বুধবার, নভেম্বর ২০, ২০১৯

কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের সাক্ষাৎকার


৭মে সঙ্গীতজ্ঞ কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের মৃত্যুদিবস। অন্যদেশ পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


প্রশ্ন : আপনাদের দলের নাম দোহার কেন?
কালিকাপ্রসাদ: দোহার মানে হচ্ছে ধুয়ো দেয়া। এটি লোকগানের একটি বৈশিষ্ট। মূল গানটি যিনি পরিবেশন করেন তার সাথে আরও কিছু লোক থাকেন যাদের দোহার বলা হয়। আমরা লোকগানের সাথে আছি, এজন্যই আমাদের সংগঠনের এই নাম।
প্রশ্ন: লোকগানের প্রতি আগ্রহ হল কেন? আপনারা কি সফল?
কালিকাপ্রসাদ: আমরা লোকগান নিয়ে চর্চা করি, পরিবেশন করি। লোকগানের উৎপত্তি, উৎস ও ইতিহাস খোঁজার কিছুটা চেষ্টা করি। আমরা সফল কিনা বলতে পারব না। ভবিষ্যত নিয়ে কিছু বলা মুশকিল। দোহার এখন বর্তমান। তাই ভবিষ্যৎই বলতে পারবে আসলে আমরা কী করতে পেরেছি।
প্রশ্ন: লোকগানে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
কালিকাপ্রসাদ: লোকগানে দেশটাকে দেখা যায়। লোকগান হচ্ছে দেশের ও মানুষের ভিত্তিভূমি। তাই এতে আগ্রহ জন্মাল।
প্রশ্ন: কোন বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে কি?
কালিকাপ্রসাদ: না সেরকম কিছু নয়। তবে বাধা তো কিছুটা থাকেই। আমরা এসবকে বাধা মনে করিনি । নতুন অবস্থায় এরকম কিছুটা হয়েছে। যখন কিছুটা পরিচিতি হয়ে গেছে তখন আর কোন বাধা আসেনি।
প্রশ্ন: লোকগান নিয়ে দর্শক হৃদয় কী করে জয় করছেন?
কালিকাপ্রসাদ: আমরা তো মেইনস্ট্রিমে লোকগান করছি। কোন বাউল আসর বা মেলায় গান করছি না। দেখা যাবে কোন অনুষ্ঠানে আমরা গান করছি, এর আগে পরে নচিকেতা বা অন্যকোন আধুনিক ব্যান্ডও গান পরিবেশন করছে। এইভাবে আমরা নাগরিক সমাজে লোকগানটাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে লোকগান চর্চা কেমন দেখছেন?
কালিকাপ্রসাদ: লোকগানের ব্যাপ্তি বাংলাদেশে অনেক বেশি। আমি একটা জিনিস দেখেছি যে, বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ লোকগান সম্পর্কে অনেকটাই ওয়াকিবহাল।
প্রশ্ন: শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে আপনি গান লিখেছিলেন। কারণ কি?
কালিকাপ্রসাদ: শাহবাগ আন্দোলনটাকে আমি এমনভাবে দেখি যে, এত বড় বিশাল একটি আন্দোলন এর আগে হয়নি। তখন আমার মনে কিছু কথা জেগেছিল। আমি তো প্রবন্ধ বা গল্প লিখি না। তাই সেই মনের কথাগুলো দিয়ে গানই লিখে ফেললাম।
প্রশ্ন: সেই ২০১২ সনে আপনাদের সহস্র দোতারা নামে এ্যালবাম বেরিয়েছিল। আর হবে কখন?
কালিকাপ্রসাদ: এ্যালবামের কাজ আসলে সেরকম হচ্ছে না। শাহ আব্দুল করিমের জীবনাবসানের পর আমরা শুধু তাঁকে নিয়েই একটি আয়োজন করেছিলাম। সেখানে শুধু শাহ করিমের গানই ছিল। তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ওইা কাজ নিয়ে একটি এ্যালবাম করার পরিকল্পনা রয়েছে। আরও হতে পারে, বাংলাদেশের লোককবিদের কাজ নিয়ে আলাদা আলাদা কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। এই যে সিলেট অঞ্চলে হাছনরাজা, রাধারমণ, শাহ আব্দুল করিম- তাঁদের মধ্যে একটা পরম্পরা রয়েছে। তাঁদের সুরের বৈচিত্র্য উল্লেখ করার মতো। এই বৈশিষ্ট্য বাংলা বা ভারতের আর কোন অঞ্চলে পাওয়াটা মুশকিল। লোকগানের সুরের এতো বৈচিত্র আর কোন অঞ্চলে দেখা যায় না।
প্রশ্ন: শাহ আব্দুল করিমকে নিয়ে আপনার একটি বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। কিছু বলবেন?
কালিকাপ্রসাদ: হ্যাঁ। আগামী বছর শাহ আব্দুল করিমের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতায় একটি বড় অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।
প্রশ্ন: মাঝে মধ্যে আপনাদেরকে রবীন্দ্রনাথের বা অন্য ঘরানার গানও করতে দেখা যায়।
কালিকাপ্রসাদ: ভাল লাগা থেকে আসলে এরকমটি হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গান এভাবেই হয়ে গেছে। তবে প্রধানত আমরা লোকগান গাই। এটিই করব।
প্রশ্ন: আপনাদের আদি নিবাস কি সিলেটে?
কালিকাপ্রসাদ: আমার বাবার জন্ম আসামে। কিন্তু আমাদের পৈত্রিক নিবাস ছিল সিলেটের ঢাকা দক্ষিণে।
প্রশ্ন: উভয় বাংলায় সংস্কৃতির সেতুবন্ধন আরও মজবুত কী করে করা যায় বলে আপনি মনে করেন?
কালিকাপ্রসাদ: সংস্কৃতির সেতুবন্ধন তৈরিতে সবচাইতে বেশি দরকার আদান প্রদান। মানে দেওয়া-নেওয়া। এতেই সংস্কৃতির প্রকৃত সেতুবন্ধন হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হচ্ছে বাংলা। কিন্তু ভারতের সেরকমটি নয়। ভারতে বাংলা হচ্ছে একটি আঞ্চলিক ভাষা। তবে আঞ্চলিক ভাষা হলেও ভারতবর্ষে এর দীর্ঘদিনের একটা পরম্পরা ও ঐতিহ্য রয়েছে। রাজনৈতিক কারণে আজ বাংলা বিভক্ত। বাংলাভাষী কিছু অঞ্চল পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারতের আসাম ত্রিপুরায় রয়েছে। এই সব বাঙালি মিলেই একটি অখ- বাঙালি সংস্কৃতির সত্বা রয়েছে। সেই সত্বায় যেমন চন্ডিদাস-বিদ্যাপতি আছেন তেমনি আলাওল-লালন ফকিরও আছেন। সংস্কৃতিতে আসলে কোন ফারাক নেই। রাজনৈতিক ভৌগোলিক কারণে মানচিত্র ভিন্ন হতে পারে কিন্তু এই বিভক্তি আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির চর্চায় কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে না। করাটা উচিতও নয়। দুই বাংলার সাধারণ মানুষ ও মিডিয়াকে অখ- বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিষয়ে উভয় সরকারকে শ্রদ্ধাশীল হতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
প্রশ্ন: রাধারমণের গান নিয়ে বিশেষ কিছু বলবেন?
কালিকাপ্রসাদ: রাধারমণের গান যদি আজকের প্রজন্ম না শোনে তাহলে সেটি রাধারমণের দুর্ভাগ্য নয় এটি হবে বর্তমান প্রজন্মের দুর্ভাগ্য। এটা সকলের বুঝা উচিৎ। তাহলেই অবস্থার আরও উন্নতি হবে। রাধারমণকে নিয়ে আরও গবেষণার ক্ষেত্র রয়েছে। তাঁর গানের সংগ্রহশালাও গড়ে তোলা দরকার। আর শুধু রাধারমণই কেন। এই অঞ্চলের সকল লোককবিদের নিয়েই গবেষণা ও সংগ্রহের কাজ ব্যাপকভাবে করতে হবে।