রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

কটন কলেজ, পর্ব ১৪

।।চৌদ্দ।।

গ্রুপের সব কয়টি ছেলেই উত্তেজিত।কেউ মেট্রনকে দোষ দিচ্ছে,কেউ আবার মেয়েদের দোষ দিচ্ছে।‘রাখ,রাখ আমাদের এতগুলি মেয়ে কী করছে,প্রতিবাদ করতে পারল না।তা না করে কিনা এভাবে কেঁদে কেটে চলে এসেছে থাকব না বলে।’

‘হাজার হোক মেয়ে তো,তাতে আবার বাড়ি থেকে এতটা দূরে রয়েছে…’

‘না,ব্যাপারটাকে কলেজ অথরিটি সেটল করতে হবে,ছাত্ররা ইন্টারফেয়ার করলে কোথাকার স্ফুলিঙ্গ গিয়ে দাবানলের সৃষ্টি করে কমিউনিয়াল রায়ট লেগে গেলে ভয়ঙ্কর কথা হবে।’

না অথরিটিতে যেতে হলে কথাটা পাঁচ কান হয়ে যাবে,স্টুডেন্টদের কথা স্টুডেন্টদেরই ডিসাইড করতে হবে’…

বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মন্তব্য শুনে চলেছি।আমরা এসে রেলওয়ে ওভারব্রিজের কাছাকাছি পৌছে গেলাম।হঠাৎ একটা রিক্সা এসে আমার পাশে দাঁড়াল।

‘নিরন!’

রিক্সায় চড়ে আসা মহিলাটির কথা শুনে আমি চারপাশে ঘুরে তাকালাম।মহিলাটি গ্রুপের মধ্যে আমাকে ছাড়া আর কাউকে চেনে না।সেইজন্য পরিচিতদের মধ্যে আমাকে দেখে আমাকেই ডেকে নিল।কিন্তু আমাদের গ্রুপের প্রত্যেকেই মহিলাটিকে জানে।সেইজন্য উত্তপ্ত আলোচনাগুলি বন্ধ করে সম্ভ্রমের সঙ্গে এবং উৎকণ্ঠা নিয়ে তার দিকে ঘুরে তাকাল।

‘কোথা থেকে এলে? ছাত্রীবাড়ি থেকে?’

মহিলাটির মুখে ভয় এবং উৎকণ্ঠার চিহ্ন।

‘হ্যাঁ,মেয়েদের রেখে এলাম।’

‘আমার সঙ্গে একবার আস তো,তোমার কোনো কাজ আছে নাকি?’

‘না,চলুন।’

আমি রিক্সায় উঠে বসলাম।বাকিরা আবার উত্তপ্ত আলোচনা করতে করতে ওভারব্রিজের দিকে এগিয়ে গেল।কিছুক্ষণ পরে হয়তো পানবাজারের কোনো একটি রেস্তোরায় গিয়ে বসবে। রিক্সা আবার ছাত্রীবাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। আমার পাশের উৎকণ্ঠিত মহিলাটি প্রত্যেকেরই পরিচিত প্রভা বরুয়া।

স্থানীয় একটি কলেজের অধ্যাপিকা।কিছুদিনের মধ্যে অসমিয়া সাহিত্য জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে নিয়েছেন,তাঁর কবিতার সুন্দর চিত্রকল্পগুলি আমাকে খুব আকর্ষণ করে। তবে এই মহিলা সাহিত্যিকের সঙ্গে আমার পরিচয় সাহিত্যের সূত্র ধরে নয়।আমরা একই জায়গার মানুষ,তাতে আমার পিসি একজনের বান্ধবী হিসেবে আমাদের বাড়িতে একটা সময়ে অল্প বেশি আসা-যাওয়া ছিল।এখন অবশ্য বিশেষ সম্পর্ক নেই। তবু পরিচিতিটা রয়েছে।তাই সমস্ত অপরিচিতদের মধ্যে আমাকে পরিচিত দেখতে পেয়ে আমাকেই কাছে ডেকে নিলেন।

‘ব্যাপারটা কী বলতো,আমি তিনটি মেয়ের স্থানীয় অভিভাবক,খবরটা পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছি।‘

‘না,না বিশেষ কিছু হয়নি,আমাদের মেয়েরা একটু কিছু হলেই ভয় পেয়ে যায়।’

‘আমিও ছয় বছর এই হোস্টেলে ছিলাম,কোনোদিন এসমস্ত কথা শুনিনি,এখন কী যে হয়েছে...’

আমি কোনো উত্তর দিলাম না। একটি সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ একটি উত্তপ্ত পরিবেশ গড়ে উঠল।

আমরা আর কতদিন খাবার টেবিল নিয়ে লড়াই করব।আমরা যতই সভ্য হই না কেন,নিজেদের যতই প্রগতিশীল বলে বেড়াই না কেন,খাবার টেবিল নিয়ে ঝগড়া আজও ঘুচল না।

আমার হয়তো গির্জায় যেতে কোনো বাধা নেই,কোনো মসজিদেও নির্বিঘ্নে ঢুকে যেতে পারব। হয়তো নামঘরের ভাওনা দেখে শেষ রাতে বাড়ি ফেরা অনেক ছেলেও আমাদের মধ্যে আছে। একটা সিগারেটকেই মুসলমান এবং হিন্দু ছেলেক একসঙ্গে খেতে বহুদিন দেখেছি। কিন্তু যখনই আনুষ্ঠানিকভাবে খাওয়ার প্রশ্ন উঠে তখনই চারপাশে হুলুস্থুল পড়ে যায়।

স্বাধীনতার আগে যারা পাকিস্তানের দাবী করেছিল আমরা তাদের সাম্প্রদায়িক বলে হেসেছিলাম,কিন্তু স্বাধীনতা লাভ করার পরে আমরা কী করলাম?

এখনও স্বাধীনতা পাওয়ার বাহাত্তর বছর পরেও ‘কটন হিন্দু হোস্টেল’,’কটন মুসলিম হোস্টেল হয়ে রিল।মুসলমান ছেলে হিন্দু ছেলের সঙ্গে অথবা হিন্দু ছেলে মুসলমান ছেলের সঙ্গে থাকবনা কোনোদিন বলেনি।

তাহলে কে বলেছে?

বলছে আমাদের সরকার,বলছে নৈতিক সাহসহীন আমাদের বড় বড় নেতারা,যারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়ে বিরাট বিরাট বক্তৃতা দেন,যার বক্তৃতা শুনে আমাদের যুবক-যুবতিরা ভবিষ্যতের ভারত গড়ার বিরাট স্বপ্ন দেখে।

আমাদের সরকার,আমাদের নেতারা জানে কটন কলেজ হল আমাদের ছাত্র সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করা একমাত্র কলেজ,কটন কলেজ আজ যা ভাবে কাল সমস্ত অসমের সমস্ত ছাত্র সমাজ তা ভাববে।

তাই এদের হিন্দু,মুসলমান করে রাখা ভালো,শাসন কার্যের সুবিধা।এটাই হল ব্রিটিশ শাসনের ব্যর্থ স্বপ্ন নিয়ে করা আমাদের সরকারের পরিকল্পনা।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম থেকে শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত ‘মহেশ’নামে গল্পটি একদিন বাদ দিয়েছিল এক অদ্ভুত যুক্তিতে। গল্পটিতে নাকি গো হত্যার কথা আছে।গো-হত্যা যে মহাপাপ।এটাই হল ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ বলে জয়ধ্বজ উড়ানো পণ্ডিতদের উর্বর মস্তিস্কের বাণী।

তাই কটন হিন্দু হোস্টেল,কটন মুসলিম হোস্টেল আজও থাকার জন্য কাকে দোষ দেব? ছাত্ররা এর প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু প্রত্যেকবারই প্রতিবাদ প্রতিবাদের মধ্যেই সীমিত থেকে গেছে,কোনো লাভ হয়নি।

আজকের ঘটনার জন্য হয়তো ছাত্রীবাড়ি হোস্টেলের মেয়েদের অনেকেই বলবে,একই রান্নাঘরে গো-মাংস রাঁধার জন্য এত হুলুস্থুল করার কী আছে,কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবাদ করে অথবা তাদের মধ্যে একটা আপোষ মীমাংসা করেই কথাটা শেষ করে দিতে পারতেন,ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে এরকম একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করল কেন? **

কিন্তু আসল কথা এটা নয়।কেবলমাত্র খাবার টেবিলকে কেন্দ্র করেই মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়নি,মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়েছে সেন্টিমেন্টকে আঘাত করা কিছু অবাঞ্ছনীয় পরিস্থিতির জন্য।

তারফলে কিছু মেয়েরা ভয় পেয়েছে।,বিশেষ করে বাইরে ঘটনাটি অন্য রকম রূপ নিয়েছে বলে।রুমাতো আমাকে দেখে কেঁদেই ফেললঃ দুদিন ধরে ভাত না খেয়ে আছি,তুমি একই কলেজের হয়েও একটা খবর পর্যন্ত করতে আসলে না।

খবর অবশ্য করেছি কিন্তু লোক দেখানো ব্যস্ততা দেখাতে যাইনি,মেট্রনকে ইমিডিয়েটলি সরাতে হবে বলে সভা সমিতিতে গরম গরম বক্তৃতাও দিই নি।

অবশ্য দেবীকাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে?সত্যিই ছাত্রীদের মধ্যে সম্প্রীতির ভাব কি একেবারেই নাই হয়ে গেছে? দেবীকা বলেছিল –‘আসলে বুঝেছেন খুব বেশি কিছু হয়নি,অন্তত বাইরে যেভাবে খবরটা ছড়িয়েছে সেরকম কিছু হয়নি,অবশ্য আমাদের মেয়েদের মধ্যে হঠাৎ একটা অপ্রীতিকর অবস্থার উদ্ভব হওয়ায় আমরা কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়েছি সেকথা সত্য,কিন্তু আমরা হোস্টেল থেকে ভয় পেয়ে পালিয়ে যেতে চাইনি,আমাদের যাবার প্রকৃ্ত কারণটা হল এই সুযোগে কলেজে মেয়েদের জন্য আরও একটি হোস্টেল তৈরি করা।না হলে মিশনারির অনুগ্রহে থাকতে পাওয়ার জন্য মাত্র কয়েকটি মেয়েকে সরকারি হোস্টেলে রেখে সবসময় আমাদের করুণার চোখে দেখে আসছে …’

দেবীকার কথাগুলি যুক্তিহীন নয়।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ,আমাদের শাসন ব্যবস্থা যা শেখাচ্ছে এরাও তাই করছে।

যদি প্রয়োজনের দাবীতে এক বৃহত্তর দৃষ্টিতে আমাদের সরকার থেকে কিছু চাওয়া হয় তাহলে ব্যর্থতা আর গ্লানি ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না।যদি কেউ ধর্মের দোহাই দিয়ে,বর্ণের দোহাই দিয়ে কিছুটা হুলুস্থুল লাগিয়ে দিতে পারে তাহলে সমস্ত সুবিধা এই সুযোগে আদায় করে নিতে পারে।

কিছুদিন আগের কথা।

লাইব্রেরি সায়েন্সের ট্রেনিং নেবার জন্য কিছু শিক্ষক এসে আমাদের হোস্টেলে ছিল।তার মধ্যে একজন মিজো শিক্ষক আমাদের পাশের ঘরে ছিল।দুদিন থাকার পরে হঠাৎ দেখি মিজো শিক্ষকটি বাক্স-পেঁটরা নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত। কৌ্তূহলবশত আমি পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম –

‘কী হল আপনি চলে যাচ্ছেন যে?’

আমি মিজোদের একটা মেসবাড়ি খুঁজে পেয়েছি।‘

‘কেন এখানে কি খুব অসুবিধা হচ্ছে?’

‘অসুবিধা? ওহো,ভাত-চা এর ক্ষেত্রে খুব সুবিধা পেয়েছি।এর চেয়ে বেশি সুখ আর কী প্রয়োজন?’কথাটা কিছুটা ব্যঙ্গ করেই বলল।

‘কেন,মেসে জয়েন করলেই তো সমস্যা মিটে যায়।‘

‘মেস? আই অ্যাম এ খ্রিষ্টিয়ান মাই ফ্রেণ্ড,অ্যাণ্ড খ্রিষ্টিয়ান ইজ নট অ্যালাউড টু জয়েন ইন ইউর মেস।’

কথাটা শুনে আমার মুখে আর কোনো কথা জোগাল না। আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। লজ্জায় আমার কান-মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল।এর পরের কথাগুলি মিজো শিক্ষক নিজেই বল্লেন—তারই কিছু কথা এখনও আমার কানে বাজতে থাকে—আই অ্যাম এ খ্রিস্টিয়ান,আই হেড এ সুপারস্টিশন দেট আই ওয়াজ এন আসামীজ... বাট নাউ আই ফীল দেট আই এম মোর খ্রিস্টিয়ান দেন এন আসামীজ নাও আই ফীল ইট ইজ বেটার ফর আস টু সেপারেট আওয়ার সেলভস এণ্ড ফাইট ফর আওয়ার ফ্রিডম...

আমি কিছুই বললাম না। বলার মতো কী-ই বা ছিল। এক অসহায় বেদনায় আমি কেমন যেন পঙ্গু হয়ে যাচ্ছিলাম।এই শিক্ষায় শিক্ষিত আমরা দেশের ভবিষ্যৎ।আমাদেরই গড়তে হবে সাম্প্রদায়িকতাহীন এক ভারত,আমাদের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বের করতে হবে পাহাড়-সমতল সম্প্রীতির নতুন শ্লোগান।

কাজেই এই মেয়েরা কী ভুল ক্রেছে?আমি বল্ব,কোনো ভুল করেনি। কোনো ভুল হতে পারে না।

ধীরে ধীরে ছাত্রীবাড়ির হোয়াইট মেমোরিয়াল হোস্টেলের গেটের সামনে এসে পৌছলাম।

‘মিছামিছি এলাম’আমি বল্লাম।যদিও আজ শনিবার বলে ৭ টা পর্যন্ত ভিজিটার আওয়ার ছিল,কিন্তু আজ পাঁচটার সময় হোস্টেল বন্ধ করে দিয়েছে।’

‘না আমাকে দেবে’দিদি বললেন—ছয় বছর এই হোস্টেলে আমি থেকে গেছি।তাতে আমি তিনজন ছাত্রীর লোকাল গার্জেন।তাছাড়া গার্লস হোস্টেলে মেয়েদের প্রবেশের ক্ষেত্রে তেমন কোনো বাধা-নিষেধ নেই।’

আমরা রিক্সা থেকে নামলাম।ইতিমধ্যে অনেক গার্জেন গেটের সামনে পৌছে গেছে।সবাই কেবল একটি কথাই বলছিল,আমরা মেয়েদের নিয়ে যাই,কে জানে রাতের বেলা কী হবে।

প্রভা দিদি এবং আমি বুঝিয়ে শান্ত করতে পারিনি যে বিশেষ কিছুই ঘটেনি।এভাবে মেয়েদের নিয়ে গেলে কথাটা বাইরে বাজে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া সবার লোকাল গার্জেন তো আসেনি।যাদের আসেনি তাদের কী অবস্থা কী হবে?

মানুষগুলিকে বুঝিয়েছি,কিন্তু কেউ আমাদের যুক্তি মানছে না।সবারই এক কথা,আমরা তো মা-বাবা নই,কোথাও কিছু একটা হয়ে গেলে সমস্ত দোষ আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে,তাই আমরা ওদের নিয়ে যাব।

অবশেষে মেট্রনের সঙ্গে দেখা করার জন্য হোস্টেলের ভেতরে যেতে চাইলেন প্রভা দিদিমণি।চৌকিদার বাধা দিল।প্রভা দিদিমণি তখন নিজের পরিচয় দিয়ে খবর দিলেন,জবাব এল,হোস্টেলের ভেতর এখন কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হবে না। অবশেষে প্রভা দিদিমণি এসে রিক্সায় উঠলেন।পাশে আমি।দিদি কোনো কথা বলছেন না।মুখ চোখে ব্যর্থতা আর অপমানের জড়তা।জীবনের ছয়টা বছর এই হোস্টেলে পার করা প্রভা বরুয়া,অসমের সবার কাছে পরিচিত সু-সাহিত্যিক প্রভা বরুয়া,একটি স্থানীয় কলেজের অধ্যাপিকা প্রভা বরুয়া ,তিনটি মেয়ের স্থানীয় অভিভাবিকা প্রভা বরুয়া।

কিন্তু একটা বেসরকারি মিসন হোস্টেলের সামনে থেকে তাকে কিনা ভিখারিনীর মতো ফিরে আসতে হল। এর প্রতিবাদ কে করবে? এইজন্য কি হোস্টেল কর্তৃপক্ষকে দোষারূপ করা যাবে? যাবে না,কারণ কর্তৃপক্ষ আইন এবং শৃঙ্খ্লার নামে কর্তব্য পালন করেছে। তাছাড়া আমরা যে প্রতিবাদ করব আমাদের সেই নৈতিক সাহস কোথায়?

আমরাই তো আমাদের ছেলেমেয়েদের মিশনারি স্কুলে পড়াচ্ছি বলে গর্ব করি।শিক্ষার প্রসার বিষয়ে বিরাট বক্তৃতা দেওয়া লোকেরাই তো তাঁদের মধ্যে বলেঃ সরকারি স্কুলে পড়িয়ে আমাদের ছেলেমেয়েদের নষ্ট করছি না। আমার ছেলে এবার সিনিয়র কেম্ব্রিজ দেবে।

এইসব মিশন স্কুল থেকেই তো হাজার হাজার ভারতের ভবিষ্যতের জন্ম হবে।আমরা তো ভারতের ভবিষ্যৎ নই—তাই এসব কথার প্রতিবাদ করার জন্য আমরা কোথা থেকে নৈ্তিক সাহস খুঁজে পাব?

সেইজন্য প্রভা দিদিমণির অবস্থার জন্য আমি দুঃখ করছি না। এসব কথা চিন্তা করার মতো আমার অবকাশ নেই। আমার মনটা ঘিরে আছে অন্য একটি মেয়ে—আমি অন্য একটি মেয়ের কথা ভাবছি।

আমি ভাবছি রুমার কথা,হ্যাঁ রুমার কথা।রুমা আজ আমাকে দেখে রাস্তার মধ্যেই রাগে আর অভিমানে কেঁদে ফেলেছে।সে আজ এই হোস্টেলে থেকে কটন কলেজে পড়ায় অনেক দিন হয়ে গেছে।গত জুলাই মাসে অ্যাডমিশন নিয়েছে। কিন্তু আমি একদিনও তার খবর নিইনি।মাসির মেয়ে বলে আমার হয়তো একটা খবর করা উচিত ছিল।

আমি জানি রুমার খবর নেওয়া মানে নীতা এবং নীতিরও খবর নিতে হবে।নীতাতো গত বছরেই এসেছে।নীতি অবশ্য এই বছর এসেছে। ওরা দুজন আমার পিসির মেয়ে? কিন্ত এটা কি আমার পক্ষে সম্ভব? আজ আর এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।কোনো আত্মসম্মান থাকা লোকের পক্ষে এটা সম্ভব নয়।তবু নীতা-নীতির যে আমি প্রয়োজনে খবর নিই নি তা কিন্তু নয়।একদিন নীতি ছুটে এসে আমাকে বলেছিলঃডাক্তার জামাইবাবুকে একবার ফোন করে দে না,দিদির অসুখ,কিন্তু জামাইবাবুর ওষুধ ছাড়া ও আর কাউকে দেখাবে না। সঙ্গে সঙ্গে না বলতে গিয়ে সেদিন আমি থমকে গিয়েছিলাম। ফোন করতে গিয়ে আমি সেদিন কী ভেবেছিলাম,কী দরকার আমার এভাবে ফোন করতে যাওয়ার,আমি তো কার ও চাকর নই। তবু আমি সেদিন ফোন করেছিলাম।নীতা এবং নীতিকে আমি সেদিন পিসির মেয়ে বলে এই সাহায্য করিনি,করেছিলাম একই কলেজে পড়াশোনা করা কোনো একটি অসহায়া মেয়ের প্রতি কর্তব্যবোধকে স্মরণ করে।সেদিন আমার মনের এটাই সান্ত্বনা ছিল। তবু সেদিন বারবার একটি পুরোনো কথা মনে পড়ছিল।

পুরোনো মানে খুব বেশি পুরোনো নয়।কয়েকবছর আগের কথা।আমার একবার একটু অসুখ হলে ভালো ডাক্তার দেখাব বলে নীতা-নীতিদের বাড়ি গিয়ে উঠেছিলাম।নিজের পিসির বাড়িতে না থেকে কোথায় থাকব,সম্ভবত এটাই ছিল আমাদের সামাজিক সংস্কার শেখানো আমার ধারণা।

কিন্তু এর পরে একবার বাবা নীতা-নীতিদের বাড়িতে গেলে পিসেমশায় বললেনঃ ‘এটা হাসপাতাল নয়,হোটেল ও নয়,অসুখ হলে হাসপাতাল ,থাকতে হলে এখানে হোটেলের অভাব নেই,মানুষের বাড়িতে এসে অসুবিধা সৃষ্টি করা কেন?’

এর পরে নীতা-নীতিদের বাড়িতে আমি অথবা আমাদের বাড়ির কেউ যাইনি। অবশ্য এই ঘটনা নীতা-নীতিরা জানে কিনা আমি জানি না। গুয়াহাটি এসে একই কলেজে পড়াশোনা করছি।একটা সহজ সম্বন্ধের মধ্য দিয়ে দিনগুলি পার করছি যদিও পারতপক্ষে আমি নীতা-নীতিদের এড়িয়ে চলতে চাই। সেইজন্য নীতা-নীতিরাও উপযাচক হয়ে কোনো খবর করেনি।একই কারণে রুমার কাছ থেকেও দূরে সরে থাকতে চাই। তবু এসব কথা রুমাকে বলতে পারলাম না।

এজন্য অনেক মিথ্যা কথা বললাম,অনেক সাজানো গোছানো কথার সাহায্যে বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করলাম ,আসল কথাটা আমি ইচ্ছা করেই তার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখলাম। এসব কথা বলায় লাভই বা কোথায়?

রিক্সাটা শব্দ করে এগিয়ে চলেছে।ডিসেম্বর মাসের ঠাণ্ডায় আমরা কেঁপে উঠছি।কেউ কথা বলছি না। আর আমি? আমি ভাবছি রুমার কথা।আমার মনে এখন ছাত্রীবাড়ির মেয়েদের কথা নেই।সেসব কথা ভাবার জন্য ইতিমধ্যে অনেক নেতার জন্ম হয়েছে।সত্যি সত্যিই আমি রুমার খবর না নিয়ে ভুল করছি কি? আমি ভেবে ভেবে কোনো কূল কিনারা পেলাম না।


চলবে ...

--------------------------------------------------

**১৯৬৪সনের ডিসেম্বর মাসে ছাত্রীবাড়ির হোয়াইট মেমোরিয়াল হোস্টেলে গো-মাংস রান্না করা নিয়ে এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।কিছু রাজনৈ্তিক লোক একে সাম্প্রদায়িক রূপ দেবার জন্য চেষ্টা করেছিল।কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের দৃঢ় মনোবল এবং কলেজের অধ্যক্ষেবং কয়েকজন অধ্যাপক,ছাত্রনেতার সুদক্ষ তৎপরতায় এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।