রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

কটন কলেজ, পর্ব -১১

।।এগারো।।

আমি,বিমল বরঠাকুর এবং রমেন।

রুমটিতে আর কেউ নেই।কেবল আমরা তিনজন। দুই একজন উঁকি মেরে জানালা দিয়ে দেখে গেছে,কেউ ভেতরে প্রবেশ করেনি।

দরজাটা বন্ধ।

রমেন ইচ্ছা করেই দরজাটা বন্ধ রেখেছে।অমূল্য শর্মা কোথাও গেছে।প্রি-ইউনিভার্সিটির ছেলেটিও নেই।হয়তো রুমের গুমোট পরিবেশে অতিষ্ঠ হয়ে চলে গেছে।

‘তুই ভাতগুলি খেয়ে নে বিমল…’

রমেনের মৌনতা ভাঙ্গা কথাগুলিতে আমরা সত্যিই চমকে উঠলাম।রমেনের কথাগুলি যেন কেবল রুমের মৌনতাই ভাঙেনি,আমাদের প্রত্যকের অন্তর গুলিকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে দিয়েছে। বিমল একবার ভাতগুলির দিকে তাকাল তারপর মুখটা ফিরিয়ে নিল। টেবিলের ওপরে রাখা ভাতের থালা যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জের মতো হাসল। বিমলের দিকে তাকালাম,তার চোখে কেবল দেখতে পেলাম কিছু বেদনার সিক্ত রেখা।

‘আমি রাতের ট্রেনে চলে যাই রমেন।’

অনেক সময় নীরবে থেকে বিমল মাত্র এই কয়েকটি কথা বলল।

‘না,না তোর যাওয়া হবে না,তোর যাওয়া হবে না,আমরা কিছু একটা করব,করতেই হবে…’

‘তোরা আমার জন্য অনেক করেছিস আর কত করবি। আমার সঙ্গে তোর ভবিষ্যৎকে নষ্ট করার যুক্তি কোথায়?কিছু করতে হবে না,কী করবি তুই।’

রমেন কী করবে জানে না।সে কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না।রমেন অনেক করেছে আর কত করবে?সেও ছাত্র,সে আত্মনির্ভরশীল নয়।মাসের শেষে তাকেও মানি অর্ডারের পথ চেয়ে থাকতে হয়।

আমিতো কিছুই করতে পারব না।রমেন অনেক করেছে।আমি হয়তো বিমলের সঙ্গে একই পথের পথিক।বিমলের আজ যা হয়েছে আমার হয়তো কাল হবে।আমাদের দুজনের মধ্যে পার্থক্য শুধু এতটুকুই।আমি আবার ভাতের থালাটার দিকে তাকালাম।কিছুক্ষণ আগে ঠাকুর একটা বাটিতে ডাল,অন্য বাটিতে ডিমের ঝোল রেখে গেছে।

থালার ঠাণ্ডা ভাতগুলি যেন অসহায় তিনটি প্রাণীর বেদনাবোধকে উপহাস করছে।

এই ভাত বিমলের জন্য।

না রমেনের গেস্টের জন্য,বিমলের নয়।

বিমল।

দুটো বছর এই হোস্টেলেই বসবাস করা বিমল।সবসময় চিরপ্রফুল্ল বিমল।কটন কলেজের দ্বিতীয় বার্ষিকীর বিমল।

দুই বছর আগে বিমল ও জীবনের হাজার হাজার স্বপ্ন নিয়ে এই কলেজে এসেছিল,প্রতিদিন নতুন রূপ লাভ করা আশার ভ্রূণ নিয়ে-কিছু একটা করব,নিজের জীবনটাকে গড়ে নেব,অভাবগ্রস্ত মা-বাবাকে কিছুটা হাসি এনে দেব,ভুলে যাওয়া হাসিকে ফিরিয়ে এনে দেব-এরকমই কিছু দুঃস্বপ্ন নিয়ে।

বিমলের পড়ার খরচ দূর সম্পর্কের এক কাকা জুগিয়েছিল। কিন্তু গত পরীক্ষার পাঁচ মাস আগে থেকে কী কারণে যেন বিমলকে খরচ পাঠানো হল না। সে কথা সে কাউকে বলেনি।মুহূর্ত আর ক্ষণ গুনে দিনগুলি পার করছিল।কটন কলেজ বলেই কথাটা কেউ জানতে পারেনি।ফীস না দিয়ে থাকলে রেজাল্ট উইথহেল্ড করা ছাড়া আর কিছু করে না।হোস্টেলে মেস ডিউজ বাকি পড়ে গেছে যদিও কেউ খবর করছে না। এভাবে দুই এক মাসের অনেকেরই বাকি পড়ে যায়।বাড়ি থেকে আনা ফীস অন্য কাজে খরচ করে ফেলে। মেস কমিটিও জানে,সুপার ও জানে ছেলেরা বাড়িতে ফোন করে দিলেই টাকা এসে যাবে।দুঃখী ছেলে,টাকা-পয়সা না থাকা ছেলে যে কটন কলেজে পড়তে আসে না তা সবাই জানে।

কিন্তু গত বছর পরীক্ষার পরে হঠাৎ হুলুস্থুল লেগে গেল। কথাটা কীভাবে যেন প্রকাশ হয়ে পড়ল যে বিমল বরঠাকুর পাঁচ মাসের মেস ডিউজ দেয়নি।তিনশো টাকার ও বেশি ফীস বাকি পড়ে গেছে।

বিমলকে মেস কমিটি ডেকে পাঠাল।সে মিথ্যা কথা বললেই পারত যে টাকা এলেই দিয়ে দেবে,বাড়িতে জানিয়েছি ইত্যাদি। ব্যাপারটা তাহলে ওখানেই মিটে যেত।কিন্তু সে মিথ্যা কথা বলল না।সে তাঁর সত্য কাহিনি জানিয়ে দিল।

সঙ্গে সঙ্গে মেস কমিটিতে হুলুস্থুল পড়ে গেল।একটি ছেলে এতগুলো টাকা মেরে দিয়ে যাবে,তা হতেই পারে না,বিচার হতে হবে-সবাই সমস্বরে জানাল।

বিচার হল।সুপার মেস কমিটির সিদ্ধান্ত নোটিস বোর্ডে জানিয়ে দিল।বিমল বরঠাকুরের সেই রাত থেকে হোস্টেলে খাওয়া বন্ধ। যতদিন মেসের ফীস জমা দেওয়া না হয় ততদিন তাঁর বিছানাপত্র,বাক্স ইত্যাদি সুপারের কাছে জমা থাকবে।

কথামতো কাজ।বিমল বাধা দিল না।কিন্তু রমেন হঠাৎ একটা অবাক কাণ্ড করে ফেলল।বিমলের এই ধরনের একটা শোচনীয় অবস্থা হতে না দিয়ে রমেন জামিন লিখে দিল।যদি দুমাসের মধ্যে বিমল টাকা দিতে না পারে,সেই টাকা রমেনদেবে,রমেন না দিলে তাঁর রেজাল্ট উইথহেল্ড করে রাখা যেতে পারে।এরপরে বিমল বাড়িতে চলে গেল।আমি রমেন,বাকি সবাই বাড়ি চলে গেলাম।কারণ ইতিমধ্যে আমাদের প্রত্যেকেরই পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছিল।পরেরটুকু হোস্টেলে এসে জানতে পেরেছিলাম।বিমলের জন্য উইথহেল্ড হয়ে থাকা রেজাল্ট রমেন টাকা দিয়ে বের করল।

বিমলের কোনো খবর নেই। কিছু ছাত্র বিমলকে ঠগ বলল।বাকিরা রমেনের মতো ছেলে এই ধরনের বোকামি কীভাবে করতে পারল তা নিয়ে মুখরোচক আলোচনা চালাল,নানা প্রশ্ন করল।

রমেন এই সমস্ত কথার কোনো উত্তর দিল না। কেবল বলল ‘আমি তো লোকের ওপর টেক্কা দিয়ে চলি বলে বদনাম আছেই,এবার নাহয় একটু পুণ্য করলাম,তাতে কী-ই বা হল?ভয় নেই টাকা কীভাবে আদায় করতে হয় আমি জানি,তোরা তো রয়েছিস। তোদের ওপরে টেক্কা মেরে কয়েকমাস চালিয়ে দিলেই পয়সা বেরিয়ে যাবে,কী বলিস?

এরপরে কেউ কিছু বলতে সাহস করল না।রমেনকে যে এক্ষেত্রে ঘাঁটিয়ে লাভ নেই তা সবাই জানে,ঠিকই তো কখন কার মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গে। তাই সবাই এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলল। কিন্তু সেই বিমল আজ হঠাৎ এসে উপস্থিত হল।

এক মাসের ওপর হয়ে গেছে ক্লাস আরম্ভ হয়ে গেছে।ওকে দেখে আমরা অবাক হলাম,কারণ সে যে আসবে সে আশা আমরা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। তাকে পেয়ে রমেন উছ্বাসে জড়িয়ে ধরল।

সেই উচ্ছ্বাস দেখে কয়েকজন মুখ টিপে হাসল।নির্লজ্জ মনটাকে চেপে রাখতে না পেরে কেউ কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল , ‘আবার যে?’

এটা প্রথম সম্ভাষণ। ‘আবার যে’মানে আবার এলি কেন?পয়সা নেই যদি ,তোমার পড়শোনার সখ কেন,তাও আবার কটন কলেজে?’

সে কোনো উত্তর দিল না।উত্তউত্তর দেবার মতো তার হয়তো কিছ নেই।সে যেতে চাইছিল না।আমি,রমেন তাকে জোর করে ডাইনিং রুমে নিয়ে গেলাম।আমরা সবাই খেতে আরম্ভ করলাম।কিন্তু আমাদের মধ্যে যে বিমলকে ভাত দেওয়া হয়নি সে কথাতো প্রথমে মাথাতেই আসেনি।কিন্তু রমেন কথাটা খেয়াল করেছিল।

‘ওকে ভাত দাওনি কেন?’রমেন জিজ্ঞেস করায় বিমলের থালার দিকে তাকিয়েছিলাম।আরে তাইতো,ওর থালায় তো ভাত দেওয়া হয়নি।

‘ওকে খাবার দিতে নিষেধ করা হয়েছে।’

ঠাকুরের কথায় আমরা দুজন চমকে উঠেছিলাম।বিমল ধীরে ধীরে উঠে বেরিয়ে গেল।রমেন হুলুস্থুল করে চিৎকার করে উঠল,‘কে নিষেধ করেছে,কেন নিষেধ করেছে?’

তার প্রশ্নের উত্তর কেউ দিল না। ‘নাথ’রমেন বেশ জোরে চিৎকার করে ডাকল।নাথ একপাশে ভাত খাচ্ছিল।তিনি মেস সেক্রেটারি।

‘আই এম হেল্পলেস,আমার কোনো উপায় নেই,সুপার জানেন।’

‘আপনি কিছু জানেন না বললে হবে নাকি?’রমেন আগের চেয়েও জোরে চিৎকার করে বলল,‘সঙ্গের একটি ছেলেকে এভাবে অপমান করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? নতুন ছেলেদের সামনে এভাবে বিমলকে অপমান করতে আপনাদের একটুও খারাপ লাগল না?’

‘ও পয়সা দেয়নি’-ভাতের গরাসটা মুখে দিতে দিতে কথা বলায় কথাটা স্পষ্ট হল না।

‘পয়সা দেয়নি মানে? আগের সমস্ত ফীসতো আমি দিয়ে দিয়েছি?’

কারেন্ট মাসের অ্যাডভান্স এখনও দেয়নি।

‘আপনি নিজে কখনও কারেন্ট মাসের ফীস অ্যাডভান্স দিয়েছিলেন?এক তারিখে যে ফীস দেবার কথা সেটা পেতে পেতে পনেরো-কুড়ি তারিখ হয়ে যায় না? তখন কি আমাদের ভাত বন্ধ করে দেন?আপনি না খেয়ে থাকেন?’

‘এটা মেস কমিটির ডিসিশন,তাঁর আগের ঘটনাটার জন্য …’

ও যতদিন আপনারা জানতেন সে ধনী পরিবারের ছেলে,খেয়ালের বশে পয়সা দেয়নি,সেদিন পাঁচমাস বাকি খাওয়াতেও আপনাদের কোনোরকম অসুবিধা হয়নি।কিন্তু যেদিন জানতে পারলেন তার টাকা পয়সা নেই,তার আগের বাকি আমিই শোধ করলাম,সেদিন থেকে তার জন্য নতুন আইন করা হল কারেন্ট মাসের অ্যাডভান্স মেসে জয়েন করা দিনেই দিতে হবে-ওকে তো আজ ভাত খাওয়ার পরেও কথাটা জানাতে পারতেন,তা না করে ওকে এভাবে অপমান করলেন কেন? ওকে আমি নিয়ে এসেছিলাম,প্রয়োজনে আমার নামে গেস্ট চার্জ লিখে রাখতে পারতেন?’

রমেন কথা বলতে বলতে ক্রোধে লাল হয়ে উঠেছিল।আমি ভাত খাওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম।কিছু লোক কৌতূহল নিবারণ করার জন্য আমাদের দিকে তাকিয়েছিল।নতুন ছেলেদের চোখে অবুঝ কৌ্তূহলের চাহনি।

‘কারও কোনো কমপ্লেইন থাকলে মেস কমিটিকে জানাতে পারেন,এটা ডাইনিং হল’’মেস কমিটির অডিটর ডম্বরু হঠাৎ গম্ভীরভাবে বলে উঠল।

‘কী?’

ক্রোধের বশে বেরিয়ে আসা শব্দটির সঙ্গে রমেন এক হাতে জোরে নিজের থালাটা ঠেলে দিল।থালাটা পাকা মেঝেতে পড়ে ঝনঝন করে আওয়াজ করে উঠল।ভাত-তরকারি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবেশটা উত্তপ্ত হয়ে ঊঠল।

‘কী পাগলের মতো কাজ করছিস?’

আমি হাতটা টান মেরে ধরে বসিয়ে দিলাম।তারপর তাকে জোর করে আমি আর অমূল্য রুমে নিয়ে গেলাম।কিছুক্ষণ পরে রমেন বলল,যা ঠাকুরকে বলে দে বিমলের রাতের খাবারটা ঘরেই দিয়ে দিতে। ও আমার গেস্ট,গেস্ট চার্জ আমার নামে লিখে রাখতে বলবি।’

‘দিতে হবে না।’

বিমলের প্রতিবাদে কান না দিয়ে আমি বেরিয়ে গেলাম।ঠাকুরকে বললাম,আমাদের রুমে একজনের খাবার পাঠিয়ে দেবার জন্য,গেস্ট মনিটরকে বলে গেস্ট চার্জটা আমার নামে লিখে রাখতে বললাম।‘আমি জানি এভাবে বিমলকে এক রাতে ভাত খাইয়ে তাকে করুণা করা ছাড়া আর কিছুই করা হবে না। কিন্তু তবু রাতটা তো তাকে উপোস করে থাকতে দেওয়া যায় না।

সেই ভাত বিমল খায়নি।কী বলেই বা খাবে।ওর কি ভাত খাবার মানসিক অবস্থা আছে?পড়ার টেবিলের ওপর রাখা ভাতের থালাটার দিকে তাকিয়ে আমরাও মাথা নিচু করে নিয়েছি।পর্বতাকায় ভাতের স্তূপটা যেন আমাদের করুণা করছে।

একটা পড়ার টেবিল।তার ওপরে ভাতের থালা এবং কয়েকটি বই।যার একবেলা ভাত খাবার অধিকার নেই সে কীভাবে পড়াশোনার কথা ভাববে?ভাতের থালাটা যেন হিমালয়ের গৌ্রবে কাছেই ছড়িয়ে থাকা বইপত্র গুলিকে বলছে –‘যার একবেলা ভাতের অধিকার নেই,তার পড়ার অধিকার কোথায়?তোমাদের পাতাগুলি উলটে দেখে নেবার আগে আমার ওপরে থাকা ভাত খাবার অধিকার থাকতে হবে।’

শিক্ষা বলে কথাটা দুঃখীকে করুণা করার জন্য।যার পেটকে সান্ত্বনা দেবার সামর্থ্য নেই,সে আবার কী সাহসে মনকে সান্ত্বনা দেবার জন্য উচ্চ শিক্ষার দুরাকাঙ্খা করতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারে না।আমিও দিতে পারিনি।গত দুই বছর আমিও একই কথা ভাবছি।আমি জানি পড়তে এসে আমিও কি একই ভুল করছি না?

নিজেকে বোঝাতে পারছি না কটন কলেজে আমি কেন এসেছি।আমার মতো মানুষের জন্য উচ্চাকাঙ্খা আর দুরাকাঙ্খা শব্দ দুটির মধ্যে কোনো কথা নেই।আমিও বলতে পারি না আর কতদিন নিজেকে ফাঁকি দিয়ে কাটাব।দুই-একমাস মেসে পয়সা বাকি পড়লেও কারও আপত্তি নেই।এত দূর থেকে হোস্টেলে থেকে পড়তে এসেছি বলে আমাকে ধনী মানুষের ছেলে বলেই মনে করে।তাই কেউ কিছু বলতে সাহস করেনা।কিন্ত যেদিন আমার প্রকৃ্ত পরিচয়টা বেরিয়ে পড়বে,সেদিন কি একবেলা খাবারের জন্য আমার অবস্থা রাস্তার কুকুরের চেয়েও খারাপ হবে না কি?

‘নিরঞ্জন।’

হঠাৎ রমেনের কথা শুনে চমকে উঠলাম।এতক্ষণ নিজের কথা ভেবে ভেবে আমি বিমল আর রমেনের অস্তিত্ব ভুলে গেছিলাম।আমি কোনো উত্তর না দিয়ে তার মুখের দিকে কেবল তাকালাম।

‘একটা কাজ করলে কেমন হয়?’রমেন জিজ্ঞেস করল।

‘কী?’

‘হোস্টেলে দৈনিক অনেক ভাত ফেলা যায় না কি?তাছাড়া কেউ কোথাও থেকে গেলে তার জন্য বরাদ্দ ভাত প্রতিদিন বিকেলে ফেলে দেওয়া হয়।’

‘দেয়,আট দশটা মানুষের প্রতিটি বেলায় দৈনিক লোকসান হয়’—রমেনের কথা কিছুই বুঝতে না পেরে্ কেবল মাত্র তার কথার উত্তর দেবার জন্যই বললাম।

‘আয়,আমার সঙ্গে আয়।‘রমেন উচ্ছ্বাসের সঙ্গে কথাগুলি বলে আমার হাত ধরে টেনে নিল।আমি কিছুই বুঝতে না পেরে তার সঙ্গে বেরিয়ে গেলাম।ঘরে কেবল একা বিমল বসে রইল।

বারান্দায় সে তার পরিকল্পনাটা বলে গেল।তারপরে আমরা দুজন প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে প্রত্যেক বোর্ডারের সঙ্গে দেখা করে রমেনের প্রস্তাবটার কথা বললাম।কয়েকজন সমর্থন করল কিছু বিরোধিতা করল আর কিছু ব্যঙ্গ করল।সবার সমস্ত মন্তব্য শুনে শুনে অবশেষে এসে বিছানায় এলাম।অমূল্য আগেই শুয়ে পড়েছে।বিমল রমেনের সঙ্গে ঘুমোল।আমার ঘুম আসছে না,বিমল আর আমার কথাগুলি মনে পড়ে যাওয়ায় বারবার ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে।দূরে কোথাও বারোটা বাজার শব্দ রাতের বিভীষিকা গুলিকে আরও প্রকট করে তুলছে।

‘এই নিরঞ্জন,উঠ উঠ।’

অমূল্য গায়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকায় আমি একটু চমকে উঠলাম।

‘কয়টা বাজে?’

‘সাতটা বাজে,উঠ সুপার ডেকেছে,এই মাত্র চৌকিদার বলে গেল।’

‘কী’

‘সুপার ডেকেছে।’

আমি লাফ মেরে উঠে টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত ঘষতে ঘষতে মুখ ধুতে গেলাম।সুপার এই সকালে ডেকেছে বলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।আজ প্রায় দেড় বছর এই হোস্টেলে রয়েছি কিন্তু কোনোদিন সুপার ডাকা তো দূরের কথা সুপারকে ভালোভাবে দেখেছি বলেও মনে পড়ে না।হোস্টেলে যেদিন এসেছিলাম সেদিন সুপারের সঙ্গে দেখা করেছিলাম,তারপরে সুপারের কাছে যাবার কোনো প্রয়োজন হয়নি।মেস ডিউজ দেওয়া ছাড়া সুপারের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক নেই।মেস ডিউজ চৌকিদারের হাতে পাঠিয়ে দিই,কখন ও রসিদ পাই কখন ও পাইনা।এসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাই না।প্রতিটি রুমে এসে চেক করার একটা নিয়ম আছে,আগে নাকি সুপার আসতেন কিন্তু আজকাল আর আসেন না।আমরাও না এলে খুশিই হই।সেজন্যই রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যাই।অবশ্য সব হোস্টেলেই সুপার বোর্ডারের সম্পর্ক এরকম নয়,কিছু হোস্টেলে টাকা পয়সার অভাব হলে সুপারের কাছ থেকে ধার নিয়ে সিনেমা দেখার উদাহরণ ও রয়েছে।

চা খেয়ে সুপারের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম।ভয়,বিস্ময়,উৎকণ্ঠার সঙ্গে অফিস রুমে বা বসার রুমে ঢুকলাম দেড় বছরের হোস্টেল জীবনে দ্বিতীয় বারের জন্য। প্রথমবার এসেছিলাম হোস্টেলে আসার দিন।

‘আমাকে ডেকেছিলেন স্যার?’

সম্ভ্রমের সঙ্গে কাগজ পড়তে থাকা সুপারের উদ্দেশ্যে আমি কথাটা বললাম।

‘কী নাম তোমার?’চশমার ফাঁকে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

‘নিরঞ্জন বরুয়া।’-দেড় বছর থাকা একজন বোর্ডারের নাম না জানাটা স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েই আমি উত্তর দিলাম।

‘ও হ্যাঁ,তোমাকে আমি সাবধান করে দেবার জন্য ডেকেছি।গলার স্বরটাকে আবশ্যকের চেয়ে গম্ভীর করে নিয়ে বললেন-হোস্টেল সব সময়ই হোস্টেল,এটা পলিটিক্স করার জায়গা নয়।’

‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার’-অবাক হয়ে আমি বললাম।

‘বুঝিনি মানে?না বুঝলে চলবে নাকি?আচ্ছা এখন যাও।কিছুটা রাগের সঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন।

সুপারের ব্যবহারে সত্যিই মর্মাহত হলাম।আমার রাগ হয়েছিল,আজ দেড় বছর হোস্টেলে কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই কাটালাম,কিন্তু আজ সকাল সকাল একটা মিথ্যা বদনাম দিয়ে হোস্টেলে রাজনীতি করছি বললেন।

স্যার,আমি বুঝতে পারছি না।আপনার ব্যবহারে আমি দুঃখিত,আপনি যদি কথাটা বুঝিয়ে বলতেন…’

আমার কথা শেষ হল না,আমি যেন আগুনে ঘি ঢাললাম। সুপার প্রায় চিৎকার করে বললেন—

আমার ব্যবহারে দুঃখিত।…দুঃখিত।…জান আমি তোমাকে হোস্টেল থেকে বের করে দিতে পারি…আমার রুম থেকে বেরিয়ে যাও…’

‘আমাকে ডেকে এনে বিনা কারণে এভাবে অপমান করার অধিকার আপনার নেই,আপনার জানা উচিত আত্মসম্মান বোধ প্রত্যেকেরই আছে।’

ক্রোধের সঙ্গে কথাগুলি বলে আমি রুম থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলাম।

সুপারের কথাগুলি আমার কানে এসে বাজছিল যদিও সেসব শোনার আমার ধৈর্য ছিল না। আমি আমার রুমে চলে এলাম। এখনও আমার রাগ পড়েনি। শান্তশিষ্ট মানুষটার এত রাগ হল কেন বুঝতে পারছি না।

ব্যক্তিগত কারণে যদি এতগুলি কথা সুপার আমাকে বলতেন আমি হয়তো কিছুই বলতাম না,কিন্তু আমি জানি একটা মিথ্যা বদনাম দিয়ে থ্রেটেনিং দেওয়ার মূলে অন্য ছেলেরা রয়েছে।সেই সব ছেলেদের ওপরে আমার আসল রাগ।এই সমস্ত কিছুই হয়েছে গতরাতের ঘটনাটির জন্য।

গতকাল রাতে বিমলকে রুমে রেখে আমি আর রমেন রুমে রুমে গিয়ে প্রত্যেক বর্ডারকে একটা অনুরোধ করেছিলাম-বিমলকে যেন বিনা মেস ডিউজে অন্তত কয়েকমাস মেসে থাকতে দেওয়া হয়।যতদিন পর্যন্ত সে পার্ট টাইম চাকরি বা অন্য কোনো ব্যবস্থা করতে না পারে।তাকে বিনা পয়সায় থাকতে দিলে মেস তার জন্য অধিক পয়সা খরচ করতে হবে না। প্রত্যেকবার সাত আট জনের মাপের খাবার লোকসান হয়,বিমলের জন্য হওয়া খরচটা সেই লোকসানের মধ্যে ধরে নেওয়া যাবে।প্রত্যেক বোর্ডার যদি রাজি হয়ে মেস ডিউজ রেহাই দেবার জন্য প্রস্তাব গ্রহণ করে মেস কমিটি তখন মেস ডিউজ রেহাই দিতে বাধ্য হবে।আমাদের প্রস্তাবে কয়েকজন রাজি হয়েছিল,সহানুভূতি দেখিয়েছিল,কয়েকজন প্রত্যক্ষভাবে নাহলেও পরোক্ষভাবে আপত্তি করেছিল আর কয়েকজন খোলাখুলি ভাবে জানিয়ে দিয়েছিলঃআমরাও কোনো লাখপতি ঘরের ছেলে নই যে বাবার পয়সায় এভাবে পুণ্য করব।মোটকথা গতকাল রাতের আলোচনায় আমরা কৃতকার্য হতে পারলাম না।

আমরা কারও ভাগের ভাতের খোঁজে যাইনি।ফেলে দেওয়া কুকুর বিড়াল খাওয়া সুপারের গরুগুলির দানার সঙ্গে দেওয়া ভাতগুলির জন্যই আমরা প্রতিটি ছেলের কাছে গিয়েছিলাম। এই উচ্ছিষ্ট খাবারের জন্য সবাইকে অনুরোধ করেছিলাম বলে আমরা পলিটিক্স করছি বলল।পলিটিক্সের এই নতুন ব্যখ্যা শুনে আমার যতই রাগ হয়েছিল ততই হাসি পেয়েছিল।পৃথিবীতে যখন হয়তো খেতে না পাওয়া মানুষগুলি খেতে চেয়েছে তখনই হয়তো তথাকথিত পলিটিক্সের জন্ম হয়েছে। আমাদের বর্তমান সরকার ও একদিন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে পলিটিক্স করেছিল,তখন ব্রিটিশ সরকার দেশের সেবা করেছিল।স্বাধীনতার পরে আজকের সরকার দেশের সেবা করছে,পলিটিক্স করছে না,কিন্তু এখনও একটা দল খাবার জন্য চিৎকার করছে,আশ্রয়ের খোঁজে চিৎকার করছে,যারা এগিয়ে গেছে,প্রতিবাদ করছে,তাঁরা পলিটিক্স করছে।তাঁরা রাজনৈতিক দলের মানুষ।আমি আর রমেন হয়তো সেই একই সূত্রে রাজনীতি করছি,হোস্টেল পলিটিক্স খেলছি।

কথাগুলি ভেবে ভেবে আমি পুনরায় বিছানায় শুয়ে পড়লাম।ক্রোধ,ক্ষোভ,আর ব্যর্থতার গ্লানি আমার মন ভেঙ্গে দিয়েছে,ক্লাসে যাওয়ার উৎসাহ আমি হারিয়ে ফেলেছি।বিমলের মতো,আমার মতো মানুষগুলি কি সত্যিই পড়তে এসে ভুল করেনি।