শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২০

কথাগুলো বলা হলো না, পর্ব -৯

সেদিন চঞ্চলের সঙ্গে কথা বলে ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখি ফোনে শর্মির সঙ্গে কথা বলছে উর্মি, ওদের ফোন পর্ব শেষ হলে উর্মি জানালো যে ওর মাথা ধরেছে, চা বানাবে, আমি খাব কি না ?

মাকেও একবার জিজ্ঞাসা করে দেখো না, যদি খায়!

না বাবা, আমি এখন ওঘরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারব না, তুমি বরঞ্চ জিজ্ঞাসা করে এসো।

আমি একটু অবাকই হই উর্মির কথায়, কেন, ওঘরে এখন কী হচ্ছে?

সে তুমি নিজে গিয়ে দেখে এসো না, ঠোঁটে একটা মিচকে হাসি নিয়ে উর্মি জানালো যে ওঘরে নাকি এখন উত্তম-সুচিত্রার সিন চলছে।

মানে?

এবার হাসির সঙ্গে একটু বিদ্রূপও যেন জুড়ে যায় উর্মির চোখেমুখে , লেটারবক্সে তোমার মায়ের নামে একটা চিঠি পড়ে ছিল, ভাবলাম গিয়ে দিয়ে আসি, তা ঘরে গিয়ে দেখি তোমার মা সুচিত্রা সেনের মত জানলা দিয়ে আকাশের তারাদের দিকে চেয়ে আছেন আর অলোককাকু উত্তম কুমারের ঢঙে বিছানায় বসে ওনার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রয়েছেন।

তখন আমার টুয়েলভ, কী কারণে যেন সেদিন স্কুলে তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গিয়েছিল, দুপুর-দুপুর বাড়ি ফিরে পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখি অলোককাকু আমাদের বড় ঘরের বিছানাটায় বসা আর মা বিছানার ডানদিকের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বৌদি, তোমার কী হয়েছে, পণ্ডিতজি সেদিন বলছিলেন যে আজকাল নাকি তুমি গানে ঠিক মতন মন দিচ্ছ না!

কাকুর কথার উত্তর না দিয়ে মা ওপরের দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে যেমন দাঁড়িয়েছিল ঠিক তেমনই দাঁড়িয়ে থাকে আর মাকে নিরুত্তর দেখে অলোককাকু নিজেই আবার বলে ওঠেন, জানো বৌদি, ভাবছি, তোমাদের বাড়িতে আর আসব না।

না আসার কারণটা কি জানতে পারি ?

বড় শুকনো লাগছে যেন কাকুর মুখটা, কারণটা কি সত্যিই তোমার অজানা ?

আমার জানা কী অজানা, সেটা প্রশ্ন নয়, আমি জানতে চাইছি যে আপনি আমাদের বাড়িতে আসা বন্ধ করতে চান কেন?

আমি কিন্তু তোমায় একটা প্রশ্ন করেছিলাম, আগে সেই প্রশ্নর উত্তর দাও, তারপর তোমার প্রশ্নের উত্তর দেব।

কী প্রশ্ন করেছিলেন ?

ঐ যে জিজ্ঞাসা করলাম যে আজকাল গানে তোমার মন নেই কেন ?

ধীরে ধীরে মা এবার দেওয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ে, নখ দিয়ে ঘরের মেঝেতে অদৃশ্য আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বলে , গানে মন নেই, এটা আপনাদের মনগড়া ধারনা, আসলে পণ্ডিতজি এখন যে রাগগুলি শেখাচ্ছেন সেগুলো বড় কঠিন, তাই হয়তো বারবার ভুল হয়ে যাচ্ছে আমার ।

কাজল, এই প্রথম কাকুকে আমি মায়ের নাম ধরে ডাকতে শুনলাম , কথার মারপ্যাঁচে তর্ক জেতা যায়, অন্যের বক্তব্যকে ভুল প্রমাণ করা যায়, কিন্তু সত্যটাকে কখনো চেপে রাখা যায় না, একটু থামেন কাকু আর তারপর আবার বলতে থাকেন , রাগগুলি কঠিন বলে তোমার তুলতে ভুল হচ্ছে এটা অন্য কাউকে গিয়ে বলো, সে হয়তো বিশ্বাস করবে কিন্তু তুমি আমায় এসব বলে ভুল বোঝাতে পারবে না, আমি জানি, বিশুদা আজকাল আমাকে নিয়ে তোমার সঙ্গে প্রায়ই অশান্তি করে , দাদা ...

মা কাকুকে কথাটা শেষ করতে দেয় না, আপনি কি মনে করেন যে আপনার এ বাড়িতে আসা বন্ধ হলেই আপনার দাদা অমনি অশান্তি করা বন্ধ করে দেবে ?

জানি না, তবে তোমাদের অশান্তির কারণ হিসেবে নিজেকে দেখতে আমার ভীষণ খারাপ লাগে , তাই ভাবছি তোমাদের বাড়িতে আসাটা বন্ধ করলে হয়তো সেই ভাবনা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারব।

বাহ! কী অদ্ভুত বিচার আপনার! অলোক, একটা কথা বলুন তো, আপনি কি সত্যিই নিজেকে আমাদের স্বামী স্ত্রী-র মধ্যের অশান্তির কারণ হিসেবে দায়ী করেন ?

সেদিন বুঝিনি, কিন্তু আজ বুঝি , সময় সময় কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বড় কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ ঐ প্রশ্নগুলির মধ্যে ঠিক-ভুল বা সত্যি-মিথ্যের ব্যবধান এত সূক্ষ্ম ভাবে মিশে থাকে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তার প্রকার ভেদ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু আমার মা তো সাধারণ নয়, সাধারণের থেকে অনেক দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনন্য মহিলা , তাই তার কাছে সব কিছুই যেন ভীষণ রকমের ওয়েল ডিফাইনড, জানেন অলোক , আমাদের স্কুলে এক দিদিমণি ছিলেন, উনি প্রায়ই বলতেন, আমাদের প্রত্যেকেরই নাকি দিনে অন্তত একবারের জন্য হলেও আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ানো দরকার, কারণ আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে নিজের যে প্রতিচ্ছবি সেখানে ফুটে ওঠে তাতে কিন্তু আমরা আমাদের মনের অনুভূতিগুলি লুকিয়ে রাখতে পারি না, আর তাই নিজের অজান্তেই সেখানে আমরা যেন ভীষণ প্রকট হয়ে উঠি।

দিদিমণির কথাটা আজও আমি ভুলিনি, উনি প্রায়ই বলতেন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখতে গিয়ে কখনো যদি তোমার অস্বস্তি হয় তাহলে বুঝবে যে কোথাও না কোথাও কিছু ভুল হচ্ছে।


অলোক, আয়নার সামনে দাঁড়াতে আজও কিন্তু আমার কোনো অস্বস্তি হয় না।


মাইতি স্যার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে মৃত বলে ঘোষণা করতে পারেন , আমার মা-ও সেদিন আয়নার সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়নি, আজও পায় না, কিন্তু উর্মি বলে আমি যদি কখনো নিজেকে আয়নায় দেখতে চাই সেখানে নাকি তাহলে আমার একটা নিষ্ঠুর রূপ ফুটে উঠবে আর সেই রূপটায় দেখা যাবে কেমন করে আমি উর্মির জীবনটা ছারখার করে দিয়েছি।

সকালে আজ অফিস বেরনোর সময় ঝিনুকের মাধ্যমে মেসেজ পাঠিয়েছিল উর্মি, আমি যেন অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি করে বাড়ি ফিরি, আসলে শর্মি আর ওর বর প্রিয়াংশুর রাতে আজ আমাদের এখানে খাওয়ার কথা । বিয়ের পর শর্মি ওর বরের সঙ্গে মুম্বাইতে থাকে, মালাডের আস্কা বিচে যে ফাইভ স্টার হোটেলটা আছে সেখানে প্রিয়াংশু কো-অর্ডিনেশন ম্যানেজারের চাকরি করে, ঝিনুকের তখন বছর তিনেক বয়স, আমরা একবার মুম্বাইতে গিয়েছিলাম । ফেরার আগের দিন প্রিয়াংশু আমাদের ডিনার করানোর জন্য ওদের হোটেলের ‘সিনাটা’ রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়েছিল। বিকেল বিকেল হোটেলে পৌঁছে সূর্যাস্তের শেষটুকু দেখব বলে উর্মিকে নিয়ে আমি চলে গিয়েছিলাম সমুদ্রের পাড়ে, সমুদ্রের পাড় ধরে সেদিন আমরা যখন হাঁটছিলাম তখন অবিরাম ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছিল আমাদের পা ছুঁয়ে আর সেই ঢেউ ভাঙ্গা জল সরতেই উর্মি দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছিল স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা ছোট-মাঝারি-বড় ঝিনুকগুলো কুড়োতে, ঝিনুক কুড়িয়ে সেগুলো আমার হাতে দিয়ে আবার ও দৌড়ে যাচ্ছিল ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসা নতুন নতুন ঝিনুক কুড়োতে।


উর্মি ঐ যে তুমি বলো না, আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে নাকি আমার নিষ্ঠুর রূপটা বেড়িয়ে পড়বে তা কিন্তু পুরোপুরি সত্যি নয়, হ্যাঁ, আমি এটা মানছি যে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আমার যে ছবিটা ফুটে উঠবে সেখানে অনেক ব্ল্যাক স্পট থাকবে, শুভ্রার কথা তো তুমি জানই, ইমাম বক্স লেনে টিয়া বলে একটা মেয়ে আছে, সেখানেও আমি মাঝে-মাঝে যাই, বললে হয়তো বিশ্বাস করবে না, এই মেয়েটার কাছে কিন্তু আমি দেহের খিদে মেটাতে যাই না, ও আমার জন্য গান গায়, ওর কোলে মাথা রেখে আমার নিদ্রাহীন চোখদুটো যেন ধীরে ধীরে বুজে আসে ঘুমে, জানো উর্মি, টিয়ার গলাটা না ঠিক মায়ের মত, তাই মায়ের সব কটা ক্যাসেট আমি ওকে কিনে দিয়েছি আর বলেছি ও যেন মায়ের সব কটা গান নিজের গলায় তুলে রাখে , স্পেশালি ঐ গানগুলো, যেগুলো গেয়ে মা ছোটবেলায় আমায় ঘুম পারিয়ে দিত, একদিন টিয়া আমায় বলেছিল যে মায়ের গান শুনতে যখন আমার এতই সখ তখন কেন মাকে সেগুলি গেয়ে শোনাতে বলি না, বিলিভ মি, আমি কিন্তু সেদিন টিয়াকে বলতে পারিনি, ইয়েস উর্মি, আই কুডন্ট টেল হার, পাপানের মৃত্যুর মিথ্যা দায় চাপিয়ে তুমি কিভাবে কাজল করের গলা থেকে চিরকালের জন্য গান কেড়ে নিয়েছ, ধুর, কী বলতে গিয়ে কী সব বলে ফেলছি, হ্যাঁ, কী যেন কথা হচ্ছিল , আয়নার সামনে দাঁড়ানোর কথা, হ্যাঁ, আয়নার সামনে দাঁড়ালে আমার মুখের এই কালো স্পটগুলো যেমন ফুটে ওঠে তেমনি তুমিও কখন যেন সেখানে এসে দাঁড়াও, এই তো শব্দ-ছক ভরতে গিয়ে নাজেহাল হচ্ছ , আমাকে জিজ্ঞাসা করছ আমি কোন ব্রান্ডের আফটার শেভ ইউজ করি , দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে ঠাকুর প্রণাম সেরে দুজনে আমরা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছি , মিসেস কাজল করের পা ছুঁয়ে তুমি বলছ আমার ভালো নাম উর্মিমালা, লাল-সাদা ঝিনুকটা পেয়ে বালির ওপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে আমায় বললে , দেখো কুশল, কী সুন্দর, বিশ্বাস করো উর্মি, নিজের ভাঙ্গাচোরা ছবিটা দেখার ভয়ে নয়, আসলে আমি তোমার আর আমার এই হারিয়ে যাওয়া ছবিগুলি যাতে আর না ফুটে ওঠে তার জন্যই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াই না, বড় যন্ত্রণা হয়, রিয়েলি আই কান্ট বিয়র ইট, আর তাই শুভ্রার ফোনে ফোন করে জানতে চাই যে ও বাড়ি আছে কি না, শুভ্রা স্কুলের পড়ানোয় ব্যস্ত থাকলে অফিস ডুব মেরে চড়ে বসি ইমন বক্স লেনের বাসগুলিতে, কী করব আমি , আমরা প্রত্যেকেই তো নিজেদের নিজেদের জীবনে সুখী দেখতে চাই, আর সেই সুখের নেশায় ক্রমশ ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে পড়ি, এন্ড ডু ইউ নো, ইন্দ্রিয়ের কাছে আমরা সবাই কিন্তু এক একটা পুতুল মাত্র, হ্যাঁ, সুতোয় বাঁধা পুতুল নাচের পুতুল , আর তাই সেখানে কোনো ফিলজফিই কাজ করে না, মিথ্যে হয়ে যায় সব কিছু, গীতাকে মনে হয় দুর্বল, কথামৃতকে মনে হয় হীনবল, বেদ-বেদান্তও যেন দূরের কোনো মেঘ বলে মনে হয়, আর তারপর ইন্দ্রিয়ের তেজ কমে গেলে মানুষ তখন হার স্বীকার করে নেয় , দেখলে না, মাইতি স্যার চঞ্চলকে বলেছিলেন , উনি এখন আর মনে রাখতে পারেন না।

তাই নিজেকে উনি সেদিন মৃত বলে ঘোষণা করেছিলেন!



চায়ের দোকানের ছেলেগুলির দেওয়া ডাইরেকশন অনুসারে আর একটু এগিয়েই ডানদিকের সরু গলিটা পেয়ে গেলাম, ইট বিছানো গলিটার দু’দিকে সারি সারি টালির বা টিনের চালা দেওয়া এক বা দু কামড়ার বাড়ি, প্রায় প্রত্যেকটা বাড়ির সামনেই ছোট এক চিলতে বারান্দা আর বারান্দার সিঁড়ির দু'দিকে বসবার জন্য রোয়াক পাতা, অনেক বাড়িরই বারান্দার দরজা এখন খোলা, ছোট ছোট বাচ্চারা খেলা করছে বারান্দায়, কোনো কোনো রোয়াকে আবার চলছে বড়দের গুলতানি, রাস্তার দুদিকেই আধ হাত মত চওড়া খোলা নর্দমা, পাঁক জমে নর্দমা দুটো থেকে এমন দুর্গন্ধ ভেসে আসছে যে অন্নপ্রাশনের ভাতও যেন পেট থেকে উঠে আসবার জোগাড়, তাড়াতাড়ি করে পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকে চাপা দেই, এর মধ্যেই কোনো একটা বাড়ির অজানা কোনো এক কোন থেকে টিপ করে আনাজের টুকরো ভর্তি একটা প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট ছুড়ে দেওয়া হলো নর্দমার পাঁক লক্ষ করে, ছপাৎ, আর একটু হলেই ছিটকানো পাঁকগুলি এসে পড়তো আমার প্যান্টে, রাস্তার উল্টোদিকের কারোর বাড়ির রান্নাঘরে কড়াইতে গরম তেলে মশলা ছাড়া হলো, ছ্যাঁত করে একটা আওয়াজ আর তারপরে গলির বাতাসে মশলার একটা বেশ ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো, আমার ডানদিকের বাড়িটার ভিতর থেকে টিভির আওয়াজ ভেসে আসছে, টেঁপির মা মনে হয় টিভি দেখতে দেখতে রান্নাঘর বা অন্য কোথাও গিয়েছিল আর সেই সুযোগে টেঁপি কখন যেন টিভির চ্যানেল ঘুড়িয়ে দিয়েছে, সিরিয়াল দেখায় ব্যাঘাত হওয়াতে টেঁপির মা এখন টেঁপির নাম ধরে চিল চিৎকার শুরু করেছে, এমনই কিছু খণ্ড চিত্রের মাঝে এক সময় এসে পৌঁছলাম সেই তিনতলা বাড়িটার সামনে, জমিটার প্রস্থ কম বলে বাড়ির মালিক অদ্ভুত লম্বাটে প্যাটার্নের এক বাড়ি বানিয়েছেন, একতলা-দোতলা-তিনতলা , সব তলাতেই সারি সারি খুপরি খুপরি ঘর, অনেকটা যেন জেলের কুঠুরির মত, বাড়ির সামনের রকে এখন কয়েকজন বিভিন্ন বয়সী মহিলা আড্ডা দিচ্ছেন, আমাকে ইতস্তত করতে দেখে তাদের মধ্যে একজন মধ্যবয়স্কা ভদ্রমহিলা জিজ্ঞাসা করে উঠলেন, কাউকে খুঁজছেন ?

ইতি বাচক মাথা নেড়ে জিজ্ঞাসা করি, শুভ্রা মানে সমুদ্ররা কি এই বাড়িতেই থাকে ?

শুভ্রা বা সমুদ্রের নাম দুটো যেন কারোর চেনা মনে হলো না, তাই নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ ব্যর্থ আলোচনা করে যিনি আমায় কাউকে খুঁজছি কি না জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি এবার বাড়ির অন্দরমহলে মুখ বাড়িয়ে কাউকে উদ্দেশ্য করে বললেন , দেখো তো কণাদি, ইনি কাউকে খুঁজছেন।

স্থূলকায় কণাদি থপ থপ করে বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে রকের ওপর এসে বসলেন, ওনার চেহারা বা বসবার ধরন দেখে কাউকে আর আলাদা করে বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার নেই যে ইনিই বাড়ির মালকিন, ভদ্রমহিলা এবার আমার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন , কারে খুঁজছ?

ইচ্ছে করেই সমুদ্রর নামটা বললাম, একজন পুরুষ মানুষ আরেকজন পুরুষ মানুষের খোঁজ করছেন তাতে জনগণের মনে বিশেষ কৌতূহলের সৃষ্টি হয় না।

ভদ্রমহিলা চট করে তার ভাড়াটের সাগরে সমুদ্রকে যেন ঠিক চিনে উঠতে পারলেন না, তাই ওনাকে আর একটু সূত্র দিতে এবার সমুদ্রের আনুমানিক বয়সটা জানালাম আর তার সঙ্গে এ-ও জানালাম যে সমুদ্রর মাথায় অনেক লম্বা লম্বা চুল, গান করে। এবার বাড়িওয়ালী ভদ্রমহিলা সমুদ্রকে চিনতে পেরে মুখটা কেমন যেন বিকৃত করে উঠলেন, কে হও তুমি ওর?

এই রে! সমুদ্রকে সেভাবে আমি চিনি না, তাই ভদ্রমহিলা এখন যদি ওর ব্যাপারে ডিটেলে কিছু জানতে চায় তাহলে ফেঁসে যাব, তাই তাড়াতাড়ি করে বললাম, না মানে সমুদ্রের সঙ্গে আমার এক আত্মীয়ের বিয়ে হয়েছে, আত্মীয় কথাটা ইচ্ছে করেই জুড়ে দিলাম, অপরিচিত মহলে কোনো যুবকের পক্ষে অল্প বয়সী একটি মেয়েকে ‘পরিচিত’ বলার থেকে আত্মীয় বলাটা অনেক বেশী নিরাপদ, আত্মীয় কথাটার বিস্তার আসলে অনেক বেশী, সন্দিগ্ধ মনকে তা কিছুটা হলেও যেন উদারতা দেয়। তবে এক্ষেত্রে আত্মীয় বলাতেও ভদ্রমহিলার মুখের ভাব খুব একটা বদলালো না, তাড়াতাড়ি করে পরিচয়টাকে তাই আরো একটু স্পেসিফিক করার চেষ্টা করলাম, মনে যা এলো তাই বলে দিলাম, সমুদ্রের বৌ মানে শুভ্রা হচ্ছে গিয়ে আমার পিসতুতো বোন।

কণাদি আর একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে জানালো যে আমি যাদের খুঁজছি তারা এ বাড়ির তিনতলার ছাদের ঘরে থাকে, বাড়ির ভিতর ঢুকে ডানদিকে এগোলে দেখবে ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি আছে । ভদ্রমহিলার বলার ভঙ্গিমায় কেমন যেন একটা তাচ্ছিল্য মিশে রয়েছে, যাই হোক কণাদির থেকে বাড়ির ভিতরে যাওয়ার গেটপাস পেয়ে আমি সদর দরজা টপকে ভিতরে ঢুকলাম , পিছন থেকে বাড়িওয়ালীর গলা আবার ভেসে এলো , শোনো, তোমার বোনকে একটু বোলো যে আসবার সময় বকুলের মা জিজ্ঞাসা করছিল, বকেয়া বাড়িভাড়া কবে দেবে?

এক একটা ফ্লোর পার করতে মোট বারোটা করে সিঁড়ি টপকাতে হয়, ছত্রিশটা সিঁড়ি পার করে এক সময় আমি এসে দাঁড়ালাম ছাদের দরজায়, একটু ঠেলতেই দরজার পাল্লা-দুটো খুলে গেলো, শুভ্রা দেখি ছাদের দড়িতে জামাকাপড় মেলছে, আমাকে হঠাৎ করে ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুভ্রা বাস্তবিকই অবাক, আরে আসুন আসুন! কী সৌভাগ্য আমার!

দরজা দিয়ে ঢুকে ছাদে এসে দাঁড়ালে বাঁদিকে শুভ্রাদের ঘরটা নজরে আসে, ঘরের দরজার পাল্লা-দুটো খোলা থাকায় পুরো ঘরটাই এখন আমার চোখের সামনে, আট বাই দশের ঘরটায় আসবাবপত্র বিশেষ দেখলাম না, বাঁদিকের দেওয়াল ঘেঁসে মেঝেতে একটা বিছানা পাতা, ঘরে খাট বা শোওয়ার আর অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই, বুঝলাম শুভ্রারা মেঝেতে পাতা এই বিছানাটাতেই শোয় , পাতলা তোষকের ওপর এখন সেখানে একটা ময়লা চাঁদর পাতা আর চাদরটা বেশ কোঁচকানো, মনে হয় কেউ এতক্ষণ ওর ওপর শুয়ে ছিল , বিছানার শেষে দেওয়ালের কোনে একটা জলের কুঁজো দাঁড় করানো, উল্টোদিকের দেওয়ালে দরজার ডানদিকের সমকোণে যেখানে হাওয়া চলাচলের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে সেখানে একটা কেরোসিনের স্টোভ রাখা, স্টোভের ওপর একটা হাড়ি বসানো, তবে হাড়িতে এখন কিছু রান্না হচ্ছে না কারণ স্টোভটা জ্বলছে না, স্টোভের পাশে দেওয়ালের মাঝ বরাবর কাঠের একটা ভাঙাচোরা শেলফ, শেলফের মাথায় বিভিন্ন সাইজের কয়েকটা প্লাস্টিকের কৌটো, কৌটোগুলির বেশীরভাগই অবশ্য খালি, শুধু দু একটায় হলুদ বা লঙ্কার গুড়োর মত রান্নার কিছু মশলাপাতি রয়েছে, একটা কৌটোয় দেখলাম চা পাতা আর তার পাশে কাঁচের শিশিটায় আধ শিশির মত চিনি, মাঝের তাকটায় কটা অ্যালমুনিয়াম আর স্টেনলেশস্টিলের বাসন, শেলফের নিচের তাকে প্ল্যাস্টিকের একটা আধ ভাঙ্গা ঝুড়ি, তাতে কয়েকটা আলু, দুটো পেঁয়াজ আর কিছু কাঁচা লঙ্কা উঁকি মারছে । দরজা থেকে দূরের বাঁদিকের কোনে দুটো কম দামী সুটকেস দেওয়াল ঘেঁসে দাঁড় করানো, সুটকেসগুলির পাশে দরজার ঠিক মুখোমুখি একটা মাঝারী সাইজের প্লাস্টিকের টেবিল পাতা, টেবিলের ওপর একটা পোর্টেবল ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট টিভি, টিভির পাশে একটা টেপ রেকর্ডার আর কিছু ক্যাসেট এলোমেলো ভাবে ছড়ানো, টিভিটার মাথায় একটা ফটো স্ট্যান্ড, ফ্রেমের একদিকে গীটার হাতে সমুদ্রের ছবি, এই ছবিটাই শুভ্রা সেদিন আমায় হাজরার রেস্টুরেন্টে দেখিয়েছিল , অন্য দিকে শুভ্রা আর সমুদ্রের রেজিস্টার অফিসে মালা বদলের ফটো, টেবিলের ওপর বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে পাউডারের আর সিঁদুরের কৌটো, তার সঙ্গে দুটো-তিনটে খালি বা আধা ভর্তি নেল-পালিশের শিশিও দেখলাম , দেওয়ালে পেরেক দিয়ে ঝোলানো ছোট একটা আয়না, আয়নার বুকে বিভিন্ন সাইজের ক’টা লাল আর কালো টিপ, মাথার ওপর দিয়ে ঘরের একপ্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত কোনাকুনি করে একটা দু ফাত্তার দড়ি টাঙ্গানো , দড়ির এক কোনে সমুদ্রের আর শুভ্রার কিছু জামাকাপড় ভাজ ভাজ করে রাখা ।

রাজপুত্র , তাহলে শেষ অবধি এসে পৌঁছলেন ভিখারিনীর ঘরে! ঘরের একমাত্র প্ল্যাস্টিকের চেয়ারটায় আমাকে বসতে বলে শুভ্রা কথাগুলো বলে উঠলো।

শুভ্রার মুখে ভিখারিনী শব্দটা কট করে যেন কানে লাগল, সত্যিই তো, এই পরিবেশে শুভ্রাকে দেখে ভিখারি- ভিখারিই লাগছে, ওকে দেখে এখন কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে ওর বাবা একটা বেসরকারি সংস্থার কত বড় পোস্টে চাকরি করেন বা কী ভীষণ লাক্সারিতে ওর শৈশব কেটেছে।

একটু মনে হয় অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম, শুভ্রার কথায় আবার বাস্তবে ফিরে এলাম, কী ভাবছেন, বলছি চা খাবেন তো?

সে আর বলতে, সেই কখন থেকে চা খাওয়ার জন্য মনটা কেমন আঁকুপাঁকু করছে। তাড়াতাড়ি করে মুখে হাসি জুড়ে কথাগুলো বলে উঠলাম।

সসপ্যানে মেপে মেপে দু'কাপ জল ঢাললো শুভ্রা, তারপর স্টোভ জ্বালিয়ে তাতে সসপ্যানটা চাপানোর ফাঁকে আমায় জিজ্ঞাসা করলো যে বাড়ি খুঁজতে কোনো অসুবিধা হয়েছে কি না, শুভ্রার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বারবার কিন্তু আমার নজর চলে যাচ্ছিল ওর মুখের দিকে, সারামুখ জুড়ে যেন কালশিটে লেপা, আমি কিছুতেই শুভ্রার এই মুখটার সঙ্গে পড়ানোর সময় দেখা ওর সেই মুখটা মেলাতে পারছি না, শুধু মুখই নয়, শুভ্রার সারা শরীর জুড়েই যেন ওর ঘরের মত দীনতা ফুটে উঠছে, দেখেই মনে হচ্ছে পরনের নাইটিটা ভীষণ রকমেরই কমদামী, তার ওপর বহুবার ধুতে ধুতে তার প্রিন্টগুলিও যেন সব উঠে গিয়েছে, হঠাৎ কি মনে পড়াতে শুভ্রা আমার মুখের দিকে চেয়ে বললো , কুশলদা, আপনার র-চা চলে তো , আমি ইতি বাচক মাথা নাড়লে শুভ্রা বলতে থাকে, আসলে আজকে দুধ-ওয়ালা আসেনি, আর সমুদ্র আজ এত সকাল সকাল বেরিয়ে গিয়েছে যে দুধ এনে দিয়ে যাওয়ার সময় পায়নি।

ঘরে ঢোকার সময়ই টেবিলের পাশে দাঁড় করানো সমুদ্রের গীটারটা নজরে এসেছিল , কিন্তু তখন শুভ্রাকে সমুদ্রের কথা জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠেনি , কী খবর তোমার কর্তার, কেমন আছেন আমাদের সমুদ্রবাবু ?

সমুদ্রের কথায় শুভ্রা যেন চট করে তার চোখেমুখে একটা নকল অভিব্যক্তি জুড়ে নিলো , সেলস লাইনে কাজ করে করে আজকাল মানুষের মুখের এই এক্সপ্রেশনগুলি আমি খুব সহজেই বুঝতে পারি , চামচে করে সসপ্যানে ফুটতে থাকা জলে চিনি ঢালতে ঢালতে শুভ্রা বলে উঠলো, ভালোই আছে আপনার সমুদ্রবাবু , তবে আজকাল বেচারির খুব খাটা-খাটনি চলছে , পুজোর পরে এই সময়টায় তো পাড়ায় পাড়ায় ফাংশন লেগেই থাকে তাই নিঃশ্বাস ফেলারও সময় পাচ্ছে না, রোজই কোথাও না কোথাও ফাংশন লেগে রয়েছে ।

বাহ , এ তো খুব ভালো খবর, তা আজকেও কি সকাল সকাল শোয়ের জন্যই বেরিয়ে গিয়েছে , মানে দূরে কোথাও শো আছে নাকি আজ ?

না, না, আজ শোয়ের জন্য নয়, আজ পাসপোর্ট অফিসে গিয়েছে , তারপর সেখান থেকে এক মিউজিক ডাইরেক্টরের কাছে যাওয়ার কথা, বেরনোর সময় তো বলে গেলো , ফিরতে ফিরতে নাকি রাত হয়ে যাবে।

পাসপোর্ট অফিস মানে তোমরা কি বাইরে যাওয়ার প্লান করছ নাকি?

প্লান মানে আপাতত সমুদ্রেরই যাওয়ার কথা হচ্ছে, ছাকনি দিয়ে চা ছাঁকতে ছাঁকতে শুভ্রা জানালো যে মাতরম বলে একটা ব্যান্ডের সঙ্গে সমুদ্রের কথা চলছে, পাসপোর্ট হয়ে গেলে সমুদ্রকে নাকি ওরা এক মাসের জন্য বিদেশ ট্রিপে নিয়ে যাবে।

ঘরটায় অ্যাসবেসটসের ছাউনি হওয়াতে বেশ গরম লাগছিল , দরজার কোনে দাঁড় করানো স্ট্যান্ড-ফ্যানটার দিকে আমায় চাইতে দেখে শুভ্রা বলে ওঠে , ইশ, আপনার খুব গরম লাগছে, তাই না? কথাটা বলতে বলতে শুভ্রা চট করে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা বহু পুরনো একটা ম্যাগাজিন নিয়ে এসে আমায় দিলো, কারেন্ট নেই তো, এখন এটা দিয়েই হাওয়া খান। সিঁড়ি বেয়ে যখন ওপরে উঠছিলাম তখন অনেকের ঘর থেকেই টিভির আওয়াজ ভেসে আসছিল, তার মানে কারেন্ট এখনই গিয়েছে, তা যেতেই পারে, কারেন্টের তো আর মানুষের মত সি ইউ বা বাই বলে বিদায় নেওয়ার অভ্যাস নেই, তার যাওয়ার হলে সে কাউকে কিছু না বলেই বিশ্রামে চলে যায়। চায়ের কাপটা আমার হাতে দিয়ে নিজের কাপটা নিয়ে শুভ্রা মেঝেতে বসলো, আর ওকে মেঝেতে বসতে দেখে আমিও চেয়ার থেকে নেমে মেঝেতে ওর মুখোমুখি বসলাম ।

তোমার দরকারি কথাটা বললে না তো।

চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে মেঝেতে সেটা রাখতে রাখতে শুভ্রা বলে উঠলো , বলছি, আসলে একটা ব্যাপারে আপনার থেকে একটু হেল্প চাই কুশলদা।



ছত্রিশটা সিঁড়ি পার করে আবার নিচে নেমে এলাম , পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাই তার আগাম ভাবনার সঙ্গে মেলে না, তাই এক মনোবিদের লেখায় পড়েছিলাম যে আমাদের মনটা নাকি দীঘির মত হওয়া উচিৎ, দীঘির জলে আলোড়ন উঠলেও তা যেমন নিজের থেকেই এক সময় শান্ত হয়ে যায় আমাদের মনটাকেও তেমন ভাবে আমাদের গড়ে তোলা দরকার। সিঁড়ি বেয়ে নামবার সময় বিভিন্ন ঘর থেকে আবার টিভির আওয়াজ পেলাম, তার মানে কারেন্ট এসে গিয়েছে , এখানে তো দেখছি তাড়াতাড়িই কারেন্ট চলে আসে, আমাদের ওদিকে আবার একবার গেলে আর আসারই নাম করে না, সদর দরজার রকে কণাদি এখনও তার দলবল নিয়ে বসে আছেন, আমাকে দেখে ভদ্রমহিলা বললেন, বোনের সঙ্গে কথা হলো?

ওনার মুখে বোন কথাটা শুনে নিজের অজান্তেই একটু চমকে উঠলাম যেন, পরক্ষণেই অবশ্য মনে পড়লো যে বাড়িতে ঢোকার এন্ট্রি পাশ নেওয়ার সময় আমিই তো ওনাকে বলেছিলাম যে শুভ্রা হচ্ছে আমার পিসীর মেয়ে , ওনার আর দোষ কী! ছাত্রী বললে ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই এখন এত আন্তরিক ভাবে ভাইবোনের সঠিক আলাপ হয়েছে কি না তা জানতে চাইতেন না। আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে ভদ্রমহিলা এবার পরের প্রশ্নটাও করে ফেললেন এবং সেটা বেশ অস্বস্তিকর , আচ্ছা একটা কথা বলো তো , বোন কি তোমাদের গলগ্রহ হয়ে গিয়েছিল যে এরকম একটা মদো-মাতাল নিষ্কর্মা অপদার্থকে খুঁজে তার গলায় বোনকে জুড়ে দিয়েছিলে?

উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে সদর দরজা পার হই , পিছন থেকে ভদ্রমহিলা আবার বলে ওঠেন , ও ছেলে, ভাড়ার কথাটা বোনকে বলেছিলে?

স্বভাবতই এবার উত্তর দিতে হলো, কোনোরকমে তুৎলে বললাম , না মানে, ওরা একটু অসুবিধায় আছে, তবে সামনের মাসে আপনার বকেয়া ভাড়া দিয়ে দেবে বলেছে।

দিলেই ভালো, নিজের মনেই ভদ্রমহিলা যেন বলে চলেছেন , এমাসে তো কারেন্টের লাইন কেটে দিয়েছি, সামনের মাসে ভাড়া না দিলে পাড়ার ছেলে ডেকে ঘর থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব। ভাগ্যিস গলিটা সোজা নয়, কাস্তের ফলার মত বাঁকা, ভদ্রমহিলার চোখের আড়াল হয়ে তাই আরো কত সত্যের মুখোমুখি হওয়া থেকে যে বাঁচলাম তা কে জানে। বাইলেনটা পার করে মেনগলিতে পা রাখব, মোড়ের ঠিক মাথায় লম্বা চুল-ওয়ালা প্যাকাটে মার্কা একটা ছেলে উলটো দিক থেকে লাট খেয়ে প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়লো, সরি দাদা, এক্সট্রিমলি সরি-ই-ই, কিছু মনে করবেন না, প্লি-ই-ই-জ, ছেলেটাকে নিজের গা থেকে সরাতে গিয়ে ওর গা থেকে ভেসে আসা সস্তা মদের গন্ধে শরীরটা যেন ঘিন-ঘিন করে উঠলো, আমার দিকে ছেলেটা এখন ঢুলুঢুলু চোখে তাকিয়ে রয়েছে, মুহূর্তের জন্য মনের মধ্যে বছর দেড়েক আগে দেখা একটা মুখ যেন ঝিলিক দিয়ে চলে গেলো , কিন্তু তা কী করে হবে, মুখের মিল থাকলেও সমুদ্র তো এখন পাসপোর্ট অফিসে , শুভ্রা বললো ওর ফিরতে ফিরতে নাকি সন্ধ্যা হয়ে যাবে , পকেট থেকে রুমালটা বের করে নাকে চাপা দিয়ে ছেলেটার পাশ কাটিয়ে হাঁটা শুরু করি, পিছন থেকে ছেলেটি তখন জড়ানো গলায় বলছে , হেই মিস্টার, আমি না আপনাকে কোথাও যেন দেখেছি, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না, বাই দ্য ওয়ে আপনি কি জিম মরিসন ...

বড় গলিটা পার করে মেন রোডে এসে পড়লাম, চায়ের দোকানের ছেলেগুলি এখনও আড্ডা দিচ্ছে , আমাকে দেখে একটি ছেলে বলে উঠলো, কী দাদা, সমুদ্রবাবুর সঙ্গে দেখা হলো , এই তো এইমাত্র এখান থেকে লাট খেতে-খেতে গেলো।

করুণাময়ীর ব্রিজের ঠিক বাঁ পাশ ঘেঁসে গোপাল শূরের যে চারতলা বাড়িটা আছে তারই গ্রাউন্ড ফ্লোরের হলঘরটায় তারকজেঠুর চেম্বার, চেম্বারের বাইরে পিতলের নেম-প্লেটে লেখা, ডঃ তারক গুহ , নিচে ছোট ছোট অক্ষরে ডিগ্রীর বহর, আধ ঘণ্টা হলো বাবাকে নিয়ে জেঠুর চেম্বারে বসে আছি, বেশ কিছুদিন হলো বাবার শরীরটা ঠিক ভালো যাচ্ছে না, মাঝে-মাঝেই জ্বর আসছে , জ্বরটা দু-তিনদিন থেকে চলে যায়, আবার কিন্তু ফিরে আসে, তবে জ্বরের থেকেও যেটা বেশী ভাবাচ্ছে তা হলো বাবার বুকে আজকাল মাঝে মাঝেই কেমন যেন একটা ব্যথা হয়, তখন নিঃশ্বাস নিতে গেলে বাবাকে বেশ কষ্ট করতে হয়, কাল অফিস থেকে বাবা জ্বর নিয়ে ফিরলে মা হুকুমজারি করলো যে অনেক হয়েছে বাবার নিজে নিজে চিকিৎসা করা , এবার গুহজেঠুর কাছে বাবাকে নিয়ে যাওয়া হবে, মা নিজেই আজ বাবাকে নিয়ে ডাক্তারখানায় আসতো কিন্তু সকাল সকাল ক্যাসেট কোম্পানির ম্যানেজার বাবু হঠাৎ এসে হাজির হওয়ায় মা আর আসতে পারলো না , আমার ওপরই তাই দায়িত্ব পড়েছে বাবাকে ডাক্তারখানায় নিয়ে আসবার।

জেঠুর ডাক্তারখানাটা দুটো পোর্শনে ভাগ করা, হলটার ভিতরের দিকে ওনার বসবার জায়গা, সেখানে একটা গ্লাস-টপে মোড়া টেবিল পাতা আর টেবিলের পিছনে একটা কাঠের চেয়ার , টেবিলটার সামনের দিকে একটা সরু বেঞ্চ, জনা তিনেক মানুষ এক সাথে সেখানে বসতে পারেন , বেঞ্চের বাঁদিকে একটা মাঝারি হাইটের স্টুল , লোহার সরু সরু চারটে পায়ার ওপর একটা স্টেনলেসটিলের থালাকে যেন উলটো করে রাখা রয়েছে, রোগীরা বেঞ্চে বসে তাদের রোগের কথা জানালে জেঠু তাদের ঐ স্টুলটার ওপর গিয়ে বসতে বলেন, তারপর বুকে স্টেথো লাগিয়ে শুনতে থাকেন তাদের বুকের ধুকপুক আওয়াজ , কখনো বা স্টুলে বসা রোগীটিকে বলেন বড় করে হা করতে , তিন সেলের টর্চটা তখন ফোকাস করে মেলে ধরেন রোগীর মুখের ভীতর , স্টুলের ঠিক পিছনেই একটা হাত দুয়েকের মত চওড়া লোহার বেড , রোগীদের শুইয়ে যখন পরীক্ষা নিরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় তখন তারা এসে শুয়ে পড়েন ঐ বেডটার ওপর । জেঠুর বসবার চেয়ারের ডানদিকে ঘরের কিছুটা অংশ একটা পর্দা টাঙ্গিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছে , অনেকটা যেন ঠিক অ্যান্টি চেম্বারের মত, দুপুরবেলায় উনি ঘণ্টা দুয়েকের জন্য ওখানে বিশ্রাম নেন।

চেম্বারের বাইরে হলঘরের বাকি অংশে দেওয়ালের দুদিক ঘেঁসে সমান্তরাল ভাবে দুটো দুটো মোট চারটে বেঞ্চ পাতা, বেঞ্চগুলো হচ্ছে অপেক্ষমাণ রোগীদের বসবার জায়গা, তবে জেঠুর যা পসার তাতে চারটে বেঞ্চ যথেষ্ট নয় , অপেক্ষমাণ রোগীদের ভিড় এক এক সময় তাই ডিসপেনসারির হল ছাড়িয়ে বাইরের রাস্তা অবধি গিয়ে পৌঁছয় , রাস্তায় দাঁড়িয়ে রোগীরা তাদের নম্বর আসার প্রতীক্ষা করতে থাকেন , আর এই নম্বর লেখার কাজটা করেন সদাদা, ঠিক করে বলতে গেলে জেঠুর চেম্বারে ডাক্তারিটুকু বাদ দিয়ে বাকী সব কাজই এই সদাদা করেন, এক কথায় উনি জেঠুর সেক্রেটারি কাম ক্যাশিয়ার কাম কমপাউনডার, অল ইন ওয়ান। আমাদের দেখে সদাদা একগাল হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, কার আবার শরীর খারাপ হলো?

প্রায় চার বছর ধরে জেঠুর সঙ্গে জুড়ে রয়েছেন এই সদাদা , থাকেন করুণাময়ীর আশেপাশেই , আগে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে জিনিসপত্র হকারি করতেন , দিনভর রোদ্দুরে ঘুরে ঘুরে ফেরি করতে গিয়ে এক সময় মারাত্মক সর্দি কাশি বাঁধিয়ে ফেলেছিলেন, সঙ্গে মাথাতেও অসহ্য যন্ত্রণা। ডাক্তারজেঠুকে দেখাতে এলে জেঠু সেদিন দাদাকে বলেছিলেন , সদা, তোর সাইনাস আছে রে, তোর কিন্তু বাবা রোদে ঘুরে ঘুরে জিনিস ফেরি করা বন্ধ করতে হবে।

রোদে ঘুরে জিনিস ফেরি করা বন্ধ করলে খাব কী, ডাক্তারবাবু?

হুম, রোদে ঘুরে জিনিস ফেরি করা বন্ধ করলে খাবি কী, সেটা তো একটা সমস্যার কথাই বটে, তা এই সারাদিন রোদে ঘুরে মাস গেলে কতটাকা উপার্জন হয় শুনি?

দাদা সেদিন ডাক্তারজেঠুকে তার মাসিক উপার্জনের একটা আভাস দিলে জেঠু বলেছিলেন, আমার এখানে কাজ করবি? সেই শুরু, এর মধ্যে সদাদা কম্পাউন্ডারির কাজটাও শিখে নিয়েছেন , আমাদের পাড়ায় এখন কারোর প্রেশার মাপবার দরকার পড়লে বা কারোকে ইনজেকশন দিতে হলে সদাদাই ভরসা, শুধু তাই নয়, ভবানিপুরের এক নাম করা প্যাথলজিক্যাল ল্যাবের সঙ্গেও দাদার যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন জেঠু , দাদা ঐ ল্যাবের হয়ে এখন আমাদের পাড়ায় কালেকশন এজেন্টের কাজ করেন, সকাল সকাল রোগীদের বাড়ি গিয়ে স্যাম্পল কালেক্ট করে রাতে আবার তাদের বাড়ি বয়ে রিপোর্ট দিয়ে আসেন । একটা কথা কিন্তু মানতেই হবে, দাদার অসীম ধৈর্য , নইলে তারকজেঠুর মত একটা খামখেয়ালী লোকের সঙ্গে বছর চারেক ধরে টিকে থাকাটা কিন্তু মোটেই সহজ কাজ নয়! এক সময় জেঠু সরকারী হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তবে বেশীদিন সেখানে কাজ করতে পারেননি, চোখের সামনে নানা দুর্নীতি হতে দেখে একদিন সুপারের মুখের ওপর বলে দিয়েছিলেন , আপনাদের মত ধান্দাবাজ আর লোভী মানুষরা যতদিন এই সব অর্গানেইজশনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন ততদিন বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কোনো উন্নতি হবে না, ব্যাপারটা অনেকদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল , জেঠুর মন্তব্যের জন্য ওনাকে শোকজও করা হয় , কিন্তু তাতে কী , শোকজের জবাবদিহি করতে এসে রীতিমত স্ট্যাটিস্টিক পেশ করে জেঠু এমন এমন সব কথা বলেছিলেন যে তা শুনে উপস্থিত অনেক বড় বড় স্বাস্থ্য অধিকারীই নাকি ঘামতে শুরু করেছিলেন ।

যাই হোক চাকরী ছাড়ার পর মূলত ছেলেদের উদ্যোগেই জেঠুর এই ডিসপেনসারি খোলা , একটা কথা মানতেই হবে, যতই বদ মেজাজি হোন না কেন জেঠুর ডায়গোনিসিস কিন্তু দুর্ধর্ষ, আর শুধু ডায়গানোসিসই নয়, রোগীদের সঙ্গে কমুনিকেট করবার এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে ওনার , আমাদের অঞ্চলের সবারই বিশ্বাস একবার গুহ ডাক্তারের কাছে গিয়ে রোগের কথা বললেই হলো, তাতেই নাকি অর্ধেক রোগ সেরে যায়, এছাড়াও ওনার পশার বাড়ার আরো একটা কারণ হচ্ছে উনি খুব কম ওষুধপত্র দেন , পরীক্ষা নিরীক্ষার কথাও খুব একটা বলেন না , একবার এক ভদ্রলোক নাকি জিজ্ঞাসা করেছিলেন , আচ্ছা ডাক্তারবাবু, একটা কথা বলুন তো , সব ডাক্তারই যখন আজকাল কথায় কথায় এত সব পরীক্ষা নিরীক্ষার কথা বলেন তখন আপনি টেস্ট ফেস্ট করানোর জন্য বিশেষ ইনসিস্ট করেন না কেন? ভদ্রলোকের প্রশ্ন শুনে জেঠু নাকি খুব গম্ভীর ভাবে ওনাকে বলেছিলেন, কত্তা, ডাক্তারিটা আমি পড়াশুনা করে পাশ করেছি আর তাই শুধু নয়, এতগুলো বছর ধরে রোগীও দেখে চলেছি, তাই এখনও যদি কথায় কথায় আমায় রিপোর্ট দেখে ওষুধ দিতে হয় তাহলে আপনারা আমায় ডাক্তার বলে মানবেন কেন বলুন তো?

সেদিন ভদ্রলোককে কিন্তু জেঠু সহজে নিস্তার দেননি, ধরুন আপনার জ্বর হয়েছে, সেটা বোঝার জন্য তো আপনার আমার কাছে আসবার কোনো দরকার নেই, ঘরে বসে জিভের তলায় থার্মোমিটার রাখলেই বুঝতে পারবেন যে আপনার জ্বর হয়েছে কি না , এবার জ্বর হলে সোজা কোনো ভালো ল্যাবে গিয়ে রক্তটা পরীক্ষা করিয়ে নিন, দেখবেন ল্যাবগুলি রিপোর্টে আপনার শরীরের কমজোরি দিকগুলো সব একদম হাইলাইট করে দিয়েছে , ব্যাস, ঐ হাইলেটটেড অংশগুলো নিয়ে এবার কিছু মেডিক্যাল জার্নাল খুলে বসুন , বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখবেন ঐ জার্নাল পড়েই আপনি বুঝতে পারছেন যে আপনার ঠিক কী বিমারী হয়েছে আর ঐ বিমারীর জন্য আপনার কোন কোন ওষুধ খাওয়া দরকার, ব্যাস ওষুধগুলোর নাম লিখে সোজা এবার চলে যান কোনো বড় কেমিস্ট শপে , সেখানে পাশ করা কেমিস্টরা দেখবেন আপনাকে সুন্দর ভাবে গাইড করে দেবেন যে কোন ওষুধটা কখন আর কবার করে খেতে হবে, এবার আমায় বলুন এই টোটাল প্রসেসে আপনার ডাক্তারের সাহায্য কোথায় দরকার পড়লো?

সদাদার লিস্টে আজ প্রথমেই এক অল্প বয়স্কা ভদ্রমহিলার নাম , ওনাকে দেখে ঠিক চিনলাম না , খুব সম্ভবত আমাদের পাড়ায় থাকেন না, সঙ্গে বছর দুয়েকের একটা বাচ্চা, বাচ্চাটা একটানা কেশে চলেছে , শুধু কাশিই নয়, কাশির সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটার বুক থেকে কেমন যেন শোঁ শোঁ আওয়াজ বেরচ্ছে, সদাদা ভদ্রমহিলার নাম ধরে ডাকতে বাচ্চাটাকে নিয়ে উনি ভিতরে চলে গেলেন, বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ, রোগীদের বসবার জায়গা আর জেঠুর চেম্বারের মাঝে যে সবুজ পর্দাটা টাঙানো তার পিছন থেকে বাচ্চাটার কাশির আওয়াজ আর ডাক্তারজেঠুর কথা ভেসে আসছে, কতদিন ধরে কাশি, এর আগে কোনো ডাক্তারকে দেখানো হয়েছে কি না, বাচ্চাটাকে জেঠু এবার লোহার বেডে এনে শুইয়ে দিতে বললেন , শব্দহীন কিছু মুহূর্ত, আর তারপরই পর্দার ওপাশ থেকে যেন কামানের গর্জন ভেসে এলো, মা ভদ্রমহিলাকে উদ্দেশ্য করে জেঠু বলছেন, আমার কাছে আর কষ্ট করে নিয়ে এলেন কেন, দুদিন পরে তো ছেলেটাকে নিয়ে একেবারে শ্মশানেই যেতে পারতেন। কথাটা শেষ করেই সদা বলে দ্বিতীয় হুঙ্কারটা ছাড়লেন জেঠু, দাদা পড়িমরি করে ভিতরে গেলে ওনাকে একটা ইনজেকশনের নাম করে সেটা এখনই পুশ করতে বললেন, ভদ্রমহিলা খুব সম্ভবত জেঠুর আর দাদার কথার মাঝে কিছু একটা বলতে গিয়েছিলেন , জেঠুর হুঙ্কার আবার ভেসে এলো , চুপ করে বাইরে গিয়ে বসুন, মা হয়েছেন, লজ্জা করে না, ছেলেটা এতদিন ধরে কাশছে, বুকের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে কফ বসে যাচ্ছে আর আপনি কি না মা হয়ে বাড়িতে বসে এতদিন তামাশা দেখছিলেন ? ভিতরে সদাদা খুব সম্ভবত ইনজেকশন দিচ্ছেন , পর্দার ওপার থেকে জেঠুর গলা আবার, তবে এবার আর হুঙ্কার নয়, তাতে যেন আদেশের সুর , শুনুন, আপনার ছেলেকে এখন আধ ঘণ্টার মত অবজারভেশনে রাখা হবে, ইনজেকশনে রিঅ্যাক্ট করলে ভালো, নইলে কী হবে তা শুধু ভগবানই জানেন, সদা ওনাকে বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করতে বল আর নেক্সট পেশেন্টকে পাঠিয়ে দে।

হাতে ধরা লাঠিটা মেঝেয় দুবার ঠুকে হরিহরদাদু উঠে দাঁড়ালেন, দাদুর পরেই আমাদের নম্বর, দাদুকে দেখে বাবা জিজ্ঞাসা করেছিল যে কী হয়েছে , উত্তরে দাদু জানায় যে কী হয়েছে না জিজ্ঞাসা করে বাবার বরঞ্চ উচিৎ ছিল এটা জিজ্ঞাসা করা যে কী হয়নি, দাদুর নাকি এখন অনেক রকমের ব্যামো চলছে, হাঁটুতে ব্যথা, হাঁটতে পারেন না, রাতে ঘুম হয় না, মাঝে মাঝেই নাকি ওনার মনে হয় বুকটা ভীষণ ধড়পড় করছে, কী জানো তো বিশু, বয়স হয়েছে তো, তাই শরীরটা আজকাল বড় সহজেই কাহিল হয়ে পড়ে, আগের মত আর যুৎ পাই না, দাদু ভিতরে গিয়ে মনে হয় এইসব কথাগুলিই আবার বলছিলেন , তারককজেঠু দেখলাম দাদুকে ভরসা দিয়ে বলে উঠলেন, আরে কী যে বলেন না দাদা, এইসব হাঁটু ব্যথা , রাতে ঘুম না আসা, এগুলো কোনো রোগ নাকি, আর আপনারা যদি এসব বলে ঘরে বসে যান তাহলে আমাদের কে দেখবে বলুন তো?

হরিহরদাদুর গলাটা আচমকাই যেন একটু বদলে গেলো, কিছুক্ষণ আগের সেই চিঁ চিঁ ভাবটা এখন আর নেই, তুমি যে কী বলো তারক, এই বয়সে আমরা আর তোমাদের কী দেখব! আমরা তো এখন সব বাতিলের দলে, একটু থেমে দাদু আবার বলেন , শোনো ভাই, আমার কাছে এখন এটা পরিষ্কার যে আমাদের মত বয়সের সবারই এখন পরকালের টিকিট কাটা হয়ে গিয়েছে , এখন শুধু অপেক্ষা ট্রেন আসবার।

একদম ভুল কথা দাদা, অন্যদের কার কী অবস্থা তা আমি জানি না কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে আমি লিখে দিতে পারি যে আপনার পরপারে যাওয়ার এখনও ঢের দেরী আছে, আর আমার কথা যদি বিশ্বাস না করেন তাহলে আজ বাড়ি ফিরে একবার আয়নায় নিজেকে দেখুন , দেখবেন এই বয়সেও আপনার শরীর কত ফিট, ঠিক যেন একদম আথ্যলিট মত, টানটান , একটা ওষুধ দিচ্ছি, সেটা রোজ রাতে শোওয়ার আগে খেয়ে নেবেন, ব্যাস আর কিচ্ছু দরকার নেই। একটু চুপচাপ, জেঠু মনে হয় পেসক্রিপশন লিখছেন, আর সেটা লেখা হয়ে গেলে দাদুর উদ্দেশ্যে আবার বলে উঠলেন, যা বলেছি এই সব হাঁটু-ঘুম নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না , ইউ আর পারফেক্টলি ওকে, আজ থেকে মন যা চাইবে তা-ই খাবেন , দুবেলা মনের সুখে ঘুরে বেড়াবেন আর ইয়ং জেনারেশনকে ভুল পথে যেতে দেখলেই তাদের কান পাকড়ে একদম সোজা রাস্তায় নিয়ে আসবেন।

আমাদের ঠিক উলটো দিকের বেঞ্চে সন্দীপদা বসেছিল, আমাদের পাড়াতেই থাকে, আমার থেকে বয়সে একটু বড়, হরিহরদাদু আর ডাক্তারজেঠুর খোশ গল্পে দাদা এক সময় তার ধৈর্য হারালো , ও ডাক্তারবাবু , বলি গল্পটা একটু কম করে রোগী দেখলে ভালো হয় না, সেই কখন থেকে তো বসে আছি। কথাটা জেঠুর কানে গিয়েছে, ভিতর থেকে তাই জেঠুর গলা ভেসে এলো, সদা, দেখ তো কার এত সময়ের দাম আর তাকে বল আমি এখানে বসে থাকবার জন্য কাউকে মাথার দিব্যি দেইনি, যার অপেক্ষা করার সময় নেই সে যেন স্বচ্ছন্দে অন্য ডাক্তারের কাছে গিয়ে নাম লেখাতে পারে , জেঠু এসব বললে কী হবে, আমরা সবাই জানি , এই অঞ্চলের কোনো পেশেন্টই গুহডাক্তারকে ছেড়ে অন্য কোনো ডাক্তারকে দেখাতে চায় না, সময় লাগে লাগুক, বসে থাকতে হয় তাও ঠিক আছে কিন্তু রোগ হলে ঐ তারক গুহই ভরসা। বেশ উজ্জীবিত ভাবে হরিহরদাদু এক সময় ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন, চেম্বারের ঢোকার সময় ওনার শরীর জুড়ে যে একটা ঝিমিয়ে পড়া ভাব ছিল সেটা যেন এখন উধাও , গটমট করতে করতে করতে হলঘর ছেড়ে বেরনোর সময় একবার ঘাড় ঘুরিয়ে সন্দীপদার মুখের দিকেও চাইলেন , আমার মনে হলো ইয়ং জেনারেশনের উদ্ধারের কাজটা দাদু সন্দীপদাকে দিয়েই শুরু করতে চান।


আরে বিশ্বনাথ যে, কী খবর বলো, পর্দা সরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই জেঠুর উষ্ণ আপ্যায়ন।

খবর ভালো নয় দাদা, শরীরটা কয়েকদিন ধরেই বেশ বেগরবাই করছে, মাঝে মাঝেই জ্বর আসছে আর শ্বাস নিতে গেলে বুকে কেমন যেন একটা কষ্ট হয়।

বাবার নাড়ি টিপে আমার দিকে চেয়ে জেঠু এবার বলে উঠলেন , তা কুশলবাবু, তুমি তো সাইন্স নিয়ে পড়ছ, তাই না ?

নাড়ি ছেড়ে জেঠু বাবার চোখ, জিহ্বা এসব পরীক্ষা করতে শুরু করলেন , আরো একটু বড় করে হা করো তো বিশ্বনাথ, বাবার মুখে টর্চটা ফোকাস করে জেঠু আমায় বললেন , তোমার মায়ের গান-বাজনা কেমন চলছে, নতুন কোনো ক্যাসেট বের হলো ?

আমি জানালাম যে কথা-বার্তা চলছে, পুজোয় সম্ভবত বের হবে।

বড় ভালো গান করেন তোমার মা, শুনলে মনটা যেন একেবারে জুড়িয়ে যায়, এই তো পরশুই শুনছিলাম, তু যাঁহা যাঁহা চলেগা, মেরা সাঁয়া সাথ হোগা, আহা কী গেয়েছেন , প্রথমে আনন্দী কল্যাণে কিছুক্ষণ স্বরে থাকলেন আর তারপর চোখের নিমেষে চলে গেলেন চলনে, বা হাতে টর্চটা ধরে কথাগুলি বলতে বলতে ডান হাতটাকে সামনের দিকে বাড়িয়ে জেঠু গেয়ে উঠলেন, স গ ম গ প, স গ ম ধ প র স, বুঝলে কুশল, তোমার মা হচ্ছেন গিয়ে একজন সত্যিকারের জিনিয়াস , তুমি ওনাকে আমার প্রণাম জানিও।

বাবা এতক্ষণ ধরে চুপ করে ডাক্তারজেঠুর ইন্সট্রাকশন মত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করছিল , জেঠুর কথা শুনে জিভ কেটে বলে উঠল, আরে দাদা এসব কী বলছেন , কাজলের থেকে আপনি বয়সে কত বড় , প্রণাম তো কাজলেরই আপনাকে করা উচিৎ!

বিশ্বনাথ, ঐ বিছানাটায় গিয়ে শোও আর শোনো, বয়সকে আমি শ্রদ্ধা করি বটে তবে প্রণাম জানানোর সময় মানুষের গুণকেই বিচার করি, বয়সটা সেখানে কোনো ফ্যাক্টর হয় না , একটানা কথাগুলি বলে উনি হাঁক দিলেন সদাদার নাম ধরে আর দাদা ভিতরে এলে তাকে বিদঘুটে একটা মেশিনের নাম করে সেটা ওপর থেকে নামিয়ে দিতে বললেন, মেশিনটা যেন একটা নলকে বেঁকিয়ে তৈরি করা, অনেকটা ঠিক ঐ পেরিস্কোপের মত , বাবাকে বড় করে হা করতে বলে জেঠু এবার সেই যন্ত্রটার একটা প্রান্ত বাবার মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন আর অপর প্রান্তে চোখ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।

জেঠুর পর্যবেক্ষণ শেষ হলে বাবা বিছানা থেকে নেমে বেঞ্চের ওপর এসে আমার পাশে বসলো, আর ডাক্তারজেঠু পর্দা সরিয়ে ওনার অ্যান্টি চেম্বারে গিয়ে ঢুকলেন, মিনিট দুয়েক বাদে সেখান থেকে একটা মোটা বই সমেত বেরিয়ে এলেন , চেয়ারে বসে বইটার একটা পাতা খুলে কিছু যেন পড়তে শুরু করলেন , ওনাকে দেখে এখন মনে হচ্ছে উনি যেন ভুলেই গিয়েছেন যে আমরা ওনার সামনে বসে রয়েছি, এক সময় বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জেঠু বললেন , কুশল, তুমি টেলিফোন ডাইরেক্টরি দেখতে জানো ?

ঘাড় নেড়ে জানালাম, হ্যাঁ জানি।

বাইরে সদার কাছে দেখবে একটা ডাইরেক্টরি আছে, সেখান থেকে ডঃ শ্যামল চক্রবর্তী, পাম এভিনিউতে বসেন, ওনার ফোন নম্বরটা খুঁজে বার করো, আর ওনাকে ফোন করে বাবার জন্য একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নাও , বলো অ্যাপয়েন্টমেন্টটা যেন উনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেন ।

আমি জিজ্ঞাসা করার আগেই বাবা জিজ্ঞাসা করে উঠল, ডাক্তারবাবু কী হয়েছে, মানে সিরিয়াস কিছু?

দেখো বিশ্বনাথ, সবটাই আমার অনুমান, আসলে তোমার অসুখটা ঠিক কী সেটা সঠিক ভাবে ডায়গোনিসিস করতে গেলে তোমার বুকের ভিতরটা একবার ভালো করে দেখা দরকার, কিন্তু আমার কাছে বুকের ভেতর দেখার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই, তাই তোমাকে ঐ চেস্ট স্পেশালিষ্টের কাছে যেতে বললাম , ওনাকে গিয়ে তুমি একবার দেখিয়ে নাও, আমাদের আর কিছু জিজ্ঞাসা করবার বা বলবার সুযোগ না দিয়ে সদাদাকে উদ্দেশ্য করে জেঠু বলে উঠলেন , সদা, পরের পেশেন্ট পাঠিয়ে দে।


ক্রমশ