শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

কথাগুলো বলা হলো না,২

দক্ষিণ কোলকাতার গড়িয়া বাসস্টান্ডের কাছে টালিনালা পাড় করে বোড়াল বলে যে পাড়াটা আছে কিছু বছর আগেও এই জায়গাটা কিন্তু একদম অজ পাড়া-গাঁ ছিল, তখন বোড়ালের চারদিকে যতদূর দৃষ্টি যেত শুধুই জলাজমি আর ধু ধু মাঠ, জলাজমি গুলির ধার ঘেঁসে ঘেঁসে ঢোল-কমলির জঙ্গল, বসতি বলতে কয়েক ঘর মানুষের বাস মাত্র, ইলেক্ট্রিসিটির পোস্ট তখনও বোড়ালের মাটির স্পর্শ খুঁজে পায়নি আর তাই সন্ধ্যা হলেই মানুষের ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত হ্যারিকেন বা কুঁপির আলো, অঞ্চলের বেশীরভাগ মানুষেরই জীবিকা বলতে ছিল চাষাবাদ, হাতে গোনা যে ক'জন শহরের অফিস কাছারিতে যেতেন তারা সকাল-সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে ৮০ বি রুটের যে বাসটা রসুইপুর থেকে বোড়ালের ওপর দিয়ে শহরের দিকে যেত তাতে চড়ে বসতেন, এলাকার মাঝখানে ছিল হরিমাধব বিদ্যামন্দির, ক্লাস টেন অবধি সেখানে পড়ানো হত আর মাধ্যমিক পাশ করার পর যদি কেউ কলেজে পড়তে চাইত তাহলে তাকেও তখন ঐ ৮০ বি রুটের বাস ধরেই শহরে যেতে হত, এক কথায় শহর কোলকাতার সঙ্গে বোড়ালের যোগাযোগ বলতে তখন ঐ ৮০ বি রুটের খান কতক বাসেরই যা যাতায়াত ছিল। আমাদের বাড়িটা ছিল বাস রাস্তার ঠিক ওপরেই, দূর থেকে বাস আসার শব্দ শুনলে মা, ঠাকুমা আর আমি এসে দাঁড়াতাম বাড়ির বারান্দায়, টিভিতে আগে একটা অ্যাড দেখাতো, একটা ট্রেকারের সারা শরীর জুড়ে অনেকগুলো মানুষ একসঙ্গে দুলতে দুলতে চলেছে, আঠার দ্রব্য গুণে কেউ অবশ্য পড়ে যাচ্ছেন না, এই অ্যাডটা দেখলেই ছোটবেলায় দেখা সেই ৮০ বি রুটের বাসগুলির কথা মনে পড়ে যায়, খাল পাড় করে রসুইপুরের দিকে আসতে থাকা বাসগুলির গা বেয়েও প্যাসেঞ্জাররা ঠিক একই ভাবে যেন চিপকে থাকত।

শহরের দিকে যাওয়ার শেষ বাসটা ছিল বিকেল পাঁচটায় আর ঐ বাসটা চলে গেলেই মা গা ধুয়ে পরিষ্কার জামাকাপড় পরে ঠাকুরঘরে এসে রাধা-কৃষ্ণের ছবির সামনে বসতো, সুগন্ধি ধূপ জ্বালিয়ে চোখ বন্ধ করে ধরতো

মুরলিধরা গোপালা যশোদা নন্দলালা

নাচন লাগি বৃন্দাবন বালা


কাট – কাট – কাট – স্মৃতির পথে আজ আর অত ঘোরাঘুরি করবার সময় নেই, সকালে শুভ্রা ফোন করেছিল বলেছিল যে নাট্যমঞ্চে যে নাটকটা চলছে তার নাকি দুটো পাস কোথা থেকে জোগাড় করে রেখেছে। সন্ধ্যা ছ’টা থেকে শো, পাঁচটা বেজে গিয়েছে, এখনই বেরতে হবে, নইলে লেট হয়ে যাব, তবে আজ রবিবার, রাস্তায় সেরকম ট্রাফিক হবে না, এটাই যা বাঁচোয়া।


রবিবার, এই দিনটা ছোটবেলায় আমার খুব প্রিয় ছিল, রবিবার মানেই ছুটির দিন, বাবার অফিস নেই, আমারও স্কুল ছুটি, তাই সেদিন পড়া শেষ করেই বাবার সঙ্গে যেতাম বাজারে, বাজার থেকে ফিরে শুরু হতো বাগানচর্চা, বাবা খুব গাছ ভালোবাসত, আমাদের বোড়ালের বাড়িতে যে কত রকমের সবজী আর ফুল-ফলের গাছ ছিল তা গুনে শেষ করা যেত না, খুনকি দিয়ে বাবা প্রথমে গাছের গোঁড়াগুলির মাটি আলগা করে দিত আর তারপর তাতে সার মিশিয়ে আমায় বলতো গোঁড়ায় জল দেওয়ার জন্য, বাগানের কাজ সারা হলে পুকুরে যেতাম আমরা, একটা বড় রাবারের টিউব ছিল আমাদের, বাবা ওটায় হাওয়া ভরে নিতো আর আমি ওটার মধ্যে গলে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে শরীরটাকে পুকুরের জলে ভাসিয়ে রাখতাম।

সেই রবিবার সকাল থেকেই বাড়ির পরিবেশটা যেন একটু অন্যরকম, ভোর না হতে হতেই ঠাকুমা আর মা বাড়ির সব জিনিসপত্র ঝেড়েঝুরে সাফ করতে শুরু করলো, বাবাকেও দেখলাম বারবার দোকানে গিয়ে এটা-ওটা কিনে আনছে, ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করাতে বলল যে বিকেলে নাকি বিধুকাকু ওনার ছোটশালাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসবেন। বিধুকাকু হচ্ছেন গিয়ে বাবার বন্ধু, ওনার অবশ্য আরো একটা পরিচয় আছে, আমাদের স্কুলের অঙ্কের টীচারও উনি, যাই হোক বিধুকাকুর ছোটশালা কোলকাতায় একটা মিউজিক কোম্পানিতে কাজ করেন, কালই ভদ্রলোক এসেছেন এখানে আর কাকু আজ তাই শালাকে নিয়ে আসছেন আমাদের বাড়িতে মায়ের গান শোনাবেন বলে। বিকেল হতেই বাবা আর আমি ধরাধরি করে বাইরের ঘরের মেঝেতে বড় শতরঞ্চিটা পেতে ফেললাম, ফরসা একটা চাদরও বিছিয়ে দিলাম শতরঞ্চির ওপর, পাঁচটা নাগাদ বাড়ির সামনে রিকশার ভেঁপু, বাইরে গিয়ে দেখি কাকু আর ওনার শালা হারমোনিয়াম নিয়ে রিকশায় বসে আছেন, শালাবাবুর বয়স বেশী নয়, বাবাদের চেয়ে অনেক ছোটই হবেন, রোগা পাতলা চেহারা, মাথার চুলগুলি পিছন দিক করে আঁচড়ানো, চোখে রুপোলী ফ্রেমের চশমা, রিকশাওয়ালা আর অলোককাকু মানে বিধুকাকুর শালা হারমোনিয়ামটার দু দিক ধরে বসার ঘরের মেঝেতে নিয়ে এনে রাখলেন, চা পর্বের মাঝে কাকু ওনার শালার সঙ্গে আমাদের সবার পরিচয় করিয়ে দিলেন আর তারপর চা পর্ব শেষ হতেই হাঁক দিয়ে বলে উঠলেন,

'কই হে বৌঠান, এবার শুরু করো তোমার গান, অলোক তো সেই সকাল থেকে তোমার গান শুনবে বলে হা-পিত্যেশ করে বসে রয়েছে'।

আমি আর ঠাকুমা ঘরের ডান দিকের দেওয়াল ঘেঁসে বসা, বিধুকাকিমা আর ওনার ননদ আমাদের ডানদিকে, বাবা আর বিধুকাকু বসেছেন আমাদের উলটো দিকের দেওয়াল ঘেঁসে, অলোককাকু হারমোনিয়াম বাজিয়ে মাকে সঙ্গত করবেন, তাই উনি মায়ের মুখোমুখি একটু তেছড়া করে বসা, কাকুর আঙ্গুলগুলি হারমোনিয়ামের রিডে ঘুরপাক খাচ্ছে, মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে জীবনে প্রথমবার একসঙ্গে এতগুলো মানুষকে গান গেয়ে শোনাতে হবে বলে ভিতরে ভিতরে খুব টেন্সড, অলোককাকুর দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় মা বললো,' আমার কিন্তু হারমোনিয়ামের সঙ্গে গাইবার একদম অভ্যেস নেই' ।

-ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না, আপনি আপনার মত গেয়ে যান, দেখবেন আমি ঠিক আপনাকে ধরে নেব।

মা চোখ বন্ধ করে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে গেয়ে উঠলো

-মাইয়া মোরি, ম্যায় নেহি মাখন খায়া...............

ঘরের সবাই আমরা এখন মায়ের গানে মজে আছে, বিধুকাকু মাঝে মাঝেই ওনার ডান হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে বলছেন, বহুত আচ্ছা! কাকিমা আর ওনার ননদের চোখে অবাক হয়ে যাওয়া দৃষ্টি, যেন বলতে চাইছেন কই আমাদের পাড়ার বৌটা যে এত ভালো গান গায় তা তো জানতাম না! ঠাকুমা যথারীতি চোখ বন্ধ করে বসে রয়েছে, ঠাকুমার বন্ধ চোখের দু কোল বেয়ে জলের ধারা নেমে আসছে, বাবার চোখেমুখেও বেশ একটা গর্বের ভাব, মা যথারীতি গানের সঙ্গে মিশে গিয়েছে, এক একটা করে টান দিচ্ছে আর আমার মনে হচ্ছে আমাদের ঘরের ছাদটা এখনই দু-ভাগ হয়ে যাবে, মাইয়া মোরি-ই-ই-ই বলে আর একটা দীর্ঘ টান দিয়ে মা চোখ খুলল আর তারপর কাউকে কিছু বলে ওঠবার সুযোগ না দিয়ে আবার গেয়ে উঠলো

-এক রাধা, এক মীরা, দোনো নে শ্যাম কো চাহা

অন্তর ক্যায়া দোনো কি চাহ মে, বোলো.....

গান শেষ হলে অলোককাকু হারমোনিয়ামের বেলোয় আংটা পরাতে পরাতে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, বিধুদা বলেছিল বটে তবে সত্যি বলছি দাদা আমি কিন্তু ভাবতেই পারিনি যে বৌদি এত ভালো গান করেন, আপনারা ওনার গান শেখানোর ব্যবস্থা করুন, দেখবেন, 'এই গলা একদিন সংগীত জগতে ধামাকা লাগিয়ে দেবে'।

সুরোদাদুর বলা কবেকার সেই কথাগুলি আজ যেন আবার অলোককাকুর গলায় নতুন করে বেজে উঠল।


অফিসে ঢুকতেই বেয়ারা এসে জানালো যে বস খুঁজছেন, দরজায় নক করে মিত্রের চেম্বারে ঢুকলাম, আমাকে দেখেই উনি আঙুলের ইশারায় বসতে বলে আবার ল্যাপটপে মন দিলেন, ওনার দুই ভুরুর মাঝখানে এখন পরিষ্কার তিনটে ভাজ, খুবই চেনা লক্ষণ, হয় কিছুক্ষণ আগে জি এম সাহেবের ফোন এসেছিল নয়তো সকাল সকাল কারোর মুখে কোনো অর্ডার হারানোর সংবাদ পেয়েছেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনে দৃষ্টি রেখেই এক সময় উনি বলে উঠলেন, কুশল, এক্সিন ইন্টারন্যাশনালের কাউকে চেনো?

ওনার স্বভাবটাই এরকম, কিক-অফ না করেই একদম দুম করে প্রতিপক্ষের সীমানায় বল নিয়ে ঢুকে পড়েন, মনের সার্চইঞ্জিনে গিয়ে ক্লিক করলাম, এক্সিন, বিদেশী কোম্পানি, প্লান্ট কন্সট্রাকশনের কাজ করে, বছর দুয়েক হলো ইন্ডিয়াতে পা রেখেছে, মুম্বাইয়ে হেড-অফিস, কোলকাতায় ক্যামাক স্ট্রীটে ব্রাঞ্চ অফিস। আলফা সিস্টেম বলে আমার যে এক কাস্টমর আছে সেখানে শুভঙ্কর সিনহা বলে যে ছেলেটা কাজ করতো সে কিছুদিন হলো এক্সিনে জয়েন করেছে, শুভঙ্করের কথাটা অবশ্য বসকে বললাম না, হাতের তাস হুট করে মেলে ধরতে নেই, বললাম খোঁজ নিলে হয়তো কেউ চেনা-শোনা বেরিয়েও পড়তে পারে।

--দেন গো প্লিজ, ফাইন্ড আউট, ইটস ভেরি আর্জেন্ট,

কথাটা বলতে বলতে মিত্র ওনার ডান হাতটা এমন ভাবে নাড়লেন যে মনে হচ্ছে যেন উনি এখনই আমাকে এক্সিনের অফিসের দিকে দৌড়তে বলছেন।

কেসটা কী, মনের কৌতূহল যাতে মুখে ফুটে না ওঠে তাই মুখটা যথা সম্ভব নির্বিকার রেখেই কথাটা জিজ্ঞাসা করলাম।

ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে মিত্র এবার আমার মুখের দিকে সরাসরি চেয়ে, হাতে ধরা পেনটাকে অহেতুক টেবিলের কাঁচে দুবার ঠুকে বলে উঠলেন --এক্সিন বলে এই কোম্পানিটা নাকি উদয়পুরের একটা সোলার প্লান্টের কাজ পেয়েছে, শুধু তাই নয়, বাজারের খবর, আগামী ছ’মাসে এক্সিন এরকম আরো চারটে প্রজেক্টের কাজ পেতে চলেছে। ফোন, আমার না, বসের, ইয়েস স্যার ... ইয়েস ... ইয়েস .. উই আর অন দ্য জব ... আই হ্যভ অলরেডি টোল্ড কুশল টু ফাইন্ড সাম কন্টাক্টস ইন এক্সিন। জি সায়গল, আমাদের জি এম-মার্কেটিং, শালা! মিত্রের কী দরকার ছিল আমার নামটা বলার, মনে মনে বেশ একচোট খিস্তি করলাম বসকে, মুখে অবশ্য জিজ্ঞাসা করলাম এক্সিনের অ্যাকাউন্টটা এখন কার কাছে, উত্তরটা যে আমার অজানা তা নয় কিন্তু এই মুহূর্তে বাগে পেয়ে মিত্রকে একটু লেগ পুলিং করতে মন্দ লাগছে না, এক্সিনের অ্যাকাউন্টটা আছে নীলয়ের কাছে, এই ছেলেটি কিছুদিন হলো আমাদের অফিসে জয়েন করেছে আর জয়েন করেই বুঝে নিয়েছে যে চিন্ময় মিত্রকে লাগানোর জন্য কোন কোম্পানির তেল সবচেয়ে কার্যকরী, তাই আজকাল ব্রাঞ্চ মিটিংয়ে প্রায়ই নীলয়ের অ্যাচিভমেন্টগুলি হাইলাইট করে মিত্র আমাদের হুড়কো দেন।

-নীলয় দেখছে, বাট, ট্রাই টু আণ্ডারসটান্ড, ইটস এ বিগ ডিল এন্ড ইট নিডস ইনভলভমেন্ট অফ আ সিনিয়র পার্সন লাইক ইউ।

আহা, কি মাখনটাই না লাগাচ্ছেন বস, নিশ্চয়ই খুব জোড় ফেঁসেছেন, নইলে ওনার মত লোক আমাকে এত তোল্লাই দিত না, বুঝলে কুশল, সায়গলসাহেব বলছেন এই প্রজেক্টটা থেকে উনি মিনিমাম পাঁচটা নমিনেটেড স্পেক আশা করছেন, মনে মনে হিসেব করলাম, আমাদের পাঁচটা প্রোডাক্ট ডাটাশিটে স্পেসিফাই হয়ে গেলে একটা প্রজেক্ট থেকেই কমসে কম আঠারো থেকে কুড়ি কোটি টাকার ব্যবসা উঠে আসবে আর পরের বছর মিত্রর এ জি এম হওয়াটা কেউ আটকাতে পারবে না, আমার ভাগ্যে অবশ্য ঐ তিন-চার পার্সেন্টের ইনক্রিমেন্টই জুঠবে। না, কেসটা থেকে আমাকেও কিছু বাগাতে হবে। শুভঙ্করের সঙ্গে কথা বলে দেখি, যদি স্পেকের ব্যাপারে কিছু কানেকশন জোগাড় করতে পারি তাহলে মিত্রকে দিয়ে গাড়ি কেনবার লোনটা পাশ করিয়ে নেব। গাড়ির শখ অবশ্য আমার নেই, ইনফ্যাক্ট কোলকাতার রাস্তায় গাড়িওয়ালাদের রোজ যা দুর্দশা দেখি তাতে গাড়ি কেনার ব্যাপারে আমার একটুও আগ্রহ নেই। কিন্তু উর্মি আজকাল কথায়-কথায় যে খোটাগুলি দেয় তাতে এখনও আমার গাড়ি কিনতে না পারাটা একটা মেন পয়েন্ট। তবে আমি জানি, গাড়ি কিনলেও উর্মির চোখে আমার খুব একটা উত্তরণ হবে না, সেখানে এখন শুধুই অবতরণ, এ স্লোপিং কার্ভ হুইচ হ্যাজ ওনলি ডাউন-ওয়ার্ড মুভমেন্ট।


মুম্বই (তখন বম্বে) থেকে অফিসের মিটিং শেষ করে ফিরছি, বিকেলের ফ্লাইট, বোর্ডিং পাস নেওয়ার সময় অনেক রিকোয়েস্ট করেও জানলা বা প্যাসেজের দিকের সিট পেলাম না, তবে প্লেনে চড়ে জানলার পাশের সিট না পাওয়ার দুঃখটা কিছুটা হলেও যেন কমে গেলো, আমার বাঁ দিকে জানলা ঘেসে বসে রয়েছেন বেশ ঝকঝকে দেখতে এক সুন্দরী, আর কে না জানে পাশের সিটে সুন্দরী যুবতী থাকলে মাঝের সিটে বসেও পুরুষদের নিজেকে বেশ কমফর্টেবল লাগে। এয়ার হোস্টেসদের শিক্ষাদান পর্ব শেষ, প্লেনের চাকা গড়াতে শুরু করেছে, যে কোনো মুহূর্তে মাটি ছেড়ে আমরা শূন্যে ভেসে পড়ব, সুন্দরীর মুখ প্লেনের জানলার দিকে, আড়চোখে তাকাচ্ছি আর ভাবছি আলাপ জমানোর কোন ছুতোটা অ্যাপ্লাই করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম জানাচ্ছে যে এখন ইচ্ছে করলে আমরা সিটবেল্ট খুলে বসতে পারি, সিটের ওপর শরীরটাকে সামান্য নাড়াচাড়া করে সুন্দরী যেন নিজেকে একটু রিল্যাক্স করে নিলেন আর তারপর হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটা ম্যাগাজিন বের করে চোখের সামনে মেলে ধরলেন, মুখ দেখেই মনে হচ্ছিল, ম্যাগাজিনের কভার পেজ দেখে নিশ্চিত হলাম, বাঙালি, ততক্ষণে যুবতী ম্যাগাজিনের এ পাতা থেকে ও পাতায় চোখ বুলিয়ে শেষমেষ শব্দছক নিয়ে পড়েছেন এবং যথারীতি আটকেও গিয়েছেন। ওপর-নিচ কলমের পাঁচ অক্ষরের এই শব্দটা আমি জানি কিন্তু সুন্দরীকে আরো কিছুক্ষণ ভাববার সময় দিয়ে এক সময় খুব কায়দা করে বলে উঠলাম, 'এক্সকিউজ মি, শব্দটা রাজতিলক হবে'।

থ্যাংকস, ‘ক’ এর সঙ্গে মিলিয়ে পাশাপাশির তিন অক্ষরে ‘কমল’ লিখে সুন্দরী এবার আমার মুখের দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোলকাতায় থাকেন'?

ব্যাস, পরের দু-ঘণ্টায় আমাদের আলাপ প্লেনের গতিকেও যেন হার মানালো, ওনার বাড়ি কোলকাতার যাদবপুরে, নাম উর্মিমালা মালাকার, বড়বাজারে বাবার সোনার দোকান, এবছরই হিস্ট্রিতে অনার্স নিয়ে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছেন, বোম্বেতে মাসীর বাড়ি, সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলেন, দিন পনের বাদে কোলকাতায় ফিরছেন, বাড়িতে পোষা লুসি মানে সাধের অ্যালসেসিয়ানটা কেমন আছে তা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন। আমিও নিজের নাম বললাম, জানালাম কাজল কর আমার মা হন, কিন্তু খুব একটা ফুটেজ মিলল না, সত্যি কথা বলতে কী আমাদের এই আজকালকার জেনারেশনে ক’জনাই বা আর রাগ সঙ্গীতের আর্টিস্টদের নাম জানে বা তাদের গান শোনে। মায়ের নাম কাজ করল না দেখে নিজের বায়োডাটাতেই মন দিলাম, যাদবপুরের বি ই, মেক, এম এন সি তে সেলস একজিকিউটিভের কাজ করি, বম্বেতে গিয়েছিলাম অ্যাওয়ার্ড অফ এক্সেলেন্স নিতে, পুরস্কারের কথাটা অবশ্য এমন ভাবে বললাম যেন এই ধরনের অ্যাওয়ার্ড আমি প্রায়ই পেয়ে থাকি। মাথার ওপরে আবার সিট-বেল্ট বাঁধার সংকেত, পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম জানাচ্ছে যে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বিমান কোলকাতায় অবতরণ করবে, ভাবছি, বাড়ির ফোন নম্বরটা চাইলে নিশ্চয়ই না করবেন না, কিন্তু চাইব-চাইব করেও শেষ অবধি আর চেয়ে ওঠা হলো না, তার আগেই প্লেনের চাকা রানওয়ের মাটি ছুঁয়ে ফেলল আর একজিট থেকে বেরতে না বেরতেই একটি অল্প বয়স্কা মেয়ে আর আমার থেকে বয়সে বড় এক গম্ভীর টাইপের ভদ্রলোক উর্মিমালার দখল নিয়ে নিলেন, উর্মিমালাও দেখলাম ওনাদের সঙ্গে কল-কল করতে করতে বেড়িয়ে গেলো প্রাইভেট গাড়ির পার্কিংয়ের দিকে।

পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে ...মহীনের ঘোড়াগুলি, পৃথিবীটা সত্যিই ছোট হয়ে যাচ্ছে কী না তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কিন্তু গানটাকে সত্যি করে পৃথিবীটা সত্যিই আমার চোখের সামনে ছোট হয়ে দেখা দিল আর সেটা ঘটলো নিউ এম্পায়ার সিনেমার সামনে, স্টিফেন পল, সুইস পরিচালক, আমার অত্যন্ত প্রিয় ফিল্ম ডিরেক্টর, বহুদিন বাদে কাল ওনার ছবি আবার কোলকাতায় রিলিজ করেছে, শনিবারের হাফ-ছুটির পর তাই আজ অফিস ফেরত সোজা চলে এসেছি লিন্ডসেতে, বিদেশকেও সঙ্গে আসতে বলেছিলাম কিন্তু ও বললো ওর নাকি একটা কাজ আছে, একাই এলাম তাই, গেট খোলার এখনো মিনিট দশেকের মত দেরী, তাই সিগারেট ধরিয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতে থাকা সুন্দরীদের দেখছি, হঠাৎ কানের কাছে একটা রিনরিনে মহিলা কণ্ঠস্বর বেজে উঠলো, 'এই যে, কেমন আছেন'?

ঘাড় ঘুরিয়ে ডান দিকে তাকাতেই মনে হলো যেন হাজার ওয়াটের আলো সেখানে, উর্মিমালা আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন, ওনার পাশে এয়ারপোর্টে দেখা সেদিনের সেই মেয়েটি।

-আপনি, এখানে, আই মিন, সিনেমা দেখতে ...... রীতিমত তোতলাচ্ছি আমি।

-না সিনেমা দেখতে আসব কেন, ভাবছি একটা সিনেমাহল কিনব, তাই সরজমিনে হলটা দেখতে এসেছিলাম।

নিজেকে এর মধ্যে সামলে নিয়েছি আমি।

-তা কিনতেই পারেন! শুনেছি তো বড়লোকদের মেয়েদের নাকি এরকম অনেক সৃষ্টিছাড়া সখ থাকে।

-বাবা! মেয়েদের সখ নিয়ে দেখছি বিস্তর পড়াশুনা করেছেন!

উত্তরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু তার আগেই উর্মিমালা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখিয়ে বলে উঠল, এ হচ্ছে আমার ছোট বোন, শর্মি, এইবার এইচ এস দেবে। এয়ারপোর্টে সেদিন এক ঝলক দেখেছিলাম, আজ ভালো করে তাকিয়ে দেখি উর্মির বোন বলে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই, দুজনার মুখের গড়ন প্রায় একই রকমের।

শর্মির দিকে তাকিয়ে উর্মিমালা বলে যাচ্ছে, সেদিন তোকে বলেছিলাম না যে এবার বম্বে থেকে ফেরার সময় প্লেনে একজনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে, ইনিই হচ্ছেন সেই মিস্টার কুশল কর।

-হাই কুশলদা, দিদি সেদিন আপনার অনেক গল্প করেছিল।

প্রথম বেল, হলের দিকে পা বাড়াই, এখুনি শুরু হবে স্টিফেন পলের দ্য লাভ এন্ড দ্য স্টোরি।

ইন্টারভ্যাল, হলের লাইট জ্বলে উঠতে আপনা থেকেই দৃষ্টি গিয়ে পড়লো সি রোয়ের দিকে, ঐ তো প্যাসেজের দিকের প্রথম দুটো সিটে উর্মি আর শর্মি বসে রয়েছে, চোখাচোখি হতে হাত নেড়ে হলের বাইরে চলে এলাম, সিগারেটে টান দিয়ে ফেরার পথে দুটো পপ-কর্ণ আর চিপসের প্যাকেট সঙ্গে নিলাম।

-এ বাবা, এগুলো আবার কেন, শর্মির হাতে প্যাকেট-দুটো দিতে উর্মি চোখ পাকিয়ে বলে উঠলেন।

সিনেমা দেখার ফাঁকে টুক-টাক খাওয়ার জন্য, হলের লাইট আবার নিভতে শুরু করেছে, নিজের রোয়ের দিকে হাঁটা লাগালে উর্মি খুব নিয়ন্ত্রিত স্বরে বলে উঠলেন, সিনেমা শেষ হলে আমি যেন আবার দুম করে চলে না যাই।

দুম করে তো মোটেও আমি যাই না, ওটা বরং তুমি করো, সওয়া দু’ঘণ্টার আলাপটা সেদিন দুম করে শেষ করে দিয়েছিলে ইভন উইদাউট সেয়িং আ ফর্মাল বাই। পর্দার সিনেমায় বুঁদ হতে হতে হতে নিজের মনেই কথাগুলি বলে উঠলাম। যুবতী মেয়ে এতদিনে জেনেছে যে তার পিতা আসলে একজন বৈদেশিক সৈনিক, মায়ের মৃত্যুশয্যায় সেকথা জানার পর মেয়ে তাই পাড়ি দিয়েছে সেই দেশে যেখানে তার বাবা থাকেন, বাবাকে খুঁজে বার করতেই হবে আর শুধু খুঁজে বার করাই নয়, বাবার কাছে তার কিছু জিজ্ঞাসাও আছে, কেন সে এতদিন বৌ আর মেয়েকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, মনের মধ্যে মেয়েটির যেন প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে, অনেক বঞ্চনার ইতিহাস লেখা আছে সেই আগুনে, বাবার সঙ্গে দেখা করে মেয়ে আজ সেসব প্রশ্নের উত্তর চাইবে নইলে তার মৃত মায়ের আত্মা শান্তি পাবে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মেয়েটি অবশেষে তার বাবাকে খুঁজে পায় কিন্তু তার সঙ্গে এটাও জানে যে তার বাবা অনেকদিন ধরে মিথ্যে রাজদ্রোহের দায়ে জেলে বন্দী। মেয়েকে কাছে পেয়ে বাবা জানায় যে যুদ্ধ শেষে যখন সে স্ত্রী আর মেয়ের কাছে ফিরে যাবে বলে ঠিক করেছিল ঠিক তখনই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাকে জেলে বন্দী হতে হয় আর এতগুলো বছর ধরে সে জেলেই বন্দী হয়ে রয়েছে, বাবা-মেয়ের দেখা হওয়ার দৃশ্যটা ভীষন হৃদয় বিদারক, অসম্ভব ভালো অভিনয় করেছেন অভিনেতা-অভিনেত্রী দুজনাই, আশেপাশে অনেককেই দেখলাম রুমাল বার করে চোখের জল মুছছেন, বাবার মুখে সব কথা শুনে মেয়েটির মনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে, এতদিনের ঘৃণা বা বিদ্বেষের বদলে সেখানে এখন ভালবাসার ছোঁওয়া, এরপর শুরু হয় বাবা-মেয়ের এক নতুন যুদ্ধ, এই যুদ্ধে তারা সহ-সৈনিক, শেষে হাজারো প্রতিকূলতা পার করে মেয়েটি তার বাবাকে নির্দোষ বলে প্রমাণ করে।

সিনেমা শেষ, হল থেকে বেরিয়ে আসছি, দুই বোন দেখি হলের বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।

-চলুন কোথাও বসে একটু চা খাওয়া যাক, অত্যন্ত ফর্মাল ভাবে কথাটা বললাম।

তা খাওয়া যেতেই পারে, কিন্তু তার আগে আমাদের কিছু কেনাকাটির আছে, আপনার আবার বাড়ি ফেরার তাড়া নেই তো।

তাড়া! তাড়া কীসের উর্মি! তুমি চাইলে গোটা একটা দিন আমি তোমায় উপহার দিতে পারি, মুখে বললাম, না, না, সেরকম তাড়া নেই, চলুন, আপনাদের কেনাকাটাগুলি আগে করে ফেলুন, তারপর না হয় কোথাও বসে চা খাওয়া যাবে।

লাঞ্চের পর অফিস থেকে বেড়িয়ে পরলাম, ক্যামাক স্ট্রীটের মুখে যে বড় বিল্ডিংটা আছে সেখানেই এক্সিনের অফিস, ঘুরেই আসা যাক একবার শুভঙ্করদের অফিস থেকে।


ক্রমশ