শনিবার, ডিসেম্বর ৫, ২০২০

চাকমা দুহিতা


চাকমা দুহিতা একটি উপন্যাস । লেখক ত্রিপুরার শ্যামল বৈদ্য । পঞ্চাশোর্ধ এই লেখকের ইতিপূর্বে বেরিয়েছে দুটি কাব্যগ্রন্থ, একটি নাটকের সংকলন ও একটি বড়সড় উপন্যাস ‘বুনোগাঙের চর’ ।

তাঁর এবারের সাহিত্যকর্মটি হল আরেকটি উপন্যাস যা ইতিহাস আশ্রিত । “চাকমা দুহিতা” । গ্রন্থটি উপহার পেয়েছি আমার অনুজপ্রতিম বন্ধু গৌতমলাল চাকমার কাছ থেকে । তাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই এমন সুন্দর একটি উপহারের জন্য ।

ইতিহাস আশ্রিত বললেও ইতিহাসের উপাদান সামান্যই । সময়কাল ভারতবর্ষে সিপাহী বিদ্রোহের সামান্য পরবর্তী । কেন্দ্রীয় চরিত্র চাকমা রানি কালিন্দী ।

ভারতবর্ষ বৃটিশের অধীনে যাবার মোটামুটি শতবর্ষ পরে সিপাহীবিদ্রোহ ঘটে আর তারও প্রায় শত বর্ষ পর ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভ । তা হলে অনুমিত হয় ভারতে বৃটিশ রাজত্বের মাঝামাঝি সময়ে এই চাকমা রানি ‘কালাবি’ বা ‘কালিন্দী’র শাসনকাল । রানি হলেও মূলত তিনি ছিলেন বৃটিশ নথিভুক্ত “চাকমা চীফ”। অর্থাৎ রাজ্যটি একটি করদ রাজ্য ।

গ্রন্থটি মূলত উপন্যাস, যার কেন্দ্রে রয়েছেন রানি কালিন্দী । কিন্তু এই রানির মূল ইতিহাসটি তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে আসলে কোথাও, কোন ইতিহাসে নেই । এমন বলেছেন লেখক । এও বলেছেন এই গ্রন্থটি যেন কোনভাবেই কোন রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত না হয় । এতে তথ্যগত ভ্রান্তি ঘটতে পারে ।

চাকমা জাতিভিত্তিক কোন উপন্যাস এর আগে তেমন নিষ্ঠভাবে রচিত না-হলেও আরেকটি গ্রন্থের হদিস আমার গোচরে রয়েছে, আর সেটা হল ডঃ সুধাংশুবিকাশ সাহা রচিত “গোমতী”, যা আমার পড়া নয় । সম্ভবত সেটি কোন মিথভিত্তিক প্রেমকাহিনি ।

‘চাকমা দুহিতা’র রচয়িতা শ্যামল বৈদ্যকে যারা এই উপন্যাস রচনায় উদ্দীপিত করেছেন বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করে, লেখক তাদের নাম উল্লেখ করেছেন গ্রন্থটির ভূমিকায় । এর মধ্যে প্রারম্ভিক উদ্দীপক গৌতমলাল চাকমা ।

বিখ্যাত তথ্যগ্রন্থ “The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein(1869)” এবং “Wild Races of South-Eastern India (1870)” যিনি রচনা করেন তিনি হলেন ‘থমাস হার্বার্ট লেউইন (Thomas Herbert Lewin)’ (জীবৎকাল ১৮৩৯-১৯১৬), যিনি বৃটিশ ডেপুটি কমিশনার হিসেবে রানি কালিন্দীর এলাকায় ১৮৬৬ থেকে ১৮৭৪ পর্যন্ত কাজ করে গেছেন । আর ইনিই হয়ে উঠেছিলেন রানির এবং রাজ্যের যন্ত্রণার কারণ । এই ১৮৭৪ সালেই রানিও বার্ধক্যজনিত রোগে দেহত্যাগ করেন তাঁর পরবর্তী যুবরাজকে রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত করার পর ।

লেখক এ ছাড়া আর যে যে গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছেন সেগুলো হল সতীশ ঘোষের “চাকমা জাতি”, বিরাজমোহন দেওয়ানের “চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত”, কুমুদ বিকাশ চাকমার “চাকমা দুই রাজবংশ” । লেউইনের দুই গ্রন্থ আর উপর্যুক্ত গ্রন্থগুলোতে রানি কালিন্দী বিষয়ে অতি সামান্য উল্লেখ পাওয়ায়, তাকেই নিজ কল্পনায় খানিক পল্লবিত করে লেখক শ্যামল বৈদ্য এক অসাধারণ কাজ করে ফেললেন, যা চাকমা জাতির আত্মবিশ্বাসকে আরও বহুমুখী করে তুলবে সন্দেহ নেই ।

বিশ্বের সকল রাজকাহিনিতেই রাজ-অন্দরমহলে ঘটনা ও ষড়যন্ত্রের ডালপালা প্রায় একই ফর্মূলায় চলে, সে অযোধ্যার রাজ অন্দরমহল হোক আর রানি কালিন্দীর রাজমহলই হোক । সকলেরই লক্ষ্য ক্ষমতা । আমরা ইতিহাস বলতে যা পড়ি, তা সবই মোটামুটি রাজকাহিনিতেই বাঁধা পড়ে থাকে বা আছে এপর্যন্ত, এর বাইরে যেতে পারেনি । বীরগাথা, ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা, খুন, সাম্রাজ্যবিস্তার, নারী-অপহরণ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ ! তাই এখানেও কাহিনি গড়ে তোলার ছক নিয়ে খুব একটা ভাবতে হয়নি বললেও, আরও অনেক কিছু বলার বাকি থাকে । লেখক একজন বাঙালি । চাকমা ভাষা একটু আধটু জানা থাকলেও তাদের সামাজিক রীতিনীতি, উৎসব, ধর্মাচরণ, পারিবারিক সংস্কার, মূল্যবোধাদি অজানাই থাকার কথা । কিন্তু গ্রন্থটি পাঠ করলে এসবের কোন ত্রুটি বা অসংলগ্নতা বা খামতি তেমন চোখে পড়ে না । আর এখানেই এই লেখকের অক্লান্ত অধ্যাবসায়ের পরিচয়টি আমি দেখতে পাই যেন । কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন, এ কথা লেখক ভূমিকাতেই অকপটে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন । এটা তাঁর সততারও একটি স্তম্ভ বটে । কারণ একথা না-বললেও কেউ ধরতে বা বুঝতে পারতেন না, কতখানি কল্পনা আর কতখানি সত্যতা রয়েছে এই ২৯৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির প্রেক্ষাপটে । কারণ, সূত্র-গ্রন্থগুলিতে রানির সামান্য উল্লেখই মাত্র রয়েছে । ফলে এই রানি আর রাজত্ব সম্পর্কে লেখক পাঠক বা চাকমা জাতিগোষ্ঠি সকলেরই একই অন্ধকারে অবস্থান । তবু আজ থেকে প্রায় ১৬০ বছর আগের ইতিহাসভিত্তিক কিছু ঘটনা জুড়ে জুড়ে একটা ধারাবাহিকতাপূর্ণ ঘটনাস্রোত নির্মাণ করা তত সহজ নয়, একথা অনুমেয় । লেখকের কৃতিত্ব এখানেই । আমি মূল কাহিনিতে ততটা যাচ্ছি না সঙ্গত কারণেই । উপন্যাসটি আমার হৃদয় জয় করেছে, এটুকুই বলার । জাতিধর্ম নির্বিশেষে এটা সকলের দ্বারা পঠিত হলে অবিভক্ত ভারতবর্ষে ইংরাজ শাসনের স্বরূপ, এবং একইসঙ্গে সেই পরিস্থিতিতে একজন স্বল্পশিক্ষিতা রানির দেশপ্রেম, জাত্যাভিমান, ইংরাজ-বিরোধিতার তীব্রতা, প্রায় নিরক্ষর প্রজাপালন, ধর্মাচরণ, শিক্ষার প্রসার, অতীত পর্যালোচনায় ভবিষ্যতের রূপরেখা স্থির করা, বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করা ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক ধারণা জন্মাবে, এবং অবশ্যই গর্ববোধ হবে ।

এবার আরও একটু পেছনে যাই । লোক-সংস্কৃতি গবেষক তথা কবি সমর চক্রবর্তীর সঙ্গে আলোচনাক্রমে অবগত হই যে, খ্রীস্টপূর্ব ২০০-৩০০ বছর আগে মঙ্গোলিয়ানদের বিভিন্ন গোষ্ঠী চিন এবং তৎসংলগ্ন এলাকা থেকে দুই দিকে ভারতবর্ষে প্রবেশ করতে শুরু করে । একটি ধারা তিব্বতের পথ ধরে নেপাল ভুটান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে । এদের বলা হয় টিবেটিয়ান গ্রুপ । আরেকটি দল বার্মার পথ ধরে ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে । ঐতিহাসিকরা এদের চিহ্নিত করেছেন বার্মিয়ান গ্রুপ বলে । বর্তমান চাকমারা এই দলের, যারা আরাকান হয়ে ত্রিপুরা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে আছেন আজ অবধি । এই মাইগ্রেশনের বিভিন্ন কারণের মধ্যে গোষ্টীকোন্দলও ছিল বলে ঐতিহাসিকদের অনুমান ।

এই কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রামে রাজানগর রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে, যার ভগ্নদশা এখনও বর্তমান, এমনকি একজন রাজাও আছেন যিনি বর্তমান বাংলাদেশে চাকমা চীফ হিসেবেই আছেন, ঠিক আগের মতই । ইনি এখনও যেমন খাজনা আদায় করেন, আবার বাংলাদেশ সরকারকে কর প্রদানও করে থাকেন ।

কাহিনিটি সিনেমাটিক ভঙ্গিতে এক আহত যুবককে নিয়ে শুরু হয় । অংলা চাকমা, যে মূলত চাকমাই নয়, কোন কারণে তাড়িত হয়ে এই এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করে এবং স্থানীয় চাকমা বাসিন্দাদের অনুগ্রহে সেখানেই স্থায়ীভাবে একজন জুম্ম বা জুমিয়া হিসেবে বসবাস করে এমনকি একজন চাকমা যুবতি, কান্যাবি চাকমার পাণিগ্রহণও করে । অংলা মূলত একজন ‘তিবিরে’ অর্থাৎ ‘ত্রিপুরী’, যা সে নিজে কখনো প্রকাশ করেনি । এই ব্যাপারটা জানা যায় কাহিনির অন্তিম চরণে ।

গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তখন প্রতিনিয়ত চলছে কুকিদের ঝটিকা আক্রমণ । উদ্দেশ্য ধনসম্পদ এবং সুন্দরী যুবতি নারী অপহরণ, শিশুবৃদ্ধ নির্বিশেষে নরসংহার আর নরমুণ্ড কেটে নিয়ে যাওয়া । এই নরমুণ্ডের সংখ্যার ওপর নির্ভর করত তাদের বীরত্বের মাপকাঠি ! এই আক্রমণগুলির কথা ঐতিহাসিক সত্য । ইংরাজ আর চাকমারাই মিলিতভাবে ক্রমান্বয়ে এসব দমন করেন ।

অংলা এমনই এক আক্রমণের কবলে পড়ে এবং যখন কুকিরা তার স্ত্রী কান্যাবিকে অপহরণ করে নিয়ে যায়, তখন সে তাদের পিছু ধাওয়া করে, কয়েকজনকে মেরেও ফেলে কিন্তু কান্যাবিকে মুক্ত করতে পারে না । প্রতি-আক্রমণে সে গুরুতর আহত হয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে এক অজ্ঞাত স্থানে এসে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায় । জ্ঞান ফেরার পর সে কোথায় আছে তা নির্ণয় করতে পারে না । পরবর্তীতে কিছু চাকমা যুবতি দ্বারা সে সহসা আবিষ্কৃত হয় ও ‘মিজিলিক’ বা ‘ছেলেধরা’ হিসেবে তাকে সন্দেহ করা হয় । খবর ছড়িয়ে পড়লে তাকে সেখানকার দলপতির ঘরে আনা হয় । এরপর কাহিনি নাটকীয়ভাবে এগোতে থাকে ।

এই ব্যাপারটা একটু বাস্তবিকভাবে ভাবলে কিছুটা অসংলগ্ন মনে হতে পারে । অংলা নিজ বাড়ি থেকে তেমন অতিদূর কোন জায়গায় পতিত হয়নি, যাতে সে এলাকাটি চিনতে না-পারে । সে জুমিয়া, টিলার পর টিলা, পাহাড়ের পর পাহাড় তার এতদিনে নখদর্পণে এসে যাবার কথা । গল্পের কারণে সেটা অবশ্য মেনে নেয়াই যায় ।

বস্তুত অংলার কাহিনি, আমার মনে হয়েছে একটি পার্শ্বকাহিনি বা সমান্তরাল কাহিনি মাত্র, যা রাজকাহিনিকে এগিয়ে নেবার জন্য লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত । তবু, বলতে হয় অত্যন্ত চমৎকার এই অংলার কাহিনি, যে-কারণে রানি কালিন্দীর মূল কাহিনি একটু ছায়াবৃত হয়েই রয়েছে ।

অংলা তার স্ত্রী কান্যাবিকে অত্যন্ত ভালবাসত, যার জন্য সে আমৃত্যু সকল সংকট মাথায় নিয়ে এগিয়ে গেছে । রাজাশ্রিত হবার পর রাজ্যরক্ষার্থে, কুকি আক্রমণ প্রতিহত করতে রানির আদেশে গেরিলা বাহিনী সে গড়েছে, কিন্তু তার মনে সবসময়ই ছিল এক দিশা, কীভাবে কান্যাবিকে উদ্ধার করা যায় । এ যেন সেই সীতা উদ্ধারের কাহিনি ! এখানেও ভিন্নভাবে রাম-সীতার বিচ্ছেদের মত ব্যাপার ঘটেছে । তবে একটা ব্যাপার আমার মনে হয়েছে, কান্যাবির জন্য অংলার মনে যে হাহাকার, যে আকাঙ্ক্ষা, যে আকুলতা তাকে ফিরে পাবার, যে অদম্য কামনা তাকে কাছে নিজ বাহুবন্ধনে পুনরায় পাবার, সেই আকুলতা কেবল লেখকের বয়ানে বা কখনো অংলার ভাবনাতেই মাত্র ব্যক্ত হয়েছে, যার বাস্তবিকতার তেমন কোন দৃশ্যময় অভিঘাত রচিত হয়নি, বা বলা যায় কান্যাবির চরিত্রটি লেখকের কাছে সেই মর্যাদা পায়নি, যা অংলার বিপরীতে একটি যোগ্য চরিত্রের পাবার কথা ছিল, ফলে পাঠকের মনে কান্যাবিকে ফিরে পাবার আর্তিটি তেমনভাবে সঞ্চারিত হয় না ।

গল্পের ক্লাইম্যাক্সে, এন্টিক্লাইম্যাক্সের ধাক্কায় অংলার এমন এক মৃত্যু দিলেন লেখক যা তার চরিত্রের সঙ্গে মানায় না বলেই আমার মনে হয়েছে । তবু দারুণ টান টান এক গল্পের ধারা বজায় রেখে গেছেন লেখক, যা আমার কাছে হিমালয়ান টাস্কই মনে হয়েছে ।

The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein ও Wild Races of South-Eastern India-এর লেখক বৃটিশ ডেপুটি কমিশনার Thomas Herbert Lewin-এর সেখানে বাস্তবিক উপস্থিতি রানির চরিত্রটিকে আরও উজ্জ্বল করেছে নানান ঘাত প্রতিঘাতে, এমনকি Lewin-এর চরিত্রটিও লেখকের কলমের খোঁচায় প্রকৃত বৃটিশ হয়ে উঠতে পেরেছে ।

চাকমা রাজারা বারো বছর ইংরাজদের ঢুকতে দেননি চট্টগ্রামে, এটা স্বাধীনচেতা চাকমা আভিজাত্য তথা দেশপ্রেমের বড় নিদর্শন । মোঘলরা চাকমাদের কাছ থেকে ‘কার্পাসমহল’ নামে যে কর আদায় করতেন, বৃটিশরা এসে তা আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা চাকমারা মেনে নেননি, উপরন্তু কর দেয়া একেবারেই বন্ধ করে দেন । এ নিয়ে আক্রমণ প্রতি আক্রমণ চলতে থাকে, ইংরাজরা পরাজিত হয় বার বার । কিন্তু এই লজ্জাজনক ঘটনা ইংরাজরা ইতিহাস থেকে মুছে দেয় ।

যে বিষয়টা খুব জোরালোভাবে আসেনি, সেটা হল তৎকালীন কৃষিব্যবস্থা, যেকোন উৎপাদন ব্যবস্থা, তথা কর আদায়ের মূল সূত্র ও ক্ষেত্র কেমন ছিল, যা থেকে রাজ্যের ব্যয় নির্বাহ হত । জুমচাষের উল্লেখ রয়েছে । রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করে তা জলপথে বাজারজাত করার কথা । কিন্তু মনে হয় না কেবল এসবের উপর নির্ভর করে একটা রাজ্য চালানো তথা প্রজাকল্যাণ করা যথেষ্ট ছিল ।

আজ থেকে দেড়শতাধিক বৎসর আগের এক চাকমা রানি, যিনি রাজা ধরমবক্‌স খাঁ’র বিধবা পত্নী, যেভাবে ইংরাজদের ক্রোধ সহ্য করেও ধৈর্য সহকারে, নিষ্কণ্টকভাবে রাজ্য পরিচালনা করে গেছেন, নানান ষড়যন্ত্র এবং কুকি-আক্রমণ মোকাবিলা করতে করতে, উপরন্তু যার কর্মচারীদের অধিকাংশই ছিলেন স্বজাতীয় নয়, বাঙালি এবং সেই রানি কালিন্দীর চরিত্র নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলার কাজটি লেখক করেছেন, তাতে লেখকের অধ্যাবসায় আর সবসময় তৎসংশ্লিষ্ট থাকার ব্যাপারটা বিস্ময়কর ! কারণ লেখাটি লিখতে তাঁকে বহুদিন সে-বিষয়ে লিপ্ত থাকতে হয়েছে এটা অনুমেয় এবং এটি একটি গবেষণার চেয়ে এক তিলও কম নয় । আমাদের লাভ আমরা একটা বিস্মৃত অধ্যায় খুঁজে পেলাম যা যেমন চাকমা জাতিগোষ্টীর, তেমনি অবিভক্ত ভারতবাসীর ।

কুতুকছড়ি গ্রামের চাষি গুজাং চাকমার কন্যা কালাবিই রানি কালিন্দী হয়ে ১৮৩২ থেকে ১৮৭৩ পর্যন্ত রাজত্ব করেন । গ্রন্থটির ভূমিকাতে উল্লেখ আছে, রাজা ধরমবক্‌স খাঁ শিকারে গিয়ে কিশোরী কালাবিকে দেখতে পান এবং তৃষ্ণা নিবারণের জন্য জল চাইলে কালাবি তাকে না চিনেই পানীয় জল দিয়েছিলেন । বাকিটুকু আমরা জানি ।

গ্রন্থটির ভাষা যথাসম্ভব তৎসম শব্দনির্ভর করা হয়েছে সম্ভবত বিষয় অনুযায়ী গাম্ভীর্য প্রদান করতে । প্রজা বলতে প্রয়োজন অনুযায়ী আশ্রিত বাঙালি, সংখ্যাগরিষ্ঠ চাকমাদের বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং জাতি নির্বিশেষে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী, যথা হিন্দু, মুসলিম এবং বৌদ্ধ । সাধারণ প্রজারা লেখকের কলমে ততটা উঠে আসেননি, যতটা একটা উপন্যাস দাবি করতে পারে, যতটা একটা কালখণ্ড দাবি করতে পারে । ফলে সাধারণ প্রজা তথা সেই জুমিয়া প্রজাদের বা রাজধানীর সাধারণ লোকদের কোন বার্তালাপ আমরা এখানে তেমন পাই না, কিন্তু উপস্থিতি পাই । কিছু চলতি চাকমা ভাষার প্রয়োগ হলে মনে হয় আরও স্বাভাবিকতা ফুটে উঠত ।

উপন্যাসটির প্রতিটি পংক্তিতে ছড়ানো রয়েছে অদম্য কৌতুহলের উপাদান, ফলে একবার পড়তে শুরু করলে সহজে রাখতে ইচ্ছে করে না । এটা নিশ্চয়ই একজন লেখকের লেখার ভঙ্গির গুণ । তবে মোহনায় এসে গ্রন্থটির সমাপ্তি ঘটেছে অতিশয় দ্রুতগতিতে, যা আগের গতিকে এবং পাঠকমনকে কিছুটা হলেও লাঞ্ছিত করে বটে ।

আমি আশা করি গ্রন্থটি সকলের কাছে আদরণীয় হয়ে উঠবে । ধন্যবাদ জানাই লেখক শ্যামল বৈদ্যকে, ধন্যবাদ জানাই কবি গৌতমলাল চাকমাকে ।

“সব্বে সত্তা সুখীতা ভবন্তু”

গ্রন্থটি ত্রিপুরায় প্রকাশ পেয়েছে ‘ত্রিপুরা পাবলিশার্স গীল্ড’-এর এবারের (২০১৮) পুস্তকমেলায় । প্রকাশ করেছেন অণিমা বিশ্বাস, গাঙচিল, কলকাতা ৭০০১১১ । প্রচ্ছদ করেছেন বিপুল গুহ । মূল্য ৪০০ টাকা ।


চাকমা দুহিতা

সেলিম মুস্তাফা ,ধর্মনগর , ত্রিপুরা