রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

কটন কলেজ, পর্ব -৩

।।তিন।।

‘আপনি,আমাকে,আপনি আপনি’বললে খুব অসুবিধা হয়।

ও –

আপনি করবী বলে ডাকেন না কেন,চলিহা চলিহা বলে ডাকলে আমার নিজেকে কেমন যেন বুড়ো বুড়ো বলে মনে হয়।

ও-

কী হল,উত্তর দিচ্ছেন না কেন?

‘আপনার যে সবে অসুবিধা হয় সেই একই অসুবিধা কি আমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়?’

‘তার মানে?’

‘তার মানে আমি চাই আপনি আমাকে আপনি বলবেন না,বরুয়া বলে সম্বোধন করবেন না।’

তাহলে কী বলে ডাকব?’

‘যা খুশি।’

করবীকে আরও একদিন একা পেয়ে গেলাম।ইতিমধ্যে আমাদের মধ্যে একটা সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।নিজেদের অজান্তেই হয়তো আমরা পরস্পরের কাছাকাছি চলে এসেছিলাম।

সকাল নয়টার প্রথম ক্লাসটা করতে এসেছি।এই ক্লাসটা প্রায় ছেলে মেয়েরাই মিস করে।প্রফেসর ক্লাসে আসার দশ থেকে পনেরো মিনিট পর্যন্ত ছেলে-মেয়েরা আসতে থাকে।সেইজন্য প্রফেসরও দেরি করে।প্রফেসর ছেলে-মেয়েদের জন্য দেরি করে,ছেলে-মেয়েরা প্রফেসর দেরি করে আসবে জেনে আরও কিছুটা দেরি করে।মোট কথা কোনোদিনই ক্লাস নয়টা থেকে শুরু হয় না।কেন জানি আজ ন’টার ক্লাসটা করার জন্য প্রায় পনেরো মিনিট আগে চলে এসেছি।এসে দেখি করবী চলিহা আমার চেয়েও আগে এসে ক্লাসে বসে আছে।

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।কিছুক্ষণ পরে আমি নীরবতা ভেঙ্গে বললাম-

‘করবী’

‘বল’

‘তুমিও আমাকে ‘তুমি’বলবে,আপনি বললে বড় পর পর মনে হয়।’

করবী উত্তর দিল না।মুখে একটা তৃপ্তির হাসি,চোখ দুটিতে একটা অধিকারের গৌ্রব।

‘করবী?’

‘বল’

‘তোমার আমার মধ্যে প্রথম কথা বলার আজ কতদিন হয়েছে তোমার মনে আছে কি?

‘একমাস।’

‘একমাসে আমরা অনেকটা পথ চলে এসেছি তাই না?’

‘জানি না।‘

একটা কথা মনে পড়ে যাওয়ায় আমার মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল।তা দেখে করবী জিজ্ঞেস করল,কী হল হাসছ যে?’

‘একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল,যেতে দাও।’

‘কী ব্যাপার বল না।’

আমার কথা নয়,আমাকে কেউ একজন বলেছিল,ভালো করে মনে নেই,মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্বের মাদকতা নাকি একমাস পর্যন্ত থাকে।’

করবী হেসে বলল-‘তোমার ভুল হয়েছে,বন্ধুত্ব নয়,প্রেমের।’

‘আমার ততদূর পর্যন্ত ভাবতে সাহস হয় না করবী।’

‘কেন?’

‘কেন অবশ্য আমি বলতে পারি না।আমি কিছুই বুঝতে পারছি’ না।আমার নিজেরই হাজার সন্দেহ হয়।

করবী কোনো উত্তর দিল না।আমি দেখলাম-করবীর চোখদুটি ছলছলে হয়ে পড়েছে।পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যে আমি হেসে বললাম-‘কী হল,খুব সীরিয়াস হয়ে পড়েছ দেখছি?’

‘তুমি আমাকে সন্দেহ কর নাকি?’

‘তোমাকে?তোমাকে আবার কী বলে সন্দেহ করব?’পরিস্থিতিটা হালকা করার জন্য আবশ্যকের চেয়ে বেশি জোরে হেসে ঊঠলাম।

‘এভাবে হাসছ কেন?’

‘না হেসে কী করব বল? বললাম আমার কথা আর তুমি গা পেতে নিলে।’

‘তোমার মনেই বা কেন সন্দেহ দেখা দিয়েছে?তোমার কি আত্মবিশ্বাস নেই?’

‘আত্মবিশ্বাস থাকলেও পরিস্থিতিকে কি অস্বীকার করা যায়?নেহরুর মতো মানুষও বলেছিলঃ Circumstances are more powerful than man,সেক্ষেত্রে তুমি আর আমি কোন ছার?’

কেন নেপোলিয়নের মতো মানুষের উক্তিকে কি তুমি ভুলে গেলেঃ Circumstances!I make Circumstances.’

নেপোলিয়নের মতো মানুষ এই পৃথিবীতে খুব কমই জন্মায়।সেইজন্য দেড়শো বছর একজন মানুষের কথা তুমি মনে করতে পেরেছ।কিন্তু আমার মতো মানুষের কাছে সেক্সপীয়রের অনুভূতি অনেক বেশি জীবন্ত।–

It (life)a tale

Told by an Idiot,full of sound and fury

Signifying nothing.

তুমি আমাকে ভালোবেসেছ,আমি তোমাকে ভালোবেসেছি।তুমি আর আমি একটা কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করি। সেখানে এই বাস্তব পৃ্থিবীটা নেই।আমাদের এই পৃথিবীতে সমস্ত কিছুই সহজ।কিন্তু যে পৃথিবী থেকে আমার উৎপত্তি তার জন্য এটা সহজ হবে না। তুমি ভালোবেসেছ আমার এই বাহ্যিক আবরণটাকে,ভালোবেসেছ স্টেজে উঠে কবিতা পাঠ করা সেই ছেলেটিকে,ভালোবেসেছ ক্লাসে অন্য অনেকের চেয়ে কম উৎপাত করা একটা ছেলেকে,ভালোবেসেছ হোস্টেলে আরামে খাওয়া,শোয়া,পড়াশোনা করা,ঘুরে বেড়ানো –এই চারটা সর্বস্ব বলে মেনে নেওয়া একটি ছেলেকে।কিন্তু আমার প্রকৃ্ত মানুষটিকে,আমার মানসিক পরিধিকে সহজভাবে নেওয়া তোমার পক্ষে সহজ নয় করবী।’

করবী কোনো উত্তর দেয়নি।শেষের কথাটুকু বক্তৃতাধর্মী হয়ে পড়ায় আমার মুখে একটা লাজুক ভাব ছড়িয়ে পড়ল।

ধীরে ধীরে ক্লাসে ছেলেরা আসতে লাগল।দুই একটি মেয়েও এসে করবীর পাশে দাঁড়াল।আমি পরিস্থিতিটা বদলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করবীকে বললাম-‘আচ্ছা চলিহা,আপনার নোটটা দেবেন,আমার Warner’s Theory টা ভালোভাবে clear হয়নি।নতুন syllabus এinclude করার জন্য Text Book গুলিতে কিছুই নেই,প্রফেসর ভূঞার নোটটাই সম্বল….’

এটা Physical Chemistry র ক্লাস।প্রফেসর গগৈ Osmotic Pressure এর ওপরে লেকচার দিচ্ছিলেন।বারবার চেষ্টা করেও স্যারের লেকচারে বিন্দুমাত্র মনোযোগ দিতে পারছিলাম না।প্রফেসর Semipermeable Membrane এর কথা বলছিলেন।আমার মনের পরিধি Membrane এ বারবার ধাক্কা খেয়ে থেমে যাওয়া হাজার হাজার ক্ষুদ্র কণিকাগুলির সঙ্গে যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম।প্রফেসর কখন ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন বলতেই পারি না।হুড়মুড় করে গ্যালারি থেকে ছেলেরা নেমে আসায় হুঁশ ফিরে এল।

আমিও নেমে এলাম।

প্রথম বেঞ্চে বসেছিল যদিও করবী যায়নি।আমার আসার পথ চেয়েছিল।ও আমার দিকে একটা বই এগিয়ে দিয়ে বলল-‘বরুয়া এর মধ্যে আমার নোট আছে।’

‘ধন্যবাদ।’

আমি ভেবে পেলাম না,এই সাধারণ কথাটা করবী কেন বুঝতে পারল না।আমি তো সত্যি সত্যি কোনো নোট চাইনি।প্রফেসর ভূঞার নোট তো আছেই।পরিবেশটা অন্যদের চোখে স্বাভাবিক করে তোলার জন্য আমি নোটের কথা বলেছিলাম।

তবু কলেজে খাতাটা খুলে দেখার সাহস হল না আমার।কে জানে যদি অন্য কিছু বেরিয়ে পড়ে।সারাটা দিন আমি খাতাটা হাতে নিয়ে কলেজে ঘুরে বেড়ালাম।কোথাও খুলে দেখার সাহস হল না।

অনেক উৎকণ্ঠা নিয়ে আমি হোস্টেলে পৌছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম।হোস্টেলে পৌছে দেখি ইতিমধ্যে আমাদের রুমটা ‘কমন রুম’হয়ে পড়েছে।হুলুস্থূলের মধ্যে খাতাটা দেখার আমার সাহস হল না। তার মধ্যে আমি ঢুকতেই রমেন চিৎকার করে উঠল।

‘বা বা নিরঞ্জন আজকাল দেখছি করবী চলিহাই নোটগুলি প্রিপেয়ার করে দেয়।’

‘হায়,আমাদের কোনো মেয়ে নোট প্রিপেয়ার করে দেওয়া তো দূরের কথা,পথে-ঘাটে দেখা হলে গুণ্ডা বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়।’

‘তুই কবি সাহিত্যিক না,মেয়েদের এক বিঘে ব্লাউজ নিয়ে অসভ্য কথা লিখে খ্যাপাবি,কবিতাতো লিখিস না।’

একই সঙ্গে তিনজন রুমমেট তিনরকম মন্তব্য করল। আমার কাছে কোনো উত্তর ছিল না। রুমমেটদের মধ্যে সম্ভবত ইতিমধ্যে করবী চলিহা আমাকে দেওয়া খাতাটা নিয়ে আলোচনা হয়ে গিয়েছিল।আমার ভয় হল কে জানে অধিক উচ্ছ্বাসে কেউ না আবার খাতাটা কেড়ে নেয়। ওর মধ্যে কী রয়েছে বলা তো যায় না। কে জানে নোটের বদলে যদি অন্য কিছু বের হয়?

তবে পরিস্থতি ততদূর গড়াল না।আমার ওপরে রুমমেটদের একটা বিশ্বাস রয়েছে। করবী চলিহাকে ‘ফিলোসোফি’বলে খেপালেও প্রেমের ব্যাপারে ওকে কেউখুব একটা গুরুত্ব দেয় না।

‘দেখ আবার নোটের সঙ্গে কখন না প্রেমপত্র এসে যায়।‘-অমর বলল। অমরের কথার সঙ্গে সঙ্গে সবাই হোস্টেল কাঁপিয়ে হেসে উঠল। আমাদের রুমের হাসি শুনে পাশের দুই একটি ঘর থেকে কয়েকটি ছেলে রসের খোঁজে আমাদের রুমে দৌড়ে এল।

হাজার হোক রুমমেটদের সঙ্গে করা হাসি-তামাসা। প্রাইভেসি দরকার।মিথ্যা কিছু রটনা করে গুজব ছড়িয়ে দেওয়াটা রুমমেটরা চায় না। মজা করতে গিয়ে কখন ব্যাপারটা সিরিয়াস হয়ে দাঁড়ায়। কথার প্রসঙ্গটা তাই রমেন শেষ পর্যন্ত বদলে দিল। আমিও রক্ষা পেলাম।

রমেনদের সঙ্গে সন্ধ্যেবেলা দীঘলিপুকুরের চারপাশে একটা চক্কর মেরে এলাম। বেড়ানোটাই উদ্দেশ্য হলেও পথে-ঘাটে কারও না কারও সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমাদের প্রত্যেকেরই সুপ্ত বাসনা ছিল। তার মধ্যে আবার ‘হ্যাণ্ডিকের’আজ মার্কেটিং ছিল।এরকম একটা সুবর্ণ সুযোগ এক সপ্তাহের জন্য কেউ ছেড়ে দিতে পারে না।

হোস্টেলে ঢুকে মুখ-হাত ধুয়ে যে যার টেবিলে বসে পড়লাম। এখন বই বা নোটখাতার খোঁজ করা ছাড়া কেউ আসবে না।

আমি করবীর খাতাটা বের করে নিলাম। খুঁজে খুঁজে দেখি কোথাও Warner’s Theory র নোটটা পেলাম না। নানা আজে বাজে কথায় পরিপূর্ণ প্রফেসরকে সিরিয়াস দেখানোর জন্য দেখলাম ‘সিটিবাস’।

‘সিটিবাস’নামটা অঙ্কের প্রফেসর চৌধুরী দিয়েছিল।সিটিবাসে যেভাবে হাজারটা মানুষ এই উঠছে এই নামছে,ঠিক সেভাবেই কলেজের ক্লাস নোট বুকেও একই পাতায় অঙ্কও আছে,তার নিচে কেমিস্ট্রি,তার পাশেই অন্য কিছু একটা।এভাবে হাজারটা বিষয় উঠা-নামা করে। সিটিবাসের যাত্রীদের কথা ভাবার প্রয়োজন যেমন কেউ অনুভব করে না,ঠিক তেমনই নোটগুলিতে কী লেখা হয়েছে তা পড়ে দেখার আবশ্যকতা কেউ অনুভব করে না।চারটার সময় কলেজ থেকে এসে ছুঁড়ে ফেলা নোটখাতার আবার প্রয়োজন পড়ে পরের দিন কলেজ যাবার সময়।

তবু মনের কৌ্তূহল দমন করতে না পেরে প্রতিটি পৃষ্ঠা ভালো করে দেখে গেলাম।অবশেষে শেষের পাতায় হঠাৎ অক্ষরগুলি দেখে থমকে গেলাম।হ্যাঁ,আজই লিখেছে।তারিখ আছে নাম নেই।

আমি বারবার শব্দগুলি পড়লাম।বোঝার চেষ্টা করলাম।কিন্তু যতই বুঝতে চেষ্টা করলাম ততই জটিল হয়ে পড়ল।

‘তুমি আমাকে বোঝার কোনোরকম চেষ্টা করলে না।কখন ও কখন ও আমার ভয় হয়,যেন নিজেকে এতদিনে একটুও বুঝতে পারিনি।‘

চলবে ...


লেখক পরিচিতি -১৯৪৫ সনের ৭ নভেম্বর নবীন বরুয়ার জন্ম হয়।শ্রী বরুয়া একজন ঔপন্যাসিক,প্রকাশক এবং খবরের কাগজের কলাম লেখক।১৯৬৫ সনে তাঁর লেখা উপন্যাস ‘কটন কলেজ’হোমেন বরগোহাঞি সম্পাদিত ষান্মাষিক পত্রিকা ‘নীলাচল’এ প্রকাশিত হয় (১৯৬৯) ।১৯৭০ সনে উপন্যাসটি পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।গত পঞ্চাশ ধরে উপন্যাসটির পাঠকদের কাছে চাহিদা এক অভিলেখ সৃষ্টি করেছে।ভারতীয় ভাষায় লেখা এটিই প্রথম ক্যাম্পাস নভেল।শ্রী বরুয়ার অন্যান্য উপন্যাসগুলি হল ‘মন অজন্তা’,’প্রেমিকা’,’অমোঘ নিবিড় অন্ধকার’,’ফিনিক্স পাখির গান’ইত্যাদি।একমাত্র গল্প সঙ্কলন ‘একান্ত ব্যক্তিগত’।১৯৮৩ সনে সরকারি চাকরি ছেড়ে পূর্বাঞ্চল প্রকাশ নামে প্রকাশন সংস্থা গড়ে তোলেন। তিনি নর্থ ইস্ট বুক ফেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।