শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

চন্দ্রিমা চ্যাটার্জি কাজী

লেখক পরিচিতি: নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে গল্প লেখা শুরু।পেশায় শিক্ষিকা। এ পর্যন্ত গল্প গ্রন্থ দুটি। 'গাঁ গঞ্জের ইতিকথা,'(২০০২)। 'কক্ষপথ,'(২০০৭)।প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস , ক্ষতমুখ,(২০০৫)এই উপন্যাসের জন্য ২০০৬ ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড থেকে,' তৃতীয় বর্ষ সাহিত্য সম্মান,' পুরস্কার পান।প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা চার।পুজোর সংখ্যায় একটি উপন্যাস উজান প্রকাশিত হচ্ছে।অপ্রকাশিত উপন্যাস দুই।বর্ধমান জাগরনী পত্রিকা থেকে শ্রেষ্ট গল্পকার হিসেবে , সোমা গুঁই স্মৃতি পুরস্কার পান।


আলোচনাটা এবার তার দিকেই ঘুরবে হয়তো। ভেতরে ভেতরে ভীষণ একটা অস্বস্তির তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছিল।এসব কথা শুনতে তার একদমই ভালো লাগে না। কিন্তু কিছু তো করার নেই। মাঝে মাঝে তাই খুব মনে হয় ,চন্দ্রিমার যে সে যদি সত্যি সত্যিই বধির হয়ে যেত, বেঁচে যেত। এই সব নোংরা কথা গুলো তাকে কোনোদিন শুনতে হতো না ।কতদিন মনে হয়েছে তার ,আলোচনা শুরু করলেই এখান থেকে চট করে উঠে চলে যাবে সে।তাকে নিয়ে কোনো কথা শুরু করার আগে তো, ভূমিকা করে এরা। ঠিক সেই মুহুর্তেই উঠে পড়বে ।কিন্তু না, শেষমেশ তার ভদ্রতায় বেধেছে। তাই আজও পারল না ,উঠব উঠব করেও,বসে তাকে থাকতেই হলো।অবশেষে বইয়ের পাতায় চোখ রাখে চন্দ্রিমা। এক সময় এসব নিয়ে তর্ক বিতর্ক কম করে নি সে। প্রতিবাদ করেছে উচ্চকণ্ঠে। যখন ভালোবাসা আর বিশ্বাসেরভূমিতে ফাটল ধরেনি তাদের।যখন দুজন দুজনকার অস্তিত্ব দিয়ে একটা স্বপ্নময় পৃথিবী রচনা করে নিয়েছিলো তারা। তখন বাইরের পৃথিবীর কোন পান্ডুরতা ওদের ভেতরকার রঙিন জগৎটাকে নষ্ট করে দিতে পারেনি। আর এখন এ কদিন যখন নিজেদের ভেতরটা অন্তঃসারশূন্য হয়ে গেছে, মুছে গেছে সব রং। তখন পৃথিবীর সবকিছুই কেমন ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে খুব দ্রুত।
এখন তার অস্তিত্বের চারিদিকে গভীর গহন অন্ধকারের বেড়। সেই অন্ধকারময় জগৎ থেকে কেমন করে যে, কোন পথে তার মুক্তি হবে, তা জানেনা চন্দ্রিমা। আদৌ কোনদিন আলোর মুখ সে দেখতে পাবে কিনা, তাই বা কে জানে। ক'দিন ধরে টানা এই যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে তার সমস্ত শরীর-মন। দিন দিন সে একটা সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।একেবারেই একা, কাউকে জানায় নি তার মনের কথা। মিহির তার বন্ধু ।ওকেই বলা যায় সব কথা। ওর সঙ্গে অনেক কথাই আলোচনা করে চন্দ্রিমা।ও হয়তো কিছু একটা আন্দাজ করে থাকতে পারে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞেস করেনি এখনো পর্যন্ত স্পষ্ট করে ।এখনো বলেনি কিছু তাকে ,তবে ওকেই বলবে প্রথম তার সমস্যার কথা।
কি হলো চন্দ্রিমা দি চুপচাপ কেন, আরে ছাড়ুন তো ওদের কথা। এই নিয়ে মন খারাপ করবেন না।
নানা মিহিরআমি এসব কিছু ভাবছি না। এমনি বসে আছি একটু। ওদের কথা আমার কানে ঢুকলেও মনের পর্দা কে স্পর্শ করতে পারছে না। এসব অনেক আগেই গা সওয়া হয়ে গেছে। এরা আগবাড়িয়ে শুধু শুধু অপমান করতে চায় ।এদের সঙ্গে কি মুখ লাগাবো বল। প্রথম প্রথম অনেক বলেছি ,চেষ্টা করেছি বোঝাবার, কিন্তু এরা কিছুতেই বুঝবে না ।তাকে অহেতুক অপমান করার সুযোগ এরা ছাড়বে না।
যাক কে, ছেড়ে দিন ওদের কথা। মন দেবেন না। নিজের কাজ করুন।
ওদিকে আলোচনা তখন তুঙ্গে।ব্যাপারটা এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে, মিহির আর কিছুতেই চুপ করে থাকতে পারল না ।সেই থেকে ঠায় চেষ্টা করছে ,কায়দা করে প্রসঙ্গটাকে ঘোরানোর। রাজনীতির কথা তুলেছে, ভারত পাকিস্তানের ম্যাচের কথা বলেছে, কিন্তু কোন কিছুই তেমন তল পায়নি তাদের কাছে ।ফিজিক্স এর স্যার, পরেশ বাবু তখন বলে চলেছেন, আসলে বাঙালি হিন্দুরা বড্ড বেশি আঁতেল। জাত টা রআর কিছু নেই মশাই। সব শেষ হয়ে গেছে ।সবটাতেই এদের বাড়াবাড়ি। এত মাথায় তোলার কি আছে রে বাবা। যাও তো অন্য রাজ্যে, এত মাখামাখি কোথাও নেই। মেয়েদের রুচিবোধ বলিহারি যাই বাবা।আর ভালোবাসার লোক পেলিনা তোরা। আমাদের ঘরে কি ছেলের অভাব ছিল ।রূপসী সুন্দরী মেয়েরা সব বললেই ছো মেরে ছেলেরা বিয়ে করে নিত । পড়ে মরতে জায়গা পেলি না ? অথচ দেখুন দেখি মুসলিম মেয়েদের ।নারী নির্যাতন,নিপীড়ন তো তাদের সমাজেই বেশি হচ্ছে। সেখানে হিন্দু মেয়েরা তো অনেক স্বাধীন ।তবুও ওদের এই দশা। গলায় দড়িও জোটে না সব।
মিহির আলতো চোখ মেলে দেখে নিল একবার সবার দিকে। চন্দ্রিমার দিকে তাকালো যখন দেখল, থমথম করছে মুখ। লজ্জায়, অপমানে, রাগে, ক্ষোভে যেন আগুন জ্বলছে দপ দপ করে প্রতিটি শিরা উপশিরা তার। অপমানের উষ্ণ স্রোত বয়ে যাচ্ছে যেনমুখের উপর দিয়ে।সংকোচে ক্ষোভে ভেতরে ভেতরে একটা সংঘর্ষ চলছে তার। চন্দ্রিমাকে দেখেখুব কষ্ট হচ্ছিল এই মুহূর্তে তার।ঠিক সেই কারণেই আরো বেশি জেদ চাপলো তার মাথায় । এ কী ধরণের অসভ্যতা? একটা মানুষকে সবাই মিলে শুধু শুধু গায়ে পড়ে অপমান করা !এদের কি কিছু আটকায় না মুখে। সামান্য সৌজন্যবোধ টুকু পর্যন্ত নেই। লেখাপড়া জানা, শিক্ষিত মানুষ সব। এর চেয়ে গণ্ডমূর্খ হওয়া ভালো ছিল। শিক্ষার অপমান। নিজের মনে মনেই বিড়বিড় করল তারপর। গলাতে একটু ঝেড়ে নিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল, আসলে কি জানেন পরেশবাবু, হিন্দু মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী,উদার। প্রেমের ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য নেই। দেখুন না রাধাকে। বিবাহিত হিন্দু রমণী রাধা। পর পুরুষের সঙ্গে প্রেম। বয়সের বাধা, সম্পর্কের বাধা ,তবু কিনা রাধাকৃষ্ণ রাসলীলা করে? আপনি ভাবতে পারছেন ব্যাপারটা? পৃথিবীর আর কোন দেশের প্রাচীন সাহিত্যে এরকম নিদর্শন কটা পাবেন আপনি? তাহলে কই রাধা তো. . . .
মিহিরের কথা অপূর্ণ থেকে গেল ।ওই কোন থেকে সত্য বাবু বলতে শুরু করে দিলেন, আঃ কি যা তা বকছো মিহির ?কিসের সঙ্গে কিসের তুলনা করছ? তোমার কি মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে নাকি
সত্যদা আপনিতো সাহিত্যের লোক, আপনিই বলুন না, যুগে যুগে কালে কালে আমরা কি রাধাকে অচ্ছুৎ বলে পরিত্যাগ করেছি?বরং রাধার প্রেম কেই বড় করে দেখেছি ।কৃষ্ণের প্রতি রাধার এই প্রেম কে তো আমরা চিরকাল শ্রদ্ধার চোখে দেখেছি, ভালোবেসেছি।
চন্দ্রিমা অবাক চোখে দেখছিল মিহিরকে। শুনছিল ওর কথাগুলো খুব মন দিয়ে। এমনিতেই মিহিরকে তার খুব ভালো লাগে ।বেশ সহজ সরল সাদাসিদে ছেলে। স্পষ্ট কথা বলে। ঝকঝকে চেহারা। এমনকি এখন এইমাত্র বললে যে কথাগুলো,বলার জন্যেই শুধু বলে নি মিহির কথাগুলো।এমনটাই বিশ্বাস করে মেনে চলে,তাই বলছে। খুব ভালো লাগছিল চন্দ্রিমায় মিহিরকে ।এত জনের বিপক্ষতার সঙ্গে মিহির একা লড়াই করছে, শুধু তাকে রক্ষা করার জন্য। কেন যে মিহির এত ভালোবাসে তাকে। এত ভাল মানুষ হলে যন্ত্রণার শেষ থাকবে না।এদের সবার মতোই হতে পারতো ও । তার জন্য শুধু শুধু কষ্ট পাবে বেচারা।এতেই তার ভীষণ খারাপ লাগে। তার ওপর যা সব লোক জন এরা।কোন দিন কি রটিয়ে দেবে কে জানে।এদের মুখে তো আটকায় না কিছু।কথাটা মনে হতেই ভয়ে লজ্জায় কেমন গা টা শির শির করে উঠল তার। ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠে চন্দ্রিমা।মিহির কে ধমকে দিল,কেন শুধু শুধু কথা বাড়াচ্ছ মিহির। ওনারা বয়স্ক অভিজ্ঞ মানুষ, জীবন সম্পর্কে অনেক বেশি স্বচ্ছ ধারণাআছে ওনাদের। আমরাআর কতটুকু জানি বলো। তবে একটা কথা বলি পরেশবাবু। আপনারা যা বিশ্বাস করেন ভালোবাসেন সেই মতো কথা বলতেই পারেন। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কেননা আমি যা করেছি তা একান্তভাবেই আমার নিজস্ব জীবন বৃত্তে আবর্তিত। ব্যাপারটা আপনাদের পছন্দ নয় তাতে কি করতে পারি বলুন।
তা বললে তো হবে না ম্যাডাম। প্রত্যেকটা মানুষ তার সমাজের কাছে কিছুটা দায় বদ্ধ। অন্তত ছাত্র-ছাত্রীদের আমরা সেই ভাবে শিক্ষা দিয়ে আসছি এতদিন ধরে। এখন আপনাকে দেখে কি শিখবে ওরা বলুন তো? সমাজ বলে কিছু থাকবে আর অবশিষ্ট?
কেন পরেশ বাবু আপনি একথা বলছেন কেন? আপনার ছেলে তো শুনেছি বিদেশে গিয়ে মেম বিয়ে করেছেন। সে দেশেই থাকেন ।এবং সে কথা বলতে আপনি গর্ববোধ করেন। ক্লাসের ছাত্র ছাত্রীদের কাছেও এ নিয়ে আপনি গর্ব করে গল্প করেছেন।
ওপাশ থেকে ইতিহাসের স্যার নির্মল বাবু চেঁচিয়ে উঠলেন , আঃ কি হচ্ছে কি? আপনার কথা বন্ধ করবেন এবার?আপনাদের কি আর কোন কাজ নেই? খুঁচিয়ে ঘা করছেন বসে বসে !ঘন্টা বেজে গেছে, জান যে যার ক্লাসে চলে যান। ছাত্রদেরকে পড়ান। বাজে আলোচনা করে ,শুধু শুধু নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ করবেন না।
সময়ের গতি বড় তীব্র। নির্মল নিষ্ঠুরতায় তার হিসেব নিকেশ স্বচ্ছ। কোন কিছুর বিনিময় ই তাকে থামিয়ে রাখা যাবে না ।কেউ পারবে না তাকে থামাতে ।শুধু ছেদ পড়ে যায় কিছু কিছু জীবনের, ভাবনার এবং নড়বড়ে হয়ে যায় বেঁচে থাকার মূল্যবোধ। হারিয়ে যায় কত স্বপ্ন দেখা ভোর ।প্রতিশ্রুতি ময় সকাল ।এখন ঠিক এসময়ে চন্দ্রিমার মনের মধ্যে এই সমস্ত চিন্তা তরঙ্গ ওঠানামা করছে। সাতদিন পাড় হয়ে গেছে। একটা অধ্যায় ।বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে চন্দ্রিমা। কাবেরির মে আছে সে,এ কদিন। এখনো সব কথা স্পষ্ট করে বলে নি কাবেরীকেও। তবে বুঝতে বাকি নেই হয়তো তার কিছু ।তবু সে নিজে যে এতোখানি চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শুনলে কাবেরীও চমকে উঠবে ।
ইউনিভার্সিটি তে তাদের প্রেম উদাহরণ ছিল সবার কাছে কেন জানি কোহিনূর কে প্রথম দেখার দিন থেকেই কেমন অন্যরকম একটা অনুভূতি হয়েছিল চন্দ্রিমার। সেদিন থেকেই তার সমস্ত নিজস্ব চেতনা কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল যেন। ফর্সা লম্বা রাজকীয় চেহারার কোহিনূরের দ্যুতিতে, চন্দ্রিমা পাগল হয়ে গিয়েছিল ।তার উপর অমন উদাত্ত কণ্ঠে," আমি পথ ভোলা এক পথিক এসেছি " সব কিছু মিলে মিশে চন্দ্রিমার আজন্ম পালিত সংস্কার বোধ ,বাবা-মার অত্যন্ত আদরের মেয়েরপ্রতি, সতর্ক সাবধান বাণী, নিজস্ব বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সব কেমন কোহিনূরের প্রেমে বানভাসি হয়ে গিয়েছিল । কোনো পিছুটান আর তাকে ধরে রাখতে পারেনি। সে প্রবল বেগে ধাবিত হয়েছিল কোহিনূরের দিকে। তখন অদ্ভুত একটা গোলকধাঁধার মধ্যে আবর্তিত হচ্ছিলসে। শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসার গল্প তখন। পৃথিবীতে কোন হিংসা দ্বেষ নেই, কোন দ্বিধা কিংবা সংকোচনেই।হৃৃদয়ের জটিলতম গ্রন্থি খুলে খুলে ,গভীরতম বিন্দুতে অস্তিত্বের স্বীকৃতি। এক অদ্ভুত উন্মাদনা।
পাঁচ পাঁচটা বছর,ক্যালেন্ডারের পাতায় তো কম সময় নয়। অথচ তাদের কাছে যেন পলকমাত্র। ভালোবাসার সমুদ্রে অবগাহন করে একদিন তারা বিয়ে করল। চোখের পাতায় ঠোঁটের কোনায় তখন স্বপ্নের রেণু।কোহিনূরের রোমশ বুকে মাথা রেখে হাসতে হাসতে সব কিছু ত্যাগ করেছে চন্দ্রিমা, মোচনের মত।নব বিবাহিতকোন বউকে শাঁখা পলায় সজ্জিত হতে দেখলে, চন্দ্রিমার বুকের মধ্যে একটা স্বপ্নের ঢেউ উঠত খুব ছোটবেলায়। নিজের ফর্সা গোল গোল হাত দুটো, পরিপাটি যত্নে সুরক্ষিত রাখত,সেই স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশায়। কিন্তু কোহিনূরের মা-বাবা চান না তাই আর পড়া হয়ে ওঠেনি সেসব কোনদিন ।তাই নিয়ে মনের মধ্যে কোন ক্ষোভ জমা হয়নি তার। কেননা চোখে তখন স্বপ্নের ঘোর। রক্তস্রোত তখন বেপরোয়াভাবে বেগবান।
ঠিক কবে থেকে যে ব্যাপারটা বাঁক নিয়েছিল, আজ আর স্পষ্ট করে মনে নেই কিছু ।একদিন হঠাৎ করেই আবিষ্কার করল চন্দ্রিমা তাদের সেই স্বপ্নময় জগতটা আর নে।ই কবে কি করে যেন রাবার দিয়ে ঘষে ঘষে মুছে দিয়েছে কেউ ,সেই রঙিন জগৎ টাকে ।এখন সবকিছু কেমন ধূসর বর্ণ ।দূরত্ব তৈরি হওয়ার আনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে বয়ে যাচ্ছে সময় ।কোন অদৃশ্য চোরাপথে বিশ্বাসে বিন্দু গুলো আস্তে আস্তে ফিরে গেছে আনমনে কখন কোথায় কেউ জানে না ।অবিশ্বাসের চোরাবালিতে ,অসীম নির্মল নিঃসঙ্গতায় ভরে গেছে বুকের মধ্যি খানের ভূমিটায়।এখন সবকিছুই কেমন অর্থহীন বেসামাল মনে হয়। লজ্জায় অপমানে নাকি ঘৃণায় ঘাড়ের শিরা দপদপ করে তার। তবুও চেষ্টা করেছে অনেক দিন ধরে ।যদি আগের সেই সম্পর্কটা আবার ফিরিয়ে আনা যায় কোনো ভাবে।সে কিন্তু যখন জানতে পারল কোহিনুরের মন অন্য হৃদয় ঘাটে নোঙর ফেলেছে ।তখন সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল তার ।আর নতুন করে করে ভাববার বা করবার মতো উৎসাহ ,বা মনের বল কোনটাই তার থাকল না।এসব কিছু থেকে খুব দ্রুত মুক্তি পেলেই সে এখন বাঁচে। এভাবে এই শুকনো ডাল এর মত নির্জীব সম্পর্ক বৃত্তে থাকতে তার একটা মুহূর্তও আর ভালো লাগে না। তাই তাকে চরম সিদ্ধান্তটা নিতে হচ্ছে, একা।
কি হলো চন্দ্রিমা দি সারাটা রাস্তা একবারে চুপচাপ যে? ছাড়ুন তো ওদের কথা !ওসব নিয়ে আবার কেউ মন খারাপ করে ?ওদের নিজেদেরই যেন কত ঠিক আছে। আবার আপনি ওদের কথায় কষ্ট পাচ্ছেন।
না না মিহির।আসলে তানয় ।এখন ঠিক এই মুহূর্তে আমিনিজেই ভীষণ একটা সংকটের মধ্যে আছি ।কথাটা তোমাকে বলি বলি করেও বলতে পারিনি ।মানে বলার মত ঠিক সুযোগ পাইনি। মন ও হয়নি। এ কদিন নিজের সঙ্গে নিজেই দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়েছি। অনেক যুদ্ধ করেছি মনের সঙ্গে। শেষে নিশ্চিত একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। ভালোবাসার মানুষকে ত্যাগ করা খুব কষ্টের মিহির।
কেন এর মধ্যে আবার কি এমন ঘটল ?এত বড় সিদ্ধান্তনিয়ে নিলেন।
আসলে ধর্মের রাংতা মোড়া জীবন বড় ভয়ঙ্কর মিহির ।কোন কিছু সঙ্গে আপস চলে না সেখানে। গোড়া ধর্মবিশ্বাসী মানুষেরা আগুনের মত সর্বগ্রাসী ।সেখানে প্রেম ভালোবাসা স্নেহ কিংবা আরও কিছু যা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সেসবের কোন দাম নেই। ধ্বংস হয়ে যায় নিরপেক্ষ বিশ্বাসের ভিতটাও। একে একে আমি আমার সমস্ত কিছুই ত্যাগ করেছি এতদিন। ত্যাগ করতে পেরেছি শুধুমাত্র ভালোবাসার জন্যেই। ভালোবাসা ছাড়া তো কোন আপস নয় না মিহির।
এখন ঠিক এই সময়ে এসে সম্পর্কের সেই জায়গাটাতেই ফাটল ধরে গেছে। তখন আর অবশিষ্ট থাকল কি বলো?এখন শুধু যুদ্ধ। মুহূর্তে মুহূর্তে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার যন্ত্রণা। এর থেকে মুক্তি চাইএবার।আর কিছুতেই পেরে উঠছি না। অনেক সহ্য করেছি, এবার আর সম্ভব নয়।
এত তাড়াহুড়োরকি আছে দিদি। একটু সময় নিন না, ভাবুন, তারপর ঠিক করবেন।
আর কিছু ভাবার নেই। অনেক ভেবেছি ।ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে গেছি। অনেক ভেবে চিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নিজেকে নিংড়ে দিয়েছি মিহির সব নিজস্বতা ত্যাগ করে, শুধু কোহিনূরের সঙ্গে থাকবার জন্য। কিন্তু তা আর কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না রে। এখন ভাবনা এবার নিজেকে নিয়ে। এরপর জীবনটাকে নিয়ে কি করবো আমি। কেমন করে কোন পথে শুরু করবো আবার?
এ কথা কেন বলছেন দিদি? ডিভোর্স নিয়ে তো কত মেয়েই দিব্যি আছে !নিজের স্বাধীনতা তেইআছে। কেউ কেউআবার বিয়ে করছে।কেউ বা, চাকরি বাকরি করে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে।অসুবিধে কি আছে। আপনি তো একটা চাকরি করেন ।যার যেমন ইচ্ছা সে তেমন ভাবে থাকবে। তাতে কে কি বলল না বলল তাতে কিছু আসে যায় না ।আপনি আপনার মত থাকবেন যা ভালো লাগে তাই করবেন। কারুরকথায় কান দেবেন না।
সেসব তুমি বুঝবে না ভাই। কোন হিন্দু ঘরের মেয়ে যখন মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করে ,তখন তার সমাজ সংসার সবকিছু একেবারে ছেড়েছুড়ে দিয়েই তাকে চলে আসতে হয়। তারপর হাজার চেষ্টা করেও সেই জগতে ফিরে যেতে পারবে না তুমি আর ।কেউ মেনে নেবে না।নিজের বাবা মা ই মানবে না। তাছাড়া আর ফিরবেই বা কোথায়? কার কাছে যাবে?খুব অসহায় লাগছে জানো মিহির।ভীষণ অস্থিরতা।স্কুলের লোক জন জানতে পারলে তো ব্যঙ্গ বিদ্রুপে টিকতে দেবে না।এখানে চাকরিটা করা যাবে কিনা কে জানে?ছাড়ুন তো এসব নিয়ে এখনি অত ভাবতে হবে না।আগে দেখুন না কি হয়।আগে থেকেই এত ভাবছেন কেন।শুধু শুধু অত টেনশন করবেন না।
চন্দ্রিমা আর কিছু বলল না ,চুপ করে ভাবছিল ।চন্দ্রিমা চ্যাটার্জী কাজী হয়তো চ্যাটার্জি তে ফিরে যেতে পারবে ।কিন্তু সে ফিরে আসার জন্য মেয়েদের কোন নিজস্ব ভূমি নেই ।ভূমিহীন নিরালম্ব শূন্য একটা জগত ।সেখানে কোনো মানুষই থাকবে না তার পাশে। নির্জন দ্বীপে পথ হারানো নাবিকের মতো, একাকী তীব্র যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ,বেঁচে থেকে কি যে লাভ হবে কে জানে? জীবনটাকে নিয়ে কি যে করবে সে, তা ভেবে ঠিক করতে পারছেনা সে। তবু এই মুহূর্তে ওদের কাছ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা ছাড়া উপায় নেই তার।একটা মুহূর্তও আর ওখানে থাকতে পারছেন চন্দ্রিমা।এর পর ও জোর করে যদি থাকে তাহলে মৃত্যু ছাড়া গতি থাকবে না তার।আর ভাবতে ভালো লাগছিল না তার।গম্ভীর করুন দৃষ্টিতে দূরের দিগন্তে দিকে তাকিয়ে দেখল।রাস্তা হাঁটছিলঠিক কথাই ,তবু যেন হাঁটছিল না।চির চেনা পরিচিত রাস্তা তাই ঠিকঠাক পা ফেলে ফেলে হেঁটে চলে যাচ্ছিল। কেউ যেন তাকে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। এই যাওয়ার জন্য তার নিজের মন বা ইচ্ছা বা শক্তি কোনটাই কার্যকরী ছিল না। অদৃশ্য শক্তির টানে সে ক্রমশ হেঁটে যাচ্ছিল স্টেশন চত্বরের দিকে।মিহির ও কি বুঝে এতটা পথ চুপ চাপ চলে এলো।কোনো কথা বলে নি সেও।
ট্রেনে উঠে বসার পরে সা সা শব্দের ট্রেন গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। ট্রেনে চন্দ্রিমা সঙ্গে মিহিরের আর তেমন কোন কথা হল না। দুজনেই নিঃশব্দ গম্ভীর হয়ে বসেছিল।কি সব যেন ভাবতে ভাবতে গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেল তারা ।বিকেল ফুরিয়ে এসেছে তখন। দিগন্ত পারে সন্ধ্যে উকিদিয়েছে সবেমাত্র। এক্ষুনি গাঢ় অন্ধকার ভরে উঠবে চরাচর ।দু-একটা তারা ফুটতে শুরু করেছে আকাশের কিনারায়। নি নি করছে তাদের আলো ।মেঘেদের বুকের মধ্যে একটা শূন্যতা বোধ যেন টের পাচ্ছিল মিহির। সেই মুহূর্তে সারাটা রাস্তা একটাও সান্তনার কথা বলতে পারিনি চন্দ্রিমাদিকে সে।কি বলবে বুঝে উঠতে পারে নি।এত সুন্দর মনের মেয়ে চন্দ্রিমা দি। প্রচন্ড ভালোবাসে কোহিনূর দাকে।একদিকে ভালোবাসার মানুষকে হারানো।আর একদিকে নিজের অস্তিত্ব সংকট। এই মুহুর্তে কি ই বা বলবে তাকে। সত্যিই তো চন্দ্রিমা চ্যাটার্জী কি আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে? ফেলে আসা বিন্দুকে কি কোনো সরলরেখা আর স্পর্শ করতে পারে?