই হলাম শিক্ষিত মানুষ।এর বাইরে যে দুই একজন ছিল তাঁরা গিয়ে পাশের চা বাগানে কেরানি মুহরির পদে জয়েন করেছে,সেখানেই থাকতে হলে এমন কি বিহু সংক্রান্তিতেও গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না…।’

‘কিন্তু আমি কি পারব? তাছাড়া আমি শৈশব থেকে অসমিয়া মাধ্যমে পড়াশোনা করিনি,কলেজেও ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেছি।কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে আমি অসমিয়া বলতে ও লিখতে শিখেছি। এতটুকু জ্ঞান নিয়ে আমি কি ভালোভাবে প্রাতে পারব?’

‘কী পারব আর কী পারব না এখন আমাদের সেটা চিন্তার বিষয় নয়। কিছু একটা করতে চাইছি এবং সেটা আরম্ভ করাটাই বড় কথা এখন হয়তো তোমাকে কোনো বেতন …’

‘বেতনের কথা কে বলছে’ অঞ্জনা বাধা দিয়ে বলে উঠল,’আমি আমার যোগ্যতার কথাই বলতে চাইছি…’

‘যোগ্যতার বিচার করার জন্য কে আছে।আমাদের যতটুকু জ্ঞান আছে আমরা শেখাব,নিজেও শিখব আর ইতিমধ্যে আমরা সরকারের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা করব।সরকারের কাছ থেকে কোনো সাহায্য এলে হয়তো দূর থেকে আমরা একজন বা দুজন শিক্ষক আনতে পারব।এভাবে যদি কিছু হয় হোক না,গ্রামে যদি কিছুটা শিক্ষার আলো আসে…’

‘তোমার প্রচেষ্টা যথেষ্ট ভালো’অঞ্জনা বলল,’তুমি পারবেও,কিন্তু আমি তোমাকে কতটা সাহায্য করতে পারব বলতে পারছি না…।’

অঞ্জনা এবং পবিত্র কথা বলার সময় থ্ৰি আপ ট্রেনটা এল। বিরাট শব্দ করে ট্রেনটা পার হয়ে গেল। ট্রেনের শব্দ ওদের কথায় কিছু বাধার সৃষ্টি করল। অঞ্জনা বলল, খালি কথা বলে চলেছ, তুমি বস, আমি গিয়ে চা করে আনি। পবিত্র বাধা দিয়েছিল । কিন্তু অঞ্জনা শুনল না। পবিত্র অবশ্য চায়ের প্রয়োজন যে অনুভব করেনি তা নয়। কিন্তু অঞ্জনা উঠে গেলে সে যে একা হয়ে পড়বে সে কথা ভেবেই অঞ্জনাকে যেতে সে বাধা দিয়েছিল।

সেদিন পবিত্র যখন অঞ্জনার ঘর থেকে যাবার জন্য উঠল, তখন বাইরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পবিত্রের সঙ্গে সঙ্গে অঞ্জনা কিছুটা পথ হেঁটে চলল। কিছুটা দূরে আসার পরে পবিত্র বলল -'তুমি ফিরে যাও অঞ্জনা ,সন্ধ্যা হয়েছে।' অঞ্জনা জিজ্ঞেস করল, 'তোমার দেরি হচ্ছে নাকি?' পবিত্র বলল,' আমার দেরির কথা আমি বলছি না। সাইকেল নিয়ে এসেছি, মাত্র চার মাইল রাস্তা। পনেরো মিনিটে ঠিক পৌঁছে যাব। তোমাকে একা একা ফিরতে হবে…’

' আমি এভাবে অনেকদিন বেড়াইনি পবিত্র' অঞ্জনা বলল ,আজ ভালো লাগছে, আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দের একটা কবিতা মনে পড়ছে, শুনবে?'

‘নিশ্চয়’ পবিত্র বলল, ‘জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমি যে পরিবেশে বড় হয়েছি সেখানে জীবনানন্দ দাসের কবিতা শোনার সুযোগ আমার ছিলনা । তোমার ঘরে সেদিন প্রথম জীবনানন্দ নামে একজন কবির কবিতার বই দেখলাম। তাই এরকম একজন কবির কবিতা এপ্রিশিয়েট করতে পারার মতো আমার জ্ঞান নেই ।একমাত্র তোমার মুখে কবিতা আবৃত্তি শোনার আগ্রহে আমি শুনতে চাইছি…’

'আমি ভালোভাবে আবৃত্তি করতে জানিনা' অঞ্জনা বলল, তবুও শোনো, অ্যাপ্রিসিয়েশনের দরকার নেই। অনুভব করতে পারলেই হবে…'

সন্ধ্যা হয় -চারদিকে শান্ত নীরবতা,

খড় মুখে নিয়ে এক শালিখ যেতেছে উড়ে চুপে;

গোরুর গাড়িটি যায় মেঠো পথ বেয়ে ধীরে-ধীরে;

আঙিনা ভরিয়া আছে সোনালি খড়ের ঘন স্তূপে;

পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;

পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;

পৃথিবীর…

হঠাৎ অঞ্জনা থেমে গেল। একান্ত মনে অঞ্জনার মুখের দিকে তাকিয়ে পবিত্র কবিতা শুনছিল। হঠাৎ থেমে যেতে দেখে পবিত্র জিজ্ঞেস করল,’ কী হল থেমে গেলে দেখছি…’

' ঠিক আছে, বাকিটুকু প্রয়োজন নেই। অঞ্জনা বলল, ‘ভুলে গেছি…’

‘ না না, কখনও নয় তুমি মিথ্যা কথা বলছ’, পবিত্র বলল, আমাকে বাকিটুকু শোনাতে হবে …’

অঞ্জনা হঠাৎ কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর বলল, 'তুমি যদি জোর কর আমাকে শোনাতে হবে। আজ আমি তোমাকে যে কবিতাটা আবৃত্তি করে শোনালাম সেই কবিতাটা অন্য একদিন আমাকে একজন শুনিয়েছিল… আমার জানা একটি দুঃখের অতীত আছে, আজ সেই সব বলে সন্ধ্যাটা নষ্ট করব না …’

তোমার যদি এই ধরনের কোনো বাধা থেকে থাকে তাহলে দরকার নেই’ পবিত্র বলল, আমি শুনব না…’

বাধার কথা নয়’ অঞ্জনা কিছুটা সহজ হতে চেষ্টা করে বলল, ‘তোমার সামনে কিছু একটা সংস্কার আমাকে কবিতাটা এবং আবৃত্তি করতে বাধা দিয়েছে, আফটার অল তুমি একটি ছোট ছেলে…’

এভাবে ছোট ছোট বলনা অঞ্জনা’ পবিত্র বলল, জ্ঞান-বুদ্ধি অভিজ্ঞতা কম বলে ইমম্যাচিউর বলতে পার। জীবনানন্দের কবিতার রস আস্বাদন করতে পারার মতো আমার জ্ঞান হয়নি, কিন্তু আমি খুব ছোট ছেলে নয়। অন্তত তোমার চেয়ে আমি বয়সে ছোট নয়। যদিও এক বছর পরে মেট্রিক পাশ করেছি…’

‘আচ্ছা, আচ্ছা হবে’ অঞ্জনা বলল, ‘ছোট বলে বললে সেন্টিমেন্টে লাগে তাইনা। বাকিটুকু শোন -একজন শ্রেষ্ঠ কবির কবিতা হিসেবে, এটা আমার কথা বলে জীবনে কোনদিন ভুল কর না

পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;

পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;

পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দুজনার মনে;

আকাশ- ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে-আকাশে।

'এই প্রেমটা কী জিনিস অঞ্জনা?'- পবিত্র জিজ্ঞেস করল।

' তোমার আর অন্য প্রশ্ন নেই' কৃত্রিম ক্রোধে অঞ্জনা বলল,' একজন মহৎ কবির কবিতার উপরে অন্য আর প্রশ্ন নেই…’

‘ও সরি’ পবিত্র হেসে বলল, ‘কবিতাটার বাকি কথাগুলি মনে রইল না, যা রইল তাই জিজ্ঞেস করছি…’

‘হবে হবে, বদমাশি করে দেখাতে হবে না। এখন তুমি যাও…’

অঞ্জনা হঠাৎ ঘুরে স্টেশনের দিকে ফিরে যেতে লাগল।

‘কী হল হঠাৎ’, পবিত্র জিজ্ঞেস করল, দাঁড়াও দাঁড়াও…’

‘ অনেক দেরি হয়েছে, তুমি যাও, গুডনাইট’- পবিত্রকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে অঞ্জনা চলে গেল। কিছু সময় পবিত্র একান্তমনে অঞ্জনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। অঞ্জনা একবারও ফিরে তাকাল না।

অঞ্জনাকে যখন আর দেখা গেল না, পবিত্র সাইকেলে উঠল। সে অঞ্জনা আবৃত্তি করা জীবনানন্দের কবিতাটা মনে করতে চেষ্টা করল-

পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;

পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;

পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দুজনার মনে;

আকাশ…’

না,পবিত্রের আর কিছুই মনে পড়ল না।

সে জোরে সাইকেল চালাতে লাগল।


ক্রমশ ...