রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

ক্রোমোজম

অণুগল্প


জমিদার বংশে তার জন্ম হয়েছিলো শুনেছি, তাই এই চৌধুরী উপাধি । ওনার মা অত্যন্ত সুন্দরী, এই আটাত্তর বছর বয়সেও বোঝা যায় জমিদারবাবু অকারণে মুগ্ধ হননি । তারাবিবি মানে দারাশিকো চৌধুরীর মা যৌবনে আগ্নেয় প্রপাত ছিলেন! এটা আমার উপমা নয়, দশগ্রামের মানুষের দেয়া খেতাব । দারাশিকো মানুষটা যত নিরীহ বৌতার ততটাই খাণ্ডারণী । লম্বা শুকনা খিটখিটে ।


সারাগ্রামের মানুষের দিন শুরু হয় দারাশিকোর বৌ কুলসুমার গপ্প দিয়ে । কুলসুমা তারাবিবির যত্ন নেয় না, পেটভরে খেতে দেয় না, দারাশিকোর সাথে অকথ্য ভাষায় চেচামেচি করে । কিন্তু ওই যে, দারাশিকো বড়ই নরম মানুষ, সাত চড়ে রা নাই! তারাবিবি গজর গজর করেন, বউয়ের ভেউড়া, বাপের মত হইতে পারলো না নিমরুদ কোনহানকার! দারাশিকোর আফসোস হয় বটে । জমিদার বাপের ছেলে হয়েও সে রাখালের সন্তানের মত থাকে । কেনো সে হুকুম চালাতে পারে না! তার ক্রোধ নেই, উচ্চাভিলাষ নেই, তবে স্বপ্ন আছে । মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যেও দেখে, শাহেনশাহী তাকিয়ায় বসে আছে, মাথায় রত্নখচিত মিনা করা তাজ । উজির-নাজির-পাইক-পেয়াদা-গোলাম.... ঠুক ঠুক ঠুক.... এ কোন আওয়াজ? ওঠ নিমরদ, বাজারে যা । বিশ বচ্ছরে না দিলি সুখ, না সন্তান, কুলসুমা ক্ষেপেছে ।


একটা সত্য যা দারাশিকো জানে না, জানেন তারাবিবি তিনি তো আলিনগর জমিদারের বিবি ছিলেন না, ছিলেন প্রিয় রক্ষিতা । দাসিরা বেগম হতে পারে না, এটা স্বাভাবিক নিয়ম । তারাবিবি ষড়যন্ত্র বোঝেন না, আগেও বোঝেননি তাই বেগম হওয়ার চেষ্টাও করেননি । তবে জমিদার সাহেব ভালোই জানতেন তার অবর্তমানে তারাবিবি এবং শিশু দারার কপালে কি ঘটতে পারে, তাই, তার পরগনার বাইরে অনেক দূরের এই গ্রামে এই বাড়ি আর কিছু জমি কিনে দিয়েছিলেন প্রিয় বাদিকে । জীবদ্দশায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন নন্দপুরে । বৃদ্ধ জমিদার সম্ভবত ভিতরবাড়ির ডাক টের পেয়েছিলেন । তার একান্ত বিস্বস্ত একটি দল এখানে পৌঁছে দিয়েছিলো তারা কে, নিজেরাও বসত গেড়েছিলো এদিকে । খবর এসেছিলো একদিন, বাতাসে ভাসতে ভাসতে ভাসতে লোকমুখে, জমিদার মুরশিদ চৌধুরী মারা গেছে, তার বড়ছেলে এখন জমিদার । দারাশিকো বড় হয়ে জানতে চাইতো, কেনো তারা আলিনগরে যাচ্ছে না! সেও তো বাবার সম্পত্তির ওয়ারিশ! তারাবিবি কথা ঘুরিয়ে দিতেন, বাবা জমিদার সাহেবের আরও তিন স্ত্রী আছে, অগো পোলারা আমাগো মাইর ফালাইবো । এইসব জেনে তোমার মরহুম পিতা আমাগো এই দূর গ্রামে ব্যবস্থা করে দিছেন ।


বাজারসদাই করে দিয়ে দারাশিকো চৌধুরী গেলো দোকানে । বেলা তো কম হয়নি! কর্মচারীরা ভারী ইয়ে, মানে চোর । এতক্ষণে কি কি সরিয়েছে কে জানে? আজ অবশ্য তার ব্যাবসায় মন নেই । ভিতরে কেমন এক রক্ত ছলকে ওঠা যন্ত্রণা । তার বাবা তেজি পুরুষ ছিলেন, দক্ষ শিকারী, মা বলেছে । যেনো ওই রক্ত এখন বান ডাকছে । দারাশিকো চৌধুরী বসে আছেন মসলিনের গদিতে । চারপাশে নবাবী দৃশ্যপট । হলো না, একজীবনে তার কিছুই হলো না । খরিদ্দার আসছে, বাটখারা উঠছে পাল্লায় । কারো দুইসের চাল, একপোয়া ডাল, গুড়, তেল…… দারাশিকো বসে আছে তেল চিটচিটে গদিতে । মনোহারী পণ্যের সম্মিলিত ঘ্রাণ কিংবা গন্ধ ।


তারাবিবি মারা গেলো দুপুরে । পনেরদিনের মতন জবান বন্ধ হয়েছিলো তার । মারা যাওয়ার আগে কথা বলতে পেরেছিলেন । দারা কে বলেছিলেন তার সঠিক পরিচয় । দারা হতভম্ব হয়ে পড়েছিলো কিন্তু মা কে সে ঘৃণা করতে পারেনি । কয়েকটা বন্ধ দরজা খুলে গেছে কেবল । দুইদিন পর সকালে কুলসুমা তাকে ঠোকনা দিয়ে বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে দিতেই গর্জন করে উঠলো দারাশিকো, -বেবাইজ্যা মাইয়া মানুষ, এত খাওন কিসের? দোকানে যাওয়ার পর কর্মচারীরে দিয়া বাজার পাঠামু, এহন ঘুমাইতে দে । খেকিয়ে উঠেছিলো কুলসুমা, দারা চৌধুরীর একথাপ্পর খেয়ে থ মেরে গেছে । ঠোঁট কেটে রক্ত ঝরছে তার । সরে এসেছে ভয়ে ভয়ে । বুঝে গেছে, কিছু একটা ওলট পালট হয়ে গেছে । আগের মত আর বশমন্ত্রের বাণ ছোঁড়া যাবে না । সেদিন দারাশিকো দোকানে ঢুকলো গটগট করে । দুই কর্মচারীকে হুঁশিয়ার করলো চিৎকার করে । দোকানের একটা মাল এদিক ওদিক হয়েছে কি সোজা জেলে পুরে দেবে ওদের । বাজারুরা থমকালো । তাদের জানা, নেই অবৈধ রক্তের ক্রোমোজম ভাঙছে ।