রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

কটন কলেজ পর্ব ১

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

লেখক পরিচিতি -১৯৪৫ সনের ৭ নভেম্বর নবীন বরুয়ার জন্ম হয়।শ্রী বরুয়া একজন ঔপন্যাসিক,প্রকাশক এবং খবরের কাগজের কলাম লেখক।১৯৬৫ সনে তাঁর লেখা উপন্যাস ‘কটন কলেজ’হোমেন বরগোহাঞি সম্পাদিত ষান্মাষিক পত্রিকা ‘নীলাচল’এ প্রকাশিত হয় (১৯৬৯) ।১৯৭০ সনে উপন্যাসটি পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।গত পঞ্চাশ ধরে উপন্যাসটির পাঠকদের কাছে চাহিদা এক অভিলেখ সৃষ্টি করেছে।ভারতীয় ভাষায় লেখা এটিই প্রথম ক্যাম্পাস নভেল।শ্রী বরুয়ার অন্যান্য উপন্যাসগুলি হল ‘মন অজন্তা’,’প্রেমিকা’,’অমোঘ নিবিড় অন্ধকার’,’ফিনিক্স পাখির গান’ইত্যাদি।একমাত্র গল্প সঙ্কলন ‘একান্ত ব্যক্তিগত’।১৯৮৩ সনে সরকারি চাকরি ছেড়ে পূর্বাঞ্চল প্রকাশ নামে প্রকাশন সংস্থা গড়ে তোলেন। তিনি নর্থ ইস্ট বুক ফেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

।।এক।।

আপনি কটন কলেজে পড়েছিলেন ?

না,পড়িনি।

আপনি কটন কলেজে পড়েছেন ?

না,পড়িনি।

তবু এই কলেজ আপনার অপরিচিত নয়। পরিচিত । খুব ভালোভাবেই পরিচিত। হাজার জনের হাজারো ভালোবাসার কলেজ। প্রাণচঞ্চল চিরযৌবনা। অন্তহীন হাজার হাসির তরঙ্গ। অনেকেই রেখে গেল ভালোবাসা। অনেকে রেখে গেল বেদনা। কটন কলেজের প্রতিটি ইট হয়তো এর সাক্ষ্য দান করবে। কিন্তু সেই সাক্ষী কেউ চায় না। সেই সাক্ষী নেবার কারও সময় নেই।

নতুন ছেলে এসেছে। নতুন মেয়ে এসেছে।নতুন প্রফেসর এসেছে। নতুন পথে এগিয়ে চলা একদল সৈ্নিক যার আশা কেবল একটা মুক্ত আকাশ। যার স্বপ্ন এক অসীম দিগন্ত।

কেউ এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে নেতা হয়েছে।কেউ আবার অধ্যাপক হয়ে এই কলেজেই ফিরে এসেছে।কেউ ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে।কেউ গবেষক হয়েছে।কেউ কেরানি হয়েছে।কেউ আবার বেকার সমস্যায় একটা সংখ্যা যোগ করেছে।

কেউ কারও হিসেব নেয়নি। কারোরেই অতীতে প্রয়োজন নেই।কেউ হয়তো কটনের সামনে দিয়ে পথ চলার সময় অতীতের রোমন্থন করেছে।সেই হিসেব কোথাও নেই। সেই হিসেব কারও কাছেই আবশ্যক নয়।

দলে দলে ছেলে মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।ক্যান্টিন,লাইব্রেরি,কমন রুমে জায়গা নেই বলে কিছু ছাত্র ছাত্রী ফিরে এসেছে।তাদের মুখে প্রতি মুহূর্তেই কেবল ফাগুনের কথা।এখানে যেন আর অন্য কোনো ঋতু না আসে।ফাগুনের রঙ সমগ্র কলেজটাকে চঞ্চল করে রাখে।

কটন কলেজ যেন বুড়ো না হয়। কটন চিরযৌবনা।এর প্রতিটি ইট কেবলই বর্ণনা করছে অসমের যুবকের,অসমিয়া যুবতির যৌবন।এই যৌবনের যেন শেষ নেই।এই যৌবনের যেন অন্ত নেই।এই কলেজের ছেলেমেয়েরা একদিন দেশের স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।কারাবরণ করেছিল।পুলিশের বেয়নেটের খোঁচায় হয়তো চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল।

দেশ স্বাধীন হল।তবু আন্দোলনের শেষ নেই।তবু মরণের অন্ত নেই।তবু বর্বরতার শেষ নেই। হোস্টেলে থাকা ছেলে ভাষার জন্য প্রাণ আহুতি দিল।শহীদ হল। স্বাধীন দেশের বর্বরতার

শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এই কটন কলেজে খোদিত হয়ে গেল।

অসম কাঁদল।অসম চিৎকার করল।

তারপর সব চুপচাপ। সব নিস্তব্ধ।সবাই হয়তো এই কাহিনি ভুলে গেল। নতুন নতুন ছেলে এল। নতুন নতুন মেয়ে এল। নতুন নতুন প্রফেসর এল।

তবু কি এই যৌবনের,এই আনন্দের এই ভালোবাসা-বেদনার কোনো পরিবর্তন আছে? কিছুই নেই।

একদিন হয়তো অধ্যক্ষ সিনিয়র ছেলেদের বলেছিলঃ তোমরা চুরুটের নেশা না করে হুঁকোর নেশা কর,নিকোটিনটা জলের মধ্যে থেকে যাবে। আজকের দিনে অধ্যক্ষ কোনো অবাঞ্ছিত দৃশ্যের সম্মুখিন হলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কিছুই বলে না। হয়তো প্রাইভেসিকে সবাই সম্মান করে।এটাই হয়তো পরিবর্তন। পরিবর্তন শধু এখানেই। আজকের দিনেও দলে দলে ছেলে মেয়েরা সন্ধ্যেবেলা দীঘলী পুকুরের পারে ঘুরে বেড়ায়। তখনও ঘুরে বেড়াত। বাতাসের আঘাতে পুকুরের বুকে ঊঠানামা করা ঢেঊয়ের কম্পন আজ ও শেষ হয়ে যায়নি। আজ ও কাঁপছে। সেই কম্পন হাজার সিম্ফনির সৃষ্টি করছে,সৃষ্টি করছে ঢেউ,প্রেম,যৌবন এবং হাজার আশা আকাঙ্খার।

সেই হাসির মধ্যে আমি হারিয়ে গেছি। সেই হাসির মধ্যে তুমিও হারিয়ে গেছ। সেই হাসির মধ্যে,উন্মাদনার মধ্যে আমরা সবাই হারিয়ে গেছি।

এই কটন কলেজেই আমি ভরতি হলাম। হোস্টেলেও জায়গা পেয়ে গেলাম। চার জায়গার চারটি ছেলে একটা ঘরে রয়েছি।একটা নতুন প্রাণচঞ্চল ঘর সাজিয়ে তুলেছি। কয়েক মিনিট আগেও কেউ কাউকে চিনতাম না,জানতাম না।এখন সবাই সবার পরিচিত। আপনি দিয়ে শুরু করে আমাদের সম্বন্ধটা তুমি এবং শেষ পর্যন্ত তুই-এ এসে দাঁড়াল।

একই প্লেটে তরকারি নিয়ে আমরা চারজন বিকেলে লুচি খাই। একজন বামুন,একজন আহোম,একজন কায়স্থ।কেউ জিজ্ঞেস করেনি কার কী জাত। যা বোঝার উপাধি থেকে বুঝে নিয়েছি।

এসব জিজ্ঞেস করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের ধর্ম এক। আমাদের লক্ষ্য এক। আমাদের চিন্তাধারাও এক। এর পরে কি আর কারও গোত্র জিজ্ঞেস করার ,ধর্ম জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন আছে? ক্লাস,ক্যান্টিন,ঘুরে বেড়ানো,পড়াশোনা,সিনেমা দেখার একটা নতুন জীবন।

‘এই নিরঞ্জন,কী করছিস?’

‘চিঠি লিখছি।‘

‘কাকে,বাড়িতে?’

হ্যাঁ।

কত টাকার কথা লিখেছিস?’

‘টাকা।‘

‘হ্যাঁ,হ্যাঁ টাকা।ফার্স্ট উইকের চিঠিতে টাকার কথা না লিখলে আর কিসের কথা লিখবি,তার মধ্যে কাল মেসের কমিটি বসেছে।‘

‘তাই নাকি?’

‘তোর তো কোনো খবরই নেই।সত্যি তোর দিব্যি চলছে-কত টাকা লাগবে,কেন লাগবে এসব কিছুই লেখার দরকার নেই,টাকা আসতেই থাকে।‘

‘হু।‘

‘আচ্ছা তোর কাছে টাকা হবে নাকি?’

‘টাকা?’

‘হ্যাঁ,হ্যাঁ কয়েকদিন আগেই তো এসেছিল,এর মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে?এক টাকা হলেই হবে। অন্যান্যদের ফাস্ট উইক আমাদের লাস্ট উইক।পানামা না খেয়ে দুদিন থেকে চারমিনার খাচ্ছি।‘

আমি আর কথা বাড়াতে চাইলাম না,চুপচাপ উঠে গিয়ে বিছানার নিচে থেকে একটা টাকা বের করে দিলাম। একটু বেশি খরচ করলেও রমেন টাকা পয়সার ক্ষেত্রে ভালো,হাতে টাকা এলেই ফিরিয়ে দেয়,অবশ্য কখনও সুযোগ বুঝে ঝামেলা করে।

‘তোরই ভালো।লাস্ট উইকে অসুবিধা হয় বলেও মানি অর্ডার করে।আমাদের আবার ফাস্ট উইকে চিঠি দেওয়া,সেকেণ্ড উইকে আসবে,থার্ড উইক আসতে না আসতেই ব্যস খতম।আবার সেই মাসের সেকেণ্ড উইক হতে না হতেই এর কাছে ওর কাছে ধার দেনা শুরু। ‘

কথা বলতে বলতে রমেন বেরিয়ে গেল।সে ঠিকই বলেছে—টাকা চেয়ে আমাকে বাড়িতে চিঠি লিখতে হয় না। কিন্তু আমি কার কাছে টাকা চাইব?

বড় কাকার ৩০ টাকা আসে সেকেণ্ড উইকে,মানে প্রত্যেক মাসের ১১/১২ তারিখ পেয়ে যাই। ছোট কাকার ২০ টাকা আসে লাস্ট উইকে।এই দুটোই নির্দিষ্ট টাকা।আমার চিঠি লেখার প্রয়োজন হয় না। গুয়াহাটিতে আসার পরে দুই-একটা চিঠি লিখেছিলাম,আজ পর্যন্ত উত্তর না পাওয়ায় লেখা বন্ধ হয়ে গেছে। আমার তরফ থেকে কেবল মানি অর্ডার পাওয়ার খবরটা জানিয়ে একটা কার্ড দিই,ব্যস ততটুকুই।

পয়সা চেয়ে কাকাদের কাছে চিঠি লেখার আবশ্যক হয় না।

মা-বাবার কাছে কোন সাহসে চিঠি লিখে টাকা চাইতে যাব আমিতো জানি কত কষ্ট করে মা টাকাটা পাঠায়। আমি জানি না সেই পঞ্চাশ টাকা মা-বাবা কীভাবে পাঠায়।কখন ও দশ টাকা,কখন ও কুড়ি টাকার এক একটি মানি অর্ডার।এভাবেই সব মিলিয়ে পঞ্চাশ টাকা।এক সঙ্গে পুরো টাকাটা পাঠাতে ভয় করে,কে জানে জমা করতে গিয়ে যদি কোনোভাবে খরচ হয়ে যায়। আমি জানি এক একটি মানি অর্ডার পাঠাতে গিয়ে মায়ের কত রকম জোড়াতালি দিতে হয়। কখনও দুধ বিক্রি করে পয়সা জোগাড় করে আবার কখনও বা তাঁতের সাহায্য নিতে হয়।

আমি কখন ও টাকা পয়সার কথা লিখিনি। লিখবই বা কোন সাহসে?আমি জানি আমি টাকার কথা লেখা মানে মা আরও দুঘন্টা কম ঘুমোবে। বাবা অসহায়ভাবে মুহূর্তগুলি কাটাবে।আমার হায়ার সেকেণ্ডারি পাশ করার প্রথম দিনটার কথা মনে পড়ল।সেদিন পাশ করার খবরটার সঙ্গে যখন টেলিগ্রামটা এল আমি অন্যান্য ছেলেদের মতো আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠতে পারিনি।মা যখন আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল তখন মার দুগাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছিল।

সে চোখের জল কিসের ছিল জানি না।আমি দেখেছিলাম আমার দুচোখ ও অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে।

‘তারপর কলেজে যাওয়ার কী করবে?’

‘হু।‘

‘কথা বলছিস না কেন,শুনিস নি?

‘শুনেছি।‘

‘শুনেছিস যদি কিছু বলছিস না কেন?’

‘কী বলব?’

ওই ঘরের বিছানায় সেদিন আমার বাবা ছিল। অসহায় বাবা মাকে কী বলবে।বলার কিছু নেই। অন্যের জন্য সারাটা জীবন শেষ করে দিয়ে বার্ধক্য জড়িয়ে ধরা এই আমার বাবা।

এই ঘরে আমি।আর ও একটি উজাগর নিশা।আমার সামনে জীবনের আশা-আকাঙ্খাগুলি খসে পড়া অসহায় ছবি। আমি ঘুমোতে পারিনি।

এখন অনেক রাত। আমার সঙ্গে পাশ করা ছেলেদের সামনে হয়তো অনাগত ভবিষ্যতের হাজারো স্বপ্ন। হাজার স্বপ্নের হাতছানি।

আর আমার?এক এক করে আমার সাত রঙের রাজপ্রাসাদ ধ্বসে পড়ছে।,খসে পড়ছে সমস্ত স্বপ্ন,এক এক করে সমস্ত আশা।

‘ওকে কাল বড় সোণের কাছে লিখতে বলতো।‘

‘বড় সোণ কি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে?’

দেবে দেবে কেন দেবে না। আমি কি ওকে দিইনি? তার পড়ার খরচ,শুধু মাত্র পড়ার খরচই নয়,গান শেখার জন্য এমনকি আমি তবলা আর হারমোনিয়াম ও কিনে দিয়েছিলাম।

দেব বললে তো দিতে পারে,তবে ,তবে …’

‘দেবে দেবে,ওর জন্য আমি কত কিছু করেছি,সে আমার একটা ছেলের পড়ার খরচ দেবে না,তার এখন যথেষ্ট আছে,সে নির্দয় হতে পারে না,সে আমার ভাই,আমার ভাই….’

‘একটা কাজ করতে হবে।‘

‘কী?’

‘মিনিকে পাঠিয়ে দিতে হবে।‘

‘মিনিকে পাঠিয়ে তুমি কীভাবে থাকবে?সারা দিন আমি বাড়ি থাকি না,তাছাড়া বাড়ির এত কাজ তুমি কীভাবে করবে?’

‘পারতে হবে। মিনিকে পাঠিয়ে দিলে আরও দশ টাকা সেখান থেকে বাঁচাতে পারব।‘

পাশের ঘরে মা-বাবার অসহায় পরিকল্পনা।

এইঘরে আমি।

আমার সামনে চারপাশে ঘুরে বেড়ানো কিছু অসহায় শূন্য ছবি। একটা নিশা শুয়ে পড়েছে।দিনের ক্লান্তি এনেছে একটা রাত।

হাজার জনের হাজার ভালোবাসার নিশা।

একটা নিশা পৃথিবীতে নামিয়ে আনে হাজার ফেনিল স্বপ্ন। হাজার জীবন নতুন সুরে অঙ্কুরিত হয়।

আমার জীবনে কোনো সুর নেই।শুধুমাত্র মরা নদীর সুঁতি পড়ে রয়েছে।গতিহীন,স্বপ্নহীন,আশাহীন।পাশের ঘরে বাবা আর মা। অসহায় চোখে শুকিয়ে যাওয়া কিছু চোখের জল।

‘নীরেন?’

‘হু’

তুই সোণের কাছে এখনই একটা চিঠি লেখ। এখনই লিখে পোস্ট করলে সকালের ডাকে চলে যাবে।‘

‘কী লিখব মা?’

‘তোর পাশ করার খবরটা লিখ।তুই জিজ্ঞেস কর পড়ার খরচ কিছু দিতে পারবে কিনা?আগেরবার এসে তোকে পুরো পড়ার খরচ দিবে বলেছিল।‘

‘বলেছিল অবশ্য। তবে…..?’

‘কী হল?’

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।মা আমাকে পুনরায় আর জিজ্ঞেস করল না। মা জানে আমি কি বলতে চেয়েছি। সেই সংশয় মায়ের ও রয়েছে।তবু ক্ষীণ আশা,যদি কিছু একটা হয়ে যায়।

অবশেষে আমি লিখেছিলাম।কেবল সোণ কাকুর কাছেই নয়,আর ও অনেকের কাছে।কয়েকজনকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্যের জন্য লিখেছিলাম।কিছুলোকের কাছে পরোক্ষ সাহায্য চেয়েছিলাম। অনেকের কাছ থেকে অনেক উপদেশ এল,অনেক শুভেচ্ছা এল।কিন্তু কেবল মাত্র উপদেশ আর শুভেচ্ছার সাহায্যে তো আর সংসার চলে না।

মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন কেবল একটি জিনিস,সেটা হল টাকা।যদি টাকা থাকে,জীবনের হাজারটা পথ খুলে যায়। তার মধ্য থেকে কেবল যে কোনো একটি পথ খুঁজে নিতে হয়।

যদি টাকা নেই,জীবনের সামনে হাজার পথ পড়ে থাকলেও মিথ্যা,পথ পথেই থাকে,তাকে অতিক্রম করার সামর্থ্য থাকে না।

অবশেষে সোণ কাকা জানাল,আমার পড়াশোনার জন্য মাসে মাত্র ত্রিশ টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারবে।আমি অবশ্য এতটা আশা করিনি।তিনি ইচ্ছা করলে হয়তো আরও দিতে পারতেন,এমন কি হয়তো পুরো খরচটাই বহন করতে পারতেন,কিন্তু আমাকে দেবার যুক্তি কোথায়?তাই এটাই আমার কাছে যথেষ্ট ছিল।

বাবা অবশ্য কিছুটা আঘাত পেয়েছিল।বাবার মুখের দিকে তাকাতে গিয়েই আমার কানে বারবার বাবার একটা কথা বেজে চলছিল-ও নির্দয় হতে পারে না,সে আমার ভাই,আমার ভাই।‘

আমি বাবাকে বলেছিলাম,যথেষ্ট দিয়েছে। আজকের যুগে কত টাকা রোজগার করছে সেটা বড় কথা নয়,কীভাবে খরচ করছে সেটাই বড় কথা।আমার জন্য মাসে ত্রিশ টাকা খরচ করার কি কোনো যুক্তি আছে?

আমার মনে হয়েছিল,তিনি ঠিকই করেছেন।জীবনের প্রকৃ্ত সত্যটা সোণ কাকা আমাকে বুঝিয়ে দিতে চাইছে।বাবারা যে ভুল করেছিল,মা যে ভুল করেছে,যে ভুলের পরিণতি এতদিন পরে হয়তো মা-বাবা আজ অনুভব করছেন,সেই ভুলের গ্রাসে যেন আমি পুনরায় না পড়ি তার জন্য প্রতি মাসে মাসে সোণ কাকার মানি অর্ডারটা আমাকে হয়তো সচেতন করে দেবে।

অপ্রত্যাশিতভাবে কণ কাকার কাছ থেকে ত্রিশ টাকা পেয়েছিলাম।তিনি লিখেছিলেন ,আমাকে মাসে কুড়ি টাকা করে পাঠাবে। এই সাহায্য আমার আশার অতিরিক্ত ছিল।প্রফুল্ল মামা একশ টাকা এবং বুন পিসি পাঠানো ত্রিশ টাকা নিয়ে আমি কলেজে নাম লেখানোর জন্য প্রস্তুত হলাম।আমার চোখের সামনে হঠাৎ আশার আলো দেখতে পেলাম,আমি জানি না এর পরিণতি কোথায়?

আমি যাবার জন্য প্রস্তুত হলাম।এক অপ্রত্যাশিত চোখের জলে আমার দুচোখ ভিজে গেল।আমি মা-বাবাকে ছেড়ে যেতে হবে বলে কাঁদছি না।আমি বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে বলে কাঁদছি না।আমি আমার বর্তমান অবস্থার জন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি কেবল একটি মেয়ের জন্য।মিনি।হ্যাঁ,মিনির জন্য।

মিনি।আমাদের বাড়িতে আজ দুই বছর ধরে বসবাস করা একটি কুলি মেয়ে।আমি তাঁর জন্য কাঁদছি। ওর ভালোবাসা আমাকে কাঁদাচ্ছে।

যাবার আগে আমি সবার সঙ্গে কথা বলে এলাম। হাজার হলেও আমার মনটা তখন কোমল হয়ে পড়েছিল। ঠিক তখনই মিনি এগিয়ে এসে আমার হাতে কিছু খুচরো পয়সা গুজে দিয়ে বলল,‘দাদা রাস্তায় ক্ষুধা পেলে কিছু কিনে খেও।‘

আমি কত পয়সা রয়েছে হিসেব করে দেখিনি।এটা-ওটায়,পুজো-পার্বণে দেওয়া দুই এক আনা পয়সা জমিয়ে রেখেছিল।হাতের মুঠোতে পয়সাগুলি নিয়ে আমি কাঁদছিলাম।আমার চোখের জল আপনা থেকে গড়িয়ে পড়ছিল।

এই মেয়েটিকে হয়তো আমি আর দেখতে পাব না।এটাই হয়তো আমার শেষ দেখা।আজ আমি যাচ্ছি।কাল তুই ও যাবি।ওকে আমাদের বাড়িতে রাখার সামর্থ্য আর মা-বাবার নেই।মিনিকে পাঠিয়ে দিয়ে আমার জন্য দশ টাকার সাশ্রয় করাটা মা-বাবার কাছে এখন বড় কথা।

মিনি যাবে। হয়তো তাকে মা-বাবা অন্য কোনো বাড়িতে রেখে আসবে।সে আবার নতুন বাড়িতে সবাইকে ভালোবাসবে।তার মা-বাবা মাসের শেষে দশ টাকা নিতে আসবে।আমার কথা ভাবার মতো তার সময় হবে না।

আর আমি?

হাতের মুঠোতে পয়সা খামচে ধরে ভেবেছিলাম এই মেয়েটির ভালোবাসাকে কোনোদিন ভুলতে পারব,এই ভালোবাসাকে কি কোনোদিন উপেক্ষা করতে পারব?

একজন এগারো বছরের মেয়ে আমাকে কাঁদিয়েছে।না,না,কাঁদায় নি।একজন এগারো বছরের মেয়ে আমাকে হাসতে শিখিয়েছে,এই পৃথিবীর ভালোবাসার কথা বলেছে।হয়তো আমার চোখের জল শেষ করে দিতে চাইছে।হয়তো এই ধরনের ভালোবাসার দ্বারাই আমার চোখের জল একদিন শেষ করে দেব…..।