শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২০

কথাগুলো বলা হলো না, পর্ব -১০

১০

রাতে খাওয়ার পর আজ বিছানায় শুতে এসে দেখি আমার আর উর্মির বালিশের মাঝে ঝিনুকের বালিশ নেই, তার মানে কি ঝিনুক আজ রাতে আমাদের সঙ্গে শোবে না ? ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে উর্মি শোওয়ার আগের তার প্রতিদিনকার রূপচর্চায় ব্যস্ত এখন, এই রূপচর্চার পর্বটা এখন বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলবে, স্টিরিও-মাফিক কিছু কাজ করতে থাকবে উর্মি, প্রথমে বিশেষ কোম্পানির তেল হাতের তালুতে ঢেলে পরিপাটি করে চুলে লাগাবে, তারপর চুলগুলিকে সামনের দিকে টেনে বড় দাঁতওয়ালা চিরুনিটা দিয়ে টানটান করে আঁচড়াতে থাকবে , আর চুল আঁচড়ানো শেষ হলে কালো ফিতের একটা প্রান্ত দাঁতের ফাঁকে চেপে শুরু হবে বিনুনি বাঁধার পর্ব।

রূপচর্চার ফাঁকেই আয়না দিয়ে উর্মি জানালো যে আমার অনুমান সঠিক, ঝিনুক আজ রাতে আমাদের সঙ্গে শোবে না, সে তার ঠাকুমার কাছে শোবে।

আয়না দিয়েই হাতের মুদ্রায় উর্মির কাছে জানতে চাই মেয়ের এই হঠাৎ ইচ্ছের কারণ?

বিনুনি বাঁধা শেষ হয়ে গিয়েছে উর্মির, ড্রেসিং টেবিলের সামনে পড়ে থাকা প্ল্যাস্টিকের টিউবটা খুলে আঙুলের ডগায় কিছুটা ক্রিম নিয়ে জানালো যে আজ পড়াশোনা শেষে ঝিনুক নাকি তার ঠাম্মার কাছে আবদার করেছিল যে গল্প শোনাতে হবে আর ঠাম্মার বলা গল্পটা নাকি এতটাই ইন্টারেস্টিং যে তার শেষটুকু আজ রাতে শুনতে না পারলে মেয়ের নাকি ঘুম আসবে না। দু হাতের তালুতে ক্রিম লাগিয়ে উর্মি এখন গালে ক্রিম ঘষছে, ওর পরনের হাতকাটা নাইটিটা কি আজ একটু বেশিই পাতলা, কে জানে, আমার শরীরের মধ্যে হঠাৎ করেই যেন একটা আনচান শুরু হয়ে গেলো, গালে ক্রিম ঘসার পর্বটা সাধারণত উর্মির একটু দীর্ঘই হয় আজ কিন্তু আমার আর যেন তর সইছে না, তাই আয়নায় ফুটে ওঠা উর্মির প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে বললাম , এই, তাড়াতাড়ি করো না একটু!

উর্মি যেন আমার কথা শুনতে পায় না, গালে যেমন ক্রিম ঘষছিল তেমনই ঘসতে থাকে।

এই উর্মিইইইইই, শোয়া থেকে বিছানায় উঠে বসি আমি।

উঃ , তুমি এমন করো না যে মনে হয় যেন আমাদের সদ্য বিয়ে হয়েছে!

সদ্যই তো , ইট’স ওনলি সেভেন ইয়ারস, একটা দশকও তো আমরা এখনও পার করতে পারিনি।

প্রসাধন পর্ব শেষ করে ঘরের টিউব লাইট নিভিয়ে উর্মি বিছানায় আসে, আসার আগে কম পাওয়ারের নীলচে আলোটা জ্বালিয়ে নেয় , এই শোনো না , তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।

আমার এখন আর কোনো কথা শোনবার মত ধৈর্য নেই, উর্মিকে তাই একটানে নিজের বুকে টেনে নিয়ে বলি, ও সব পরে শুনব , এখন আমাকে আগে ভালবাসিবারে দাও অধিকার।

উর্মি কিন্তু আমার বুকে নাক ঘসতে ঘসতে কথাটা বলেই ফেলে , এই জানো, তুমি না আবার বাবা হতে যাচ্ছ।

কী! আনন্দে যেন চিৎকার করে উঠি! যে আনচান ভাবটা এতক্ষণ আমায় অধীর করে তুলেছিল সেটা উর্মির কথায় কোথায় যেন হারিয়ে যায়, উর্মির মুখটা বুক থেকে চট করে তুলে ধরি, আবছা আলোয় ওর মুখের দিকে চেয়ে বলি, তুমি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছ না তো?

আমার কপালের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলি সরিয়ে উর্মি জানায় যে সে ইয়ার্কি করছে না, না মশাই, ইয়ার্কি নয়, ইটস ফ্যাক্ট , দুমাস ধরে মিস করছি , পরশু ডঃ রীতা ভাওয়ালের ওখানে গিয়েছিলাম, উনি ইউরিন টেস্ট করাতে বলেছিলেন, আজ বিকেলে রিপোর্ট পেয়েছি , ইটস পজিটিভ।

বিছানায় উঠে বসি, আমার সারা শরীর জুড়ে যেন সত্যিই একটা আনন্দের স্রোত বয়ে চলছে এখন, ঝিনুক হওয়ার সময়ও প্রথম যেদিন উর্মি আমায় খবরটা জানিয়েছিল সেদিনও খবরটা শুনে ঠিক এরকমই মনে হয়েছিল, সত্যিই খুব আনন্দ হচ্ছে আমার, মনে মনে বলি, ইস্, এবার যেন আমাদের একটা ছেলে হয়, আসলে ঝিনুক আমার মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করে দিয়েছে, এবার আমাদের যদি একটা ছেলে হয় তাহলে আমাদের সংসারটা যেন পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে, হঠাৎ করেই একটা সিগারেট খেতে মন চাইছে এখন, আসলে আজকাল মনের কোনো বিশেষ অনুভূতির সঙ্গে সিগারেট খাওয়াটা যেন অঙ্গাঙ্গী ভাবে জুড়ে গিয়েছে আমার, খাটের বাজুতে রাখা সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাইটা নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াই, উর্মিও আমার পিছুপিছু ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়, এমনিতে আমার সিগারেট খাওয়ার সময় উর্মি আমার ধারে-পাশে থাকে না, ওর প্রচণ্ড আপত্তি আছে আমার সিগারেট খাওয়া নিয়ে, প্রথম প্রথম তো খুব অশান্তি করতো, এখন আর অত অশান্তি করে না তবে হাবভাবে বা বিভিন্ন কথায় এটা বুঝিয়ে দেয় যে আমার এই সিগারেট খাওয়াটা আসলে আমার দায়িত্ব-জ্ঞানহীনতারই পরিচয়, যাই হোক আজকে এই মুহূর্তে উর্মি কিন্তু ব্যালকণিতে এসে আমার পিঠে নাক ঘষতে ঘষতে আমার মনের কথাটাই যেন বলে ফেলে, এই কুশল, তোমার কী মনে হয়, এবার আমাদের ছেলে হবে না মেয়ে হবে?

আমি আকাশের দিকে ভেসে যাওয়া ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে ওকে উল্টো প্রশ্ন করি, তুমি কী চাও?

নাকটা আমার পিঠে চেপে ফিসফিস করে উর্মি জানায় যে সে-ও আমার মতই ছেলে চায়।

দু'জনাই কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি, যেন রাতের গভীরে অখণ্ড নিস্তব্ধতায় আমরা উপভোগ করতে চাইছি আমাদের জীবনের এই বিশেষ আনন্দ মুহূর্তটাকে। এক সময় নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে উর্মিকে আমি বলি, মাকে জানিয়েছ খবরটা?

উর্মি আমার পিঠে মুখ ঘষতে ঘষতেই জানায় যে সে বলেনি। বলিনি, কাল সকালে তুমি জানিও।

আমি কেন, তুমি যদি মাকে খবরটা দাও দেখবে মা কত খুশী হবে।

উর্মি এবার আমার পিছন থেকে সরে এসে ব্যালকণির রেলিংটা দুহাতের মুঠোতে ধরে আকাশের দিকে তাকায়, না কুশল, এটা তোমার ভুল ধারণা, তোমার মা আমার মুখ থেকে খবরটা শুনলে মোটেই খুশী হবেন না, তার চেয়ে তুমি বরঞ্চ কাল তোমার নিজের মুখে খবরটা দিও, দেখবে উনি অনেক বেশী খুশী হবেন। হঠাৎ করেই যেন একটা দমকা হাওয়া বয়ে যায় আমাদের ব্যালকণিতে আর সেই হাওয়ায় উর্মি জানায় যে তার খুব ঘুম পাচ্ছে, আমি যেন তাড়াতাড়ি সিগারেট শেষ করে ঘরে আসি, উর্মি ঘরের দিকে চলে গেলে কিছুক্ষণ আমি শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকি, ধোঁয়ার যে সরল রেখাটা এখন শূন্যে ভেসে যাচ্ছে তার উৎসটা আমি জানি, সিগারেটের বুকে জ্বলতে থাকা আগুন থেকেই তার সৃষ্টি, কিন্তু উর্মির আর মায়ের মাঝে দিন দিন যে ধোঁয়ার কুণ্ডলীটা তৈরি হচ্ছে তার উৎসটা ঠিক কোথায়, না, আই মাস্ট স্পেন্ড সাম টাইম টু ফাইন্ড ইট আউট , আদারওয়াইজ ...



চায়ের কাপ-দুটো ধুয়ে জায়গা মত রেখে শুভ্রা মেঝেতে আমার মুখোমুখি এসে বসে, কয়েক সেকেন্ড দুজনাই আমরা চুপচাপ, কথা বলি না, শুভ্রা দেখি ধীরে ধীরে মেঝের দিকে তার দৃষ্টি নামিয়ে নিচ্ছে, বুঝতে পারছি যে কথাটা বলবে বলে আমায় ডেকে পাঠিয়েছে সেটা বলবার আগে মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছে, এক সময় নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে শুভ্রা বলে ওঠে, কুশলদা, প্লিজ একটা ব্যাপারে আমাকে হেল্প করুন।

আগে বলো কীসের হেল্প তারপর তো সেটা করার প্রশ্ন, মনে মনে ভাবলাম, ইস্ এবার যেন শুভ্রা এমন কিছু একটা বলে যেখানে আমি সত্যিই ওকে হেল্প করতে পারি। এর আগে এক-দুবার যখনই ও কিছু করার কথা বলেছে আলটিমেটলি আমি কিছু করে উঠতে পারিনি।

কুশলদা, আসলে, একটু দম নেয় যেন শুভ্রা, আমি প্রেগন্যান্ট...

শুভ্রাকে ওর কথা শেষ করতে দেই না , ইন্টারেপ্ট করে বলে উঠি , বাঃ, এ তো দারুণ খবর , তোমাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই আমার তরফ থেকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন ।

কুশলদা … এক প্রকার জোড় করেই যেন নিজের ভিতরের জমে থাকা জড়তাটাকে কাটিয়ে শুভ্রা আমার চোখে সরাসরি চোখ রেখে বলে, জানি কথাটা শুনলে হয়তো আপনি দুঃখ পাবেন , হয়তো মন থেকে মেনেও নিতে পারবেন না, কিন্তু বিশ্বাস করুন এই মুহূর্তে আমার কাছে আর কোনো বিকল্প নেই।

শুভ্রার কথা ঠিক মত বুঝে উঠতে পারি না, তাই ওকে বললাম যদি কিছু মনে না করো তাহলে যা বলবার তা একটু খুলে বলো, নয়তো আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

হ্যাঁ বলছি, শুভ্রা আরো একটা দীর্ঘশ্বাস নেয় আর তারপর মুখটা মাটির দিকে নামিয়ে বলে, কুশলদা, এই বাচ্চাটা আমার পক্ষে এখন কিছুতেই ... আমি মিন বাচ্চাটা আমি নষ্ট করে ফেলতে চাই, প্লিজ আমাকে সে ব্যাপারে একটু হেল্প করুন।

প্রয়োজনের তুলনায় হয়তো একটু বেশী জোড়েই কথাগুলো বলে ফেললাম, কী বলছ তুমি! তোমাদের প্রথম বাচ্চা আর তাকে তুমি নষ্ট করে ফেলতে চাইছ! তুমি জানো পৃথিবীতে কত দম্পতি আছেন যারা সারা জীবন বাচ্চা না হওয়ার দুঃখ নিয়ে কাটিয়ে দেন।

জানি কুশলদা, আপনার কি মনে হয় একটি মেয়ে হয়ে আমি জীবনে প্রথম মা হওয়ার অনুভূতির স্বপ্ন দেখি না, কিন্তু কী করবো বলুন, সত্যিই আমি খুব নিরুপায়, সব কিছু হয়তো আপনাকে খুলে বা বুঝিয়ে বলতে পারছি না বাট বিলিভ মি, দেয়ার আর মাল্টিপল রিজন হুইচ ইজ ফোর্সিং মি টু টেক দিস ডিসিশন, সত্যিই আমি এখন এই বাচ্চাটাকে ... কথাটা শেষ করতে পারে না শুভ্রা, ওর থুতনিটা নিজের অজান্তেই যেন ওর বুকের ওপর নেমে আসে।

মনে মনে ভাবি শুভ্রা হয়তো ওদের ফাইনানসিয়াল ক্রাইসিসের কথাটা আমার সামনে তুলে ধরতে লজ্জা পাচ্ছে , একবার ভাবি ওকে বলি, বাচ্চা হতে তো এখনও অনেক দেরী আছে, ততদিনে সমুদ্র নিশ্চয়ই ফাইনানসিয়ালি সেটেল করে যাবে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেই, সমুদ্রকে বিয়ে করে ও যে কোনো ভুল করেনি , শুভ্রার এই মিথ্যা অহংকারটা ভাঙ্গতে মন চায় না, চুপ করে থাকি।

কুশলদা, প্লিজ আপনার চেনাশোনা কোনো জায়গা যদি থাকে আই মিন যেখানে বাচ্চাটাকে অ্যাজ আরলি অ্যাজ পসিবল অ্যাব্রট করানো যাবে তাহলে সেখানে আমায় একটু নিয়ে যাবেন?




কাল পুরো রাত মা ঘুমোয়-নি, আমিও অনেক রাত অবধি জেগে ছিলাম আর তারপর শেষরাতের দিকে চোখটা কখন যেন বুজে এসেছিল , সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মা এর মধ্যে চান সেরে ঠাকুরঘরে রাধা-কৃষ্ণের মূর্তির সামনে এসে বসেছে, বড় করুণ দেখাচ্ছে মাকে, গুনগুন করতে থাকা মায়ের দু চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে

যো খিল সাকে না ও ফুল হাম হ্যায়

তুমহারে চরনো কি ধুল হাম হ্যায়

দয়া কি দৃষ্টি সদা হি রাখনা

তুমি হো বন্ধু, সখা তুমি হো

তুমি হো মাতা, পিতা তুমি হো

তুমি হো বন্ধু, সখা তুমি হো

বাবকে নিয়ে কাল আমরা ডঃ শ্যামল চক্রবর্তীর চেম্বারে গিয়েছিলাম , তারকজেঠুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে সেদিন সামনের পি সি ও টা থেকে ওনার নম্বরে ফোন করলে ওনার অ্যাসিটান্ট ফোনটা ধরেছিলেন , ভদ্রমহিলাকে অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথাটা বলাতে উনি লাইনটা একটু হোল্ড করতে বললেন, মিনিট খানেক বাদে জানালেন যে সেপ্টেম্বরের ফার্স্ট উইকের আগে ডেট পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সেপ্টেম্বরের ফার্স্ট উইক মানে তো প্রায় সাড়ে তিনমাসের অপেক্ষা, অনেক করে রিকোয়েস্ট করলাম যদি এর আগে কোনো ডেট পাওয়া যায় , কিন্তু ভদ্রমহিলা জানালেন , অসম্ভব, আগের সব ডেটই নাকি বুকড, শেষ অবধি অলোককাকুই সমস্যার সমাধান করলেন , ওনার চেনা-শোনা কাউকে ধরে বাবার অ্যাপয়েন্টমেন্টটা উনি তিন সপ্তাহের মাথাতেই করে দিলেন ।

ডঃ চক্রবর্তীর পাম এভিনিউর চেম্বারটা ওনার বাড়িরই একটা এক্সটেনডেড পোর্শন, ভীষণ সাজানো গোজানো, ছিম-ছাম , তারকজেঠুর চেম্বারের ঠিক যেন উলটো সংস্করণ, সুইংডোর ঠেলে ভিতরে ঢোকার পরই হালকা একটা ঠাণ্ডা আমেজ ভেসে এলো, দরজার ঠিক উলটো দিকে এক সুন্দরী ভদ্রমহিলা টেবিলের পিছনে রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন, আমাদের ঢুকতে দেখে উনি হাসিমুখে বললেন , গুড ইভনিং, গলা শুনে বুঝলাম এনার সঙ্গেই সেদিন ফোনে কথা হয়েছিল।

উনি পেশেন্টের নাম জানতে চাইলে বাবার নাম বললাম, ডায়েরি দেখে আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বললেন ভদ্রমহিলা , হলঘরটার দুপাশে দুটো বড় সোফা পাতা, সোফার গদিগুলি এত নরম যে বসলে মনে হয় শরীরটা যেন একদম ডুবে যাচ্ছে, দুটো সোফার মাঝে লো হাইটের একটা টেবিল রাখা রয়েছে যার ওপর বাংলা ইংরেজি দু ধরনের কিছু ম্যাগাজিন ছড়ানো। আমাকে ঘরের কোনে রাখা ওয়াটার কুলারটা থেকে কাগজের গ্লাসে করে জল খেতে দেখে বাবা বললো , বাবু আমায় একটু জল দে তো।

জলটা খুব ঠাণ্ডা, তাই না, উল্টো দিকের সোফায় বসা মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা আমায় উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলে উঠলেন , আমি ওনার কথায় ইতি বাচক ঘাড় নাড়তে উনি এবার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন, বড় আলাপী ভদ্রমহিলা, সামান্য সময়েই মায়ের কাছে নিজের ব্যাপারে অনেক কিছুই জানিয়ে দিলেন , কলেজ স্ট্রীটের দিকে ওনাদের বাড়ি, আগে একান্নবর্তী পরিবার ছিল , এখন একই বাড়িতে ভাসুর দেওর থাকলেও হাঁড়ি কিন্তু আলাদা, লেজ-স্ট্রীটে ওনাদের বইয়ের দোকান আছে, হাজবেন্ড সারাদিন সেই দোকানেই বসেন, বেশ কিছুদিন হলো ভদ্রলোকের নাকি মাঝে মাঝেই জ্বর আর সর্দিকাশি হচ্ছে, পাড়ার ডাক্তার টিবি বলে সন্দেহ করছেন, তাই একটা সেকেন্ড ওপিনিয়ন নেওয়ার জন্য এই ডাক্তারবাবুর কাছে এসেছিলেন, আগের দিন ডাক্তারবাবু ওনার স্বামীকে দেখে রক্ত আর কিছু টেস্ট করাতে বলেছিলেন , আজ উনি সেই সব রিপোর্ট-পত্র নিয়ে এসেছেন, একটানা কথাগুলি বলে ভদ্রমহিলা প্রায় ছলছল চোখে মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন , বোন, ভগবানকে একটু বলো না যাতে ডাক্তারবাবু রিপোর্ট দেখে বলেন মানুষটার কোনো কঠিন রোগ হয়নি।

এক ভদ্রলোক ডাক্তারবাবুর চেম্বারের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলে ভদ্রমহিলা ভিতরে গেলেন আর কিছুক্ষণ বাদে ভীষণ খুশী খুশী মুখ নিয়ে বেরিয়ে এসে মাকে বললেন , বুঝলে বোন, ডাক্তারবাবু বলেছেন, টিবি-ফিবি কিছু নয়, সারাদিন দোকানে বসে থাকে তো, তাই রাস্তার ধুলোবালি নাকে মুখে ঢুকে এরকম হচ্ছে।

রিসেপশনের ভদ্রমহিলা এবার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, যান, আপনারা ভিতরে যান।

বয়সে এই ডাক্তারবাবু তারকজেঠুরই বয়সী হবেন, তবে এনার বেশভূষা বা চেহারা যেন অনেক বেশী পরিমার্জিত, কথাবার্তাও বেশ পরিশীলিত, টেবিলের উলটো দিকে পাতা চেয়ারে আমাদের বসতে বলে উনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে একবার আমাদের সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, বলুন মিস্টার কর, আপনার অসুবিধাগুলি ঠিক কী কী।

তারক জেঠুর প্রেসক্রিপশনটা ওনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বাবা তার অসুবিধার কথাগুলো বলতে শুরু করলো।

সিগারেট খান?

না, বাবা মাথা নেড়ে জানান দিলো ।

কী করেন , মানে চাকরি না ব্যবসা ?

বাবা জানালো যে সে একটা কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অ্যাকাউন্ট ডিপারমেন্টে রয়েছে ।

এর আগে অন্য কোথাও চাকরি করতেন?

হ্যাঁ, এর আগে আমি বছর পাঁচেক একটা অ্যাসবেসটস কোম্পানিতে কাজ করতাম।

সেখানে আপনাকে ঠিক কী কাজ করতে হতো ?

আসলে ওটা তো খুব ছোট কোম্পানি ছিল তাই ওখানে আমাদের সবাইকেই প্রায় সব ধরনের কাজ করতে হতো ।

কী তৈরি হতো ঐ কোম্পানিটায়?

ডাক্তারবাবুর প্রশ্নের উত্তরে বাবা জানায় যে ঐ কোম্পানিটায় অ্যাসবেসটসের ফাইবার বানানো হতো। আমি আর মা চুপ করে বাবার আর ডাক্তারবাবুর এই সওয়াল জবাব শুনে যাচ্ছি, সত্যি কথা বলতে কী আমার কিন্তু একটু বিরক্তিই লাগছে, এত কাঠখড় পুড়িয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এসেছি, তা ডাক্তারবাবু রোগীকে না দেখে এসব কী চাকরি বাকরির কথা জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছেন!

বাবা আগের কোম্পানির কাজের ব্যাপারে ডাক্তারবাবুকে ডিটেলে জানালে উনি আরো একবার তারকজেঠুর প্রেসক্রিপশনটায় চোখ বুলিয়ে বললেন , দেখুন মিস্টার কর, এর আগে আপনাকে যে ডাক্তারবাবু দেখেছেন উনি মনে হয় ঠিকই সন্দেহ করেছেন, তবে কনফার্ম করে কিছু বলবার আগে আমি আপনার বুকের একটা লেজার এক্সরে করাতে চাই , এক্সরেটা আপনি এখান থেকেই করাতে পারেন, আর সেক্ষেত্রে ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই রিপোর্ট দেখে আপনার ট্রিটমেন্ট শুরু করে দেওয়া যেতে পারে । মা ইশারায় বাবাকে এক্সরেটা করিয়ে নিতে বললে ডাক্তারবাবু ওনার টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা তুলে কাউকে ভিতরে আসতে বললেন , অল্প বয়স্ক একটা ছেলে ঘরে ঢুকলে ডাক্তারবাবু বাবাকে দেখিয়ে বলে দিলেন যে কী করতে হবে ।

এক্সরে রিপোর্টটা স্ট্যান্ডে লাগিয়ে অনেকক্ষণ মন দিয়ে ডাক্তারবাবু দেখলেন আর তারপর নিজের জায়গায় বসে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, দেখুন মিস্টার কর, আপনার যে রোগ হয়েছে ডাক্তারি পরিভাষায় তার নাম হচ্ছে অ্যাসবোসেসটিস আর তার সঙ্গে আপনার ম্যালিগন্যান্ট মেসোথেলিয়ামাও রয়েছে, আসলে আপনি যখন আপনার পুরনো কারখানায় কাজ করতেন তখন অ্যাসবেসটস ফাইবারের মধ্যে ক্রমাগত শ্বাস নিতে নিতে আপনার ফুসফুসের মধ্যে এক ধরনের টিসু ডেভেলপ করেছিল আর এই টিসুগুলোকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে ফাইব্রোসিস, এই ধরনের টিসু ডেভেলপ করলে আমাদের ফুসফুসের সংকোচন বা প্রসারণে ক্রমাগত বিঘ্ন ঘটতে থাকে, আপনি যদি আপনার বুকে স্টেথো রাখেন তাহলে দেখবেন সেখানে ক্রমাগত একটা ক্রাকিং সাউন্ড শুনতে পাবেন আর এই শব্দটাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে রেলস্, তবে আপনার ক্ষেত্রে যেটা চিন্তার বিষয় সেটা হচ্ছে রোগটা অনেকদিন ধরেই আপনার মধ্যে বাসা বেঁধেছে , কী হয় জানেন, এই রোগটা এমনই এক রোগ যে এর অনেক সময় প্রকাশ পেতে পেতেই প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর সময় লেগে যায়, এনিওয়ে আমি ওষুধ দিচ্ছি, আশা করছি ফুসফুসের মধ্যে জমে থাকা তরল সেই ওষুধে পাতলা হয়ে বেরিয়ে আসবে, কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, যে কোনো সময়ে কিন্তু আপনার নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের কষ্ট শুরু হতে পারে আর তখন অক্সিজেন মাস্ক ব্যবহার করাটা একান্তই প্রয়োজনীয়।

যে প্রশ্নটা আমাদের তিনজনের মাথাতেই ঘুরপাক খাচ্ছিল মা শেষ অবধি সেটা করেই ফেললো, ডাক্তারবাবু, বলছি কী, ভয়ের কিছু নেই তো?

কিছু একটা বলতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে যেন নিজেকে সামলে নিলেন ডাক্তারবাবু, আসলে পাঁচ বছর তো অনেকখানি সময় ম্যাডাম, আর এই দীর্ঘ সময়ে উনি ডাইরেক্টলি অ্যাসবেসটসে এক্সপোজড থেকেছেন , লেটস হোপ ফর দ্য বেস্ট।



যো খিল সাকে না ও ফুল হাম হ্যায়

তুমহারে চরনো কি ধুল হাম হ্যায়

দয়া কি দৃষ্টি সদা হি রাখনা

ঠাকুরের সামনে বসে উদাস নয়নে মা গুণগুণ করছে , আমি পাশে এসে বসাতে আমায় জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, বল তো বাবু, ভগবান কেন আমাদের এভাবে শাস্তি দিতে চাইছেন ? আমি মাকে কিছু বলে ওঠবার আগেই বারান্দায় বাবার গলার আওয়াজ পেলাম, কলঘরের কাজ সেরে বাবা বেরিয়ে এসেছে, মা তাড়াতাড়ি করে চোখের জল শাড়ির আঁচলে মুছে জিজ্ঞাসা করলো , তোমার হয়ে গিয়েছে, চা বসাই তাহলে?

সব গুণী গায়ে অব প্রভুকা নাম

প্রভুকে নাম বিন কুছ নাহি কাম

বয়সের ভারে শরীরটা বেঁকে গিয়েছে, কিন্তু সুর যেন আজও ওনার গলায় একই রকমের সমাদৃত , পণ্ডিত নন্দকুমার আরও একবার সব গুণী গায় অব প্রভুকা নাম লাইনটা গেয়ে মঞ্চে রাখা পঞ্চ প্রদীপে আলো জ্বালিয়ে দিলেন । সঙ্গীত এন্ড সুরের পক্ষ থেকে আজ যে ‘রাগ’ সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে সেখানে মায়ের নতুন অ্যালবাম জিন্দেগী এক দর্দের উদ্বোধন করা হবে । কাল রাতে আমি অ্যালবামের গানগুলি শুনছিলাম , এই অ্যালবামের প্রতিটা গানে মা যেন সুরের রেখায় এক অদ্ভুত বিষাদ এঁকেছে , হয়তো বাবার বর্তমান শারীরিক অবস্থাই মায়ের মনের এই বিষাদের উৎপত্তি , সত্যিই মা আজকাল আর হাসে না , সব সময় কেমন যেন একটা দুঃখ দুঃখ মুখ নিয়ে সারাদিন যন্ত্রের মত ঘরের কাজ করে যায় , আমার খুব খারাপ লাগে মাকে এরকম দেখতে , মায়ের ক্যাসেটের উদ্বোধন হয়ে গেলো , নন্দজী মিস্টার বালওয়ার হাত থেকে ক্যাসেটটা নিয়ে দর্শকদের দিকে তুলে ধরলেন, হাততালি শেষ হলে এবার জুবেনকাকুর ডাক পড়লো মঞ্চে

ইয়ে দিল হামহারা সামহালকার হাতমে লেনা

নজাকৎ ইসমে ইতনী হ্যায়

নজরসে গীড়া তো টুট যায়েগা

যথারিথি পুরো হলঘর এখন কাকুর সুরে ভাসছে , অনুপদাদু চোখ বন্ধ করে গানের তালে তালে হাতদুটো ক্রমাগত শূন্যে দুলিয়ে যাচ্ছেন, ওনাকে ওভাবে শূন্যে হাত দোলাতে দেখে আমার মনে হচ্ছে দাদু যেন সুরের সাগরে সাঁতার কাটছেন । ইয়ে দিল হামহারা সামহালকার হাতমে লেনা, লম্বা একটা টান দিয়ে কাকু চোখ খুললেন আর কেউ কিছু বলে ওঠবার আগেই নন্দজী কাকুকে উদ্দেশ্য করে হিন্দিতে বলে উঠলেন , থামলি কেন বেটা, আর একটা গান গা , বড় সুন্দর তোর গলা।

কাকু মাথা নিচু করে পন্ডিতজির কথায় এবার ধরলেন

আই বাদল

চমকত রহি বিজুরী

বোলত মুরলা বনমে

চঞ্চল সৈঁয়াকে পিয়া

গয়ে পরদেশ কল না পরত

কঁপন লাগে জিয়া ভর মে

আই বাদল

গৌড়-মল্লারে গাওয়া এই গানে সারা হলঘরে এখন অদ্ভুত এক মায়াবী আবেশ, বাদল - বিজুরী - শব্দগুলি সত্যিই যেন আমাদের চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে , জুবেনকাকুর গান শেষ হলে মঞ্চে এবার এক বয়স্ক ভদ্রলোক উঠলেন, ঠুমরী ধরলেন উনি, কী অদ্ভুত গলা, সুর তাল নিয়ে যেন হলের চার দেওয়ালে ভদ্রলোক একের পর এক ছবি এঁকে চলেছেন, ‘ইয়াদ পিয়াকি আয়ে, ইয়ে দুখ সেহেনে না যায়ে’ বিলম্বিত একতালে কিছুক্ষণ থেকে চলে গেলেন তিন তালে আর হলঘর জুড়ে রাশি রাশি দুঃখ-মেঘের ভেলা যেন ভেসে বেড়াতে শুরু করলো, ওনার গান শেষ হলো এক সময়, সঞ্চালক মশায় এবার মায়ের নাম ধরে ডাকছেন

কেহতে হ্যাঁয় মেরি মওত পর

উসকে ভি ছিন হি লিয়া

ঈশক কো মুদাতোঁ কি বাদ

একমিলা থা তরজুমাঁ।

আপনি কী করে এত ভালো বেহালা বাজান , উত্তরে ফ্রিজ ক্রিসলার বলেছিলেন “ ইটস প্র্যাকটিস, ইটস প্রাকটিস, ইটস প্রাকটিস ওনলি, ইফ আই ডোন্ট প্র্যাকটিস ফর এ মান্থ , দ্য অডিয়েন্স ক্যান টেল দ্য ডিফারেন্স , ইফ আই ডোন্ট প্র্যাকটিস ফর এ উইক , মাই ওয়াইফ ক্যান টেল দ্য ডিফারেন্স , ইফ আই ডোন্ট প্র্যাকটিস ফর এ ডে , আই ক্যান টেল দ্য ডিফারেন্স। মা , তোমার গানের সুর বা তালে আজকাল সামান্য ভুল হলেও আমি কিন্তু তা বুঝতে পারি , আজ তোমার গানে একদম মন নেই , তুমি আজ শ্রোতার মন ভোলাতে সুর-লয়-তানের পুঁথিগত বিদ্যার নোটেশন সামনে রেখে গেয়ে যাচ্ছ, কারণটা অবশ্য আমি জানি, গত এক সপ্তাহ ধরে বাবার শরীরটা খুব খারাপ যাচ্ছে, ঘন-ঘন মাস্ক নিতে হচ্ছে বাবাকে, সেদিন তো আমরা বেশ ঘাবড়েই গিয়েছিলাম, ফোন করে অলোককাকুকে রাতের-বেলায় ডেকে আনিয়েছিলাম , কাকু সারা রাত সেদিন বাবার পাশেই বসেছিলেন , তবে কাল সন্ধ্যা থেকে বাবার শরীরটা একটু ভালোর দিকে , তবে এটা ঠিক যত দিন যাচ্ছে অসুখের সঙ্গে যুদ্ধ করে করে বাবা যেন ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে , এর মধ্যে একদিন গুহজেঠু এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে , নিচের তলার সুদীপ জেঠিমার প্রেশারটা হঠাৎ করে খুব নেমে যাওয়াতে ডাক্তারজেঠুকে ওনারা কল দিয়ে ডেকে আনিয়েছিলেন , জেঠিমাকে দেখা হলে জেঠু নিজের থেকেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসেন, বাবার বিছানার পাশে বসে বাবার সঙ্গে সেদিন অনেকক্ষণ কথা বলেছিলেন জেঠু, বুঝলে বিশ্বনাথ, একটা কথা সব সময় মনে রাখবে, শরীর তোমায় কমজোরি করে দিতে পারে কিন্তু ভেঙ্গে ফেলতে পারে না , মানুষ তখনই ভেঙ্গে যায় যখন তার স্বপ্ন দেখার মনটা হারিয়ে যায়, পৃথিবীর ইতিহাস খুলে দেখো, দেখবে সেখানে কত মানুষ আগামীকাল মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও জীবনটাকে শেষদিন পর্যন্ত উপভোগ করে গিয়েছেন, কত মানুষ দেখবে শারীরিক প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে ঐতিহাসিকদের বাধ্য করিয়েছেন পৃথিবীর ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে , চিয়ার-আপ বিশ্বনাথ, উই অল আর উইথ ইউ টু ফাইট দ্য ব্যাটেল এন্ড এট দ্য এন্ড অফ দ্য ডে আমরাই কিন্তু গিয়ে দাঁড়াব উইনার্স স্ট্যান্ডে … সচরাচর যারা মিথ্যা কথা বলেন না তাদের পক্ষে মিথ্যে বলাটা খুব কঠিন , ভেতর থেকে কেউ যেন তাদের গলা চেপে ধরে , জেঠুও তাই কথাগুলি শেষ করতে পারলেন না, মেঝের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন , আমি বা মা ওনাকে বাড়ন করলাম না , মানুষকে কখনও কখনও নিজের ছায়া থেকেও নিজেকে লুকনোর সুযোগ করে দেওয়া উচিৎ।

গান শেষ হলে মা সবার থেকে তাড়াহুড়ো করে বিদায় নিয়ে বললো , বাবু, একটা ট্যাক্সি ডাক তো , তোর বাবার জন্য মনটা কেমন করছে রে ।



তিনদিন বাদে অফিসে শুভ্রার ফোন এলো, কুশলদা সেদিন আপনাকে যে ব্যাপারটায় খোঁজ নিতে বলেছিলাম আপনি কী কিছু খোঁজ নিয়েছেন?

সেদিন শুভ্রাদের বাড়ি গিয়ে আমার কাছে এটা পরিষ্কার যে সমুদ্রকে বিয়ে করে ও ওর জীবনের একটা মস্ত বড় ভুল করেছে এবং সেই ভুলের মাশুল দিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা, বাড়ি ফেরার পথে বারবার সেদিন শুভ্রাদের বাড়িওয়ালীর বলা সেই কথাগুলো কানে যেন বাজছিল, বোন কি তোমাদের এতই গলগ্রহ হয়ে গিয়েছিল যে এরকম একটা মদো মাতাল নিষ্কর্মার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলে, আর গলির মুখে সমুদ্রের যে রূপটা আমি সেদিন নিজের চোখে দেখেছি তাতে এটা পরিষ্কার যে কণাদির বলা কথাগুলো মোটেই মিথ্যে নয়। বুঝতে পারছি এই অবস্থায় শুভ্রার পক্ষে এখন বাচ্চার জন্ম দেওয়া বা ভবিষ্যতে তার লালন পালন করার রিস্ক নেওয়াটা খুব কঠিন আর শুভ্রা সেটা নিতে চাইছে না। কিন্তু এত সব কিছু বোঝার পরেও আমার কোথায় যেন শুভ্রার এই বাচ্চা নষ্ট করার ডিসিশনটা মনে কিচকিচ করছে, কিছুতেই আমি এটাকে ঠিক মেনে নিতে পারছি না। আর তাছাড়া ক্লিনিক খোঁজার ব্যাপারে আমার আরো একটা অসুবিধা এই যে সাধারণত যেসব ক্লিনিক বা নার্সিংহোম আমি জানি সেখানে গিয়ে এই ব্যাপারে কথা বলা আমার পক্ষে অসম্ভব আর অচেনা জায়গায় কাজটা কতখানি সেফলি করা যাবে তা নিয়ে আমার মনে একটা দুশ্চিন্তা হচ্ছে, শুনেছি তো অপারেশনের সময় এসব ক্ষেত্রে কিছু ভুলভাল হলে অনেক সময় নাকি ভবিষ্যতে আর কোনোদিন মা হওয়া যায় না, কালকেই ভাবছিলাম ব্যাপারটা নিয়ে বিদেশের সঙ্গে কথা বলব, ওকে সব জানিয়ে একটা ভালো ক্লিনিক খুঁজে দিতে বলব, বিদেশ হচ্ছে গিয়ে আমার সেই বন্ধু যার ওপর আমি চোখ বুঝে ভরসা করতে পারি, জীবনে যখনই আমি কোনো ব্যাপারে ফেঁসে গিয়েছি ও কিন্তু নিঃস্বার্থ ভাবে আমায় সাহায্য করেছে। আর বিদেশের চেনাশোনাও প্রচুর, নিশ্চয়ই ও একটা ভালো ক্লিনিকের সন্ধান দিতে পারবে।

ফোনের অপর প্রান্তে শুভ্রাকে কিছুটা যেন রেস্ট-লেশ লাগছে , কুশলদা প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি করুন, বুঝতেই পারছেন, যত সময় যাবে ব্যাপারটা তত কমপ্লিকেটেড হয়ে উঠবে আর একটা কথা, সমুদ্রকে আমি এই ব্যাপারে কিছু জানাতে চাই না, তাই বিফোর হি রিয়েলাইজস আই ওয়ান্ট টু … কথাটা শেষ করে না শুভ্রা , লাইনটা কেটে দেয়।



কাকুলিয়া রোডের এই ক্লিনিকটার খবর বিদেশই আমায় দিয়েছে, বলেছে জায়গাটা নাকি শুধু সেফই না , খরচাপাতিও কম। শুভ্রাকে নিয়ে আজ আমি ক্লিনিকটায় এসেছি, ডাক্তার আজ শুভ্রাকে পরীক্ষা করে জানাবে যে অপারেশনটা করা যাবে কি না আর করা গেলে তার ডেটও দিয়ে দেবে, গোল-পার্কের গোল চক্করের যেদিকে মৌচাক বলে বিখ্যাত মিষ্টির দোকানটা আছে তার ঠিক পাশ দিয়েই ক্লিনিকের গলিটা , গলিতে ঢুকে বার চারেক ডাইনে-বাঁয়ে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে আমরা এসে পৌঁছই সাধনা ক্লিনিকের সামনে , রাস্তার ওপরে দেড়তলা বাড়ির মেন দরজার ওপর সাদা সাইনবোর্ড টাঙানো, লাল অক্ষরে তাতে লেখা, সাধনা ক্লিনিক , নিরাপদে গর্ভপাত করানো হয়, সরকার অনুমোদিত , পাশে একটা রেড ক্রসের চিহ্নও আঁকা , দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই ডেটল, ফিনাইল, ওষুধ সব কিছু মিলিয়ে একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে ঢুকলো , শুভ্রা দেখি তাড়াতাড়ি করে রুমাল বের করে নিজের নাক চেপে ধরেছে , হলঘরের সামনের দিকটায় রিসেপশন , এক মধ্য বয়স্কা ভদ্রমহিলা সবুজ পেড়ে সাদা শাড়ি পরে টেবিলের পিছনে রাখা চেয়ারটায় বসে রয়েছেন , আমাদের ঢুকতে দেখে মোটা গলায় ভদ্রমহিলা জিজ্ঞাসা করলেন , কী কেস ?

দেওয়াল ঘেঁসে যে চেয়ারগুলো পাতা রয়েছে তার একটায় শুভ্রাকে বসতে বলে আমি এসে দাঁড়াই ভদ্রমহিলার সামনে , আমতা-আমতা করে বলি, মানে …

মাঝপথে আমাকে থামিয়ে শুভ্রার মুখের দিকে তাকিয়ে ভদ্রমহিলা জিজ্ঞাসা করেন , ক মাস?

শুভ্রা কোনো রকমে খুব নিচু গলায় জানায়, এ মাস ধরলে দু’মাস।

প্রথম? ভদ্রমহিলা আবার খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞাসা করে উঠলেন ।

এবার আর শুভ্রা মুখে কিছু বললো না, ইতিবাচক ঘাড় নেড়ে জানালো যে হ্যাঁ।

আগের জন্মে ভদ্রমহিলা যেন পুলিশ ছিলেন, গম্ভীর গলায় এবার উনি আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলেন , আপনি কি ওর স্বামী হন?

প্রশ্নটায় এত তীক্ষ্ণতা ছিল যে নিজের অজান্তেই হাত দুটো যেন একটু জোড়ে শূন্যে নেড়ে জানান দিলাম যে আমি শুভ্রার স্বামী হই না।

তাহলে ... এবার প্রশ্নটার সঙ্গে ভদ্রমহিলা যেন আমার মুখের দিকে কিছুটা অসম্মানের দৃষ্টিও ছুড়ে দিলো।

আবার সেই আত্মীয় শব্দটার আশ্রয় নিতে হলো, সত্যি এই শব্দটার বিস্তার যেন আকাশের থেকেও বেশী , আত্মীয় বলাতে ভদ্রমহিলা আর বিশেষ কিছু প্রশ্ন করলেন না, টেবিলে ওপর থাকা রেজিস্টারটা এগিয়ে দিয়ে বললেন , নিন, এখানে নাম ঠিকানা লিখুন আর পঁচাত্তর টাকা জমা করুন, ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করে যদি বলেন কেস নামানো যাবে তাহলে তিনদিন পরে মানে সামনের বৃহস্পতিবার পেশেন্টকে নিয়ে আসবেন, সেদিন পাঁচশো টাকা লাগবে আর সঙ্গে করে এমন কাউকে নিয়ে আসবেন যে পেশেন্টের হয়ে বন্ডে সই করতে পারবে।

খাতায় নাম-ঠিকানা লিখে শুভ্রার পাশের চেয়ারটায় এসে বললাম, একটা সমস্যা হলো যে।

কী সমস্যা? শুভ্রা একটু অসহায় ভাবে আমার মুখের দিকে চাইলো।

না, ব্যাপারটা হচ্ছে যে কাল আমাকে অফিসের কাজে বাইরে যেতে হবে আর ফিরতে ফিরতে সেই উইক-এন্ড, তাই বৃহস্পতিবার তোমার সঙ্গে ...

শুভ্রা আমার চোখের দিকে তাকিয়েই বললো, ঠিক আছে, অফিসের কাজ যখন তখন তো যেতেই হবে, আপনি যান, আমি দেখছি কী করা যায়। একটু ভেবে শুভ্রা বললো যে ওর এক কলেজ বান্ধবীর শ্বশুরবাড়ি বিজয়গড়ে মানে ওদের ওখানেই।

মল্লিকাকে বলবো'খন বৃহস্পতিবার আমার সঙ্গে আসার জন্য।



প্রতি মে’দিবসের গানে গানে

প্রতি মে’দিবসের গানে গানে

নীল আকাশের তলে দূর

শ্রমিকের জয়গান কান পেতে শোনো ঐ

হেনরির হাতুড়ির সুর

ও হো হো হো হো

হেনরির হাতুড়ির সু-র-র-র-অ-অ

খুব ভালো লাগে গানটা আমার , চুপ করে তাই শুনতে থাকি

জন হেনরির কচি ফুল মেয়েটি

জন হেনরির কচি ফুল মেয়েটি

পাথরের বুকে যেন ঝরনা

মা-র কোল থেকে সে

পথ চেয়ে আছে তার

বাবা তার আসবে না আর না

ও হো হো হো হো

বাবা তার আসবে না আর না


অদ্ভুত একটা মাদকতা আছে গানটায়, বারবার করে ফিরে আসা ঐ চারবারের হো হো হো হো শব্দগুলি শুনলে সত্যিই যেন শরীরের সব রোমকূপ একদম খাড়া হয়ে যায় , কে যেন ভিতর থেকে বলতে থাকে যে এই পৃথিবীতে মানুষের পক্ষে কোনো কিছু করাই অসম্ভব নয়, তাই হেনরির হাতুড়ীর বিনের কাছে স্টিম ড্রিলও একদিন হেরে যায়, গায়ক যখন গানের কথায় বলে ওঠেন যে হেনরির হাতুড়িতে খোদাই হওয়া ভার্জিনিয়ার সুরঙ্গের মধ্য দিয়ে রেল ইঞ্জিন এবার সিটি বাজিয়ে চলে যাচ্ছে তখন আপনা থেকেই ঐ কর্মবীর মানুষটির জন্য শ্রদ্ধায় যেন মাথা নত হয়ে আসে। আজ মে-দিবস, আমাদের ক্লাবটা একটু বাম ঘেঁষা , তাই সকাল-সকাল ক্লাবের পাঁচিল ঘেঁসে বাঁশের মাথায় একটা লাল পতাকা টাঙ্গিয়ে কারা যেন মাইকে পালা করে শঙ্খচিল বা ক্যালকাটা ইয়থ ক্যয়ারের ক্যাসেট বাজাচ্ছে । পায়ে পায়ে ক্লাবের লনে এসে দাঁড়ালাম , তপন বা তমালকে দেখলে বলবো চল একবার করুণাময়ীর কালী মন্দির থেকে ঘুরে আসি, মন্দিরের পিছনটা আমাদের সিগারেট খাওয়ার ঠেক , ফার্স্ট ইয়ারে ঢোকার পর বন্ধুদের পাল্লায় পরে আমিও সিগারেটে টান দিতে শুরু করেছি , তবে তমাল বা তপনের মত আমার অত নেশা নেই , মাঝে-সাঝে সখ হলে টান দেই , আজ যেমন সকাল থেকেই একটা সিগারেটে টান দিতে খুব ইচ্ছে করছে।

ক্লাব-লনের সিমেন্টের বেঞ্চে মতিকাকু এখন বেশ জমিয়ে আসর বসিয়েছেন, ক্লাবের ভীতরে ঝাড়পোঁছ হচ্ছে, তাই তাসের আড্ডা এখনো বসেনি, কাকু ওনার চার পাশে ঘিরে থাকা ভিড়টাকে তাস খেলা নিয়ে ওনার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছেন, তপনকে ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কানে-কানে বললাম , মন্দিরে যাবি নাকি ?

সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মন্দির থেকে বেরতে যাব ঠিক তখনই তমাল এসে ঢুকলো , কোথায় যাচ্ছিস, দাঁড়া না, আমিও একটা সিগারেটে একটু … অগত্যা দাঁড়াতেই হলো , শুধু দাঁড়ানোই নয়, তমালের ইচ্ছেয় ওর সিগারেটে কাউন্টারও মারতে হলো , একটা সিগারেটকে যখন একাধিক-জন পর্যায় ক্রমে টানতে থাকে তখন তাকে কাউন্টার মারা বলে, সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে তমালকে উদ্দেশ্য করে তপন বললো ও নাকি কাল বিকেলে কুঁদঘাটের বাসস্টান্ডে রঞ্জনাকে একটা ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করতে দেখেছে, কথাটা শুনে তমাল অবশ্য কোনো রিঅ্যাকশন করলো না, রঞ্জনা যে ওকে ঘোরাচ্ছে সেটা তমাল এতদিনে বুঝে গিয়েছে। তমালকে খোঁচা দেওয়াটা ঠিক মত হলো না দেখে তপন এবার আমায় নিয়ে পড়লো , কী রে কুশল, তোর কী খবর ?

আমার আবার কীসের খবর , কোনো রকমে দিন কেটে যাচ্ছে।

তমাল হঠাৎ আমার আর তপনের কথার মাঝে বললো, এই শোন না, নবীনায় ব্রুসলির সিনেমা এসেছে, যাবি আজকে?

ঠিক হলো আজ ম্যাটিনি শোতে আমরা তিনজন ব্রুসলির সিনেমাটা দেখতে যাব, কথা বলতে বলতে মন্দির ছেড়ে তিনমাথার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি, এখান থেকে ডান দিকে টার্ন নিলেই আমাদের ক্লাবের রাস্তা , মোড়ের মাথায় আমাদের দেখেই ক্লাবের সামনে জমে থাকা ভিড়টায় সবাই যেন এক সঙ্গে চিৎকার করে উঠলো, ঐ তো কুশল, কে যেন অন্যদের উদ্দেশ্য করে বললো, তোরা কুশলকে নিয়ে আয় , আমরা ততক্ষণে সব ব্যবস্থা করে ফেলি।



শর্মি বলে পাপানের মুখটা নাকি আমার মত হয়েছে। আমার শাশুড়ি অবশ্য বলেন নাতি র মুখ নাকি তার বড় মেয়ের মতই হয়েছে। অলোককাকুর মতে পাপানের চোখ দুটো উর্মির মত হলেও বাকি মুখে আমারই ছায়া । মায়ের মতে, পাপানের চোখেমুখে ওর দাদুর মুখ নাকি একদম কেটে বসানো । যাই হোক যার মতই দেখতে হোক না কেন আমাদের পাপানবাবু যার ভালো নাম আদিত্য কর তিনি কিন্তু এক বছর বয়সেই বাড়ির সবাইকে একদম ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছেন, যাকেই দেখেন তাকেই তিনি মুখের সামনে তর্জনী তুলে বপ্ করতে ছাড়েন না , জানি না কোথা থেকে এটা শিখেছে, কিন্তু পাপানের কাছে এই যেচে যেচে বকা খাওয়াটা এখন আমাদের সবারই একটা খুব প্রিয় টাইম-পাস, নিচের ঘরের সুদীপ জেঠু-জেঠিমা বা অলোককাকুও দেখি আজকাল আমাদের বাড়িতে এলেই পাপানকে নিয়ে এই বকা খাওয়ার খেলাটা খেলতে শুরু করে দেন , ঝিনুক সেদিন বলছিল , জানো পাপা, ভাই শুধু বকেই না, সেদিন আমার চুলের মুঠি ধরেও টানছিল, ঝিনুকের কথায় আমি যেন পাপানের ওপর খুব রেগে যাই, মেয়েকে বলি, সে কী রে , তুই ওর থেকে আট বছরের বড় দিদি আর তোকেই কী না ও চুল ধরে টেনেছে , দাঁড়া, ওকে এক্ষণই বকে দিচ্ছি।

না, পাপা, ভাইকে তুমি একদম বকবে না , ভাইকে তুমি যদি বকো তাহলে মুঝসে বুরা কোই নেহি হোগা, একটা পপুলার হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকাকে আজকাল প্রায়ই এই ডায়লগটা বলতে শোনা যায়, ঝিনুক মনে হয় সিরিয়ালটা থেকেই কথাটা শিখেছে, তবে মেয়ে কিন্তু আমার তার ভাইকে খুব ভালবাসে, ঝিনুকের একটা পয়সা জমানোর ভাণ্ড আছে , সেদিন জোড় করে আমাকে দিয়ে ও সেটার মুখ খুলিয়ে দশ টাকা বের করে আমার হাতে দিয়ে বললো আমি যেন পাপানের জন্য একটা বল কিনে নিয়ে আসি । অফিস থেকে ফিরে আজ ঝিনুক আর পাপানকে নিয়ে আমি এতক্ষণ খেলছিলাম, মা নিজের ঘরে বসে পূজো করছে, কলিং বেল, ঝিনুকের টিউটর এসেছেন, মেয়ে হলঘরে পড়তে চলে গেলে উর্মিও কিচেনের দিকে পা বাড়ালো , আবার বেল, উর্মি জানালো যে কামাল এসেছে, কামাল হচ্ছে গিয়ে আমাদের ফ্যামিলি রাজমিস্ত্রি , বাবার আমল থেকেই আমাদের বাড়ির সমস্ত কাজ দেখাশুনা করে, কদিন ধরেই ভাবছি যে তিনতলার কাজটায় এবার হাত দেব , কামালের থেকে একটা এস্টিমেট নিতে হবে, ঝিনুক হলঘরে পড়ছে, তাই কামালকে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে বসলাম।



মাতর্মেদিনি, তাত মারুত, সখে তেজঃ, সুবন্ধো জল, ভ্ৰাতর্ব্যোম, নিবন্ধ এষ ভাবতামন্ত্যঃ প্ৰণামাঞ্জলিঃ।

যুষ্মাৎসঙ্গবশোপজাতিসুকৃতোদ্রেকক্ষুদ্রান্নিৰ্ম্মল জ্ঞানাপাস্তিসমস্তমোহামহিমা লীয়ে পরে ব্রহ্মণি

মা বসুন্ধরা, পিতা পবন, বন্ধুবর অগ্নি, আত্মীয়-সম জল, ভ্রাতা-রুপী আকাশ, তোমাদের সকলকে করজোড়ে আমার শেষ প্রণাম, তোমাদের সকলের কাছ থেকে শেখা বিদ্যায় আর জ্ঞানে আমি নিজেকে রঞ্জিত করেছি এই জীবনে আর তারই নিদর্শন স্বরূপ জীবনের কঠিন-তম অজানা বাঁকগুলো পার করে আজ আমার অবিনশ্বর সত্যের মাঝে মিলিয়ে যাওয়া। বাবার মৃত শরীরটার সামনে দাঁড়িয়ে হরিহরদাদু নিজের মনে শ্লোক বলে চলেছেন । বেশ কয়েক বছর আগে ঠাকুমার মৃত্যুর সময় একবার শ্মশানে এসেছিলাম , সেটা ছিল প্রথমবার, আর আজ দ্বিতীয়বার , কালের প্রহরে পৃথিবীর সব কিছু বদলালেও এই জায়গাটার কিন্তু বদল হয় না , মৃত্যুপুরী তার নিজের অবস্থানেই যেন বিরাজমান , আজও দেখলাম একদল মানুষ প্রিয়জনের শোকে কেঁদে চলেছেন, আর এক দল মানুষ শোক সামলে জরুরী কাগুজে কারবারি সারতে ব্যস্ত , শ্মশানের নিজস্ব মানুষগুলি অবশ্য তারই ফাঁকে নির্বিকার ভাবে একের পর এক প্রাত্যহিক কাজ সেরে যাচ্ছেন । হরিহরদাদু পায়ে পায়ে মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন, কেঁদো না বৌমা , কেঁদো না , কেঁদে আর কী করবে , যা হওয়ার তা তো হয়ে গিয়েছে, আসলে কী জানো , মৃত্যু বড় নিষ্ঠুর, সে কারো আর্জি শোনে না, নিজের অহংকারে নিজের নিয়মেই সে চলতে থাকে, কেঁদো না তুমি, বৌমা।

দাদু জানে না মা আজ সকাল থেকে একবারের জন্যও কাঁদেনি , আমরা কেউ আজ মায়ের চোখে এক ফোটা জলও দেখিনি, নির্বাক দৃষ্টি নিয়ে সেই সকাল থেকে মা বাবার পায়ের কাছে বসে ছিল , সুদীপ জেঠিমা মাকে শ্মশানে আসতে বারণ করছিলেন , মা শুনলো না , আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বারবার সেই একই কথা , বাবু তুই কিন্তু আমায় ফেলে একা-একা শ্মশানে চলে যাস না , আমায় নিয়ে যাস, একবার পুড়ে গেলে তো মানুষটাকে আর কোনোদিন চোখের দেখা দেখতে পাব না , মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হচ্ছিল জমে থাকা কান্না বাষ্প হয়ে মাকে আজ পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।

অনুপদাদু কখন যে শ্মশানে এসেছেন খেয়াল করিনি , এক কোনে বুকের সামনে হাতদুটো জড়ো করে দাদু দাঁড়িয়ে আছেন, তিন নম্বর চুল্লিটার মুখ এবার খুললেই ডোমেরা বাবার শরীরটাকে আগুনের গহ্বরে ঢুকিয়ে দেবে, এর মধ্যে বাবাকে খাট থেকে নামিয়ে চাটাইয়ের ওপর শুইয়ে দেওয়া হয়েছে, পরনের কাপড় খুলে ধুতির মতন এক ফালি কাপড় দিয়ে বাবার শরীরটা ঢেকে দিয়েছে ওরা, শ্মশানের পুরোহিত মশাই তার সহকারীকে ডেকে বললেন মৃতের শরীরে যেন ভালো করে ঘি মাখিয়ে দেওয়া হয়, ঘি মাখানো শেষ হলে মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন উনি, পিঠে কারো হাতের স্পর্শ , মাথা ঘুড়িয়ে দেখি ডাক্তারজেঠু আর অলোককাকু আমার দুদিকে দাঁড়িয়ে , কাকু বললেন, চলো বাবু , পুরোহিত মশাই ডাকছেন , যন্ত্রের মত এগিয়ে গেলাম, পুরোহিত মশাইকে উদ্দেশ্য করে কাকু বললেন, ছেলে। পুরোহিত মশাইয়ের নির্দেশে অলোককাকু এবার জ্বলন্ত পাটকাঠিটা এগিয়ে দিলেন আমার হাতে , নাও বাবু , মুখাগ্নি করো বাবার, তিন-নম্বর চুল্লির মুখটা আবার খুলে গেছে এর মধ্যে , আরো একটা জীবনকে শেষবারের মত দগ্ধ করতে সে প্রস্তুত , ডোমেরা বাবার শরীরটা মাটি থেকে তুলতে সমবেত সবাই হরি ধ্বনি দিয়ে উঠলেন, বাবার শরীরটা এবার ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছে চুল্লির মধ্যে, ফার্নেসের মুখটা এক সময় নিজের থেকেই যেন বন্ধ হয়ে এলো, তপন-তমাল-মতিকাকু-ডাক্তারজেঠু-সদাদা-হরিহরদাদু-অলোককাকু-সবার চোখেই এখন জল...

জল নেই শুধু দুটো মানুষের চোখে – নিথর দৃষ্টিতে মা চেয়ে আছে ফার্নেসের বন্ধ পাল্লা-দুটোর দিকে – আর অনুপদাদু আকাশের দিকে চেয়ে নিজের মনে গেয়ে চলেছেন


এই তো জীবন

হিংসা বিবাদ লোভ ক্ষোভ বিদ্বেষ

চিতাতেই সব শেষ – চিতাতেই সব শেষ

সাধের এই দেহটাও একদিন সাদা ছাই হবে

সবই তো পিছেই পরে রবে

চুকে যাবে সময়ের সবটুকু হিসেব নিকেশ

চিতাতেই সব শেষ



ক্রমশ