শুক্রবার, নভেম্বর ২২, ২০১৯

চীনে কেমন আছে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায় ?


গত কয়েক বছর ধরে আমরা চীনের শিংজিয়াং অঞ্চলের উইঘুর সম্প্রদায়ের কথা শুনে আসছি। বিশেষত চীন প্রজাতন্ত্র এই মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে বর্তমানে যে ব্যবহার করছে তা নিয়ে এখানে অতি সংক্ষেপে কিছুটা আলোচনা করব। মজার কথা হলো যে পাকিস্তানী মিডিয়া কাশ্মীরীদের দুঃখ নিয়ে সদাই অশ্রু বিসর্জন করে থাকে তারা কিন্তু শিংজিয়াঙে উইঘুরদের ওপর অত্যাচার নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব। শিংজিয়াং অঞ্চলটি চীনের পশ্চিমপ্রান্তে অবস্থিত যে অঞ্চলটি কিছুটা বিতর্কিত। এর ভৌগলিক অবস্থান এমনই যে এই অঞ্চলটি আটটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের সীমানা শেয়ার করে। যেমন মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, কাজাখিস্তান, কির্ঘিস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত। তাই ভৌগলিক অবস্থান হিসেবে এই অঞ্চলটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও চীনের এই অঞ্চলটি খনিজ সম্পদে ভরপুর। এখানে বাস করেন প্রায় ৯০ লক্ষ উইঘুর সম্প্রদায়ের লোক যারা মূলত তুর্কী সম্প্রদায়ের। চীনের এই অঞ্চলটিকে নিয়ে বর্তমানে সংবাদ মাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে কারণ উইঘুরদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের কারণে চীন সরকার বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে যা এই মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্ম পালনের অধিকারের খিলাফ। কিন্তু যে প্রশ্নটি আমার মনে আসে তা হলো বালুচিস্তানের মুক্তি আন্দোলনে যেমন ধর্মের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই কারণ পাকিস্তান একটি ইসলামিক রাষ্ট্র তেমনি উইঘুরদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনও কিন্তু বালুচিস্তানের অনুরূপ তাই এই সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনকে ধর্মীয় চেহারা দেওয়ার যে চেষ্টা চীন চালাচ্ছে তা আমার মতে সমর্থনযোগ্য নয়। ১৯৪৯ সালে শিংজিয়াং অঞ্চলটি চীন প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সামিল হয়েছিল। এর আগে শিংজিয়াং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল এবং এই অঞ্চলটিকে উইঘুররা পূর্ব তুর্কিস্তান বলে জানতেন। চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর মাও জে দঙের পরিকল্পনা অনুযায়ী এই অঞ্চলটিকে চীন প্রজাতন্ত্রে সামিল করা হলেও এই আগ্রাসনে উইঘুররা মোটেই খুশি ছিলেন না। চীন এই অঞ্চলটিকে কব্জা করেছিল মূলত দুটো কারণে। প্রথমত এর ভৌগলিক অবস্থান এবং দ্বিতীয়ত এর প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ। শিংজিয়াং অঞ্চলে আগে থেকেই মূলত দুটো সম্প্রদায়ের বাস। উইঘুর ও হান সম্প্রদায়। বর্তমানে প্রায় ৪৫ শতাংশ হলেন উইঘুর ও ৪০ শতাংশ হান সম্প্রদায়ের। বাদ বাকি ১৫ শতাংশ অন্যান্য সম্প্রদায়ের। এই উইঘুর ও হান সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐতিহাসিক দিক থেকে কারা এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা তা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। দুটো সম্প্রদায়ই মনে করেন যে তারাই এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা তবে হানরা মনে করেন তারা যে এখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে পরিণত হচ্ছেন তার কারণ চীন উইঘুরদের আঞ্চলিক স্বাধীনতা প্রথম থেকেই দিয়ে আসছে। আসলে হানরা সংখ্যালঘুই ছিলেন | কিন্তু মাও জে দং কিছু সরকারি নীতি তৈরি করে হানদের সংখ্যাগুরু ও উইঘুরদের সংখ্যালঘু জাতিতে পরিণত করতে চান | ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর ডেং জিয়াওপিং ক্ষমতায় এসে এটাকে অন্যায় মনে করে তিনি চীনের এক সন্তান নীতি হানদের ওপর লাঘু করলেও উইঘুরদের ওপর এটা লাঘু করেন নি। তাই কয়েক দশক ধরেই উইঘুররা নিজেদের অটোনমি নিয়ে চীন প্রজাতন্ত্রে সামিল থেকে ভালই ছিলেন। চীনের আর্থিক বিকাশে উইঘুরদেরও বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে অন্য কারণে। সোভিয়েত রাষ্ট্রের পতনের পর নব্বইয়ের দশকে উইঘুররা দেখতে পান যে তাদের আশপাশের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে মুক্তি পেয়ে দিব্যি স্বাধীন ভাবে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। যেমন কাজাখিস্তান, কির্ঘিস্তান, তাজিকিস্তান ইত্যাদি। এই জিনিসটাই শিংজিয়াঙের কিছু মানুষের মধ্যে স্বাধীন শিংজিয়াঙের ধারণার জন্ম দিয়েছে এবং তারা চীন প্রজাতন্ত্র থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কিন্তু উইঘুরদের এই স্বাধীনতা আন্দোলনে মদত দিচ্ছে আল কায়দা সহ বিভিন্ন ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। যার ফলে এই আন্দোলন ইসলামিক সন্ত্রাসী রূপ নিয়ে নিয়েছে। তাই চীন প্রশাসন এই উইঘুরদের ওপর নানা ধরণের প্রতিবন্ধকতা লাগিয়ে দিয়েছে যা কিনা ধর্ম পালনের বিরুদ্ধে। যেমন ৪৫ বছরের কম বয়সীরা দাড়ি রাখতে পারবেন না, মহিলাদের হিজাব পরা নিষেধ, রমজানের সময়ে রোজা রাখা চলবে না, এমন কি বাড়িতে কোরান রাখাও নিষিদ্ধ। এখন এক লক্ষ উইঘুরদের রি-এডুকেশন ক্যাম্পে রেখে মগজ থেকে ইসলামি ধর্ম বিশ্বাস ছাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এছাড়াও চীনা পুলিশ অনেক যুবকদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধরে নিয়ে গেছে যারা এখনও নিখোঁজ। তাই শিংজিয়াঙে যা ঘটে চলেছে তা মানবাধিকারের দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয়।