বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০২০

কথাগুলো বলা হলো না, পর্ব -১৪

১৪

কামাল, তোমার কাজে কখনো খবরদারী করি না বলে তুমি যা খুশী করবে তা কিন্তু মেনে নেওয়া যায় না!

আহা , রাগ করেন কেন বাবু, বলেন না কী হইছে, আপনাগো লগে কি আমার আজকের সম্পর্ক যে আপনাগো জাইন্যা শুইন্যা আমি ঠকাম।

কথাটা ঠকানোর নয়, কথাটা হচ্ছে বিশ্বাসের, তোমায় আমরা বিশ্বাস করি বলে তুমি কী করছ না করছ তা নিয়ে কখনো প্রশ্ন করি না, যা জিনিসের এস্টিমেট এনে দাও তাই কিনে দেই, আমরা ভাবি তুমি আমাদের কাজটা নিজের মনে করেই করো, কিন্তু ছাদের রেলিংটা কী বানিয়েছ তুমি ! পই পই করে সেদিন বললাম যে বাড়িতে বাচ্চা আছে , রেলিঙয়ের হাইটটা যেন একটু উঁচু হয়, আর তুমি কী না সেটা হাঁটু অবধি গাঁথলে, আর এমন ভাবে গাঁথলে যে দুদিনের মধ্যেই ইট আলগা হতে শুরু করেছে । আমার গলায় মিশে থাকা উষ্মাটা খুব একটা অবোধ্য ছিল না , আর সেটা বুঝেই কামাল বলে উঠলো , ঠিক আছে দাদাবাবু , চিন্তা করবেন না, রেলিংটা ভাইঙ্গা আমি নতুন কইরা আবার গাঁইথা দিম।

যা করবার তাড়াতাড়ি করো, পাপান দিন দিন যেমন দুরন্ত হয়ে উঠছে তাতে কিন্তু আমার ভীষণ ভয় হয়, আর সেই জন্যই ছাদের রেলিংটা তোমায় তাড়াতাড়ি করে বানাতে বলা যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, কামাল জানালো যে সে একটা কাজে কাল দেশে যাচ্ছে আর ফিরে এসেই আমাদের ছাদের রেলিংটা নতুন করে গেঁথে দেবে , কামালের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন পাপান আমার কোলেই ছিল, ওর চিবুকটা ধরে কামাল বলে উঠলো , বাবু-সোনা, তুমি কিন্তু এই কয়দিন একদম ছাদে উঠবা না, ছাদে কিন্তু একটা ভূত আছে। ভূত শব্দটার সঙ্গে পাপান সেরকম পরিচিত নয়, আসলে এখনকার বাচ্চারা আমাদের সময়কার আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠে না, তাই ওরা ভূত-রাক্ষস-দত্যিদানো এসবের থেকে অনেক বেশী পরিচিত কার্টুনের চরিত্রগুলির সঙ্গে, কামালের মুখে ভূত শব্দটা শুনে তাই পাপান বলে উঠলো , বাবা, ভূত কি ?

কামাল চলে গিয়েছে, আজ রবিবার, যাই, একটু ক্লাব থেকে ঘুরে আসি, বিকেলে আজ আবার শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণ আছে, আমার একমাত্র শালার আজ বিবাহ বার্ষিকী, সকালে অবশ্য এ নিয়ে উর্মির সঙ্গে আমার এক প্রস্থ হয়ে গিয়েছে , চা খেতে খেতে কথাটা আমিই তুলেছিলাম, উর্মিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আরে বিকেলে তো ও বাড়িতে নিমন্ত্রণ আজ, তা তোমার দাদা বৌদিকে কী গিফট দেবে সেটা কি ভেবেছ?

আচ্ছা, এই সংসারে সব কিছুই কি আমাকেই ভেবে ঠিক করতে হবে, তোমরা কি সব এই সংসারের অতিথি?

আরে বাবা, রাগছে কেন, গিফট-ফিফটগুলি তো তুমিই কেনাকাটা করো, তাই বলছিলাম আর কী।

হ্যাঁ তা করি কারণ আমি তো আর তোমার মত অমন কানকাটা নই যে হাতে করে কিছু একটা নিয়ে গিয়ে লোকের বাড়িতে অমনি পাত পেতে খেতে বসে যাব। উর্মির কথাটা আংশিক সত্যি , আসলে গিফট ফিফটের ব্যাপারে আমার একটা খুঁতখুঁতানি আছে, আমি মনে করি উপহার কেনার সময় অনুষ্ঠানটা কী আর গিফটটা কাকে দিচ্ছি সেটা খুব ইম্পরট্যান্ট, আর এই ইম্পরট্যান্ট বিষয়টা ভাবতে ভাবতেই বেশীরভাগ সময় আমার আর শেষ অবধি কিছু ভেবে ওঠা হয় না, তখন ফাইনালি উর্মিকেই দায়িত্ব নিতে হয়।

এই শোনো না, আমার মাথায় কিন্তু একটা আইডিয়া এসেছে, চা শেষ করে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাইটা নিতে নিতে কথাটা বলি আর উর্মি আমার কথা শুনে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়ায়, মুখে কিছু না বললেও বুঝতে পারছি উর্মি মনে মনে কী ভাবছে, নিশ্চয়ই ভাবছে, আচ্ছা! ঐ গোবর পোড়া মাথা থেকেও তবে আইডিয়া বেরয়!

বলছিলাম কী, একটা ঢোক গিলি, আসলে যে আইডিয়াটা মাথায় এসেছে সেটা শুনে উর্মি কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে সেটা নিয়ে আমার নিজের মধ্যেই একটু সংশয় হচ্ছে, দেখো, অনুষ্ঠানটা তো তোমার দাদা বৌদির বিবাহ বার্ষিকী, তাই এমন একটা গিফট দেওয়া উচিৎ যাতে গিফটটা দুজনাই ব্যবহার করতে পারবেন, আই মিন উপহারের আনন্দটা যেন দুজনাই ওঁরা উপভোগ করতে পারেন!

উর্মি চুপ করে আমার দিকে চেয়ে আছে, যেন মনে মনে বলছে, ফেলো তোমার তাস, তারপর দেখাচ্ছি কত ধানে কত চাল!

আচ্ছা, ধরো, আমরা যদি ওঁদের একটা খোল-কর্তালের সেট দেই তাহলে কেমন হয়, তোমার মা তো রোজ সন্ধ্যাবেলায় পুজো আচ্চা করেন, আর সেই সময় যদি তোমার দাদা অফিস থেকে ফিরে চা-টা খেয়ে খোলটা বাজাতে থাকেন আর তোমার বৌদি দাদার পাশে বসে কর্তালে সঙ্গত দেন তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়, অবশ্য তুমি চাইলে ব্যাপারটা ভাইস-ভার্সাও হতে পারে, সেক্ষেত্রে দাদার হাতে কর্তালদুটো দিয়ে বৌদিও খোল বাজাতে পারেন, উর্মি এখনও আমার দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে অ্যাছে, তবে মুখে কোনো এক্সপ্রেশন নেই, বুঝতে পারছি ওর এই চুপ করে চেয়ে থাকাটা আসলে ঝড়ের আগের সেই নিস্তব্ধতা, তবে সাহস করে গলায় আবেগ মিশিয়ে পরের কথাগুলোও বলে ফেললাম, ভেবে দেখো, জাস্ট ইম্যাজিন, বিকেল শেষ হয়ে একটা মধুময় সন্ধ্যা নেমে এসেছে তোমাদের বাড়ির চৌকাঠ পার হয়ে, তোমাদের ঠাকুরঘরে মহারাজ কৃষ্ণ তাঁর রাধার গলা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, ওদিকে তোমার মা কৃষ্ণ নাম জপ করতে করতে সমানে কেঁদে চলেছেন, আর ওনার ঠিক দুপাশে তখন তোমার দাদা-বৌদি খোল-কর্তাল বাজিয়ে ওনাকে সঙ্গত করছেন , উর্মি চুপ, আর তাই দেখে আমার কল্পনায় আরো একটু বিস্তার দেই, তবে খোল-কর্তালে যদি তোমার আপত্তি থাকে সেক্ষেত্রে তাহলে আমরা ওঁদের একটা ঘুড়ি-লাটাইয়ের সেটও প্রেজেন্ট করতে পারি এন্ড আই থিং দ্যট উইল বি অলসো এ ভেরি আনকমন এন্ড ক্রিয়েটিভ প্রেজেন্টেশন! ছুটির দিনে ভাত-ঘুম সেরে তোমার দাদা হাফ প্যান্ট পরে বিকেলের দিকে ফুরফুরে হাওয়ায় তোমাদের ছাদে রং বেরংয়ের ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন, তোমার বৌদি হাতে ধরে রয়েছেন লাটাই , দাদা কখনো সুতোয় টান দিয়ে ঘুড়িটাকে ওপরে নিয়ে যাচ্ছেন আবার পরক্ষণেই গোৎ খাইয়ে হয়তো নিচে নিয়ে আসছেন, লাটাই হাতে তোমার বৌদির মুখে সে কী উত্তেজনা আর তোমার দাদা যেই অন্য ছাদের থেকে ওড়া ঘুড়িটাকে এক টানে পচাৎ করে কেটে দিলেন অমনি তোমার বৌদি আনন্দে দাদাকে একেবারে জড়িয়ে ধরে একপাক নেচে নিলেন, জাস্ট ইম্যাজিন! হাউ রোমান্টিক উইল বি দ্য সিন !

ডিসগাস্টিং , আমায় আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মুখটাকে বেঁকিয়ে দুপদাপ করে পা ফেলতে ফেলতে উর্মি রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো আর আমি ওর যাওয়ার পথ ধরে বলে উঠলাম, আরে যাচ্ছ কেন, লেট’স ফাইনালাইজ দ্য গিফট।



জানতাম না ক্লাবে আজ মিটিং আছে , সকাল থেকেই তাই অনেকেই আজ ক্লাবের লনে এসে ভিড় করেছেন, মিটিং কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে, ক্লাবে যখন আসছি তখন পঞ্চাননতলার মাঠে হরিহরদাদুর সঙ্গে দেখা হলো , দাদু আজকাল বয়সের ভারে একদম যেন নুইয়ে পড়েছেন, ওনাকে পঞ্চাননতলার মন্দিরের বারান্দায় বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, দাদু, কেমন আছেন ?

আর আমার থাকা! একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো দাদুর বুক থেকে, নির্ধারিত সময় তো অনেক কাল আগেই পার করে এসেছি, এখন চলছে এক্সটেনশন পর্ব, তবে এই এক্সটেনশন পর্বটা আর মনে হয় খুব বেশীদিন চলবে না , ভগবান এবার যখন-তখন নোটিশ পাঠিয়ে বলবেন, হরিহর, অনেক হয়েছে, এবার ওপরে চলো, কথাগুলি বলতে বলতে দাদু লাঠিতে ভড় করে উঠে দাঁড়ালেন , আমার একটা কাজ করে দেবে কুশল ?

বলুন না কী কাজ, নিশ্চয়ই করে দেব ।

বলছি কী নিতাইয়ের দোকান থেকে আমার জন্য ক’টা চকোলেট এনে দেবে, পাঞ্জাবীর বুক পকেট থেকে হরিহরদাদু একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বার করে আমার হাতে দিলেন ।

ওনার হাত থেকে টাকাটা নিতে নিতে বললাম , এনে দিচ্ছি কিন্তু কী করবেন এত চকোলেট দিয়ে , বাড়িতে কি আজ ছোট কারোর জন্মদিন আছে নাকি?

আরে না না, বাড়িতে নয়, আজ তো সন্তোষের জন্মদিন, বেঁচে থাকতে কত গরীব দুঃখী ছেলে-মেয়েদের ও এই দিনটায় জামাকাপড়, খাওয়ার-দাওয়ার, বই-খাতা এসব দিত।

সত্যিই স্মৃতি বড় চলমান, ঘড়ির কাটা মুহূর্তেই যেন আজকের বর্তমানকে কালকের অতীতে পরিণত করে, প্রতিদিন সময়ের পাতায় তাই নতুন নতুন স্মৃতিরা এসে ভিড় করে আর আজকের বর্তমানরা যেন একটু একটু করে চাপা পড়ে যায়, এই যে আমি কুশল কর, আজ আমি চলছি, ফিরছি, কথা বলছি, পরিবার বন্ধু-বান্ধবের কাছে তাই আমি আজ একটা লাইভ অবজেক্ট, কিন্তু এই আমি যদি আজ মরে যাই, কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-স্বজন-পরিবার-পরিজন সবার মন থেকে আমি কিন্তু হারিয়ে যাব, প্রথম কিছুদিন হয়তো আমার ফটোতে থাকবে চন্দনের টাটকা ফোঁটা, থাকবে সমবেত স্মৃতি চর্চা , তারপর এক সময় চন্দনের ফোঁটা শুকিয়ে সবার অলক্ষ্যে মাটিতে ঝড়ে পড়বে , ফটোর বাসী মালা তখন আর কেউ বদলানোর কথা মনে করবে না ।

এই ক’বছরে সন্তোষজেঠুকে আমরা কেমন ভুলে গেলাম! অথচ এই ভদ্রলোক তার জীবনের শেষ পাথেয়টুকু দিয়ে এই মাঠ-মন্দির সব আমাদের জন্য বানিয়ে দিয়ে গিয়েছেন !

ক্লাবের ভিতরে মিটিং চলছে এখনো, এক ঘেয়ে মিটিংয়ের কথাবার্তা শুনতে আর ভালো লাগছিল না, তাই বাইরের বেঞ্চে এসে বসি, একটা সিগারেট ধরাই , দিনকাল কেমন যেন সব বদলে গিয়েছে, এই ক্লাবটা গড়ে ওঠার পিছনে আমার সেরকম কোনো কন্ট্রিবিউশন বা শ্রম না থাকলেও এই ক্লাবটার সঙ্গে আমার কিন্তু একটা আত্মিক যোগাযোগ আছে, আসলে আমার বয়স আর ক্লাবটার বয়সে খুব একটা পার্থক্য নেই, আমরা যখন প্রথম পঞ্চাননতলায় এসেছিলাম তখন আমার চোখের সামনেই ক্লাবঘরটা গড়ে উঠেছিল, তখন অবশ্য আমি খুবই ছোট, পাড়ার তখনকার তরুণ আর যুবকরা উদ্যোগ নিয়ে এক ঘরামী জোগাড় করে গেঁথে ফেলেছিল মাটির একটা ঘর আর তার ওপর টালির ছাউনি। মেঝেতে বিছানো হয়েছিল ইট আর তার ওপর লড়বরে স্ট্যান্ডে রাখা হয়েছিল একটা ক্যারাম বোর্ড , ক্যারাম বোর্ডের ওপর একটা চল্লিশ পাওয়ারের হলুদ আলো, এই ছিল আমাদের ক্লাবের প্রথম দিককার ছবি, তারপর এক সময় মাটির দেওয়াল ভেঙ্গে ইটের গাঁথনি হলো, টালির চাল বদলে হলো কংক্রিটের ঢালাই, কিন্তু এত সবের মাঝেও আমাদের ক্লাবের ভাবমূর্তির কিন্তু কখনো বদল হয়নি, একটু রাজনীতির ছোঁয়া ছাড়া কোনোদিনই আমাদের ক্লাবের আর কোনো বদনাম ছিল না, কিন্তু গত দু বছরে অনেক কিছুই যেন বদলে গিয়েছে, ক্লাবের দায়িত্ব এখন কুণাল বা সঞ্জুদের মত নওজোয়ানদের হাতে, রাতের দিকে ক্লাবের ভিতরে নাকি আজকাল পয়সা দিয়ে তিন-পাত্তির আসর বসে , শুধু তাই-ই নয় , ক্লাবের ছাদে আজকাল প্রায়ই বোতল খোলা হয় , যাক গে, আমি আর এসব ভেবে কী করব, বহুদিন আগেই তো নিজেকে আমি ভেজা বারুদ বলে ডিক্লেয়ার করেছি, উর্মির ভাষায় দাঁত থাকলেও আমি নাকি আসলে একটা বিষহীন ঢোঁরা সাপ!

সিগারেটের ফিলটারটা আঙুলের টোকায় ছুড়ে ফেলে বাড়ির দিকে রওনা দেই, কে জানে গিফটের ব্যাপারে উর্মি কিছু ডিসাইড করলো কি না, বাড়ি এসে দেখি হলঘরে ঝিনুক আর পাপানের যুদ্ধ প্রস্তুতি চলছে, তবে সত্যিকারের যুদ্ধ নয়, টিভিতে এখন একটা পৌরাণিক কাহিনীর রি-টেলি-কাস্টিং শুরু হয়েছে, সেই সিরিয়ালে কালকের এপিসোডে দেখানো যুদ্ধটা ঝিনুক আর পাপান এখন থ্রি ডাইমেনসনে রিপিট করতে চায় , শোওয়ার ঘরে উঁকি মেরে দেখি উর্মি ফোনালাপে ব্যস্ত, ভেসে আসা কথাবার্তা থেকে বুঝলাম ফোনের অপর প্রান্তে ওর বৌদি রয়েছেন , উনি মনে হয় আমাদেরকে তাড়াতাড়ি করে ও বাড়িতে যাওয়ার জন্য বলছেন, জবাবে উর্মি বলছে, আমি কি আর তোমার মত অত সৌভাগ্যবান যে সকাল থেকে শাশুড়ি হাতে-হাতে সব কাজ করে দেবে, আমাকে একাই সব কাজ করতে হয়, না থেমে উর্মি বলে চলেছে, এই তো সবে রান্না-বান্না করে উঠলাম, এখন দেখি কাজের লোক দয়া করে কখন আসেন , তারপর খাওয়াদাওয়ার পাট চুকে ঐ যেতে-যেতে ধরো বিকেলই হয়ে যাবে।

এদিকে হলঘরে ভাইকে গদা যুদ্ধের নিয়মকানুন শেখাচ্ছে ঝিনুক, শেখানো হলেই শুরু হয়ে যাবে মহা সংগ্রাম, ছোট দুটো সাইড পিলো গদা হিসেবে ব্যবহারের জন্য হলঘরের সোফায় প্রস্তুত, উর্মির ফোন পর্ব শেষ হলো, ফোন রেখে ও হলঘরের দিকেই আসছে, ফোনালাপের কন্টিনিউশনে মনে মনে আমি তৈরি, উর্মির তরফ থেকে এখনই একটা ফতোয়া জারি হবে, আমরা যেন আজ তাড়াতাড়ি করে চান-টানগুলি সেরে নেই, কিন্তু উর্মি হলঘরে ঢুকে সম্পূর্ণ অন্য কথা বললো, এই শোনো না, একটা দরকারি কথা আছে । স্বাভাবিক ভাবেই কথাটা বললো, কিন্তু আজকাল যে কী হয়েছে, উর্মির সব কথাতেই যেন আমি একটা মানে খোঁজবার চেষ্টা করি, কে যেন আমার মনের মধ্যে বিপ-বিপ করে বলছে এখন, কুশল, গেট রেডি, সম্ভবত তুমি আবার একটা অনভিপ্রেত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চলেছ।

ও বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল।

হ্যাঁ , তা তো শুনলাম, তুমি তোমার বৌদির সঙ্গে কথা বলছিলে।

বৌদির সঙ্গে তো পরে কথা হলো, আসলে ফোনটা মা-ই করেছিল । উর্মির মুখে ওর মায়ের কথা শুনে নিজের অজান্তেই আমার মনটায় যেন ধক করে উঠলো, স্বীকার করতে লজ্জা নেই, আমার শাশুড়ি মা-কে আমি ঠিক বুঝতে পারি না, তবে একটা জিনিস বুঝি যে জামাই হিসেবে আমি ওনার একদমই পছন্দের নই, আমাদের বিয়ের সময় থেকেই কে যেন ওনার মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে জামাই হিসেবে আমি ফেলনা টাইপের, উর্মি নেহাত তখন গোঁ ধরেছিল তাই বাধ্য হয়ে এরকম একটা ফালতু ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে হয়েছে, আমি খেয়াল করে দেখেছি উর্মি যখনই আমার নামে কোনো নালিশ নিয়ে ওনার কাছে যায় তখন ভদ্রমহিলার চোখে-মুখে যেন বেশ একটা তৃপ্তির ছাপ ফুটে ওঠে, মেয়ের দিকে তাকিয়ে উনি যেন নিঃশব্দে বলতে চান , বোঝ এখন, তখন তো আমার কথা শুনলি না, তবে শ্বশুর-মশাইয়ের দিক থেকে আমি কিন্তু নিশ্চিন্তই ছিলাম, আলাপের প্রথমদিন ভদ্রলোক যে কথাগুলি বলেছিলেন আজীবন উনি তা মেনে চলেছেন , কখনো উর্মি আমার নামে ওনার কাছে কিছু বলতে গেলে উনি বলে উঠতেন, এ তোমাদের নিজস্ব সমস্যা, তোমাদেরকেই ভেবে ঠিক করতে হবে যে হাউ টু ট্যাকল ইট।

কী বললেন তোমার মা?

মা বলছিল আমরা যদি আজ একটু তাড়াতাড়ি করে ও বাড়িতে যাই তাহলে ভালো হয়, রান্না-বান্নার কাজে আমি ওদের একটু হেল্প করতে পারব আর তুমি গেস্টদের আপ্যায়নের ব্যাপারগুলি দেখাশুনা করতে পারবে।

উহু কুশল, ব্যাপারটা অত সোজা নয়, উর্মি মনে হয় এখনো আসল কথায় আসেনি, ও যা বললো সেটা হলো আসলে আসল কথায় আসার উপক্রমণিকা, মনের মধ্যে আবার সেই বিপ-বিপ।

আর শোনো না... উর্মি তার কথাটা শেষ করতে পারে না, হঠাৎ ঝিনুক আর পাপানের যুদ্ধে গদা হিসেবে ব্যবহৃত কভারহীন একটা কোলবালিশের খোলের সেলাই খুলে রাশি রাশি মুক্ত তুলো এখন হলঘরের চারদিকে উড়তে শুরু করেছে, ঝিনুক আর পাপানের চোখ-মুখ তুলোয় ভরা, পাপানকে কিন্তু বেশ লাগছে দেখছে, ওর সারা মুখ আর মাথায় এখন সাদা তুলো, একটা শুধু লাল জামা পরিয়ে দিলেই হলো, একদম স্যান্টাবুড়ো লাগবে, প্রাথমিক হতবাকটা কাটিয়ে ঝিনুক হলঘরের এক কোনায় গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো, ওকে দেখে মনে হচ্ছে তুলো-ঝড়ের পরিণামটা যে কী হতে যাচ্ছে সেটা বুঝতে ওর আর বাকি নেই, ভাইয়ের সাথে গদা যুদ্ধে জিততে থাকলেও মায়ের সঙ্গে এখন যে ওর যুদ্ধ শুরু হবে তাতে বেচারি যে প্রতিরোধ বা প্রতিঘাতের কোনো সুযোগই পাবে না সেটা ও জানে, আর সেটা জানে বলেই ঝিনুক হঠাৎ করে যেন ভ্যা করে কেঁদে উঠলো।

হলঘরে উড়তে থাকা তুলো এক সময় ডাস্টবিন বন্দী হলো, ভাইকে নিয়ে ঝিনুক এখন তার পড়ার ঘরের খাটে, উর্মির ফতোয়া, চান করার আগে কারোকে যদি সে এক পা বিছানা থেকে নামতে দেখে তাহলে তার পিঠে আজ আস্ত কাঠের স্কেল ভাঙ্গা হবে।

ঝড় শেষের শান্ত হলঘরে আমরা আবার আমাদের আলোচনায় ফিরে এলাম , হ্যাঁ, তখন যেন কী বলছিলে, তোমার মা কী বলেছেন?

মা জিজ্ঞাসা করছিল যে উনিও আজ আমাদের সঙ্গে যাবেন কি না?

একটু আশ্চর্যই হই, আমার মা ঐ বাড়িতে যাবে কি না তা নিয়ে উর্মির বা ওর মায়ের কৌতূহলটা আমার যেন ঠিক স্বাভাবিক লাগছে না , মাকে এই মা-বেটী খুব একটা পছন্দ করে না, আমাকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে উর্মি নিজেই জানালো যে আজ সন্ধ্যায় ওদের গুরুদেব মশাইয়েরও নাকি ও বাড়িতে আসবার কথা, আর সেই উপলক্ষে উর্মির মা একটু নাম কীর্তনের আয়োজন করেছেন, আমার মা যদি সেই নাম কীর্তনের আসরে গুরুদেবকে দু-একটা ভজন-টজন গেয়ে শোনান তাহলে খুব ভালো হয়।



এসো, ছুঁয়ে দাও আমায়...

ভাঙা রোদ স্পর্শ করুক অবুঝ সেই পিয়ানো আবার...

শীত ও অসম্পূর্ণ সান্নিধ্যের মাঝে যে ঘুম আমার খুব প্রিয় তাকে আমি আজ বিলিয়ে দেব নির্ধারিত বালিশ অথবা চাদরে, সন্ধ্যার বেদনাময় জলে মিশিয়ে দেব কলঙ্কিত সুরভি...বীঠোভেন বালিকা... এসব শুধু তোমার জন্য... বৃষ্টি এবং বিদ্যুৎভরা তোমার আঙুলগুলো আজ হোক আবার সংকেতময়, প্রথম দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সিম্ফনির সুরে স্পষ্ট হয়ে উঠুক আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস ... চতুর্থ পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ সপ্তমে খসে যাক সব মুখোশ অথবা পরচুলো ... তারপর তুলনামূলক প্রেমে রাত থাকুক আজ অভিসন্ধিময়ী ঈর্ষা হয়ে ...

সেখান থেকেই না হোক জন্ম-হোক অষ্টম... নবম ...

জন্ম হোক ব্যথিত প্রশ্নের অথবা ভ্রুক্ষেপ-হীন করোটি কিংবা কংকাল...

ছুঁয়ে দাও, ছুঁয়ে দাও আমায় ...বেজে উঠুক দশম...

বীঠোভেন বালিকার আঙুল ভাসিয়ে দিক

মরা মেঘ আঁকড়ে থাকা বৃষ্টি ভেজা সেই সকাল

কাল তিন-তিন বার পুরো রিং হয়ে ফোনটা বেজে গিয়েছিল, শুভ্রা ফোন তোলেনি, আজ সকালে অফিসে ঢুকতেই ক্যারলের মেসেজ, ফিফটিন মিনিটস ব্যাক, দেয়ার ওয়াজ এ কল ফ্রম শুভ্রা, শী উইল কল ইউ এগেন অ্যাট টেন থার্টি।

ঘড়ি মিলিয়ে ঠিক সাড়ে দশটাতেই শুভ্রার ফোন এলো, কুশলদা, কাল আপনি ফোন করেছিলেন?

শুভ্রার গলা শুনে কেন কে জানে হঠাৎ করে যেন মনে হলো অফিসের বদ্ধ দেওয়াল, ডেস্ক, ল্যাপটপ, কোলাহল এসব ছেড়ে আমি এখন একটা খোলা মাঠের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছি, আজকাল সব সময় যে একটা দমবন্ধ ভাব আমায় অস্থির করে রাখে সেটা যেন এখন আর নেই, আমার মাথার ওপর এখন যেন একটা নীল আকাশ, পায়ের নিচে সবুজ ঘাস, তিরতির করে হাওয়া বয়ে চলেছে সেখানে, বয়ে চলেছে সময়, শুভ্রাকে জানালাম যে হ্যাঁ, ফোন করেছিলাম।

আরে আপনি যখন ফোন করেছিলেন তখন আমি শাওয়ার নিচ্ছিলাম, বাথরুম থেকে বেরিয়ে আপনার অফিস নম্বর থেকে মিসড কল দেখে ফোন ব্যাক করলাম কিন্তু দেয়ার ওয়াজ নো রিপ্লাই।

তার মানে তুমি সাড়ে ছটার পর ফোন করেছিলে , বৃষ্টি কমলে কাল সাড়ে ছটা নাগাদ আমি অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম।

তা হবে হয়তো, প্রসঙ্গ বদলালো শুভ্রা, কুশলদা আপনি একটা সেলফোন নিচ্ছেন না কেন বলুন তো?

কেন সেলফোন নিলে কী হবে?

কী আবার হবে, আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করাটা তখন অনেক সহজ হয়ে যাবে, আর আপনি যে প্রফেশনে রয়েছেন সেখানে তো সেলফোন থাকাটা ভীষণ জরুরী।

শুভ্রাকে জানালাম যে ম্যানেজমেন্ট কর্পোরেট কানেকশন নেওয়ার কথা ভাবছে, সামনের মাসেই হয়তো আমাদের সেলস টিমের প্রত্যেককে সেলফোন দিয়ে দেবে কোম্পানি।

ওহ, দ্যটস গ্রেট!

মোটেই গ্রেট নয়।

কেন ?

আসলে এই গ্যাজেটগুলো দিয়ে কোম্পানিগুলি আজকাল তার এমপ্লয়িদের চব্বিশ ঘণ্টার চাকরে পরিণত করে।

জানি না, তবে আমার কী মনে হয় জানেন সেলফোন থাকাটা খুব জরুরী , যাক গে ছাড়ুন এসব কথা, এখন বলুন কাল ফোন করেছিলেন কেন?

এমনিই, বৃষ্টিতে অফিসে আটকে গিয়েছিলাম, হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা ল্যান্ডফোনের ইন্সট্রুমেন্টটা দেখে মনে হলো তোমার সঙ্গে একটু গ্যাঁজাই ।

আর আমি ভাবলাম কী না কী, তা একদিন আসুন না আমার বাড়িতে, বসে বেশ গ্যাঁজানো যাবে ।

যাব’খন।

উহু যাব’খন নয়, বলুন কবে আসবেন?

আরে, এই তো সেদিন তোমার বাড়ি থেকে ঘুরে এলাম, এত ঘন ঘন যাওয়াটা ঠিক নয়!

ধুর, সেদিন আর গল্প হলো কই, পুরনো স্মৃতির ভাড়ার খুলে ঝাড়পোঁছ করতে করতেই তো সেদিন সময় শেষ হয়ে গেলো।

ঠিক আছে, সময় করে একদিন আসব'খন।

উহু, একদিন নয় , টেল মি দ্য ডেট ।

উরে বাবা , বলছি তো আসব , ঠিক আছে, সামনের শনিবার দুপুরের দিকে যদি বাড়িতে থাকো তাহলে অফিস ফেরত আসতে পারি সেদিন ।




“ It’s not when I look back at all the memories and good times we had that makes me sad, it’s when you consider those memories as nothing to you, when they ment everything to me … Some times you will never know the true value of a moment until it’s become a memory “

কী যেন কথাটা, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, স্মৃতির ঝাঁপতাল, কুশলদা সত্যি সত্যিই আপনি কিন্তু আমাকে স্মৃতির ঝাঁপতাল খুলে বসতে বললেন।

আরে না, না, ওভাবে বলো না, ইনফ্যাক্ট আমি জিজ্ঞাসা করেছি বলেই যে তোমাকে ... এটা তোমার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার, সুতরাং তুমি যদি না চাও তাহলে আমরা অন্য কিছু নিয়েও আলোচনা করতে পারি ।

এসি চলছে, হলঘরের সব দরজা জানলা তাই বন্ধ, জানলার ব্লাইন্ডগুলোও টানা, একটা আবছায়া অন্ধকার শুভ্রার হলঘরে ছেয়ে রয়েছে, সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায় শুভ্রা, জানলার ব্লাইন্ডগুলো সরিয়ে দেয়, আর অমনি স্লাইডিং গ্লাস ভেদ করে ঝলমলে আলোর একটা তোড় যেন কারোর অনুমতি না নিয়েই হুড়মুড়িয়ে হলঘরটায় ঢুকে পড়ে।

কুশলদা মনে আছে আমি আর আপনি সেদিন কাকুলিয়া রোডের সেই ক্লিনিকটায় গিয়েছিলাম , সেইদিন রাতেই সমুদ্র যখন বাড়ি ফিরলো অনেকদিন বাদে ওর মুখে সেদিন মদের গন্ধ ছিল না, শুধু তাই-ই নয়, ওর হাতে ধরা প্যাকেটটা থেকে যে সুগন্ধটা ভেসে আসছিল তাতে বেশ বুঝতে পারলাম যে খাওয়ারগুলি কোনো ভালো দোকান থেকেই প্যাক করা। আমার চোখে-মুখে লেগে থাকা বিস্ময়টাকে উপভোগ করতে করতে সমুদ্র এক সময় নিজেই রহস্যটা ভাঙ্গলো।

জানো শুভ্রা আজ কী হয়েছে?

অনেকদিন বাদে সমুদ্রকে রাতে বাড়ি ফিরে এইভাবে কথা বলতে দেখে সত্যিই সেদিন আমার খুব ভালো লাগছিল, নয়তো তখন প্রতিরাতেই সমুদ্র প্রায় বেহেড মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরত আর তারপর টলতে টলতে কোনোক্রমে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ত, খাবে কি না জিজ্ঞাসা করলে জড়ানো গলায় বেশীরভাগ দিনই উত্তর দিত যে খেয়ে এসেছে, ওর গা থেকে ভেসে আসা দেশী মদের গন্ধটা সহ্য করতে না পেরে আমি তখন ছাদে গিয়ে চুপচাপ খোলা আকাশের নিচে বসে থাকতাম আর শুনতাম ঘুমিয়ে না পড়া অবধি সমুদ্র সমানে বলে যাচ্ছে, শুভ্রা, মাই ডার্লিং, তুমি কোথায়, প্লিজ এদিকে এসো, প্লিজ তুমি আমায় আণ্ডার এস্টিমেট করো না, দেখবে, একদিন না একদিন সবাই তোমার এই সমুদ্রকে নিয়ে নাচানাচি করবে, এভরিওয়ান উইল টেল, দিস ম্যান হ্যজ আলটিমেটলি ক্রিয়েটেড দ্য হিস্ট্রি ইন মিউজিক, জাস্ট ওয়েট বেবি, ওয়েট ফর সাম মোর ডেজ। এই একই কথা প্রতিদিন বলতে বলতে তারপর এক সময় ও ঘুমিয়ে পড়ত আর আমি তখন ছাদ থেকে ঘরে এসে বালিশটা ওর মাথায় ঠিক করে দিয়ে কোনদিন দুটো খেতাম, আবার কোনদিন না খেয়েই মেঝের অন্য কোনে একটা বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়তাম। সমুদ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে তাই সেদিন কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কী হয়েছে গো?

জাস্ট গেস।

সমুদ্রর মুখে মিটিমিটি হাসি, বুঝতে পারছি যে কোনো মিউজিক কোম্পানি থেকে ওরা অফার পেয়েছে, তবু কথাটা ওর মুখ থেকেই শুনবো বলে খাওয়ারগুলি প্লেটে ঢালতে ঢালতে বললাম, ধুর বাবা, বলো না কী হয়েছে?

সমুদ্র নিজের ভিতরের উত্তেজনাটাকে আর বেশীক্ষণ চেপে রাখতে পারলো না।

আরে তোমাকে বলেছিলাম না যে বোম্বের একটা মিউজিক ডাইরেক্টরের সঙ্গে কথা চলছে , আজ উনি কোলকাতায় এসেছিলেন এন্ড হি হ্যজ ফাইনালাইজড দ্য ডিল , কথাগুলি বলতে বলতে সমুদ্র আমার কোমরটা জড়িয়ে শূন্যে তুলে ধরলো, ভাবতে পারছ শুভ্রা, আমরা এবার হিন্দি সিনেমায় গান গাইবো , সারা ভারতবর্ষের লোক আমাদের গান শুনবে, তোমায় বলেছিলাম না যে একদিন দেখবে আমি ঠিক আমার প্রতিভার দাম পাবো।

সমুদ্রর চোখমুখ জুড়ে হাজারো খুশীর ঝলকানি যেন, খেতে খেতে সমুদ্র জানালো যে ডাইরেক্টর ভদ্রলোক আজ ওদেরকে অ্যাডভানসও করে গিয়েছেন। খাওয়া শেষে প্লেটগুলি যখন ধুচ্ছি সমুদ্র তখন বললো , আরে দেখেছ, কথায় কথায় আসল কথাটাই তো তোমায় বলা হয়নি, আমাদের হাতে কিন্তু একদম সময় নেই, সামনের রবিবারই আমাদের বম্বে যেতে হবে।

বোম্বেতে! কেন?

আরে বাবা বোম্বেতে না গেলে গানের রেকর্ডিং হবে কী করে, ঝড়ের গতিতে সমুদ্র এরপর জানিয়েছিল যে আমাদের এখন ক’মাস বোম্বেতেই নাকি থাকতে হবে।

জানেন কুশলদা, সেদিন সারারাত সমুদ্র আমার চোখের সামনে একের পর এক স্বপ্নের ছবি এঁকে গিয়েছিল, ওদের গানের দলের সবাই মিলে ঠিক করেছে যে বোম্বে যাওয়ার এই সুযোগটাকে ওরা যথা সম্ভব ইউজ করবে, ওখানে গিয়ে রেকর্ডিংয়ের পাশাপাশি অন্য কাজ পাওয়ারও চেষ্টা করবে, ঘটনাগুলি এত দ্রুত ঘটে যাচ্ছিল যে সত্যিই আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে বৃহস্পতিবার আমার ক্লিনিকে যাওয়ার কথা, আর তার বদলে রবিবারের বিকেলে সমুদ্রদের দলটার সঙ্গে আমিও বোম্বে মেলে চড়ে বসলাম ।

বোম্বেতে পৌঁছনর পর প্রথম দু তিনদিন আমরা সবাই একটা মেস-বাড়িতে উঠেছিলাম, তারপর দলের বাকিরা মেস-বাড়িতে থেকে গেলেও সমুদ্র আমাকে নিয়ে গোঁড়েগাওয়ের কাছে একটা এক কামড়ার ঘর ভাড়া নেয়, নতুন করে সেখানে আবার সংসার পাতা, সমুদ্রদের রিহার্সালের তোড়জোড়, নতুন জায়গায় মানিয়ে নেওয়া, ঘর গোছানোর ব্যস্ততা, এসবের মাঝে দিন যেন তখন ঝড়ের গতিতে চলে যাচ্ছিল, তবু তারই মাঝে মনের কোথাও একটা অস্থিরতাও ছিল আমার, বুঝতে পারছিলাম না যে পেটে যে বড় হচ্ছে তার ব্যাপারে কী করব, একবার ভাবি সমুদ্রকে বলে আশেপাশের কোনো ক্লিনিকে গিয়ে অ্যাবরেশনটা করিয়েই ফেলি , আবার ভাবি সমুদ্রের জীবনে যে বাঁকটা এসেছে সেই স্রোতে হয়তো একটা রিস্ক নেওয়াও যেতে পারে, একদিন রাতে দোনোমনা করে সমুদ্রকে প্রেগন্যান্সির কথাটা বলেই ফেললাম, বলার আগে বুঝতে পারছিলাম না যে খবরটা শুনে ও কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে, আসলে তখন ওরা বোম্বের মাটিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করানোর জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে , মনে মনে ঠিকই করে রেখেছিলাম যে খবরটা শুনে সমুদ্র যদি অন্যভাবে রিঅ্যাক্ট করে তাহলে অ্যাবরেশনটা করিয়েই ফেলব।

সমুদ্র কিন্তু খবরটা শুনে ভীষণ আনন্দ পেয়েছিল , উত্তেজনায় এমন করছিল যে আমার মনে হচ্ছিল ও নিজেই একটা বাচ্চা ছেলে, কুশলদা, আই উইল নেভার ফরগেটে দ্যট পিরিয়ড অফ মাই লাইফ , এক একটা করে দিন যাচ্ছিল আর যত সময় এগিয়ে আসছিল দুজনাই আমরা যেন অধীর হয়ে উঠছিলাম আমাদের প্রথম সন্তানের মুখ দেখবার জন্য, সমুদ্রকে দেখে তখন আমার খুব ভালো লাগত, কোলকাতায় থাকাকালীন ওর চোখেমুখে যে একটা বিষাদের ছায়া ক্রমশ ছাপ ফেলছিল সেটা মুছে গিয়ে আবার যেন ও বিয়ের আগের সেই দিনগুলিতে ফিরে এসেছিল, প্রতিদিন তখন বেলা বারোটা নাগাদ ও কাজে বেরিয়ে যেত, ফিরতে ফিরতে সেই মাঝ রাত, সারাটা দিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি অপেক্ষা করতাম কখন সমুদ্র বাড়ি ফিরে আসবে, বাড়ি ফিরে ঘুমনোর আগে ও আমায় জানাত যে সারাদিন কী কী হয়েছে, বিকেলে তিনটে থেকে তখন ওদের রিহার্সাল শুরু হতো, কয়েকদিন রিহার্সাল দেওয়ার পর একদিন সমুদ্র জানালো যে ডাইরেক্টর ভদ্রলোক নাকি ওদের দিয়ে হিন্দি সিনেমার গানে একটা নতুন কনসেপ্ট ইন্ট্রডিউস করাতে চাইছেন, সিনেমার দৃশ্যে ওদের গাওয়া গানগুলি যখন দেখানো হবে তখন অ্যাকচুয়াল সিনটার সঙ্গে পর্দার এক পাশে সমুদ্রদেরও গান গাইতে দেখা যাবে।

এর মধ্যে বোরিভেলির একটা বার থেকে ওদেরকে প্রতিদিন রাত আটটা থেকে চার ঘণ্টা করে গান গাওয়ার অফার করলো, কাজটা অবশ্য ঐ মিউজিক ডাইরেক্টরই যোগার করে দিয়েছিলেন। দেখবেন কুশলদা, জীবনে ব্যর্থতা বা সাফল্য যা-ই আসুক না কেন তা যেন সব সময় একটা ঢাল-পথ বেয়েই আসে, আমাদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি, মাস তিনেকের মধ্যে তাই সিনেমার মিউজিক রিলিজ করলে দেখলাম ক'দিনের মধ্যেই ওদের গাওয়া গানগুলি সব সুপারহিট, দুটো মিডিয়াম বাজেটের সিনেমার প্রযোজক সঙ্গে সঙ্গেই কোনো সুপারিশ ছাড়াই ওদেরকে দিয়ে ওনার আগামী ছবির বেশ ক'টা গানের জন্য কন্ট্রাক্ট করে নিলেন, একটা বড় হোটেল থেকেও ওদেরকে বললো যে শনি রবিবার করে লাঞ্চের সময় সমুদ্রদের দিয়ে গান গাওয়াতে ওরা আগ্রহী।

আর এসবের মাঝেই একদিন আমরা আমাদের সেই এক কামড়ার ঘুপচি ঘরটা ছেড়ে এসে উঠলাম মালাদের দেড় কামড়ার একটা বাড়িতে, আর সেখানেই কিছুদিন পর জন্ম হলো আমার উজানের।

না কুশলদা, এর পরের পাঁচ বছরে আমার গল্পে সেরকম কোনো টুইস্ট নেই, জীবন তখন যেন একদম মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলছিল , মনে হচ্ছিল, এবার একবার কোলকাতায় যাই, আর কোলকাতায় গিয়ে সেই সব মানুষগুলিকে ডেকে বলি যারা বলেছিল যে সমুদ্রকে বিয়ে করাটা আমার জীবনের মস্ত বড় ভুল, দেখো, আই ডিডন্ট ডু এনি মিস্টেক।

মিডিয়াম বা লো বাজেটের সিনেমায় গান গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরা তখন বিভিন্ন লাইভ প্রোগ্রামেও গান গাইতে শুরু করলো, ঐ প্রোগ্রামগুলোতে বিভিন্ন হিট হিন্দি গানকে নিজেদের মত করে ভেঙ্গে ওরা তাতে বিটস বা পাঞ্চ মিশিয়ে ফিউশন ধর্মী গানের একটা নতুন চল সৃষ্টি করলো আর এই ফিউশন ধর্মী গানের স্টাইলটা বেশ জনপ্রিয়ও হয়ে উঠলো , আর এরকমই একটা প্রোগ্রামে ওদের দলটার সঙ্গে আলাপ হলো অর্চনা মিত্রর , জন্ম সূত্রে বাঙ্গালি তবে ছোটবেলা থেকেই বোম্বেতে বড় হয়ে ওঠা, বড়লোকের অত্যাধুনিক যুবতী কন্যা বলতে যা বোঝায় অনেকটা সেরকম, বাড়ির শাসন ফাসনের সেরকম তোয়াক্কা করে না, সমুদ্রদের দলটার সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে আড্ডা মারে, সিগারেটে টান দেয় , এক সঙ্গে মদের গ্লাসেও চুমুক দেয়, মেয়ে বলে আচার আচরণে কোনো রকম অস্বস্তি নেই, হাসতে হাসতে বা কথায় কথায় সমুদ্রদের গায়ে এমন ভাবে গড়িয়ে পড়ে যে ছেলে-ছেলেতে বা মেয়ে-মেয়েতে যেন আড্ডা হচ্ছে, প্রথমদিকে দলটার সবার সঙ্গে অর্চনার সমান বন্ধুত্ব থাকলেও ধীরে ধীরে সমুদ্রতেই যেন মেয়েটা ভেসে যেতে চাইল, না কুশলদা, পারলাম না সমুদ্রকে সেই আমন্ত্রণ থেকে সরিয়ে রাখতে, এদিক ওদিক থেকে ওদের একান্ত মেলামেশার কথা ভেসে আসতে শুরু করলো, মনকে সান্ত্বনা দিতাম , নিজেকে বোঝাতাম যে এটা একটা সাময়িক মোহ, সময়ে সব কিছু ঠিক করে দেবে, আমাকে বা উজানকে ছেড়ে সমুদ্র কোথায় আর যাবে, কিন্তু ভুল কুশলদা, আই ওয়াজ অ্যাবসোটলি রং, সময় কিছুই ঠিক করলো না, ক্রমশ সমুদ্রর বাইরে রাত কাটানোটা বাড়তে লাগলো, জিজ্ঞাসা করলে নানা অজুহাত দিত, ধীরে ধীরে আমিও সমুদ্রর মিথ্যে কথা বলার ধরনগুলির সঙ্গে বেশ পরিচিত হয়ে গেলাম, তখন বুঝতে অসুবিধা হতো না যে কোনটা ও সত্যি কথা বলছে আর কোনটা মিথ্যে।

শুভ্রার সেলফোনটা বাজছে, জানলার কাছ থেকে সরে এসে ও সেন্টার টেবিলের ওপরে পড়ে থাকা ফোনটা কানে ধরলো , টেলি মার্কেটিং কল, কলটা ডিস-কানেক্ট করে সোফায় এসে ও এবার আমার মুখোমুখি বসলো।

তারপর?

তারপর আর কী, বাকিটা ঐ বহুবার শোনা গল্পের রেপ্লিকেশন যেন, রোজ-রোজকার অশান্তি , ঝগড়া, মান-অভিমান, আমাদের দুজনার মধ্যের আড়ালগুলি ক্রমশই যেন সব সরে যাচ্ছিল, ফাইনালি সমুদ্র একদিন জানালো যে ওর পক্ষে আর আমার সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়, হি ইজ লিভিং , শুভ্রার চোখ টেবিলের দিকে , জানেন কুশলদা, মনের মধ্যে সেদিন একটা জেদ জন্মেছিল, তাই সমুদ্র দিতে চাইলেও ওর থেকে খোরপোষের টাকা নিতে রাজী হলাম না, সম্পর্কহীন ভিক্ষা নিতে আসলে মন চাইছিল না , বেঁচে থাকার জন্য তাই এবার শুরু হলো এক নতুন সংগ্রাম, কেউ হয়তো আপনারা বিশ্বাস করবেন না যে সেদিনের সেই অবস্থা থেকে আজকের এই স্বাচ্ছন্দ্যে আসতে আই হ্যড টু ডু লট অফ স্ট্রাগল , উজানকে বড় করে তুলতে জীবনের ঐ পর্বে আমি মনে হয় কোনো কিছুতেই আরাজি ছিলাম না, সেলসের চাকরি, বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রোডাক্ট প্রমোশন , ডিপারমেন্টাল স্টোরের ম্যানেজারি , আই হ্যভ ডান অল এন্ড এভরিথিং , কোনো ভদ্র কাজই তখন আমার কাছে ব্রাত্য ছিল না , সমুদ্রর ওপর যে অভিমানটা মনে বাসা বেঁধেছিল কখন জানি তা বদলে গিয়েছিল উজানকে বড় করে তোলার নেশায় । এসবের মধ্যেই একদিন মালাডের কাছে একটা স্কুলে টিচারির চাকরী পেয়ে গেলাম, বাচ্চাদের প্রাইমারী স্কুল , আর ওখানে পড়াতে পড়াতেই স্কুলের ম্যানেজমেন্ট আমাকে পুনে যাওয়ার প্রস্তাবটা দিলো, পুনেতে তখন ওনারা একটা গার্লস স্কুল খুলছিলেন, আমাকে বললেন আমি যদি পুনেতে যাই তাহলে উঁচু ক্লাসে পড়ানোর সুযোগ পাব আর তার সঙ্গে স্যালারিও বেড়ে যাবে , চলে গেলাম পুনে , পয়সাটা তো একটা ফ্যাক্টর ছিলই তবে তার থেকেও যেটা বেশী ছিল তা হচ্ছে আমার তখন আর বোম্বেতে থাকতে মন চাইছিল না, মা আর ছেলে আমরা তাই পুনেতে চলে এলাম, উজানকে ভর্তি করে দিলাম পুনের সব চেয়ে নামকরা স্কুলগুলির একটাতে, মনকে বোঝালাম, দরকার হলে নিজের জীবনের সব স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেব কিন্তু উজান হ্যজ টু শাইন ইন হিজ লাইফ, বেশ কিছু বছর পুনেতে থাকার পর একটা কনসালটেন্টের থ্রু-তে এখন যে স্কুলে পড়াই তাদের কাছ থেকে অফার পেলাম, এই স্কুলটা একটা বড় শিল্পগোষ্ঠীর, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এদের চেইন অফ স্কুল রয়েছে , ইনটারভিউতে এরা এত ভালো মাইনে অফার করলো যে মাথা ঘুরে গেলো, তবু পুনে ছাড়তে হবে ভেবে দ্বিধা ছিল একটা, কিন্তু ছেলে বললো, মা, বেশী ভেবো না , ইউ শুড গো ফর ইট, ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, বেশী পয়সার দরকার নেই, তার চেয়ে আমরা মা-ছেলে বরঞ্চ একসঙ্গেই থাকি, উজান কিন্তু শুনলো না, আমাকে বোঝালো যে পয়সাটা বড় কথা নয়, ভেবে দেখো একবার, এখানে জয়েন করলে তুমি আমাদের দেশের ওয়ান অফ দ্য বিগেস্ট কর্পোরেটের পার্ট হয়ে যাবে।

আমাকে ওরা মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, কানপুর আর কোলকাতার অপশন দিয়েছিল, অনেক ভেবে শেষ অবধি কোলকাতাতেই লোকেশন নিলাম। উজানের মাধ্যমিকের পর ওকে বলেছিলাম, আয়, কোলকাতায় চলে আয়, ইলেভেনে এখানেই ভর্তি হয়ে যা, কিন্তু ছেলে বললো, থাক মা, ইলেভেন টুয়েলভটা বরঞ্চ পুনেতেই পড়ি, আমিও ভাবলাম সেটাই ভালো , এমনিতেই হায়ার সেকেন্ডারিতে পড়ার চাপ অনেক বেশী, তারপর কোলকাতায় এসে প্রথম প্রথম যে কালচারাল শকটা লাগবে সেটা ওর পক্ষে সামলে নেওয়াটা একটু মুশকিল হয়ে যাবে।

উজানের খোঁজ খবর নিত না সমুদ্র?

যতদিন মুম্বাইতে ছিলাম মাঝে মাঝে স্কুলে ছুটির সময় স্কুলে এসে উজানের সঙ্গে দেখা করে যেত।

তোমার সঙ্গে সমুদ্রের আর কোনো যোগাযোগ আই মিন ...

না , বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর ওর সঙ্গে আর আমার সেরকম যোগাযোগ হয়নি, সেপারেশনের বছর দুয়েকের মাথায় ডিভোর্স চেয়ে সমুদ্র কোর্টে অ্যাপিল করেছিল, তখনই কোর্টেই যা দু-একবার দেখা হয়েছে, পুনেতে থাকাকালীন বেশ কয়েক বছর আগে ওদের দলের একটা ছেলের সঙ্গে একবার রাস্তায় দেখা হয়েছিল, ওর কাছেই শুনলাম অর্চনার সঙ্গেও নাকি সমুদ্রর সেপারেশন হয়ে গিয়েছে , তবে এবার আর ওর ইচ্ছেয় সেপারেশনটা হয়নি, অর্চনাই ওকে ছেড়ে চলে গিয়েছে, মেয়েটি নাকি সমুদ্রকে ছেড়ে উঠতি একজন সাইড হিরোর সঙ্গে লিভ ইন রিলেশনে জড়িয়ে পড়েছিল, আর সমুদ্রও কিছুদিন দেবদাস হয়ে থাকার পর ওর থেকে বয়সে অনেক বড় একজন হোটেল সিঙ্গারের সঙ্গে থাকতে শুরু করেছে।



আলো জ্বলেনি, বারণ না মানা চাঁদ তবু জানলা জুড়ে, ঝুঁকে পড়ি আমি লেখার টেবিলে... কবে উঠেছিল এই ঘূর্ণিঝড়, কবে থেকে আমাদের ঘিরে পরস্পর উন্মাদ হয়েছিল ঝরাপাতা বা কাগজের সব টুকরো, আর বিচূর্ণ আলোর মত সেদিন তুমি ছড়িয়ে পড়েছিলে সৌখিন কোনো মেঘের পরতে পরতে...

জানো, আমার সব অবৈধতার জন্ম কিন্তু সেদিন থেকেই, উন্মাদ লিপ্সায় সেদিন থেকেই আমি দৌড়চ্ছি, আমার প্রতিটি শিরায় আর ধমনীতে এখন বইছে অন্ধ অতীত, অহর্নিশ তারা খুঁজে বেড়াচ্ছে শহরের ব্যস্ত জনপথে তোমায়, খুঁজে চলেছে চলন্ত বাসে, পরিত্যক্ত গির্জায়, ঝিমিয়ে পড়া অফিস-বাড়িতে অথবা হাইরাইজের ফাঁকে...

আর তারপর প্রতি সন্ধ্যায় নিয়ম মেনে আমাকে বলছে লেখার পাতায় এসে বসতে, পরিচিত সকলের নজর এড়িয়ে তখন আমি অবগাহন করি অগণন শব্দের মাঝে, ডুবতে ডুবতে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, মুখের দু'কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে সাদা ফেনা, জলজ শিকড়রা বারবার তখন পেঁচিয়ে ধরে আমার কণ্ঠনালী ... আর তারপর বাঁচবার জন্য, শুধু বেঁচে থাকবার জন্য প্রতিদিন আমি নতুন করে লিখি আমার রূপকথা আবার ...

আর এসব অবৈধতার মাঝে তুমি এসে দাঁড়াও এক নিষ্পাপ বালিকা হয়ে...



কালোমেয়ে, আমি যখন শুভ্রার সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখন আমার কানের কাছে তুমি কী বলছিলে?

এখন আর সে কথা শুনে কী হবে?

আহা, রাগ করছ কেন, বলো না, কী বলছিলে ।

বলছিলাম শুভ্রা যখন ওর জীবনের কথাগুলি বলছিল তখন পাথরের মত অমন চুপচাপ বসে না থেকে ওর হাতটাও তো একটু ধরতে পারতে।

তুমি না, একটা যাচ্ছেতাই!

আমাকে যাচ্ছেতাই বলে কী হবে, নিজের বুকে হাত রেখে বলো তো, মেয়েটা যেতে বলেছিল বলেই কি তুমি আজ ওর বাড়িতে গিয়েছিলে, এই ক’দিনে তুমি মনে মনে শুভ্রার কথা ভাবনি?



“দমকা হাওয়ায় পুড়িয়ে দিচ্ছে আগুনে জন্মানো একটা প্রেম ...

যে প্রেমে স্পষ্ট দেখা যেত একটা হাত ধরে আছে

আর একটা হাত ...... “


না কালোমেয়ে তুমি আমায় ভুল বুঝছ , শুভ্রা নয়, আসলে আমি যাকে ভালবাসি, যাকে চাই, সে তো এক অন্য মেয়ে, আজও আমি তার মুখ দেখিনি, শুধু তার বাড়ানো আঙ্গুলগুলি কখনো কখনো আমায় যেন ছুঁয়ে যায়, কিন্তু তখন আমাদের মাঝে থাকে অস্পষ্ট একটা কুয়াশা, কুয়াশার সেই আবরণ কিছুতেই আমি যেন ভেদ করতে পারি না, হারিয়ে যায় তাই সেই মেয়ে বারবার … হারিয়ে যায় ঘন কুয়াশার আড়ালে … আর ঠিক তখনই তুমি এসে আমায় ডাকতে থাকো …

তুমি আমায় ডাকতে থাকো কালোমেয়ে …


এই সব ছবি একদিন একান্তই ছিল আমার রোজকার অনিশ্চিত যাপন ... চরিতার্থহীন বেলা শেষে অনুযোগহীন কিছু শব্দ নিয়ে তাই প্রতিদিন এসে বসি...

বসি সত্যিকারের এক প্রেমের কবিতা কোনো একদিন লেখা হবে, সেই প্রতীক্ষায়...




ক্রমশ