রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

কটন কলেজ, পর্ব ৯

নয়

মশারিটা বিছানার চারপাশে গুঁজে দিয়ে একটা বই পড়ব ভাবলাম। না ,পড়া সম্ভব নয়।পাশের ঘরে বড় গণ্ডগোল হচ্ছে।মশারির নিচে দিয়ে হাত বের করে হাতড়ে হাতড়ে সূইচ অফ করে দিলাম। ঘরটা অন্ধকার হয়ে পড়ল।

পাশের ঘরে বড় বেশি গণ্ডগোল হচ্ছে।হোস্টেলেনতুন ছেলে এসেছে।হোস্টেলের তথাকথিত নিয়মানুসারে অর্থাৎ নবাগতদের ওপর যথারীতি র‍্যাগিং চলছে।

একজনও রুমমেট নেই। রমেনই এসব কিছুর প্রধান পাণ্ডা। কেন করে,কেউ জানে না,কিন্তু এটা জানে নতুন ছেলে এলে কিছুটা উৎপাত করতে হয়,কারণ আমাদের করেছিল,আমরাই বা কেন করব না।

এই ‘কেন’র কোনো সমাধান নেই বলেই হোস্টেলে হোস্টেলে বছরের পর বছর ধরে নিয়মটা চলে আসছে।বয়েজ হোস্টেলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য গার্লস হোস্টেল গুলিতেও এর বীজাণু ছড়িয়ে পড়েছে।কে কোথায় কবে শুরু করল কেউ জানে না।ভারতেরআজ যে কোনো হোস্টেলেই যান না কেন এটাকে হোস্টেলের প্রথম অভিজ্ঞতা বলে সবাই স্বাগত জানিয়েছে।

একটা যুগ ছিল যখন নিচের ক্লাসের ছেলেরা ওপরের ক্লাসের ছেলেদের গুরুর মতো ভক্তি করত,অনুগত ভৃত্যের মতো কাজ করে দিত এবং তার পরিবর্তে আদায় করে নিয়েছিল ভালোবাসারঅভিভাবকত্ব।

কিন্তু যুগের পরিবর্তন হল।বেনসনের দিনের ইটন স্কুলে ওপরের শ্রেণির ছেলেকে ভোরবেলা জাগিয়ে আবশ্যকীয় কাজ করে দেবার মতোআর করতে ভালোবাসল না।আজকের যুগের ছেলেরা ,সমঅধিকারেরদাবী জানাতে শিখল।

তার ফলে আরম্ভ হল বর্বরতার দাবী।নতুনছেলেদের এভাবে রাখবে যাতে তোমাকে ভয় করে,ভক্তি করাটা ক্লাসিকেল শব্দ,বিজ্ঞানের যুগে ডেড ওয়ার্ড,সংস্কৃতের মতোই অনাবশ্যক।সেদিন থেকে শুরু হল এই দৌরাত্ম। কেউ কেউ এই দৌরাত্মের উৎপাতে থাকতে না পেরে শিক্ষাজীবনেরঅবসান ঘটাল।

সেইজন্য ভয়াতুর,Cowards die many times before their death এর মতো তাঁরা বিদায় জানাল,তাঁদের জন্য কেউ অনুশোচনা করল না।

আমার ওপরেও গত বছর উৎপাত করেছিল।প্রথমদিকে সত্যিই কিছুটা ভয় পেয়েছিলাম।পরেসহ্য হয়ে গেল।সভ্যতার অবদান জ্ঞান আহরণ করতে গিয়ে আদিমতার স্বাদ কেমন লেগেছিল বলতে পারব না,কিন্তু Whitemen এর ভাষায় বিনা সঙ্কোচে বলতে পারতাম,--I think I could turn and live with animals, they are so placid and self contained সভ্যতার উচ্চ শিখরে উঠে পশুত্বকে নিয়ে করা আমোদ স্ফুর্তি সত্যি পশুতূল্য হতে পেরেছিল?

তবু র‍্যাগিং শেষ হওয়ার পরে আমাকে বলেছিল, Animality gives Sincerity

পশুত্বই নাকি সরলতা দান করে।আজ যদি আমি ছেলেদের,নতুন স্বপ্ন নিয়ে আসা ছেলেদের আমার ওপর করা অত্যাচারের মতোই উৎপাত করতাম,আমিও তখন বলতাম Animality gives Sincerity।ওরাও আমার কাছে শিখত, মা-বাবার স্নেহময় কোল থেকে বেরিয়ে এসে আত্মনির্ভরশীল হতে শেখার প্রথম পদক্ষেপে,তথাকথিত সমাজে যদি বেঁচে থাকতে চাও,যদি মানুষ বলে পরিচয় দিতে চাও তুমি পশু হও,মানুষ হতে চাওয়া মানেই বারান্দার কুকুর হও তথাকথিত সমাজের উচ্ছিষ্টের মধ্যেজায়গা করে নিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়াও।

তাই এই ছেলেগুলি কোনো ভুল করেনি।জীবনেরএক চরম সত্যের কেবল একটি নাটক করে দেখিয়েছে,তার জন্য ওদের দোষ কোথায়?

দোষ দেবার জন্য মানুষ রয়েছে,শাস্তি দেবার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ রয়েছে,তাছাড়া আছে প্রতিটি ছেলেরই আত্মসম্মানবোধ। এইসব কিছু থাকার পরেও ছেলেগুলি কী করে?

কারণ তাঁদের এই যুবক বয়সে,বয়ঃসন্ধিরসন্ধিক্ষণে জীবনের ব্যতিক্রমী স্বাদ চাই,excitement। কিছুদিন আগে একটা ইংরেজি উপন্যাস পড়েছিলাম।নামটা ভুলে গিয়েছি।নাম মনে রাখার মতো কোনো বিখ্যাত বই নয়।

উপন্যাসের নায়ক বয়ঃসন্ধিরসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যুবক।জীবনেটাকা-পয়সা,আমোদ-প্রমোদ কোনো কিছুরই অভাব নেই।তবু কোটিপতি বাপের সন্তান হয়েও অনুভব করে জীবনটা বড় বোরিং,কোনো excitement নেই।অবশেষে কোনো কারণ ছাড়াই সে একটি মেয়েকে হত্যা করে ফেলে। কারণ? কোনো কারণ নেই,কারণ ছেলেটির excitement চাই।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে গোটা বিষয়টা হয়তো অবিশ্বাস্য।তবু,কখনও আমার নিজেকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে,আমাদের কি কোনো ব্যতিক্রম চাই না? আমাদের কি কোনো excitement চাই না?

কিন্তু কলেজ,ক্লাস,ক্যান্টিন,হোস্টেলের এই রুটিন জীবনে excitement কোথায়?

আজ যদি আপনি কটন কলেজের একটি ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেন,কলেজ এবং হোস্টেলে পড়াশোনা করা সময়টুকু ছাড়া সে শারীরিক আর মানসিক বিকাশের জন্য সারাদিনে কী করে,শতকরা নিরানব্বইজনের কাছ থেকে উত্তর আসবে কিছুই করি না।

এই কিছুই না করা শতকরা নিরানব্বইজন ছাত্রই যখন একটা ক্লাস করে দুটো অফ পিরিয়ড পানবাজারের কোণে আড্ডা মেরে কাটিয়ে দেয় তখন এই ছাত্রগুলির কাছ থেকে কী ধরনের বৌদ্ধিক বিকাশ আশা করা যেতে পারে?পারেন না,আপনি কিছুই আশা করতে পারেন না।

আপনি বলতে পারেন,পানবাজারের কোণে আড্ডা দেওয়ার চেয়ে কমন রুমে খেলাধুলো করছে না কেন? অথবা লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়াশোনা করছে না কেন?কিন্তু কমন রুমে কী খেলবে?লাইব্রেরিতেখোঁজ করা বই পাবার সৌভাগ্য কজনের হয়েছে?

এইসব ছেলে যার স্বপ্ন আছে,কিছু একটা করার দুর্বার আগ্রহ রয়েছে।এরা চায় এক গতিশীল জীবন,চায়excitement,জীবনের এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ চায়।কিন্তুতা করার মাধ্যম কোথায়,তা করার পরিবেশ কোথায়?তাই এই শক্তিশালীবিস্ফোরণের প্রকাশ যদি র‍্যাগিয়ের রূপ লাভ করে,যদি পাশ দিয়ে পার হয়ে যাওয়া একটা মেয়েকে উত্যক্ত করে excitement চায় এই ছেলেরা,তখনকি তাদের দোষ দেওয়া যায়?

র‍্যাগিং খারাপ বলে সম্পাদককে কটু ভাষায় চিঠি লেখা যেতে পারে,কর্তৃপক্ষকেগালি গালাজ করা যেতে পারে অথবা কলেজ থেকে দুই একজন ছেলেকে তাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।কিন্তু এতে কি সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে?

না,হতে পারে না। বছর শেষে অনুষ্ঠিত কলেজ সপ্তাহেই নাকি বৌদ্ধিক প্রকাশের সাফল্য প্রচেষ্টা?

এই প্রশ্নের উত্তর কলেজ কর্তৃপক্ষ দেয় না।এই প্রশ্নের উত্তর অধ্যাপকরা দেয় না। এই প্রশ্নের উত্তর অভিভাবকরাও দেয় না।তাই আপনি এদের দোষ দিতে পারেন না।

আজ যে ছেলেদের আপনি বলে সম্বোধন করছি কাল ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে তারা তুই হয়ে দাঁড়াবে,দুজনে মিলে একটা সিগারেট খাবে,একই মেয়েকে থার্ড ইয়ারের একটি ছেলের সঙ্গে প্রি ইউর একটি ছেলে খ্যাপাতে পারবে।এতে কী কোনো ভুল রয়েছে,না কোনো ভুল নেই।

হয়তো এই কোনো ভুল হয়নির একই ফমূর্লা প্রবীরকে আমি আজ বিকেলে বলতে পেরেছিলাম। Animality gives Sincerity। প্রবীর প্রতিবাদ করেনি।প্রতিবাদকরার মতো হয়তো তার সামনে কোনো যুক্তি ছিল না।

কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।সত্যিই সে কি এই চরম সত্যটাকে সত্যি বলে মেনে নিতে পেরেছিল?

প্রবীর আমার কেউ নয়,আমার বন্ধু।তবুওতথাকথিত বন্ধুদের চেয়ে সে যেন কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল,সব সময় সত্যি বলে ভেবে আসা মতেই আমি যেন প্রবীরের কথা ভাবতে পারছিলাম না—I had money and my friend ,I lost money and my friend।প্রবীর আজ বিকেলে এসে হাজির হয়েছিল।সেপ্রায়ই আসে।প্রবীরইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে,আমি কটনে।প্রায় দেড় বছরেই দুটো আলাদা আলাদা পরিবেশের মধ্যে থেকে,আলাদা আলাদা নতুন নতুন বন্ধুগুলিরমধ্যে থেকেও আমরা দুজন যেন সরে যেতে পারলাম না।বরং আগের চেয়ে বেশি কাছাকাছি চলে এলাম।

হোস্টেল থেকে গুয়াহাটি এলে বাস থেকে নেমেই তার বন্ধু বান্ধবদের ছেড়ে আমার কাছে এসে হাজির হয়।আমিও ও এলে আমার সমস্ত বন্ধু বান্ধবকে বাদ দিতে পারি।একথা আমার রুমমেটরাওজানে।সেজন্য প্রবীর এলে বন্ধুরা নিজে থেকেই দূরে থাকে।

সত্যিই আমরা দুজন একসঙ্গে থাকলে বাকিদের অস্তিত্ব ভুলে যাই।আমরা যখন কোনো বিষয়ে তন্ময় হয়ে কথা বলি তখন যদি কেউ হঠাৎ এসে উপস্থিত হয় ,আমরা দুজনেই তখন অনুভব করি,আমাদের ভাব আর চিন্তাধারার সঙ্গে সেই তৃতীয় পুরুষের যেন কোনো সম্পর্ক নেই।আমরা যেন একটা পৃ্থক জগতের মানুষ।

আজও প্রবীর এসেছিল।আগেইআসব বলে খবর দিয়ে রাখায় বিকেলে কোথাও বেরোইনি।রুমমেটরা প্রবীর আসবে শুনে কোথাও যাবার জন্য অনুরোধ করেনি।

প্রবীর আসার পরে আমরা দুজনেই বেরিয়ে গেলাম।প্রথমে আমাদের গন্তব্যস্থানহল সিজি হোস্টেল,আমি কুন্তলার সঙ্গে দেখা করব আর প্রবীর নির্মালী হাজরিকার সঙ্গে দেখা করবে। কুন্তলার কাছে আমি যদি ভিজিটিং ডে’র দিন না যাই পরের দিনেই খবর করবে আমি কেন যাইনি। তাই বুধ আর রবিবার বিকেলে কুন্তলাকোথাও যায় না,গেলে আমাকে খবর দিয়ে যায়। যেতে যেতে হোস্টেলের সুপার থেকে আরম্ভ করে চৌকিদার পর্যন্ত আপন হয়ে উঠেছে। আজকাল আর ভিজিটরস বুকে সই করতেও হয় না,চৌকিদারকে ও বলতে হয় না কার খোঁজে গিয়েছি।হোস্টেলের ঠিক গেটের মুখে দোতালা হোস্টেলটারওপরের বারান্দায়শুনি ‘কুন্তলা দিদি।‘তারপরে দৌড়ে নেমে এসে কুন্তলা বলবে, ‘তুমি আসবে বলে আমি তখন থেকে পথ চেয়ে রয়েছি,এত দেরী করলে কেন?’ ‘এই কেন এত দেরি করে এলে’ কথাটা আমি দিনের দুটোর সময় গেলেও বলবে,বিকেল পাঁচটার সময় গেলেও বলবে।তাই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে বলে আমি ভাবিনি,সেইজন্য অন্যান্য দিনের মতো বলি,এমনিতেই’।

সুরভি দিদি সুপার থাকার সময় আমাকে দেখলেই বলেন,‘এলে’যেন আমার আসাটা একটা দৈনন্দিন ঘটনা।কখন ও দিদি আমার সঙ্গে কথা বলে অনেক সময় কাটিয়ে দেন।আমার মনে হয় যেন দিদির বাড়ি এসেছি,কোনো গার্লস হোস্টেলে আসিনি।আজকাল কেন জানি নতুন সুপার আসার পর থেকে হোস্টেলে আসতে ভালো লাগে না।হয়তো নতুন সুপারের গুমরো মুখটাই এর জন্য দায়ী।অবশ্যএছাড়া অন্য একটি কারণ ও রয়েছে।কখন ও ছোট ছোট ঘটনাই বড় ভালো মানুষের প্রতিও ধারণা বদলে দেয়।

গতবার পুজোর কথা।

পুজোর বন্ধের শেষে আসার সময় বাসে এসেছিলাম।গুয়াহাটিতে প্রতি বছর উজনি অসম থেকে শত শত ছেলে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য আসে।সেইজন্যবন্ধে,আসা-যাওয়ার সময় বাসে বড় ভিড় হয়।বাসে বেশি ভিড় হওয়ার জন্য,সেবার গুয়াহাটিতেডিব্রুগড়,শিবসাগর এবং যোরহাট থেকে স্পেশিয়াল বাস দিয়েছিল।

প্রায় কয়েকটা বাস একসঙ্গে এসেছিল।কিন্তু আমাদের অভার টেক করে পার হয়ে আসা একটা বাস হঠাৎ কাজিরাঙ্গার পাশের একটা সেতুতে অ্যাক্সিডেন্ট করে।আমরা পেছন পেছন আসছিলাম।সেইজন্য আমাদের বাস সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল।বাসের কোনো লোক যদিও আহত হয়নি বাসটা তাড়াতাড়ি চালানোর মতো অবস্থায় নেই।

বাসের প্রায় যাত্রীরাইপরিচিত।অনেকেই কটন কলেজের ছাত্র ছাত্রী।এইনতুন সুপারও এসেছেন।অবশেষে আমরা ঠিক করলাম মহিলা এবং মেয়েদের আমাদের বাসে নিয়ে যাব,জিনিস পত্র সহ ছেলেদের নগাঁও থেকে আসা পরের বাসে যাব।

সেইমতোই মেয়েরা আমাদের বাসে উঠল।নতুন সুপারও উঠলেন,তাকে আমার সিটটা ছেড়ে দিয়ে আামি তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম।এভাবে আমি গুয়াহাটি পৌছলাম।কিন্তু কী আশ্চর্য যে মহিলার জন্য আমি সিটটা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে এলাম সেই মহিলা ভুলেও একবার কিছু বললেন না।মুখের চেহারা দেখে এরকম মনে হল যেন তাঁর সিটটাতে এত সময় অনধিকারভাবে বসে এসেছিলাম।

কাজিরাঙ্গা থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত দাঁড়িয়ে এসেছি।আমিতাঁর ছাত্র,ইচ্ছা করলে একই সিটে আমার জন্য কিছুটা জায়গা বের করে দিতে পারতেন।ধন্যবাদজানানোর কথা বাদই,সামান্য সৌজন্যটুকুওপ্রকাশ করলেন না। বাস এসে জখলাবন্ধায় দাঁড়াল।অল্প সময়ের জন্য আমরা নিচে নামলাম।

হঠাৎ আমার একজন বন্ধু ‘পুরুষের বিশ্রাম ঘর’এর দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,’বুঝেছ?’

আমি কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম,’কি?’

‘মহিলার বিশ্রাম ঘর থাকতে পুরুষের বিশ্রাম ঘরের সামনে আমাদের সুপার দিদি দাঁড়িয়ে কেন জান?’

‘কেন?’

‘সেই যে মহিলার বিশ্রাম ঘরে গ্রামের মহিলারা বসে রয়েছেন,তাদের চেয়ে উনার যে পার্থক্য রয়েছে সেই কথাটা অন্যেরা বুঝতে না পারলেও তিনি ভালো করেই জানেন,তাই …

বন্ধুর অবজারভেশন দেখে খুব ভালো লাগল।আমাদেরআধুনিকতার উলঙ্গ রূপটা মনে হয় এভাবে যেখানে সেখানে বড় নির্লজ্জভাবে প্রকাশ পায়।আমি অবশ্য তাকে কিছু বললাম না। নিজের ওপরে রাগ হল,কী দরকার ছিল এতটা সৌজন্য দেখানোর?যদি এই ধরনের ব্যবহার কোনো অশিক্ষিত মহিলা করতেন তাহলে ভাবতাম ,কিছুই জানে না,অশিক্ষিত,বোকা।

একটা সরকারি কলেজের অধ্যাপিকা,একটা মেয়েদের হোস্টেলের সুপার,এরকম একজন মানুষের মধ্যে যখন সৌজন্যের অভাব দেখা যায় তখন আপনি কী বলবেন?

এটাই কি স্ত্রী স্বাধীনতা,স্ত্রী শিক্ষার প্রকৃত স্বরূপ?

অবশ্য এর থেকে আমি একটা শিক্ষাও লাভ করলাম।মহিলা বলে আমরা বেশি নম্র,বেশি ভদ্র হতে চাওয়া মনটা সেদিন থেকে কিছুটা হলেও সংযত হবে।

এইজন্যই বোধহয় সুরভি দিদি চলে যাবার পর থেকে আমার কুন্তলাদের হোস্টেলে যেতে ভালো লাগে না।কুন্তলাকেবলেছি,সে বুঝে না।উল্টে সে প্রশ্ন করে,তুমি আমার কাছে আস নাকি সুপার দিদির কাছে আস?

প্রবীর এবং আমি মেয়েদের হোস্টেলের সামনে পৌছে গেলাম।কিন্তু আমরা যেন ভুলে গেলাম আমি কুন্তলার সঙ্গে আর প্রবীর নির্মালীরসঙ্গে দেখা করতে এসেছি।নিজের খুশিতে চলে বেড়ানো পা দুটি আমার নদীর তীরের দিকে নিয়ে গেল।

আমি জানি প্রতিদিনেরমতো প্রবীরের সমস্ত উদ্যম মেয়েদের হোস্টেলের সামনে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে গেছে।প্রবীরেরএই দুর্বলতারকথা আমি জানি,সেইজন্য সে কেন হোস্টেলে প্রবেশ করল না সেকথা আমি জিজ্ঞেস করলাম না।

আমাদের মাঝখানের দীর্ঘ নিস্তব্ধতাটুকু বারবার বিরক্ত করায় আর প্রবীরের মুখ থেকে গুমড়ো ভাবটা দূর করার জন্য অবশেষে আমি বললাম,তুই মিছামিছি নির্মালী হাজরিকার কথার ওপরে এতটা গুরুত্ব কেন দিচ্ছিস বুঝতে পারছি না।এবার বল তোর দিদি আবার….’

আমি থেমে গেলাম।কী বলব ভেবে ঠিক করতে পারলাম না।প্রতিদিনশোনা,প্রতিদিন বলা একই কথা বলতে গিয়েও আমি কিছুই বলতে পারলাম না।

‘এটা সত্যি যে নির্মলা আমার দিদি,নির্মলাকেআমি দিদির মতোই সবসময় আমার কাছে চেয়ে এসেছি কিন্তু...।’

সে কথাটা শেষ করল না। আমি জানি সে আর কিছুই বলতে পারবে না।পরবর্তী অংশটুকু আমাকেই বলতে হবে,প্রতিদিন বলা কথাগুলি আবার নতুন করে বলতে হবে।

নির্মালী এবং প্রবীর। প্রথম বসন্তে উদ্দাম হয়ে উঠা যুবক-যুবতি কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল।প্রবীরক্লাস ইলেভেনে,নির্মালী হায়ার সেকেণ্ডারিপরীক্ষা দিয়ে প্রবীরদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে।দূর সম্পর্কের দিদি,প্রবীর আগে কখনও দেখেনি,এই প্রথম দুজনের দেখা হয়েছে।অবশ্যনির্মালীর কথা,নির্মালীদের বাড়ির কথা মা-বাবার মুখে সবসময় শুনে আসছে।নির্মালীরমা-বাবা ভাইবোনেরা আগেও এসেছে,প্রবীরের মা-বাবা ভাইরাও আগে নির্মালীদেরবাড়িতে গিয়েছে,সেখানে থেকেছে।তবে যাওয়া-আসা বা পরিচিতি ছিল না কেবল প্রবীর আর নির্মালীর।

প্রবীরের পিতা কিছু একটা কাজে নির্মালীদেরবাড়ি গিয়েছিল।নির্মালী পরীক্ষা শেষে বাড়িতে বসেছিল।সেইজন্য প্রবীরের পিতা নির্মালীকে নিয়ে এল।প্রবীর আর নির্মালী প্রথমবারের জন্য পরস্পরকে দেখতে পেল।নতুন বসন্তের প্রথম লজ্জায় দুজনেই কিছূটা দূরত্ব রক্ষা করে চলছিল যদিও মা-বাবার তিরস্কারেদুজনেই দুজনের কাছে চলে এসেছিল।প্রবীরএবং নির্মালী দুজনেই বিকেলে বেড়াতে বেরোতে শুরু করল।

প্রবীণের মা সেদিন পাকঘরে।বাবা এবং ছোট ভাই বোনেরা কোথাও বেরিয়েছিল।বাধ্য হয়ে প্রবীর আর নির্মালী সন্ধ্যেবেলাটা জ্যোৎস্নায় বসে কাটাচ্ছিল।

হঠাৎ মায়ের ‘ভাত হল তোরা খেতে আয়’ শুনে প্রবীর অন্ধকারের মধ্যে বসার চেয়ারটা ভেতরে নিয়ে যাচ্ছিল।নির্মালীও তাঁর বসার চেয়ারটা অন্ধকারেরমধ্য দিয়ে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছিল।অন্ধকারে অনভ্যস্থ ঘরের মধ্যে ঢুকেই নির্মালী হোঁচট খেয়ে ছিটকে পড়ছিল কিন্তু তার আগেই প্রবীর নির্মালীকেধরে ফেলেছিল।

অন্ধকারের মধ্যে কোনো মেয়েকে প্রবীরের এত কাছে পাওয়াটা এই প্রথম।নির্মালী তাঁর গায়ে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল যদিও সে অনেক সময় জড়িয়ে ধরেছিল।তারপর ধীরে ধীরে প্রবীর অনুভব করল তার সমস্ত শরীর দিয়ে যেন এক ধরনের বিদ্যুৎ প্রবাহ প্রথমবারের মতো বয়ে গেল।সে যতই এটা অনুভব করল সতেরোটা বসন্ত পার করা প্রবীর তারচেয়ে কেবল এক বছরের বড় নির্মালীকে পেল আরও এক চরম রূপে।সাপেরমতো সে প্রবীরের সারা শরীর জড়িয়ে ধরল।প্রবীর সেই বন্ধন থেকে নিজেকে সরিয়ে আনার সমস্ত শক্তি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলল।কেবল সে অনুভব করল,তাদের দুজনের মধ্যে থাকা ঠোঁটের ব্যবধান ধীরে ধীরে কমতে কমতে শেষে একটা বিন্দুতে এসে মিলে গেল।

দুজনে এভাবে কতটা সময় ছিল বলতে পারে না।পুনরায় একবার মা রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে ডাকায় নিজেদের অস্তিত্ব যেন হঠাৎ অনুভব করতে পারল।

এক লাফে প্রবীর সরে গেল।সেই সরে যাবার পর থেকে নির্মালী বাড়িতে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত প্রবীর আর তার কাছাকাছি আসতে পারল না। নির্মালী এসে কটন কলেজে পৌছাল।প্রবীর ও এসে একবছর পরে গুয়াহাটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হল। যদিও সেই সরে যাওয়া শরীর দুটো কাছাকাছি এল না তবু মনের সম্পর্কটা দুজনের মধ্যে চলতে থাকল দুটো ভিন্ন রূপে।

নির্মালী পুরো ব্যাপারটাকেসহজভাবে নিয়েছিল।সেইএকই সহজভাব সে প্রবীরের কাছ থেকে আশা করেছিল।কিন্তুপ্রবীর পারল না।সে যেন হঠাৎ অনুভব করল তার জীবন থেকে কিছু একটা যেন হঠাৎ নাই হয়ে গেল।

নির্মালী পুরো ঘটনাটা যতই সহজ করে নিয়েছিল,প্রবীর তা ততটাই জটিল করে তুলছিল।প্রবীর নির্মালীকে নতুন রূপে ভালবাসতে চাইল।ভাই-বোনের ভালোবাসায় এক নতুন জীবন গড়ে তুলতে চাইল।

অবশ্য এই চাওয়াটা প্রবীরের মনের মধ্যেই রইল।সে কোনোভাবেই প্রকাশ করতে পারল না,হয়তো সে কী চায় সেই সম্পর্কে তার নিজের ও স্পষ্ট কোনো ধারনা ছিল না,নাহলে হয়তো অন্য কোনো কারণে সে বোঝাতে সমর্থ হল না।

নির্মালী প্রবীরের এই অপ্রকাশিত বেদনা কোনোদিনই বোঝার চেষ্টা করল না,নতুবা বোঝার মতো কিছু রয়েছে বলেও ভাবল না। একটি ছোট দুর্ঘটনা,একটি ছোট ভুল বা স্বাভাবিক ঘটনা বলেই নির্মালী ভুলে গেল দুর্ঘটনাটিকে । ‘কিছুক্ষণ খেলব,মজা করব তারপর কোথায় চলে যাব’এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাসী নির্মালী প্রবীরকে চেয়েছিল আর দশজন প্রেমের প্রার্থীর মতোই।

এই দুর্ঘটনার পরে অনেকদিন পার হয়ে গেছে।নির্মালীর জীবনে এই ধরনের আরও অনেক ঘটনা ঘটল।হয়তো ভুলে যাবার মতো ঘটনা বলেই ভুলে গেল।কিন্তুপ্রবীর ভুলতে পারল না।এই দুর্ঘটনারবেশ কয়েক মাস পরে একদিন সে সমস্ত কথা আমার কাছে খুলে বলল।সেদিন তার কথাগুলি,তার মনের বেদনাগুলিশুনে আমার মন ও কোনো এক অবুঝ বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল।তারচোখ দুটির দিকে তাকানোর সাহস আমি সত্যিই সেদিন হারিয়ে ফেলেছিলাম।

আমার কাছে এই একই কথার বহুবার পুনরারাত্তি করেছে, প্রতিবারইনির্মালীকে ডিফেণ্ড করেই একই কথায় অনেক যুক্তি তুলে ধরেছি,আমি সহজ ভাষায় তাকে বুঝিয়ে বলেছি এই বয়সে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকের ক্ষেত্রেই হয়,যে দুর্ঘটনা হয়তো প্রবীর এবং নির্মালীরক্ষেত্রেও আকস্মিকভাবেঘটে গেছে।

‘তুই বড় বাজে সেন্টিমেন্টেভুগছিস প্রবীর’আমি কিছুটা ভালোবাসারসুরেই তাকে তিরস্কার করলাম।ইতিমধ্যে আমরা এসে নদীর তীরে প্রতিদিন বসা পাথরটার ওপরে বসে পড়লাম।

‘হয়তো আমি বাজে সেন্টিমেন্টাল,তুই ঠিকই বলেছিস’কিন্তু আমরা দুজন তো এভাবে সরে না গেলেও পারতাম।আমাদেরতো দুর্ভাগ্য এভাবে দূরে সরিয়ে না দিলেও পারত...

তার কথা শেষ করতে না দিয়ে আমি ইচ্ছা করেই কিছুটা জোরে হেসে উঠলাম।

‘তুই হাসছিস,তুই আমাকে উপহাস করছিস?’

‘না হেসে করবটা কী?’আমি বললাম,অস্কার ওয়াইল্ড তোদের মতো মানুষদের কথা ভেবেই লিখেছিলেন,A little Sincerity is a dangerous thing and a great deal of it is absolutely fatal… তোর এই সিনসিয়ার লাভ,তোর কল্পনা রাজ্যের কথাগুলিকেনির্মালী গুরুত্ব দিয়েছে কি,পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষ দিয়েছে?ইট ড্রিঙ্ক এণ্ড বী মেরী—জীবনের প্রকৃ্ত সত্য মাত্র এটাই বুঝেছিস।... আর তোরা দুটো কোথায় দূরে সরে যাচ্ছিস।A little animality gives more sincerity বুঝেছিস তোরা দুটি আগের চেয়ে আরও কাছাকাছি চলে এসেছিস,না বলা কথাও বলতে পারছিস,তাছাড়া যে ভুলটা হয়েছে তার জন্য তুই একা দোষী নস,নির্মালীও দোষী,কিন্তু নির্মালী ঘটনাটিকে কতটুকু গুরুত্ব দিয়েছে?’

আমি অনর্গল কথা বলে গেলাম।রাত আটটার বাসে তুলে দেওয়া পর্যন্ত কেবল কথাই বললাম।কতটা সে শুনল,কতটা বুঝল জানি না।সবসময় বলার মতো কেবল বলে গেলাম,বলাটাই যেন আমার ধর্ম।

পাশের ঘরে গণ্ডগোল কমে এসেছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই র‍্যাগিং হয়তো শেষ হয়ে যাবে।তারপরযে কোনো একজন বুঝিয়ে বলবে,হয়ে যাওয়া ঘটনাগুলি বড় কথা নয়,আমাকে একদিন বলার মতো ওদেরকেও বলবে,’অ্যানিম্যালিটি গিভস সিনসিরিয়াটি।‘ বিভিন্ন জায়গার ছেলেগুলি নিজেদের মধ্যে সহজ হয়ে পড়বে,লজ্জা-সঙ্কোচ দূরীভূত হবে।

ঠিক এই ফর্মূলাতেইপ্রবীরকেও আজ আমি বুঝিয়ে দিয়েছিলাম,অ্যানিম্যালিটি গিভস সিনসিরিয়াটি,‘ও বুঝেছে কি না জানি না।

আর এই ছেলেগুলি? এই ছেলেগুলি বুঝল কি না তা জানার আবশ্যকতা কেউ বোধ করে না।প্রবীরবুঝল কিনা এই সহজ কথাটা কেউ জানার আবশ্যক হয়তো নেই,নির্মালী,আমি বা অন্য কেউ।

নির্মালীর হয়তো জীবনে অনেক ছেলের সঙ্গে দেখা হবে।হয়তো তারই একজনকে একদিন আপন করে নেবে।ভুলে যাবে অতীতের কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে প্রবীর নামের একটি ছেলের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা।

আর প্রবীর?

আমি জানি না প্রবীর কী করবে?

হয়তো সারা জীবনের জন্য আপন করে নেওয়া মেয়েটিকে খুব কাছে টেনে নেওয়ার দুর্বল মুহূর্তে,‘তুমি আমার জীবনের প্রথম নারী’বলতে গিয়ে থমকে যাবে।আর?আর কিছু করার শক্তি এবং সাহস প্রবীরের জীবনে হয়তো কোনোদিনই হবে না।

চলবে ...