শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২০

কথাগুলো বলা হলো না, পর্ব -১২

১২

“কেমন সহজে আমি ফোটালাম এক লক্ষ ফুল

হঠাৎ দিলাম জ্বেলে কয়েকটা সূর্য চাঁদ তারা

আবার খেয়াল হলে এক ফুঁয়ে নেবালাম সেই জ্যোৎস্না

নেবালাম সেই রোদ

নিন্দুকে নানান কথা আমাকে দেখিয়ে বলবে , বিশ্বাসকরো না

হয়তো বলবে শিশুকিংবানির্বোধ

অথবা ম্যাজিকওয়ালা

ছেঁড়া তাঁবু , ফাটা বাজনা , নানান সেলাই করা

কালো কোর্তা গায়ে লোকটা কী মারণ খেলা

খেলাচ্ছে আহারে ঐ মেয়েটার চোখে

আমাকে ম্যজিকওয়ালা বললে (তবু) তুমি বিশ্বাস করো না”

না আমিম্যজিকওয়ালা নই,ম্যজিকওয়ালারা কখনো নিজেরা হারায় না , তারা সবার চোখেরসামনে থেকে বরঞ্চ অন্যকে অদৃশ্য করে দেয় , মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে জাদুকর হাতে ধরা জাদুদন্ড নাড়তে নাড়তে বলে ওঠেন, গিলি গিলি ফুস্ ফুস্ বাছু মন্তর্ ,আর চোখের নিমেষে সামনের মানুষটি যেন অদৃশ্য হয়ে যায়, অন্যকে অদৃশ্য করবো কী, আমি তো নিজেই মাঝে মাঝে হারিয়ে যাই। এইসংসার , পরিচিত মানুষ, তাদের কোলাহল , ব্যস্ততা, এসবের থেকে আমি তখন অনেক দূরের একটা দেশে চলে যাই, যেখানে এক অদৃশ্য গ্রান্ডফাদার ক্লক যেন টিক টিক করে আমাকে স্বাগত জানায় আর সময়কে সে ধরে রাখে, তাই সেখানে কোনো জন্ম হয় না , কোনো মৃত্যু হয় না , সে এক আজব দেশ --

“মরণ মরিতে চায় , মরিছে না তবু , চিরদিন মৃত্যুরূপে রয়েছে বাঁচিয়া “,

অথবা মন যেন নিজের অজান্তেই তখন গেয়ে ওঠে

“কেন হারাবার লাগি এতখানি পাওয়া, জানি না, এ আজিকার মুছেফেলা ছবি আবার নতুন রঙে আঁকিবে কি তুমি ?”

ছবি কি কখনো সত্যিই মুছে ফেলা যায় বা তাকে কি নতুন করে আঁকা যায় ? হয়তো না, হয়তো হ্যাঁ, কিন্তু এটা সত্যি যে সময় অসময়ের স্মৃতি কিন্তু বারবার ফিরে আসে, সে যেন লুকোচুরি খেলে আমাদের সঙ্গে, আর সেই লুকোচুরির খেলায় নিজেকে লুকোতে শেষ অবধি আমি হারিয়ে যাই, কেউ খুঁজে পায় না তখন আমায়,আর খুঁজে না পেয়ে তারা যখন অন্য পথে ভুল করে চলে যায় তখন আমি রাস্তার বাঁকে এসে দাঁড়াই,শেষবারের মতন একবার যেন পিছন ফিরে দেখতে চাই,দেখে নিতে চাই অন্ধঅতীত অথবা ধূসর স্মৃতিকথা যা আমার জন্য পড়ে রয়েছে, পড়ে রয়েছে কত পাওয়া না পাওয়া অথবা মেলা বা না মেলার হিসেব, আর সেই হিসেব মেলানোর আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় গিয়ে পৌঁছই মাঠের ঠিক মাঝখানটায় , সূর্যকে আড়াল করে সেখানে তখন এক টুকরো মেঘ যেন ছায়াপথ এঁকে রাখে আর সেই ছায়াপথ ধরে শেষমেশ গিয়ে পৌঁছই মাঠের শেষে আমার সেই ছোট্ট কুঁড়েঘরটায় --

"আমার বাড়িতে আসবে, দেখবে সে কীআজব বাড়ি ?

মাথার ওপরে ছাদ, চেয়ে দেখো , চারিদিকে দেয়াল রাখিনি

আমার বাড়িতে দেখো অনুগত ভৃত্যের মতন

নানান জাতের হাওয়া ঘুরছে ফিরছে , ঝুল ঝাড়ছে জাতের কার্নিশে

নানান রঙের টান দিয়ে দেখছেব্যস্ত দিনরাত"


আর সেই কুঁড়েঘরের দাওয়ায় আমি যখন জিরতে থাকি তখন মেঘের মুখে আমার আসার খবর পেয়ে দৌড়ে দৌড়ে আসে আমার কালোমেয়ে , আমার হাতে জলের ঘটি এগিয়ে দিয়ে বলে , আহা রে,বড্ড ঘেমে গিয়েছ , বাইরে বড় রোদ্দুরের তাপ, তাই না?

অপলক চোখে চেয়ে থাকি কালোমেয়ের মুখের দিকে, আমাকে ওভাবে চেয়ে থাকতে দেখে সে এক সময় বলে ওঠে,কী দেখছ অমন করে , কালোমেয়ের কথার উত্তর না দিয়ে আমি তখন ওর মুখে লেগে থাকা হাসিটা আমার চোখের মণিতে যেন ভরে নেই, আর তারপর ওর কাজল কালো চোখের দীঘিতে যখন নাইতে থাকি তখন ও আমায় তাড়া দেয়,কই গো, হাত-মুখধুয়ে এসো, আমি যে ভাত বেড়ে বসে আছি!

আর আমি তখন--


" ... ছবি আঁকছি দেয়াল-বিহীন ঘরে মেয়েটির চোখে"


"জানি এই মুহূর্তে ধীরে ধীরে তুমি খুলে দিচ্ছ তোমার জানলার কপাটদুটো, চাঁদ নেই আকাশে, খুব সাবধানে আগলে রেখেছ হাওয়া বা কেঁপে কেঁপে ওঠা মোমবাতির আলো, আমিও এই মুহূর্তে শরীর থেকে নিজেকে বার করে দাঁড়িয়েছি রাতের উঠোনে, একলাই, চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে কোলোকল ঘণ্টা, পুরনো ক্যাথিড্রাল, বিরাট কালো ঘড়ি, অজস্র পাখির মৃতদেহ, ভাঙা মাস্তুল, অবয়বহীন মানুষ, শুকনো কাঠ, মোম-পালিশ দড়ি আর--

'মৃত মর্যাদায় দাঁড়িয়ে থাকা একলা আগুন পাহাড়

পাহাড়ের মাথায় গোল হয়ে ঘিরে অপেক্ষা করছে সময়েরা যদি তোমার হাত মৃত ঘণ্টার নীচে পৌঁছয় কখনো...

কিন্তু সব বাস চলে গিয়ে ফাঁকা এখন রাজপথ

বিশ্বাস করো, প্রতি রাতে চেষ্টা করি আমি এত শব পার না হওয়ার ...

মৃতদের ঘুম ভাঙিয়ে তোমার অভিমান না ছোঁয়ার ..."


আচমকাঘুমটা ভেঙ্গে যায় , বাসটা মনে হয় অনেকক্ষণ ধরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, আজ সকালে অফিসের কাজে গড়িয়ার দিকে এসেছিলাম, কাজ সেরে দুপুরবেলায় অফিস ফেরার বাস ধরব বলে বাস ডিপোতে এসে দেখি ডিপোর গা ঘেঁষা যে পাইস হোটেলটা আছে সেখান থেকে গরম ভাতের ধোঁয়া উঠছে, লাঞ্চটা ওখানেই সেরে ফেলি, সরষে বাটা দিয়ে পার্শে মাছটা এত ভালো রেঁধেছিল যে ভাতটাএকটু বেশীই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল আর ভাত খাওয়ার পর ফাঁকা মিনিবাসে জানলার পাশে সিট পেয়ে ঘুম আসতে তাই আর দেরী হয়নি, ঢাকুরিয়া ব্রিজের ওপর পঞ্চাননতলার মুখে বাসটা নাকি প্রায় আধ ঘণ্টার মত দাঁড়িয়ে আছে, জানলা দিয়ে চোখ মেলি, যতদূর দৃষ্টি চলে ততদূর গাড়ির লাইন, এর মধ্যে কন্ডাকটর ছেলেটা কোথা থেকে যেন ঘুরে এসে ড্রাইভারকে বললো ,পার্টনার, কেস কিন্তুএকদম গুবলেট, শুনলাম গড়িয়াহাটা অবধি টানা জ্যাম।

আমার পাশের সিটে বসা বছর পঞ্চাশ পঞ্চান্নর গম্ভীর মুখের ভদ্রলোক আমাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে বলে উঠলেন, কী হয়েছে বলুন তো, কতক্ষণ আর এরকম বাসের মধ্যে একই জায়গায় বসে থাকতে হবে, প্রায় মুখ ফসকে বেরিয়ে এসেছিল, আমাকে দেখে কি আপনার মহাভারতের সঞ্জয় বলে মনে হচ্ছে যে এখানে বসেই আমি বলে দেব আগে কোথায় কী হয়েছে, নিজেকে সামলে ভদ্রলোককে বললাম,কিছু একটা নিশ্চয়ই হয়েছে , না হলে এই দুপুরবেলায় এরকম জ্যাম হবে কেন । আমার উত্তরে ভদ্রলোক খুব একটা সন্তুষ্ট হলেন না, বিড়বিড় করে নিজেকেই যেন শুনিয়ে বলতে থাকলেন, ডিসগাস্টিং, এই জন্যই এই শহরটার কিচ্ছুহয় না। আমাদের প্যারালাল সিটের বাঁদিকে বসে থাকা ভদ্রলোক এই ভদ্রলোকের কথায় টাইমপাসের সাবজেক্ট যেন খুঁজে পেলেন, যা বলেছেন মশাই, এটা একটা শহর !রাস্তায় বেরবেন , এক পা-ওএগোতেপারবেন না,সকাল সন্ধ্যা সব সময়ই খালি জ্যাম , দশ মিনিটের পথ যেতে দু’ঘণ্টা লেগে যাবে দেখবেন ! আশেপাশের প্যাসেঞ্জাররাও ধীরে ধীরে এবার আলোচনায় অংশ নিতে থাকলেন, আমাদের ঠিক পিছনের সিটে অল্প বয়সের যে ছেলে দুটো বসেছিল তাদের মধ্যে একজন ফিচলে মিকরে বলে উঠলো, তা ছোটখাটো ডিস্টেন্সগুলো তো দাদা হেঁটেই মেরে দিতে পারেন , তাতে জ্যামেও ফাঁসবেন না আর ভুঁড়ি-ফুঁড়িগুলিও দেখবেন অনেক কন্ট্রোলে থাকবে । যাকে উদ্দেশ্য করে বলা তিনি ওনার নেয়াপাতি ভুঁড়িটায় একবার হাত বুলিয়ে বলে উঠলেন, আরে ভাইহেঁটে যে যাব , তারও কি উপায় আছে, শহরের ফুটপাথ জুড়ে তো শুধু হকার আর হকার , কার বাবার সাধ্য আছে যে ফুটপাথ ধরে হাঁটবে!

তা যা বলেছেন, ডিসগাস্টিং বাবু মানে আমার পাশে বসা ভদ্রলোকটি গলায় একটা খাঁকারি দিয়ে হকারির কথাটা যেন লুফে নিলেন, কোলকাতার হকার, বাপরে বাপ ! সাংঘাতিক ব্যাপার, সত্যি কথা বলতে কী দিস ইজ অ্যানাদার ডিসগাস্টিং থিং অফ দিস সিটি, জাস্ট ভাবুন, একটা সো কলড মহানগরীর সমস্ত ফুটপাথ কি না দখল করে বসে আছে হাজার হাজার হকার ! ক্যান ইউ ইমাজিন!

প্যারালাল সিটের ভুঁড়িবাবু ডিসগাসটিংবাবুর কথায় একটু জ্বালানি ঢাললেন, যা বলেছেন ! একদম সত্যি কথা,বাজার, স্টেশন, হাসপাতাল , যেখানেই যান না কেন সেখানেই দেখবেন হকার যেন একদম থিকথিক করছে!

শুনুন তাহলে, প্যারালাল সিটের দ্বিতীয় ভদ্রলোকও এবার তেড়েফুঁড়ে আলোচনায় নিজেকে ঢুকিয়েনিলেন , সেদিন সন্ধ্যায় একটু হাঁটব বলে লেকে গিয়েছিলাম, গিয়ে দেখি হকারগুলো জোড়ায় জোড়ায় বসে থাকা কাঁপলগুলিকেও ছাড় দিচ্ছে না,তাদের ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে সমানে ইরিটেট করে যাচ্ছে, দিস ইজ রিয়েলিটু মাচ ! পথের এইসাময়িক স্থবিরতা বাসের সবাইকে যেন হঠাৎ করে একটা ফাঁকা ক্লাসঘর উপহার দিয়েছে , বাস ভর্তি লোক তাই আড্ডায় মসগুল এখন, কথার শাটলকক মুহূর্তে এধার থেকে ওধারে যেন ছুটে চলছে,একদম সামনের দিকের সিটে বসে থাকা মাঝবয়সী ভদ্রলোক নিজেকে আর আলোচনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারলেন না, ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, মাঝে তো আবার কিছুদিন এই সব হকার-ফকার উচ্ছেদ নিয়ে খুব তর্জন গর্জন হলো, কিন্তু দু’দিন যেতে না যেতেই সব আবার যেমন কী তেমন। বুঝি না বাপু এরা যে কী করে!

আমার সামনের সিটে পাজামা পাঞ্জাবি পরিহিত এক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক গম্ভীর ভাবে এতক্ষণ সবার কথা শুনছিলেন, ভদ্রলোক এবার নিজেও আলোচনায় অংশ নিলেন, এক একজন মানুষ থাকে যাদের চোখমুখ দেখলেই মনে হয় সুবক্তা, ইনি হচ্ছেন গিয়ে সেই ক্যাটাগরির মানুষ, এক মিনিট, কথাটা আপনি কিন্তু ভুল বললেন,সরকার যে মুভমেন্টটা নিয়েছিলসেটা মোটেও হকার উচ্ছেদ নয়, ওদেরকে বলা হয়েছিল যে ফুটপাথ ছেড়ে সরকারের দেওয়া নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে যেন জিনিসপত্র বিক্রি করেন, তাতে যেমন ফুটপাথগুলি খালি হয়ে পথচারীদের পথ চলাচল অনেক সহজ হবে তেমনি একটা নির্দিষ্ট চৌহুদ্দিতে হকারদের বিকিকিনিও সেন্ট্রালাইজড এবং অর্গানাইজড হয়ে উঠবে।

আরে রাখুন মশাই, এসব কথা না ঐ ভাষণেই শুনতে ভালো লাগে, বাস্তবতার নিরিখে যদি দেখেন তাহলে বুঝবেন এসব হচ্ছে গিয়ে আসলে এক একটা মুর্খামি,গেটের ঠিকপরের সিটে বসে থাকা মাঝবয়সী ভদ্রলোক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলে উঠলেন ।

কীসের মুর্খামি মশাই, দাড়িওয়ালার মনে হয় সরকার বিরোধী আলোচনা ভালো লাগে না।

মুর্খামি নয়! আপনি জানেন হকারি জোন বলে যে জায়গাগুলি চিহ্নিতকরা হয়েছে সেগুলি আসলে কোথায় ! জাস্ট একবার ভাবুন, একটা হকার যে কি না বছরের পর বছর ধরে গড়িয়াহাট, হাতিবাগান বা নিউমার্কেটের রাস্তায় জিনিস বেঁচে আসছে তাকে কি না হঠাৎ করে বলা হলো যে ভাই তুমি কাল থেকে শহরের প্রান্তে ঐ ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুরে আমরা যেখানে একটা মাঠ ঠিক করেছি সেখানে গিয়ে জিনিসপত্র বেচবে, বাস্তবতা দিয়ে জিনিসটাকে ভাবুন একবার, দেখবেন তখন নিজেই বুঝতে পারছেন যে সিদ্ধান্তটা কত ভুল !

উল্টোদিকের সিটে বসা সহযাত্রীর সমর্থনও পেয়ে গেলেন ভদ্রলোক , তবে সহযাত্রীটি সূক্ষ্ম ভাবে আলোচনার বিষয়টা এবার বর্তমান সরকারের বুদ্ধি বিবেচনার মাপকাঠির দিকে নিয়ে গেলেন, ওনার কথা শুনে মনে হলো যে ভদ্রলোক লাল বিরোধী, কী বলবো মশাই, আমাদের এমনই একটা সরকার যে যা ডিসিশনই নেয় সেটাই শেষ অবধি ভুল বলে প্রমাণিতহয়, রিয়েলি প্যাথেটিক! ভদ্রলোকের কথা শুনে আমার পিছনে বসে থাকা ফচকে ছেলেদুটোর একজন ছোট্ট করে তাতে একটা ফুট কাটলো,'ভুল' বলবেন না দাদা, বলুন 'ঐতিহাসিকভুল'।

গাড়িগুলি একসঙ্গে অনেকক্ষণ ধরেএক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তাই বাসের ভিতর যেন এখন একটু সাফোকেশন হচ্ছে, এক্সকিউজ মি বলে ডিসগাস্টিংবাবুকে একটু জায়গা করে দিতে বলি, বাস থেকে নেমে ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে একটা সিগারেটধরাই, না, গতিক সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না, উলটোদিক দিয়েও গাড়িঘোড়া আসছে না, একটা অল্প বয়স্ক ছেলেকে উলটো দিক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আসতে দেখে তাকে জিজ্ঞাসা করি , ভাই, আগে কোথাও কি মিটিং ফিটিং হচ্ছে নাকি?

না দাদা, মিটিংনয়, গড়িয়াহাটের মোড়ে অটোওয়ালারা রাস্তা আটকে অবরোধে নেমেছে ।

কীসের অবরোধ ভাই ?

তা জানি না, ঘাড় শ্রাঘ করে ছেলেটা আবার হাঁটতে শুরু করলো , সিগারেটে শেষ টান দিয়ে আমিও এবার গুটিসুটি গড়িয়াহাটের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, এভাবে এখানে জ্যাম কবে ছাড়বে তার অপেক্ষায় থেকে কোনো লাভ নেই , এই সব অটো-ফটোর ইউনিয়নগুলি খুব শক্তিশালী হয়, সাধারণ ট্রাফিক পুলিশের কম্ম নয় যে ওদেরকে হটাবে, তিনটে দশ, যাই, গড়িয়াহাটের মোড়ে গেলে অবস্থাটা বোঝা যাবে, সেরকম হলে আজ আর অফিসেফিরব না , গড়িয়াহাটের মোড় থেকে অটো পেলে ভালো নইলে রাসবিহারী অবধি হেঁটেই মেরে দেব, রাসবিহারী থেকে আমাদের ওদিকে যাওয়ার প্রচুর বাস আছে। অনেককেই দেখলাম আমার মতন হাঁটতে শুরু করেছেন , অচেনা মানুষের একটা স্রোত এখন যেন ঢাকুরিয়া ব্রিজের ঢাল বেয়ে গোলপার্কের দিকে চলতে শুরু করেছে, আমার আগে আগে যে ভদ্রলোক হাঁটছেন তার হাতে একটা মোবাইল ফোন,রাস্তার দুর্গতির কথা কাউকে জানাচ্ছেন ফোনে, খুব অল্পসময়েই এই মোবাইল ফোন ব্যাপারটা কিন্তু আমাদের জীবনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো , আজকাল রাস্তাঘাটে সবার হাতেই প্রায় এইযন্ত্রটা দেখতে পাওয়া যায়,ঝিনুক সেদিন স্কুল থেকে ফিরে বলছিল যে ওদের ক্লাসের একটা মেয়ের জন্মদিনে তার বাবা নাকি তাকে মোবাইল ফোন গিফট করেছেন, আমি তো বুঝি না, একটাক্লাস এইটে পড়া মেয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে কী করবে, তবে খবরটা জানানোরসময় ঝিনুকের চোখে লেগে থাকা ভাষাটা আমি পড়ে ফেলেছিলাম আর তাই ওকে বলেছিলাম, ঠিক আছে, তুমি যদি মাধ্যমিকে স্টার পাও তাহলে তোমাকেও আমি একটামোবাইল ফোন কিনে দেব।

প্রমিস, পাপা?

মোবাইল ফোনওয়ালারা মানুষের মনের একটা খুব সেন্সেটিভ জায়গা আসলে ধরে ফেলেছে, আজকের ব্যস্ত জীবনে কেউ আর অপেক্ষা করতে রাজি নয়, সবারই সব কিছু যেন একদম ইনস্ট্যান্ট চাই, ইনস্ট্যান্ট চা-কফির মত জীবনের চাহিদাগুলো নিমেষে পূরণ না হলে জীবনটাই যেন ব্যর্থ, এটাই আজকের বাস্তবতা আর সেই চাহিদা পূরণের জন্য নিমেষে যোগাযোগ করা বা তথ্য যোগার করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, আর এখানেই মোবাইল ফোনের কার্যকারিতা, আঙুল দিয়ে বোতাম টিপলেই হলো, মুহূর্তে দূরত্ব ঘুচে গিয়ে আপনি যার সঙ্গে কথা বলতে চান প্রযুক্তির দৌলতে তিনি ভার্চুয়ালি আপনার কাছে এসে হাজির হবেন, এবার সহজেই আপনি জেনে নিতে পারবেন আপনার জিজ্ঞাস্যটা, আরো একটা ইম্পরট্যান্ট দিক আছে মোবাইলফোনের, জীবনের ব্যস্ততায় আজ আমাদের থেকে একটা জিনিস হারিয়ে গিয়েছে আর সেটা হলো সময়, আগের মত তাই আজ আর আমাদের হাত পা ছড়িয়ে বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় নেই, আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাতও যেন ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছে, কিন্তু হাতের মুঠোয় এই মোবাইল ফোন নামক যন্ত্রটা থাকলে আপনি কিন্তু খুশিমতো আপনার প্রিয়জনের সঙ্গে টুক করে কথা বলে নিতে পারেন, কথাবলার মত অত সময় যদি আপনার না থাকে তাহলে দু-চারটে শব্দ লিখে একটা মেসেজও পাঠিয়ে দিতে পারেন, দেখবেন হয়তো মেসেজ পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই উলটো দিক থেকে আসা উত্তর আপনার ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে, ব্যস মনে মনে আপনি এবার একদম রিফ্রেশড, নেটওয়ার্ক প্রোভাইডাররা মানুষের মনের এই সূক্ষ্ম জায়গাটাকে ধরে দিন-দিন কথা বলার জন্য নতুন-নতুন সব আকর্ষণীয় স্কিম নিয়ে আসছে, আসলে এরা আপনাকে প্র-ভোক করছে যে আপনি যেন আরো বেশী করে কথা বলেন, মোবাইল ফোনের সঙ্গে সঙ্গে ইদানীং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলিও খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, এখানে আবার বন্ধুত্বের গণ্ডি পরিচিতদের মধ্যেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকে না ,নিজের একটা ভার্চুয়াল স্বত্বা বানিয়ে সহজেই দুনিয়ার অপর প্রান্তে বাস করা কোনো ভার্চুয়াল স্বত্বার সঙ্গে আপনি কথোপকথন শুরু করে দিতে পারেন।

বড় অদ্ভুত লাগে আমার এই সব কাণ্ড কারখানা, বুঝি না কাছের মানুষগুলো যখন ক্রমশ আবছা হয়ে ধূসর হয়ে যাচ্ছে তখন মানুষ ফোনের বাটন টিপে বা কম্পিউটারের কী বোর্ডে কেন খুঁজে বেড়ায় নতুন নতুন বন্ধুত্ব, জানতে চায় তার অচেনা বন্ধু এখন কেমন আছে?

গোলপার্কে পৌঁছে গড়িয়াহাটের দিকে যাওয়ার বাঁদিকের ফুটপাথটায় উঠে এলাম , ভালোই হলো, এই ফুটপাথের ওপরএকটা পুরনো বইয়ের দোকান আছে, দোকানটার বৈশিষ্ঠ হচ্ছে যে এখানে সেকেন্ড হ্যান্ড বইও বিক্রি হয়, পৃষ্ঠাসংখ্যা ধরে ধরে বইয়ের পাতা মিলিয়ে নিতে পারলে অনেক সময় কিন্তুএই সেকেন্ড হ্যান্ড বইয়ের দোকানগুলো থেকে অনেকদুর্লভ বই সস্তাতে পাওয়া যায়, ঝিনুকের স্কুল থেকে বলেছে এখন থেকেই যেন ওরা বিভিন্ন সাবজেক্টের রেফারেন্স বই ফলো করে, মাস তিনেক আগে দোকানটা থেকে আমি ঝিনুকের জন্য একটা ইতিহাসের বই কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম, ঝিনুক বলেছে বইটা দেখে নাকি ওদের হিস্ট্রি টিচার খুব অ্যাপ্রেশিয়েট করেছেন, বলেছেন, এই বইটার নতুন সংস্করণ নাকি আজকাল আর পাওয়া যাচ্ছেনা, আজ যখন এদিকে এলামই তখন দোকানটায় বরঞ্চ একবার ঢুঁ মেরে যাই , দেখি, ঝিনুকের জন্য কোনো বই পাওয়া যায় কি না । দোকানদার ভদ্রলোক কিন্তু আমায় চিনতে পারলেন, ওনার মনে আছে যে আমার মেয়ে এইটে পড়ে আর আগেরবার আমি একটা ইতিহাসের বই কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম মেয়ের জন্য, ভিতর থেকে উনিএকটা লেটার রাইটিংয়ের বই বের করে আমায় এনে দিলেন, এটা নিয়ে যান দাদা , একদম খোদ বিলেতি সাহেবের লেখা আর ছাপাটাও ওদেশ থেকেই, দেখবেন এই বইটা আপনার মেয়েকে ইংরেজিতে লেটার লিখতে খুব হেল্প করবে, বইয়ের ইনসাইড কভারটা খুলে দেখি পাউন্ডে দাম লেখা, নিচু হয়ে বসে বইয়ের পাতা মেলাচ্ছি হঠাৎ পিছন থেকে একমহিলা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, আচ্ছা দাদা, আপনার কাছে কি শেলি বা কিটসের কবিতার বই পাওয়া যাবে ?

গলাটা শুনে চমকে উঠি , আর মাথা ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই দুজনার গলাতেই যেন এক সঙ্গে বিস্ময়ের সুর বেজে ওঠে, আরে ...


না, মায়ের কিডনিতে কোনো সমস্যা নেই, টেস্ট রিপোর্ট দেখে ডাক্তারবাবু জানিয়েছেন যে পেটব্যথার আসল কারণ হচ্ছে লিভারের ইনফেকশন আর ইনফেকশনটা রিপিটেডলি হচ্ছে, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক উনি প্রেসক্রাইব করে দিয়েছেন আর বলেছেন যে পার্মানেন্ট কিওরের জন্যএকটা ছোটখাটো অপারেশন করানো দরকার, মা কিছুতেই কিন্তু অপারেশন করাতে রাজী নয়, অপারেশন করানোর কথা বললেই বলছে, না বাবা, এ বয়সে আর ওসব কাটাছেঁড়া করে দরকার নেই, কিছুদিন আগে পন্ডিতদাদুর শিরদাঁড়ায় একটা ব্যথা হয়েছিল, উনি তখনএক হোমিওপ্যাথি ডাক্তারকে দেখিয়েছিলেন, ডাক্তারবাবুর ওষুধ খেয়ে দাদু এখন ভালো আছেন, আজ মাকে নিয়ে আমি আর অলোককাকু তাই সেই হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের কাছে এসেছি,রোগীদের বসবার জায়গায় মা আর আমি অপেক্ষা করছি, কাকু গিয়েছেন পান খেতে , পান ছাড়া কাকুর আর কোনো নেশা নেই, আগে যখনগান-টান করতেন তখন পানও খেতেন না, নেশা জিনিসটা বড় অদ্ভুত লাগে আমার, অনেক ভেবেও আমি এর সঠিক কোনো ডিফাইনড ডেফিনিশন খুঁজে পাইনি, তবে এটা বুঝি যে নেশা হচ্ছে গিয়ে এমন একটা বিশেষ অভ্যাস যা আমাদের জীবনের প্রতিনিয়তকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, দুঃখকে ভুলিয়ে রাখে, এর যেমন অনেক খারাপ দিক আছে তেমনি এর সৃষ্টিশীল দিকও কিন্তু রয়েছে, আসল কথা হচ্ছে মানুষ কিভাবে নেশাকে তার জীবনে জুড়ে নেবে তার ওপরই সব কিছু ডিপেন্ড করে।

আমার চারদিকের মানুষদের কত রকমের নেশা করতে দেখি, কেউ মদ খায়, কেউ সিগারেট বিড়ি টানে, আবার কিছু কিছু মানুষ তাদের কাজের নেশাতেই বুঁদ হয়ে থাকে। কত ভালো ছবি, কত কবিতা, কত ভাস্কর্য এসব তো আসলে শিল্পীর মানসিক নেশারই বহিঃপ্রকাশ, কেউ কেউ আবার রাজনীতি বা সমাজসেবা মূলক কাজেও তার নেশা খুঁজে পান, কারোর আবার চেনা অচেনা জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর নেশা, আমাদের প্রত্যেকেরই যেন বেঁচে থাকার জন্য একটা না একটা কিছুর অবলম্বন দরকার, আর অনেকের ক্ষেত্রেই সেই অবলম্বনটাই শেষ পর্যন্ত তার নেশা হয়ে দাঁড়ায়, বাবার যেমন ছিল বাগান করার নেশা, বোড়ালের বাড়ি বিক্রি করে পঞ্চাননতলায় আসার পরেও বাবা তাই বাগান করার নেশা ছাড়তে পারেনি,আমাদের পঞ্চাননতলার বাড়িতে উঠোন বলে কিছু ছিল না , তাই বাবা ছাদে টবেতে করে গাছ লাগিয়েছিল , ঠাকুমার ছিল আচার , বড়ি, এসব বানানোর নেশা , মা মনে হয় ঠাকুমার কাছ থেকেই আঁচার বানানোর কায়দাগুলি শিখেছে, তবে মায়ের আসল নেশা হচ্ছে তারগান, ছোটবেলা থেকেই দেখছি, গান গাওয়ার সময় মা যেন নিজেকে একদম হারিয়ে ফেলে, এক-একটা রাগের মূর্ছনায় মায়ের মুখ বা শরীর নিজের থেকেই যেন বদলে যেতে থাকে, মল্লারের রাগে যদি মায়ের চোখে শ্রাবণের ধারা নেমে আসে তবেআশাবরীর সুরে মা কিন্তু আবার বিষাদপ্রতিমা যেন, এক-এক সময় ভাবি, এই যে এত মানুষের এত রকমের নেশা, আমার নেশাটা ঠিক কী, না চা বা সিগারেটের কথা আমি বলছি না, সময় পেলে আমি যে মাঝে মাঝে কবিতা বা গল্পের বইয়ে চোখ রাখি সেটাও কিন্তু আসলে আমার নেশা নয়, কারণ নেশা হলো এমন এক জিনিস যা মানুষকে সবকিছু ভুলিয়ে দেবে, এক ফরাসী কবিতার ইংরেজি অনুবাদে পড়েছিলাম কবি সেখানে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন যাতে ঈশ্বর তাকেএমন কিছু কাজ দেন যা তাকে সব সময় পাগল করে রাখবে,আমিও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি , ঈশ্বর তুমি আমায়ও এমন কিছু একটা দাও যাতে আমি এই প্রতিদিনকার একঘেয়ে জীবনটা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারি।

অলোককাকু পান চিবোতে চিবোতে ফিরে আসছেন,কাকুর ফর্সা মুখটা রোদে লাল হয়ে উঠেছে, একটাআভিজাত্য যেন ওনার চেহারায় পারমানেন্টলি জুড়ে রয়েছে , কাকুর মাথার চুলগুলি এখন অনেকটাই সাদা হয়ে এসেছে , আর হবেই বা না কেন,বয়সতো আর কম হয়নি, আমার হিসেব অনুযায়ী কাকুর বয়স এখন পঞ্চান্নর ওপারে, দূর থেকে কাকুকে আসতে দেখে কিছুদিনআগে দেখা সেইসিনেমার দৃশ্যটার কথা মনে পড়ে গেলো, নায়ক সেখানেএকটু বয়স্ক, মধ্য যৌবন পার করে ফেলেছেন, কাকুর মতই ওনার মাথাতেও কাঁচাপাকা ব্যাক ব্রাশ করা চুল , কাকুর মতই ডান কাঁধটাকে ঈষৎ হেলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভদ্রলোক এসে ঢুকলেন নির্জন রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুমে, হাতেরব্যাগটা ওয়েটিং রুমের বেঞ্চিতে রেখে চোখ তুলে তাকাতেই নজরে পড়লো উলটো দিকের বেঞ্চে বসা বহুদিন আগের ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকাকে, দুজনা কিছুক্ষণ চুপচাপ দুজনার দিকে তাকিয়ে রইলেন আর তারপর এক সময় নায়কটি খুব শান্ত গলায় বলে উঠলেন , কেমন আছ , কাকু অবশ্য হাতে করে নিয়ে আসা জলের বোতলটা মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, নাও বৌদি, জল খাও। মাঝে-মাঝে আমি ভাবি, এই যে মানুষটা সারাটা জীবনআমাদের সংসারে জুড়ে থাকলেন, আমাদের বিপদে আপদে নিঃস্বার্থ ভাবে সব সময় আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন, বিনিময়ে উনি কী পেলেন?উর্মির কথা অনুযায়ী বা আমাদের চেনাশোনা আরো অনেকের মতে যার মধ্যে এমনকি আমার স্বর্গীয়বাবাও রয়েছেন তারা মনে করেন যে মা আর অলোককাকুর মধ্যে নাকি একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে, যদিও ব্যাপারটা আমি একটু অন্যভাবে দেখি, পরিষ্কার করে বলি আজ অবধি মা বা অলোককাকুর ব্যবহারে বা ওদের কথাবার্তায় কোনোদিন আমি এমন কিছু নজর করিনি বা শুনিনি যাতে আমার মনে হতে পারে যে এই দুটো মানুষের মধ্যে এক বিশেষ সম্পর্ক আছে, তবে এটা ঠিক যে অলোককাকুর তরফ থেকে মায়ের প্রতি একটা টান আছে আর সেটা ওনার কথাবার্তায় বা এতদিন ধরে আমাদের সংসারে উনি এই যে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে জুড়ে রয়েছেন সেটা থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায়, কিন্তু যে বিষয়টা আমার কাছে আজও ক্লিয়ার নয় সেটা হচ্ছে মায়ের দিক থেকেও কি অলোককাকুর প্রতি সেই টানটা আছে? আর এই জায়গাটাতে এসেই আমার সবকিছু কেমন যেন গোলমাল হয়ে যায়, বাবার মৃত্যুর পর বাবার ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের বলা ঐ কথাগুলো, তোর বাবাই ছিল আমার একমাত্র ঈশ্বর বা ঠাকুমার বলা একদিনের সেই কথা, আমি কিছুতেই বিশ্বাস করি না যে কাজল কোনো অন্যায় করতে পারে, তারপর অলোককাকুকে আমাদের পারিবারিক বহু বিষয়ে মতামত প্রকাশের অধিকার দিলেও মা যে সব সময়ই কাকুর থেকে একটা প্রয়োজনীয় দূরত্ব মেনটেন করে এসেছে, এগুলো যেন আমাকে ভাবতে বাধ্য করায় যে বন্ধুত্ব ছাড়িয়ে মা কখনই অলোককাকুকে অন্য নজরে দেখেনি, হয়তো মায়ের জীবনে অলোককাকুর থেকে ভালো বন্ধু আর কেউ নেই বা আসেনি কিন্তু মা কখনোই সেই বন্ধুত্বের সীমারেখা পার করার কথা ভাবেনি।

কিছু মা যদি সীমারেখাটা পার করার কথা ভাবত তাহলে কি মা কোনো অন্যায় করত, জানি না, কারণ কখনো কখনো আমার মনে হয় এই সীমারেখাটা পার করতে না পারাটা আসলে মায়ের জীবনের একটা মস্ত বড় ভুল বা বিরাট বলিদান, আমার মতে প্রতিটি বিবাহিত সম্পর্কের সাফল্য আসলে ডিপেন্ড করে একটা সঠিক সমীকরণের ওপরে যেখানে স্বামী স্ত্রী উভয়ই উভয়ের পরিপূরক হয়ে উঠবে বা তা হয়ে ওঠার চেষ্টা করবে আর কোনোপক্ষই এই সমীকরণে অন্যকে ডমিনেট করার চেষ্টা করবে না, অথচ বাবা-মায়ের সম্পর্ক দেখে আমার কিন্তু সব সময়ই মনে হয়েছে যে এই সম্পর্কটায় বাবা সব সময়ই ডমিনেট করতে চেয়েছে বা করে গিয়েছে, আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে বলতে হয় বাবার কাছ থেকে মা কোনদিনই তার প্রাপ্য সম্মান বা ভালবাসা পায়নি, ভালবাসার চোরাবালিতে মা তাই কখনই নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলতে পারেনি, দুজনার বয়সের ব্যবধান যদি এর একটা কারণ হয় তবে তার থেকেও বড় কারণ হচ্ছে বাবা আসলে কখনোই তার মনের পর্দায় নিজেকে কাজল করের প্রেমিক হিসেবে দেখতে চাইত না, সেখানে ফুটে উঠত তার স্বামিত্ব, তার অধিকারবোধ বা শাসনের বেড়াজাল ।

এ বাবা! ঠাণ্ডা না বলে তাহলে তো নর্মাল টেম্পারেচারের জল দিতে বললেই হতো, জলের বোতলটায় হাত দিয়ে মা খুব ঠাণ্ডা বলায় কাকু কথাগুলো বলে উঠলেন,কাকুর বয়সটা এখন এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে যেখানে মানুষের যৌবনের চাহিদাগুলি আর প্রকট হয়ে থাকে না বা স্তিমিত হয়ে আসে,অথচ ভদ্রলোক এই মুহূর্তে কী বিব্রতই না হয়ে পড়েছেন মা জলটা খুব ঠাণ্ডাবলায়, হোয়াট ইজ দিস কলড, ইজ ইটনটট্রু লাভ, না মা, আমার মনে হয় সম্পর্কের বাঁধন আর সামাজিক ভ্রুকুটির ব্যবধান অস্বীকার করতে না পেরে তুমি হয়তো নিজেকে সারাটা জীবন সত্যিকারের ভালবাসা থেকে বঞ্চিতই করে গেলে।বেশ কিছু বছর আগের কথা, বাবা তখনও বেঁচে, আমরা সেদিন প্রথম অলোককাকুদের বাড়িতে গিয়েছিলাম, নিউ আলিপুরের অভিজাত এলাকায় পুরনো বনেদী বাড়ি, গেটে পিতলের চকচকে নেমপ্লেট, শ্রী অমরেশ মজুমদার লেখা তাতে, অলোককাকুর বাবা, নামের নিচে ওনার ব্যারিস্টারের পরিচয়ও দেওয়া রয়েছে। আমাদের আসার ব্যাপারটা আগে থেকে ঠিক করা থাকলেও হঠাৎ কোনো কাজে আটকে পড়ায় আমরা যখন কাকুদের বাড়িতে পৌঁছলাম তখন কাকু ছিলেন না, অলোককাকুর মা এসে দরজা খুলে আমাদের নিয়ে বসালেন ওনাদের ড্রয়িংরুমে, দুপুরবেলায় বাড়িতে পুরুষরা এখন কেউ নেই , অলোককাকুর দুই বৌদি এসে আমাদের সঙ্গে আলাপ করে গেলেন , বৌদিদের মধ্যে একজন প্রেসিডেন্সি আর একজন বেথুন থেকে পাশ করা,কথাবার্তায় সাবেকিয়ানার ছাপ সুস্পষ্ট, ইতিমধ্যে কাজের লোক ট্রেভর্তি মিষ্টি নিয়ে এসে রেখেছে আমাদের সামনে,মাসীমা মানে অলোককাকুর মা পরিমিত পীড়াপীড়িও করছেন আমরা যাতে প্লেটের একটা মিষ্টিও ফেলে না রাখি, সব কিছুই যেন একদম নিয়ম মেনে চলছে,খেতে-খেতে বড়দের টুকিটাকি কথাবার্তার মাঝে আমার একটু ছোট বাইরে যাওয়া দরকার পড়লো, টয়লেট সেরে বসার ঘরে ফিরছি,প্যাসেজের মুখে যেঘরটা রয়েছে তারপর্দার ওপার থেকে মহিলা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।

আমি তো বাবা ভেবে পাই না যে দেওর বাবাজী কী দেখে এমন মজলো?

যা বলেছ দিদি, ভদ্রমহিলার মুখটা দেখলে তো সাঁওতালী সাঁওতালী বলে মনে হয়!

ঠিক বলেছ,শুনেছিতো বিয়ের আগে নাকিসাঁওতাল পরগনাতেই থাকতেন।

আর ভদ্রলোককে দেখেছ, ভদ্রমহিলার পাশে ওনাকে তো বাবা বলে মনে হচ্ছে যেন !

পর্দার ওপাশ থেকে চাপা হাসির শব্দ, তারপরে আবার বড় বৌয়ের গলা, জানিস তো, এই সাঁওতালপরগনার মানুষরা কিন্তু ওসব জাদুটোনা-ফোনা কীসব বলে না, সেসব কিন্তু জানে , আমার কী মনে হয় জানিস, এইভদ্রমহিলাও ঐসব করে আমাদের দেওর বাবাজীকে ফাঁসিয়েছেন।

অস্বাভাবিক কিছু নয়,হতেও পারে , এনিওয়ে ছাড়ো এসব , যাদের ছেলে তারা বুঝবে'খন, এখন চলো তো, ভদ্রমহিলাকে গিয়ে বরঞ্চ একটা গান শোনাতে বলি , শুনেছি ওনার গানের গলাটা নাকি অপূর্ব।

ওনাদের ঘর থেকে বেরনোর আগেই চট করে আমি প্যাসেজটা পার করে হলঘরে চলে এলাম, মায়ের পাশে বসে কানে-কানে মাকে বললাম, বাড়ি চলো, আমার খুব বড় বাইরে পেয়েছে।

না, কিছুতেই আমি মাকে এখানে গান গাইতে দেব না, যারা আমার মাকে শ্রদ্ধা করে না, তাদের কোনো অধিকারই নেই আমার মায়ের গান শোনার ।


ডাক্তারবাবু বেশ বয়স্ক, কথাবার্তায় অনেকটা যেন গুহজেঠুর আদল, পর্দা সরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই এমন একটা উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন যে আমরা যেন কতদিনের পরিচিত। মা আর কাকু ওনাকে কেসহিস্ট্রি শোনালো , সঙ্গে করে নিয়ে আসা টেস্ট রিপোর্টওদেখাতে চাইলো, উনি কিন্তু আগ্রহ দেখালেন না , আরে বাবা আমি হচ্ছি গিয়ে হোমিওপ্যাথি ডাক্তার, ওসব ছবি-ফবি দেখে আমি কী করব, তার চেয়ে মা তোমার ডান হাতটা দাও দেখিনি , নাড়িটা একবার ভালোকরে দেখি। প্রায় পনের মিনিট ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মাকে সব কিছু জিজ্ঞাসা করার পর আমাদের মুখের দিকে চেয়ে উনি বললেন, ভয় পেয়ো না,সেরে যাবে, তবে একটু সময় লাগবে, জানোই তো হোমিওপ্যাথিতে রোগ সারতে একটু সময় লাগে, ওষুধ দিচ্ছি, কয়েক মাস এখন টানা খেতে হবে।

বাড়ি ফেরার সময় অলোককাকু ওনার গাড়ি করে আমাদের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলেন, বাড়িতে এখন সিমেন্ট-বালির স্তূপ, মনে হচ্ছে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তিনতলার কাজটা শেষ হয়ে যাবে, ঘরের পার্টিশন , ছাদের ঢালাই , সব হয়ে গিয়েছে, ফিটিংসও সব রেডি, কাল-পরশুর মধ্যেই ইলেকট্রিক্যাল কাজ যে টুকু বাকী আছে সেটুকুও হয়ে যাবে, শুক্রবার থেকে রঙের কাজ শুরু হবে, মাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে, সামনে কবে ভালো দিন আছে, গৃহপ্রবেশটা সেরে রাখব , তারপর ধীরে ধীরে মালপত্র তিনতলায় শিফট করতে হবে, সামনের মাস থেকে দোতলায় ভাড়াটে আসছে, ভদ্রলোক ব্যাঙ্কে চাকরি করেন, স্বামী, স্ত্রী আর একটা বাচ্চা।

ঝিনুকের খাটে উর্মি শুয়েছিল, আমাকে দেখে উঠে এলো, কী বললো ডাক্তার?

সেরকম ভয়ের কিছু নেই, তবে সারতে একটু সময় লাগবে।

এই জানো, আজ না পিয়ালিদি এসেছিলেন। উর্মি চটকরে প্রসঙ্গ বদলালো।

পিয়ালিদিটা কে সেটা অবশ্য আমি হুট করে মনে করতে পারলাম না, আর উর্মির চোখে আমার সেই না পারাটা ধরা পড়ে যাওয়ায় উর্মি বলে উঠলো, আরে পিয়ালিদিকে মনে নেই , সেই যে আমাদের বাসরে গান গেয়েছিল , এবার আমার মনে পড়লো, মোটাসোটা গোলগাল ভদ্রমহিলা আমাদের বাসরটাকে সত্যিই সেদিন হাসি ঠাট্টায় আর গানে একদম জমিয়ে রেখেছিলেন, ওনার হাজবেন্ড শোভনবাবুও খুব মজাদার মানুষ, উর্মি অবশ্য আমার চেনার সুবিধার্থে আরো কিছু রেফারেন্স দিলো, ওনারা তো ঝিনুক হওয়ার পরেও আমাদের বাড়িতে একবার এসেছিলেন।

তা হঠাৎ এতদিন পরে উনি আমাদের বাড়িতে এলেন?

আরে ওনাদের এক আত্মীয় নাকি এইকুঁদঘাটেই থাকেন, আজ সেই আত্মীয়র বাড়িতে এসেছিলেন আর ফেরার পথে আমাদের বাড়িটাও একবার ঘুরে গেলেন। এই শোনো না, পিয়ালিদির সেই আত্মীয়দের নাকি কুঁদঘাটব্রিজের কাছে একটা প্লে স্কুল আছে, ভাবছি সামনের মাস থেকে পাপানকে ঐ স্কুলে ভর্তি করে দেব।

উর্মির কথাশুনে আমি হাসব না কাঁদব কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা, পাপানের তো এখনো দু বছরওবয়স হয়নি, ও এখনই কী স্কুলে যাবে?

আরে বাবা, এটা তো প্লে স্কুল, সত্যিকারের স্কুল থোড়ি!

সত্যিই প্লে স্কুল ব্যাপারটা যে ঠিক কী বা সেখানে অ্যাকচুয়ালি কী শেখানো হয় সে সম্বন্ধে আমার যে আইডিয়াটা খুব একটা ক্লিয়ার নয় সেটা বোঝার পর উর্মি আমাকে প্লে-স্কুলের ব্যাপারে ছোটখাটো একটা লেকচারই দিয়ে দিলো,প্লে স্কুল নাকি বাচ্চাদের আসল স্কুলে যাওয়ার হ্যাবিট তৈরি করার জায়গা, বাচ্চারা ঐ স্কুলে গিয়ে খেলে, কাঁদে, দুষ্টুমি করে, মানে বাড়িতে যা যা করে সেই সব করে,তফাতটা হচ্ছে, এসব বাচ্চারা করে বাড়ির লোকদের বিনা উপস্থিতিতে।


আজ মাসের পয়লা,হলোই বা প্লে স্কুল, পাপান আজ প্রথম স্কুলে যাবে, আর আজই সেনবাবুরা মানে দোতলার ভাড়াটেরা শিফট করবেন আমাদের বাড়িতে।


ক্রমশ