রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

কটন কলেজ, পর্ব ৮

।।আট।।

জেগে আছি যদিও উঠতে ইচ্ছা করছে না।একজন ও রুমমেট আসেনি।তিনমাস বন্ধের পরে গতকাল এসে পৌছেছি।জানালা খুলে দিয়ে রোদের দিকে তাকালাম। জুলাই মাসের রোদ।চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।জানালাটা আবার বন্ধ করে দিলাম।একটা সময় অনুমান করে নিলাম।আমার নিজের ঘড়ি নেই।

তিনমাস বন্ধ পেয়েছিলাম যদিও অন্যদের মতো আনন্দ-উৎসাহে তিনমাস কাটিয়ে দিতে পারলাম না।উৎকণ্ঠা এবং চিন্তায় সময়গুলি পার করলাম।বাড়িতে থাকা ছাড়া পুরো বন্ধটাতে অন্য কোথাও যাওয়া হল না।যাওয়া মানেই তো পয়সা খরচ।তার মধ্যে রেজাল্ট আমি এক সপ্তাহ আগে পেয়েছি।আগে রেজাল্ট পেলে হয়তো কিছু শান্তিতে কাটাতে পারতাম।পরীক্ষা খারাপ হওয়ার জন্য মনে বিন্দুমাত্র শান্তি ছিল না।

রেজাল্ট দেওয়ার অনেক দিন হয়ে গেছে।এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে দিয়েছিল। কলেজ ফীস বাকি থাকায় রেজাল্ট উইথহেল্ড ছিল।আসার আগে নিজের জন্য মাত্র সাত টাকা হাতে রেখে বাকি টাকাটা মানে তিন মাসের ফীস ৩৬ টাকা আমি কুন্তলার হাতে দিয়ে এলাম।কুন্তলা ডিগ্রি পার্ট ওয়ান দিয়েছে বলে এপ্রিলের শেষে পরীক্ষা শুরু হয়ে মে মাসে শেষ হয়েছিল।আর ও দুই মাসের ফীস বাকি পড়ে রইল।ওকে বললাম বাড়ি গিয়ে ফীস পাঠিয়ে দেব। সে যেন আমার থেকে বাকি টাকাটা পেলেই ফীসটা জমা করে দেয়।

যদিও বলেছিলাম গিয়েই পাঠিয়ে দেব কিন্তু নানা অসুবিধায় তা সম্ভব হল না। কুন্তলাও আমি পাঠাব বলে অপেক্ষা করে রইল। এদিকে ওর আবার পরীক্ষা। আমার ফীস পরীক্ষার শেষেও না পৌছানয় আমার ৩৬ টাকার সঙ্গে আরও ২৪ টাকা কুন্তলার কোনো লোকাল ক্লাস ফ্রেণ্ডের হাতে নিজের থেকে দিয়ে এল।ফীস ক্লিয়ার করে আমাকে রেজাল্ট পাঠিয়ে দিল।

ছেলেটিকে দিয়ে আসা আমার ঠিকানাটা হারিয়ে ফেলার ফলে রেজাল্টটা আমার কাছে পাঠাতে না পেরে কুন্তলার কাছে পাঠিয়ে দিল।গত সপ্তাহে কুন্তলার কাছ থেকে রেজাল্টটা পেলাম।রেজাল্ট পাওয়ার পরে আসতেই হল।কুন্তলাকে ২৪ টা টাকা আর ফিরিয়ে দিতে পারিনি। ও এভাবেই আমাকে অনেকবার সাহায্য করেছে।এতদিন কোনো খবর না থাকা এই মেয়েটির ভালোবাসা ধীরেধীরে আমাদের মধ্যের এতদিনের ব্যবধানটুকু সরিয়ে দিয়েছে। আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে এক নতুন কুন্তলার,অতীতে যদি কিছু ছিল জানিনা,কিন্তু বর্তমানের মধ্যেই আমি প্রকৃ্ত কুন্তলাকে খুঁজে পেয়েছি।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিলীমাদির বাড়িতে যাবার কথা ঠিক করে ফেললাম।রুম মেটরা আসেনি। হোস্টেলের খুব কম ছেলেরাই এসেছে। সারাটা দিন একা একা কাটাতে বিরক্ত লাগবে। মুখ ধুয়ে চা খেয়ে বেরিয়ে গেলাম।নিলীমাদির বাড়িতে ভাত খাব।জামাইবাবু কেমিস্ট।বেশ ভালো উপার্জন।অহঙ্কার নেই বলে আমার বেশ ভালো লাগে।নিলীমা দিদি আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়া,নিজের দিদি নন।তবু আমার নিজের দিদি বলেই মনে হয়। তাছাড়া আমি এসেই আজ দিদির ওখানে যাওয়ার মধ্যে একটা উদ্দেশ্য ও রয়েছে।

গত মার্চ মাসের কথা।আমি এমনিতেই নিলীমাদির বাড়ি গিয়েছিলাম,মানে রবিবারের সোসিয়াল ভিজিট আর কি। আমি বাড়ির সামনে পৌছাতেই দেখি জামাইবাবু গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে আসছে।আমাকে দেখেই জামাইবাবু গাড়ি থেকে চিৎকার করে উঠলেন—ও,নিরঞ্জন আজকাল দেখছি আর আসাই হয় না।

‘এই তো এলাম।’ আমি হাসতে হাসতে উত্তর দিলাম।

‘এসেছ মানে? জামাইবাবু অভিমানের সুরে বললেন-‘এক মাস পরে আজ মনে পড়ল।তোমরা কলেজে পড়া ছেলেদের দীঘলি পুকুরের হাওয়া খেয়ে বেড়াতে গিয়েই সময় নেই,আমাদের কথা আর কোথায় মনে পড়বে?আমি তোমাকে নিয়ে আসার জন্যই গাড়ি বের করছিলাম।’

আমি কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল হাসলাম।জামাইবাবু গাড়িটা ব্যাক করে নিয়ে পুনরায় গ্যারেজ করে দিলেন।আমি বুঝতে পারলাম না,আমার প্রতি এত অনুগ্রহের কারণটা কী।

আমি পেছনের বারান্দায় গিয়ে বসলাম।জামাইবাবু গাড়ি রেখে আমার কাছে এলেন। আমি এতদিন আসিনি বলে দিদি কৃ্ত্রিম রাগ দেখালেন। বেশ কয়েকটি রবিবার নাকি আমি যাব বলে পথ চেয়ে বসেছিলেন।দিদি,জামাইবাবু এবং দিদির ছেলে মনোকণের সঙ্গে নানা ধরনের কথা,হাসি-ঠাট্টা করে খেতে বসলাম।ভাতের পাতে জামাইবাবু বলল—‘একটা ভালো খবর আছে নিরন’।

‘কী’?

আমরা যে গত বছর একটা সায়েন্স সোসাইটী খুলেছিলাম তোমার মনে আছে কি?’

‘হ্যাঁ,সেইসময় কিছু একটা শুনেছিলাম।

এখন আমরা ওর থেকেই ‘বিজ্ঞানের খবর’নাম দিয়ে একটা মাসিক পত্রিকা বের করতে চাই।সব ধরনের মানুষ যাতে বুঝতে পারে সেভাবে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ,খবর,এমনকি বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে লেখা গল্পাদিও থাকবে। কিরকম হবে ব্যাপারটা?’

‘খুব ভালো হবে’ আমি বললাম—আমাদের ভাষায় এই ধরনের পত্রিকা নেই।’

‘কাজে হাত দিয়ে বিপদে পড়েছি—কিছুটা চিন্তিত ভাবে জামাইবাবু বললেন। সোসাইটির পুঁজি খুব বেশি নেই,সরকারের কাছ থেকে দশ হাজার টাকার গ্রান্টটা পেলে তবেই বিহুর সময় প্রথম সংখ্যাটা বের করতে পারব।’

‘তাই নাকি?’আমি আগ্রহ সহকারে জিজ্ঞেস করলাম –‘সম্পাদক কে হবে?’

এখনও কিছুই ঠিক হয়নি,সোসাইটির সভ্য এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপককে বলেছি। তবে একজন তো নয়,সাব এডিটর আদিও লাগবে।দাম বেশি করলেও কেউ কিনবে না,তবে অনেক টাকা পয়সা দিয়ে স্টাফ রাখতেও সাহস হয় না,সার্কুলেশন কত হবে তা তো জানি না। আমি কোনোরকম মন্তব্য করলাম না।

‘আচ্ছা,তোমার দিনে মোট কটা ক্লাস থাকে?’হঠাৎ প্রসঙ্গটা পরিবর্তন করে জামাইবাবু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।

‘ক্লাস আর কোথায়,হিসেব মতো থিয়োরির পিরিয়ড তিনটে এবং প্র্যাক্টিকেল পিরিয়ড দুটো,মোট পাঁচটা।অবশ্য সপ্তাহে তিনটে ইংরেজির ক্লাসও থাকে।আজকাল বি.এস.সি ক্লাসেও ইংরেজি পড়তে হয়,তবে ক্লাস তো হয়ই না। তারমধ্যে হাফ,ছুটি,বন্ধ ইত্যাদি তো রয়েছেই।‘

‘মানে দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি নয়?’

ঠিক তাই,তবে ক্লাসের কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন?কিছুটা কৌ্তূহল নিয়েই আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘আমি একটা কথা ভাবছি নিরন।’

‘কি?’

‘তোমার যদি সময় হয় সারা দিনে তুমি তো দুই-তিন ঘণ্টা কাজ করে দিতে পার।কাজটা সাব-এডিটরের মতোই হবে,তবে সাব-এডিটর হিসেবে তো নিতে পারব না,এডিটর অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবেই নিতে হবে। প্রয়োজনে কাজগুলি তুমি হোস্টেলে নিয়েও করতে পার। কারণ আমাদের তো অফিস আওয়ার্স বলে কিছুই নেই। সবাই চাকরি-বাকরি করে।পারিশ্রমিক হিসেবে এর জন্য পঞ্চাশ টাকা দেবার ব্যবস্থা করে দেব। তুমি বিষয়টা ভেবে দেখ?’

আমার মন আনন্দে নেচে উঠল।পঞ্চাশ টাকা মাসে মাসে পেলে আমার টাকা বেঁচে যাবে।কাগজ,বই,কাপড়-চোপড় সব সেই টাকা দিয়ে কিনতে পারব।

‘আমি তো এই ধরনের কাজ পেলে খুশিই হই,আমি কোনো একটা পার্ট টাইম জবের খোঁজ করছিলাম।’

‘আচ্ছা,আমাদের গ্রান্টের টাকাটা আসুক’,জামাইবাবু বললেন—‘তোমাকে নেবার জন্য অনুরোধ করব।তারমধ্যে তোমার লেখা-লিখির হাতও রয়েছে।

আমার মন আনন্দে নেচে উঠল।মাসে পঞ্চাশ টাকা।কাকুরা চাকরি করছি জানলে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেবে নাকি?পঞ্চাশ টাকা পেলে তো আমার বাড়ি থেকে টাকা পয়সা না আনলেও হবে।না,আনব।আমাকে টাকা জমা করতে হবে।বলা তো যায় না বাবা-মা আর কতদিন দিতে পারবে।কাকারা ও আর কতদিন দেবে তার কী ঠিক। আমার তো বই পত্র একেবারেই নাই বলা যায়,প্রথম মাসের টাকা পেলেই আমি তা দিয়ে বই কিনব।না,না মায়ের জন্য কিছু কিনতে হবে।আমার প্রথম মাসের উপার্জন দিয়ে কেনা,বন্ধে বাড়িতে গিয়ে যখন মায়ের হাতে তুলে দেব মা কত খুশি হবে।

না,না মাকে কাজ করার কথা বলব না।মা জানতে পারলে খুব দুঃখ পাবে।ভাববে আমার প্রয়োজনীয়টুকু দিতে পারছে না বলেই চাকরি করছি।এই ধরনের নানান কথা-বার্তা মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে লাগল।হঠাৎ জামাইবাবু বল্লেন,‘আমাকে একটা কাজ করে দিতে পারবে? পারবে না কেন,পারবেই।তোমার তো লেখার অভ্যাস রয়েছেই।’

‘কী কাজ?’আমি আনন্দের সঙ্গেই বললাম,আমার সামর্থ্যের মধ্যে হলে নিশ্চয় করে দেব।’

জামাইবাবু ভেতরে চলে গেলেন এবং কাগজের একটা পুঁটলি এনে বললেন,’এর মধ্যে একটা আর্টিকেল রয়েছে,আমাদের পত্রিকার জন্য লিখেছি…জানইতো স্কুল ছেড়ে আসার পরে দীর্ঘকাল দুই একটা চিঠি লেখা ছাড়া অসমিয়া ভাষায় আর কিছুই লেখা হয়নি। …তুমি প্রবন্ধটা ভালো করে দেখে নিয়ে কপি করে দিও,ভাষাটাও একটু ঠিকঠাক করে দিও। তুমি যখন বিজ্ঞানের ছাত্র ব্যাপারটা সহজেই বুঝতে পারবে।’

আমি কাগজের পুঁটলিটা হোস্টেলে নিয়ে এসে পড়ে দেখলাম।জল সম্পর্কে লেখা একটি প্রবন্ধ।শুরুটা সরাসরি কোনো বিজ্ঞানের বই থেকে অনুবাদ করে নিয়েছে বলে মনে হয়,বক্তব্য বিষয় প্রকাশ করতে না পেরে বারবার ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করায় অর্থ পরিষ্কার হয়ে উঠেনি।মাঝে মাঝে কথাগুলি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন লেখার মতো হয়ে উঠেছে। তাছাড়া এখান থেকে একটা বই ওখান থেকে একটা বই নিয়ে লেখায় ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি।

আমি প্রবন্ধটা কয়েকবার পড়ে নিয়ে কয়েকটা অধ্যায়ে ভাগ করে নিলাম।প্রথমেই জল কাকে বলে,তারপর জলের গঠন,আলাদা আলাদা জল কোথায় কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে সমস্ত বিস্তারিতভাবে লিখে গেলাম,কথাগুলি একই রেখে ভাষাটা পরিমার্জন করে নিলাম,পরিভাষা বদলে নিলাম এবং শুরু আর শেষের কথাটা সম্পূর্ণ নিজের ভাষায় লিখে দিলাম যাতে পাঠকের মনে প্রথমেই ছাপ বসানো যেতে পারে।

এটা মার্চ মাসের কথা। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পরীক্ষা।তবু নিজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে প্রবন্ধটা নতুন করে লিখে দিলাম।যদি এই প্রবন্ধের দ্বারা প্রভাবিত করতে পারি তাহলে হয়তো কাজটা পাওয়া অনেক সহজ হবে।

পরীক্ষার যখন এক সপ্তাহ বাকি প্রবন্ধটা দিয়ে এলাম। আসার সময় বলে এলাম বন্ধের মধ্যে কোনো খবর বের হলে আমাকে জানাতে। কারণ পরীক্ষার পরেই আমি বাড়ি চলে যাব,কলেজের গরমের বন্ধ শুরু হবে।

বাড়ি পৌছে একটা চিঠি দিয়েছিলাম।ব্যস্ততার জন্যই হয়তো উত্তর দেয়নি।কিছু একটা জানার জন্য উৎকণ্ঠায় রয়েছি। পঞ্চাশ টাকা পেলে অনেক গুলি কাজ করতে পারব।এই বছর আসব না ভেবেছিলাম। কাজটার কথা মনে পড়ায় সাহস করে চলে এসেছি।

না এসেই বা কী করব? চাকরি করতে হলে আরও এক বছর বসতে হবে।তাছাড়া কোনো ডিগ্রি ছাড়া যে চাকরি পাব সে আশা করা বৃথা।এই বছরে প্রশ্নই উঠে না,আণ্ডার এজ,আর ও এক বছর না হলে চাকরি পাওয়া তো দূরের কথা,ইন্টারভিউতেই ডাকবে না।

তাই ফিরে আসাটাই ঠিক করে নিলাম।একবছর যখন এভাবে পার হয়ে গেল আরও এক বছর কাটিয়ে দিতে পারব।তারপরে একটা চাকরি অন্তত জোগাড় করে নিতে পারব।যদি কাজটা জামাইবাবু ঠিক করে রেখে থাকে তাহলে তো কথাই নেই। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে দিদির বাড়ি পৌছে গেছি বলতেই পারি না। আমাকে দেখেই দিদি জিজ্ঞেস করল,‘কখন এলে?’

জামাইবাবু বললেন ‘অনেকদিন পরে এলে?’

মনোকন বলল,‘পাশ করলে যে,মিষ্টি কোথায়?’

প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর হিসেবে প্রথমে বোকার মতো হাসলাম এবং তারপরে বললাম,‘গতকাল’।

অনেক কথা বললাম।বাড়ির কথা।আমি যাবার পরে মনোকনের অসুখের কথা।আমাদের জায়গাটা কত বদলে গেল সেকথা।একের সঙ্গে অপরের সংযোগ না থাকা কথা।কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও আমি আসল কথাটা তুলতে পারছি না। বারবার আমার মনে জেগে উঠছে একটিই কথা-আমার কাজটা হল কি?

দিদি এসে আমাকে এককাপ চা দিলেন।ভাবলাম ভাত হতে নিশ্চয় দেরি হবে,এক কাপ চা খেয়ে নেওয়া যাক।ক্ষুধাও পেয়েছে।

না,এখন কথাটা বলা ঠিক হবে না।ভাববে,এর স্বার্থ আছে বলেই এসেছে।ভাত খাওয়ার পরে ফিরে যাবার আগে কথাটা উত্থাপন করা যাবে।চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রাখতে যেতেই সুন্দর ম্যাগাজিনটা দেখতে পেলাম।নাম ‘বিজ্ঞানের খবর’প্রথম সংখ্যা।ছোট টি-টেবিলটা থেকে ম্যাগাজিনটা হাঁটুর ওপর নিয়ে পাতা উলটে যেতে লাগলাম।হঠাৎ সেই প্রবন্ধটি চোখে পড়ল।‘বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিতে চোখের জল’।জামাইবাবু লিখেছেন,সঙ্গে জামাইবাবুর একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও রয়েছে। আমার লেখা সমস্ত কথাগুলি চোখের সামনে ভেসে উঠল।আমি জামাইবাবুর মুখের দিকে তাকালাম এবং বললাম,‘সেই প্রবন্ধটা বেরিয়েছে’।

আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে জামাইবাবু ক্রোধ এবং বিতৃষ্ণার সঙ্গে বলে উঠলেন,‘এটা ড্রইং রুমে এনে কে রেখেছে,আমি সবসময় লাইব্রেরি রুমে রাখতে বলেছি।’

আমার হাত থেকে চিলের মতো থাপ মেরে ম্যাগাজিনটা জামাইবাবু নিয়ে গেলেন এবং চিৎকার করে ডাকলেন—মনো মনো,মনো।মনো ভেতরে এল।একটু রাগের সঙ্গেই জামাইবাবু বললেন—‘এসব এখানে কেন রেখেছিস।বইপত্রগুলি আমি সবসময় লাইব্রেরি রুমে রাখতে বলেছিলাম না।’

‘তুমিই রাখতে বলেছিলে’মনোকন বলল –‘তোমার নাকি কী সব লেখা বেরিয়েছে।‘

আচ্ছা,এটা এখন নিয়ে যা’জামাইবাবু বিরক্তির সঙ্গে বললেন। মনোকন ম্যাগাজিনটা নিয়ে চলে গেল।

আমি বসে রইলাম। জামাইবাবু এবং আমার মধ্যে কোনো কথা নেই।কী কথা বলব ভেবেও ঠিক করতে পারলাম না। কেন যেন আমি হঠাৎ বলে ফেললাম,আমি যাই।’

‘ও।‘

একটা সংক্ষিপ্ত উত্তর। রাগে,বিতৃষ্ণায় না এমনিতেই বুঝতে পারলাম না।আমি বেরিয়ে এলাম।

দরজার সামনের স্টেপগুলি অতিক্রম করেছি,তখনই আমাকে বেরিয়ে আসতে দেখে দিদি জিজ্ঞেস করলেন—‘তুই চলে যাচ্ছিস। ভাত খেলি না?’

‘না,খাব না।’

আমি বাইরে চলে এলাম।জিজ্ঞেস করব ভেবেও কথাটা আর বলা হল না। হয়তো এখন আর জিজ্ঞেস করার কোনো আবশ্যকতা নেই।

আমি আর এসব কিছু ভাবছি না।ভাবছি কেবল এখন হোস্টেলে গিয়ে ভাত পাব কিনা।বারোটা বাজতে চলল।রবিবার ছাড়া অন্য দিনগুলিতে দশটা বাজার পরে খাবার জন্য আর কেউ থাকে না। রুমে ভাতটা এনে রাখতেও বলা হয়নি। ভাতটা না পেলে বড় অসুবিধা হয়ে যাবে।

আমি জোরে হাঁটতে লাগলাম।সিটিবাসে গিয়ে মিছামিছি পয়সা কেন খরচ করব?


চলবে