বুধবার, ডিসেম্বর ৮, ২০২১

করোনা কালের ডায়েরি, প্রথম দ্বিতীয় পাঠ

সময় কাটাতে , তোমার পছন্দের গান শুনতে , ...এ ছাড়া , তুমি তো লেখ , লেখালেখি করেই তো সময়টা কাটিয়ে দিতে পারো ...

--- চেষ্টা তো করি স্যার , কিন্তু মন বসাতে পারি না , সব সময় মনে হয়করোনা যেন আমার চারদিক থেকে ধেয়ে আসছে ...সত্যি সত্যি স্যার আমার বাড়ির চারপাশে কন্টেনমেন্টজোন ছড়িয়ে আছে ...

--- ও সব নিয়ে একদম চিন্তা করবে না শেখর , ওসব নিয়ে বেশি চিন্তা করলে একদিন ডিপ্রেশান এসে যাবে ,এখনআমরা তো মুখোমুখি কাউকে পাই না কথা বলার মতো , তাই তোমার ঘনিষ্টদের সংগে নিয়মিত মোবাইলে কথা বলবে দেখবে মনটা হাল্কা থাকবে ...আমি তো তাই করি শেখর , তারপর নাতনিটাকে নিয়ে বসি , ও ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী , এ বছর ওর চূড়ান্তসেমেস্টার , আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের খোঁজখবর রাখে , অমিতাভ ঘোষ আর চেতন ভগতেরফ্যান , ওর সংগে এইদুজন লেখকের উপন্যাস নিয়ে বাদ-বিবাদেকেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ ...তারপর ছেলে সুমনেরফেসবুকে অনলাইনপ্রোগ্রাম থাকে , ওখানেও লিখতে হয় , বলতে হয় ...প্রস্তুতি থাকে ...

--- বাহ স্যার আপনার তো ভালোই কেটে যায় দেখছি ...

--- ভালো কাটানোর রাস্তা বের করে নিতে হয় শেখর ...বিমর্ষ হয়ে বসে থাকলে চলে না ...আমাদের এই শিলিগুড়িতেও তো ভয়ংকর অবস্থা , প্রতিদিন ছড়াচ্ছে হাজারে হাজারে ...।আসলে যে কথাটা না বললেই নয় শেখর , তুমি লক্ষ্য করেছ কিনা জানিনা , এই করোনাকালে আক্রান্ত কারা বেশি হচ্ছে জানো ?

--- কারা স্যার ?

--- ধনী আর মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো । এরাই তো বেশি ভাবে , এরাই তো কল্পনাপ্রবণ হয় ...ডিপ্রেসড এরাই বেশি হয় ...কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায় তাদের মধ্যে সংক্রমনটা কম , ওরা অতো ভাবে না , ঘাবড়ায়ও না , ভালো ভালো খাবার না খেলেও শরীরে ইমিউনিটি পাওয়ার ওদের বেশি ...

বলে থামলেন কিছুক্ষণ ভবানীস্যার । শেখরবাবু স্যারের কথা শোনার জন্য চুপ করেই থাকলেন। এই বয়সেও স্যারের কথায় যেন ফুল ঝরে !

ভবানীস্যার আবার শুরু করলেন , যতই তোমার মনোবল বাড়াতে চেষ্টা করি না কেন শেখর , আমিও যে আতংকিত হই না বা বিমর্ষ হয়ে পড়ি না এটা ভুল ...আমার তো মনের কথাটি শোনার যিনি ছিলেন তিনি চলে গেছেন ... তাই তোমাদের সংগে মোবাইলে কথা বলে নিজেকে হাল্কা করি ...সুতরাং শেখর, নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখো , সবার সংগে যোগাযোগ রেখো , যতদিন বেঁচে থাকো , তুমি আমায় ফোন না করলেও আমি তোমায় করব ...ভালো থেকো , সাবধানে থেকো ...বলতে বলতে ভবানীস্যার মোবাইল বন্ধ করে দিলেন ।

শেখরবাবু নিজের লেখার ঘরে এসে ভাবতে বসেন , এই পঁচাশিবছরের বৃদ্ধ কোথা থেকে এতো মনের জোর পেলেন ! তাঁর স্ত্রী পরলোকগতা প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেল ।

জীবনটাই তো কাটিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে । রবীন্দ্রনাথকে গুলে খেয়েছেন । এই রবীন্দ্রনাথই কি তবে তাঁর সব মনের জোরের উৎস ?

Space ###

একটু বাদেই শ্যামলী ফিরে এলো ।মুখটা ওর বেজার । কিছুই বলছে না । ওই অবস্থাতেই ঘরকন্নারকাজ করে যাচ্ছে । শেখরবাবু অস্থির হয়ে উঠলেন শ্যামলী কোনো কথা বলছে না দেখে । একসময় তিনি উঠে রান্নাঘরে গিয়ে শ্যামলীর কাছে দাঁড়ালেন , কী গো তুমি দেখি থম মাইরাগেলা !

শ্যামলী শেখরবাবুর দিকে ফিরে তাকালো । চোখ দুটি ওর ভেজা-ভেজা । তারপর ধরা-ধরা গলায় বলল , কৃষ্ণা আর রাহুল-তাপসীর দিকে তাকান যায় না ...হেরা হোম কোয়ারেনটাইনে আছে ...দূর থিক্য্যহেগ লগেকথা কইলাম । জানলাটা খোলা আছিল । রাহুল জানাইল , ভাস্করদারবডি এখনো নাকিমর্গেই পইড়া আছে । ওইখান থিক্য্যশ্মশানে নিয়া যাইতে নেকি চাইর-পাঁচ দিন লাইগ্য্যযাইব । কারণ আগের অনেক বডি নেকি পইড়া আছে । যেদিন নিয়া যাইব হেরা ফোন কইরা জানাইয়া দিব ...। বলতে বলতে শ্যামলী মুখে আঁচলচাপা দিল । শেখরবাবুর দু চোখ ফেটে আবার জল বেরিয়ে এলো ।মনে মনে বলে উঠলেন ঈশ্বর এতই নিষ্ঠুর হতে পারেন!

তিনি আবার ফিরে এলেন লেখার টেবিলে । কপালে হাত দিয়ে বসে রইলেন । ভাবতেই বড় কষ্ট হচ্ছে আজ , ভাস্করের মতো একজনভালো মেধাবীমানুষ , ছেলেবেলা থেকেইযার আত্মপ্রতিষ্ঠাররঙিন ছটা সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে আসছিল , তাঁর অন্তিম পরিণতি এই ! নাস্তিক হলেই যেন ভালোহতো । 'ঈশ্বরেরপ্রতিভাববাদীবিশ্বাসেরফলাফলবড়ো কষ্টকর হয় শেখর' , প্রবালদারএই কথাটা বহুদিন পর মনে পড়ে গেল শেখরবাবুর । প্রবালপ্রতীম সান্যাল , ছিলেন রেলের মজদুর ইউনিয়নের নেতৃত্বের মাথা। বাম আদর্শের প্রতীক ।গোড়া নাস্তিক ।বাড়িতে কোনো ঠাকুরঠুকুরের ছবি ছিল না । তবে ছিলেন অমায়িক ।মন্ত্রী -আমলাদের সংগে ওঠাবসা থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকতেই পছন্দ করতেন বেশি তিনি। পড়াশুনার ন্যাক ছিল । প্রচুর বই কিনতেন । লেখালেখিও করতেন । তিনি ছিলেন শেখরবাবুর বড়দার সহকর্মী। প্রায়ই তাঁদের বাড়ি আসতেন । শেখরবাবুর লেখালেখির হাত আছে জেনে তিনি তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বড়দাকে একদিনডেকে বলেছিলেন , বিশুবাবু , আপনার ভাইকে বলুন কী ভাবে লিখতে হয় আমাকে শিখিয়ে দিতে । শেখরবাবু বিনয়ে গদ গদ হয়ে প্রবালদার পা দুটো ছুঁয়ে বলেছিলেন , দাদা আমায় লজ্জা দিচ্ছেন ...

প্রবালদা যেন তেড়েমেড়ে বলে উঠেছিলেন , কেন লজ্জা দেব তোমায় , তোমার কাছ থেকে কি কিছু শেখা যায়না ? তুমি তো ভালো লেখো শুনেছি ...

শেখরবাবু প্রবালদার দিকে তাকিয়ে দেখলেন , সত্যি তিনি বেশ আন্তরিক , ঠাট্টা করেননি ...

প্রবালদা আবার বলে উঠেছিলেন , আমার বাড়ি যেও শেখর , আমার অনেক বই আছে , ঘেটে দেখো অনেক রসদ পাবে , আমাকেও শোনাতেপারবে ... সব বই পড়ার তো সময় পাই না ...

বলতে বলতে ম্রিয়মান হেসেছিলেন তিনি ।

সদর্থে, প্রবালদা শেয়ালকে ভাঙা বেড়া দেখিয়েছিলেন । সেদিন তোপ্রবালদা অনেকটাজোর করেইশেখরবাবুকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর বাড়িতে । চার-পাঁচটা বড় বড় আলমারিতে ঠাসা বই । আলমারির বাইরেও বইয়ের রেকে রয়েছে অসংখ্য বই আর ম্যাগাজিন । পুরোনো দিনের ' প্রবাসী ' , ' পূর্বাশা ' , ' ব্লিজ ' , ' ফ্রন্টিয়ার' -এর সংখ্যাগুলি যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছেন । ' পরিচয় ' , ' কৃত্তিবাস ' , ' স্বাধীনতা ' -র সংখ্যা গুলি বাঁধিয়ে রেখেছেন । মায় ' দেশ ' , ' অমৃত ' -ও বাদ দেননি । আলমারির পঞ্চাশ শতাংশ বইই ছিল সোভিয়েত ল্যান্ড সিরিজের ।এর বাইরেও ভারতীয় ও ইউরোপিয়ান সাহিত্যের সংগ্রহও মজুত ছিল।নতুন কেনা বইগুলি রাখতেন ডাইনিং টেবিলের আকারে একটি বড় টেবিলের ওপর । বোঝা যেত তিনি সুযোগ পেলেই বই কিনতেন । বলতে গেলে প্রবালদার বসতবাড়ি অর্থাৎ রেল কোয়াটারের সবঘরেই যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যেতকোনো বই নয়তো সাময়িক পত্রিকা । পড়তেন প্রবালদা। জায়গা মতন রেখে দেয়ার আর সময় পেতেন না । ওগুলোকে গুছিয়ে রাখার ডিউটি ছিল বৌদির অর্থাৎ ছন্দাদির । কখনো সখনো শেখরবাবুও এ কাজটি করে দিতেন ।

শেখরবাবুকে এরপর আর ডাকতে হতো না । ওই বই-পত্রিকার টানে সপ্তাহে দু তিন দিন ওখানেই কাটাতেন । প্রবালদা খুব খুশি হতেন । খুশি হতেন ছন্দাদি । ছন্দাদি হালুয়া বানিয়ে খাওয়াতেন । কোনো কোনো দিন লুচি আলুর দোম । প্রবালদা ছিলেন নিঃসন্তান । তিনি গেলে তাঁদের একাকীত্বটা ঘুঁচতো কিছুক্ষণের জন্য । বিশেষ করে ছন্দাদির । রোববার বা কোনো ছুটির দিন তো প্রবালদার সংগে ওই বইয়ের ঘরে বসে আড্ডায় আড্ডায় দিন কেটে যেত । ওই আড্ডায় যোগ দিতেন ছন্দাদিও । এই ভাবে একদিন বড়ভাই-ছোটোভাইয়ের সম্পর্কের নিগড়ে বাঁধা পড়ে গিয়েছিলেন তাঁরা ।

অবসরের পর প্রবালদা জলপাইগুড়ি শ্বশুরবাড়ির কাছে বাড়ি করে চলে গিয়েছেন। শেখরবাবু গিয়েছিলেন ওই বাড়িতে । প্রবালদা তাঁর বইয়ের ঘরটি ঠিক বজায় রেখেছেন । প্রবালদা তো এখন ওই বইয়ের ঘরেই সারাদিন কাটান । ...অনেকদিন প্রবালদার সংগে কথা হয় না । কেমন আছেন তিনি । মাঝখানে পড়ে গিয়ে তো পায়ে চোট পেয়েছিলেন । ছন্দাদিরও নার্ভের সমস্যা দেখা দিয়েছে ! শেখরবাবু প্রবালদারনম্বর টিপলেন । ওপারে গান বেজে ওঠে ' এই কঠিন সময়ে আমরা ভয় পাবো না ...' প্রবালদাই শুরু করলেন ---

--- বলো শেখর , কি করছো এখন ?

--- আপনি বলুন কেমন আছেন , সময় কী ভাবে কাটছে ? ছন্দাদি কেমন আছেন ?

--- হ্যাঁ , তোমার ছন্দাদি ওর বাপের বাড়ি গেছে , সামনেই রাস্তার ওপারে ওর বাপের বাড়ি । .বাড়িতে একা একা সময় কাটে না । তাই রান্নাবান্না সেরে চলে যায় ও । ওর ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের সংগে লুডো খেলে , গল্প করে । আর আমি বই নিয়ে আছি । সদ্য একটাবই ধরেছি , আমার হাতেই আছে। উইলিয়াম ডালরিম্পিলের 'দ্য অ্যানার্কি' । সপ্তদশ , অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে এই ভারতের উপর দিয়ে যে অরাজতা বয়ে গিয়েছিল তার ইতিহাস । সেই মুঘল সম্রাটদের আমল থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড বাহাদুরদের আমল পর্যন্ত তাদের হাতে যে তৎকালীন ভারতের লক্ষ লক্ষসাধারণ আদি মানুষ মারা গিয়েছিল তার জ্বলন্ত ইতিহাস । বইটি পারলে পড়ে নিও শেখর । ঐতিহাসিক ডালরিম্পিল নতুন নিরপেক্ষ ধ্যান-ধারণা নিয়ে বইটি লিখেছেন । গেল বছর বইটি বেরিয়েছে । আমি অন-লাইনে বইটি আনিয়েছি ।

--- বই পড়েই আপনার বেশ কেটে যাচ্ছে প্রবালদা, তাই না ...

--- হ্যাঁ , ঠিক বলেছো শেখর , এই লকডাউনে বেশ কয়েকটা বই পড়ে ফেলেছি, নগেন শইকিয়ার আহমদের ইতিহাস নিয়ে একটা বই কিনেছিলাম পান্ডুতে থাকতেই , কিন্তু তখনপড়া হয়নি , এখন সেটাও পড়ে ফেললাম ...আহমদের নিয়ে একটা কৌতূহল ছিল তখন থেকেই , সেটারকিছুটা হলেও নিরসন হয়েছে ...ও হ্যাঁ শেখর সম্প্রতি ' দেশ ' পত্রিকায় একটি ইংরেজি বই নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা পড়লাম , Brahamaputra । লেখক অরূপজ্যোতি শইকিয়া । বইটি অসাধারণ হবে । আমি অনলাইনে অর্ডার দিয়েছি । তোমার চোখে পড়েছে নিশ্চয় । অবশ্য তুমি তো ' দেশ ' পড় না । না পড়লেও ক্ষতি নেই । আমি পড়ি । একটি নতুন উপন্যাস বেরোচ্ছে । একটি মেয়ের লেখা । ল্যাঙ্গুয়েজটা বেশ নতুন নতুন ঠেকছে । ...

বলে থামলেন কিছুক্ষণ তিনি ।


ক্রমশ