শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

কটন কলেজ, পর্ব ১০

।।১০।।

আজ কলেজের ফ্রেশার সোসিয়াল,নবীন বরণ সভা।সঙ্গে সঙ্গীতানুষ্ঠান।তারপরে মিষ্টি বিতরণ।মোট কথায় একটা বিরাট আয়োজন।তারজন্য বাছা বাছা বিশিষ্ট অতিথি আসছে,নবাগতদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য শিক্ষামন্ত্রী আসছে,সন্ধ্যেটাকে মধুর করে তোলার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে শিল্পীরা আসছেন।

অবশ্য আজ ‘ফ্রেশারস সোসিয়াল’হওয়ার কথা ছিল না। আগামী সপ্তাহে হওয়ার কথা ছিল।কিন্তু মন্ত্রীর ট্যুর প্রোগ্রামের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হল বলে হঠাৎ আজকেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হল।সেইজন্য নির্দিষ্ট বক্তারূপে আহ্বান করা একজন শিক্ষাবিদ বক্তৃতা দেবে বলে সুন্দর নিমন্ত্রণী চিঠিগুলিতে যদিও লেখা ছিল আগের তারিখটা কেটে আজকের তারিখ করে দেবার সঙ্গে সঙ্গে সেই নিমন্ত্রিত শিক্ষাবিদের নামটা কেটে দেওয়া হল কারণ তিনি হঠাৎ আজ আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। তাঁর বদলে অবশ্য অন্য কোনো নাম লেখা হয়নি। সময়ে যে কোনো একজনকে স্টেজে তুলে দিলেই হল।কথাটা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। ছেলেমেয়েদের সামনে এতদিন ধরে বক্তৃতা দিতে দিতে বুড়ো হওয়া প্রফেসাররা কেন আছেন? আর কেউ না হলেও জামাল স্যার তো আছেন।তিনি চালিয়ে নিতে পারবেন।বক্তৃতা কেউ শুনতে চান না।এই আনুষঙ্গিক জিনিসগুলি প্রচলিত নিয়ম বলেই লিস্টে রাখতে হয়েছে। আসল কৃতকার্যতা নির্ভর করছে ‘মিউজিক সেক্রেটারি’র ওপরে।কারণ সঙ্গীতানুষ্ঠান খারাপ হলে সমগ্র ইউনিয়ন বডির বদনাম হবে।

সেইজন্য মিউজিক সেক্রেটারি প্রভাত কাকতি আজ বড় ব্যস্ত।এই ব্যস্ততাই করবীর গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।সঙ্গে একটা অহেতুক গুরুত্ব আমার ওপরেও এসে পড়েছে।কারণ ভাবা অনুসারে করবী একজনের ও গান গাইবে না।আমার লেখা গান গাইবে বলে সেক্রেটারি জানিয়ে দিয়েছে।কথাটা শুধুমাত্র প্রভাত কাকতিকেই বিস্মিত করেনি,কয়েকজন অধ্যাপককেও শঙ্কিত করে তুলেছে।অবশেষে করবীরগানও যদি হিট করতে না পারে নিজের বলার মতো দেখছি কিছুই থাকবে না।বাইরের আর্টিস্টের ওপরে সেইজন্য সবাই নির্ভর করছে।অনেকে পূর্বের সুনাম অর্জন করতে পারবে না বলে আমার লেখা গান গাইতে বাধা দিয়েছে।

এই একটি শঙ্কা আমার ও আছে।আমিও বহুদিন থেকে করবীকে তার এই সঙ্কল্প বাদ দিতে বলেছি।কিন্তু করবী শুনে না।স্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছে,আমি যদি গান একটা গান লিখে না দিই তাহলে সে নাকি সোসিয়ালে গানই গাইবে না।

কবিতা লেখা আর গান লেখা দুটি আলাদা কথা,দুটির জন্য আলাদা প্রতিভার প্রয়োজন—এই কথাটা করবীকে বারবার বোঝাতে গিয়ে আমি ব্যর্থ হয়েছি।তাছাড়া আমাকে কবি হিসেবেই বা কয়জন স্বীকৃ্তি দেয়?এখন ও পনেরো পয়সার একটা টিকেট লাগিয়ে পাঠিয়ে দিলে পত্রিকার সম্পাদক সযতনে আমার কবিতা ফেরৎ পাঠায়,কখন ও জায়গা ভরানোর জন্য কিছু না পেয়ে আমার কবিতা দিয়ে ভরিয়ে নেয়,পাতার বেশিরভাগ খালি থাকলে দেখতে খারাপ লাগে বলেই।

আমি এসে ইউনিয়ন হলের সামনে উপস্থিত হলাম।ইতিমধ্যে হলটা ছেলেমেয়েতে ভর্তি হয়ে গেছে।কয়েকজন এমনিতেই এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।আমি ক্ষণিক দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকালাম।হঠাৎ দেখি প্রভাত কাকতি আর দীপক বরুয়া দুজনেই ‘এডমিনিসট্রেটিভ বিল্ডিং ‘ এর দিক থেকে খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে।দীপক বরুয়া জেনারেল সেক্রেটারি,প্রভাত কাকতি মিউজিক সেক্রেটারি।তাই দুজনেই আজ খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।সেইজন্য এই আগস্ট মাসের গুয়াহাটির কাঠফাটা গরমে টেরিলিনের ড্রেসের সঙ্গে মানানসই ভাবে টাই বাঁধতে ভুলে যায়নি। দীপক বরুয়ার ঠোঁটের কোণে চির পরিচিত সিগারেটটা আজও রয়েছে,অবশ্য সিগারেটটা অন্য দিনের মতো ‘নাম্বার টেন’বা ‘পানামা’নয়,অন্য কনো ফরেন ব্রেণ্ড।

‘বরুয়া এসেছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘চলুন ভেতরে যাই।’

কাকতির অনুরোধে তাঁদের দুজনের সঙ্গে সঙ্গে আমি গ্রীণ রুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।

‘আজ চলিহার ওপরে অনেকটাই নির্ভর করছে,হঠাৎ দিনটা এগিয়ে নিয়ে আসতে হওয়ায় রিহার্সেল এর অভাবে কয়েকটা আইটেম বাদ দিতে হয়েছে।‘

‘আচ্ছা।’

দীপক বরুয়ার কথাগুলি প্রভাত কাকতি কেবল নির্লিপ্তভাবে সমর্থন করলেন। আমাকে কিছু বলতে হবে নাকি কিছুই ভেবে পেলাম না। জানি,কথাগুলি আমাকেই বলেছে।পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে,’তুমি কি লিখেছ বলতে পারি না,তোমার ওপরে সবাই,করবী চলিহা পূর্বের সুনাম না রাখতে পারলে সেই দোষ তোমার,কিন্তু বদনামের ভাগী তোমাকে হতে হবে না,হব আমরা।’

গ্রীণরুমের ভেতরে ঢুকেই আমি থমকে গেলাম।আমাকে হয়তো কাকতি বা বরুয়া খেয়াল করেনি।প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততা তাঁদের আরও কিছুটা বেশি হয়ে গেল।এই ব্যস্ততার মধ্যে আমাকে খবর করতে আসার অবসর কোথায়? করবী আমার গান গাওয়ার জন্য কিছুটা লৌকিকতার খাতিরেই ‘ভেতরে যাই চলুন’ বলল।ততটুকুই।নাহলে হয়তো গ্রীণরুমের দরজার ওপরে লিখে রাখা ‘নো অ্যাডমিশন’বলে অক্ষরগুলির দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিত। আমি জানি এই ‘গ্রীণরুম’এর ভেতরে আমার আবশ্যক নেই। এর ভেতরে সবাই ব্যস্ত। দুই একজন প্রফেসর ও একই ধরনের ব্যস্ততায় এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।কয়েকজন ছেলে একটা কোণ সিগারেটের ধোঁয়ায় একেবারে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

আমি জানি এই কোণের ছেলেগুলিও আমার মতো অনাবশ্যকীয়।কিন্ত আমার মতো অপ্রয়োজনীয় নয়।এঁরা হল গতিশীল ব্যস্ততা।কাজ কিছু নেই,কিন্তু এঁরা ব্যস্ত। কখন একজন শিল্পী গান গাইতে স্টেজে উঠেছে,স্টেজ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে শেষ শুভেচ্ছাটুকু এঁরাই জানাবে। আবার কোনো একজন স্টেজ থেকে নামছে,তাকেও প্রশংসার ঢেউয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে যেন তিনি স্টেজ থেকে নামছেন না,মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে এসেছেন অথবা উৎপল বরবরার মতো শ্ত্রু ব্যূহের পঞ্চাশ ফুট ওপর দিয়ে এরোপ্লেন চালিয়ে ফোটো তুলে এইমাত্র প্লেন থেকে নেমেছেন।

সেইজন্যই এদের প্রয়োজন আছে।ক্লান্ত হয়ে পড়া শিল্পীর এবং কর্মীর প্রাণ চঞ্চলতা এঁরা দিতে পারেন,এঁদের ব্যস্ত হাতে এগিয়ে দেওয়া এক গ্লাস জল খেয়েও অমৃত কুণ্ডে ডুব দেওয়া বলে অনুভব করা যেতে পারে।

আমি এবার এমনিতেই এদিক ওদিক তাকালাম।এক কোণে দেখছি করবী তাঁর সঙ্গে সঙ্গত করা শিল্পীদের মাঝে মধ্যে নির্দেশ দিয়ে শেষবারের জন্য আমার গানটার রিহার্সেল দিচ্ছে।কৌ্তূহল দমন করতে না পেরে এগিয়ে গেলাম।হাজার হোক আমি লেখা জীবনের প্রথম গান,নিজের ও তো একটা কৌ্তূহল রয়েছে।

‘এস,এস,এত দেরী করলে কেন?’

‘আবশ্যক নেই বলে।’

করবী আমাকে দেখে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলা কথাগুলির উত্তর আমি নির্লিপ্তভাবে হাসতে হাসতে দিলাম।

সঙ্গে সঙ্গে দেখি তবলার ওপরের হাত দুটি,হারমোনিয়মের রিডের ওপর নাচতে থাকা আঙ্গুলগুলি,হাওয়াইন গীটারের সুরের কম্পন,বেহালার তাঁর চারটার ওপরে ছড়টা একসঙ্গে থেমে গেল। হঠাৎ সমস্ত পরিবেশটার মধ্যে নিজেকে কেমন যেন বড় অপরিচিত বলে মনে হল।করবী কথা বলে চলল,উত্তর খুঁজে না পাওয়া মনটা কেবল ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’করে গেল।

‘চলিহা,আমাদের আর একবার প্র্যাকটিস করা দরকার।’অতিষ্ঠ হয়ে কেউ একজন কিছুক্ষণ পরে বলে উঠল।আমিও হঠাৎ জেগে উঠা মানুষের মতো সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম,‘আমি যাই করবী,তুমি প্র্যাকটিশ কর,আমার শুভেচ্ছা থাকল।’

করবীকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমি দ্রুত গ্রীণরুম থেকে বেরিয়ে এলাম।আমি জানি আমি এই পরিবেশের মধ্যে সম্পূর্ণ অনাবশ্যকীয় ব্যক্তি।করবী আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলতে থাকাটা বাকিদের কেউ পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক।প্র্যাকটিস করতে হবে বলে নয়,প্র্যাকটিস না করেও যদি করবী তাঁদের সঙ্গে কথা বলে বাকি সময়টুকু কাটিয়ে দেয়,তখন ও কোনো একজন পুনরায় প্র্যাকটিসের কথা বলবে না। তাঁরা তো প্রফেশনাল শিল্পী নয়,স্টেজেতো নিজের নিজের ইনস্ট্রুমেন্টে মন প্রাণ ঢেলে দিতে হবে।কিন্তু তার আগে কিছুক্ষণ যদি করবীর সান্নিধ্য একান্ত করে লাভ করতে না পারে,দুই একটা মিষ্টি কথা বলতে না পারে ,তাহলে এত কষ্ট করে কী লাভ? এটা ওদের প্রাপ্য।তার মধ্যে আমার মতো একজনকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে করবী কথা বলার আবশ্যকতা কোথায়?

আমি এসে ‘ইউনিয়ন হল’এর এক কোণে বসে পড়লাম। ভারতীয় সময় নিয়মানুবর্তিতায় গতানুগতিকভাবে আরম্ভ হল সঙ্গীত মধুর নবাগতদের নবীণ বরণ অনুষ্ঠান। স্টেজে একবার যে উঠেছে ভুলেও অসমিয়া ভাষায় কথা বলতে ভুলে গেছে। ইংরেজি গান শেখার সুযোগ সেভাবে অসমে গড়ে উঠেনি বলেই হয়তো অসমিয়া গানগুলি জায়গা পেয়েছে।

প্রতিদিনের মতো আজও পেছনের কোণটি থেকে শিস,চিৎকার এবং অনাবশ্যক মুহূর্তে বেশি করে হাততালি পড়ছে। কর্তব্যবোধ,আত্মসম্মান,শৃঙ্খলাবোধ এবং তার চেয়েও বেশি ছাত্রের ওপরে থাকা কনট্রোলিং পাওয়ারটা প্রকাশ করার জন্যই দুই একজন সামনে বসে থাকা অধ্যাপক দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দিচ্ছে। বাকি সমস্ত অধ্যাপক অসহায় ভাবে মাঝে মধ্যে পেছনে ঘুরে তাকাচ্ছে যদিও কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব করে,সামনের দিকে মন দিয়েছে।

কিন্তু কেউ কার ও নির্দেশ মানছে না,কেউ কারও কথা শোনার আবশ্যক মনে করছে না।সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত।

এখানে কেউ কাউকে দোষ দেয় না,এখানে কেউ ভুল ধরে না,প্রত্যেকেই কেবল দোষ এবং ভুল নিজে নিজে ঢেকে রাখার এক আপ্রাণ চেষ্টা কসরৎ চালিয়ে যাচ্ছে যাতে এই নতুন নতুন ছেলে মেয়েরা নতুন সুন্দর একটা স্বপ্ন নিয়ে অন্তত আজকের রাতটা পার করে দিতে পারে।

হঠাৎ ঘোষকে ঘোষণা করল অসমিয়ায় না ইংরেজ্জিতে—এর পরের অনুষ্ঠান করবী চলিহার গীত।ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পরের গ্রুপগুলিতে হুলুস্থুল পড়ে গেল।ক্লেপ,শিস আর দুই একটা অশ্লীল চিৎকার।কিন্তু এত হুলুস্থুলের মধ্যে কেন জানি আমার বুকের ধপাস ধপাস শব্দটা আমি বারবার শুনতে পেলাম।

করবী এখন আমার গান গাইবে।যদি আগের সুনাম করবীর না থাকে,যদি আমার জন্য করবীকে এতগুলি মানুষের সামনে লজ্জা পেতে হয়,যদি…

আমি থেমে গেলাম।আমি ভাবতে পারার মতো শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেল্লাম।ছিঃ মেয়েরা কীভাবে যে কাজগুলিকে ইমোশনাল করে তোলে,আমার লেখা গান গাওয়ার কী দরকার ছিল।আমি তো গান লিখি না,কী দরকার ছিল করবী বলেছে বলেই লিখে দেবার।নিজেও তো একবার ভেবে দেখা উচিত ছিল। গীতিকার নাম নিতে গিয়ে মিছামিছি একজন সু-গায়িকার জন্য কলঙ্ক ডেকে আনলাম।

করবী গান গাইতে শুরু করেছে।প্রাণের সমস্ত ভালোবাসা উজার করে দিয়ে গান গাইছে।আমার কথাগুলিতে নাকি করবী সুর দেবে,করবী বলেছিল,আমার স্বপ্নগুলিকে নাকি সে আকার দেবে।

‘আমার ঘরের বহু দূরের

যদি তুমি একটি তারা

এই রাতের অন্ধকারে

যদি একটি স্বপ্ন হও।

থাকবে,দূরে,আমার থেকে

একটি তারা হয়ে থাক

এস না,কাছে,জ্বলতে থাক

স্নিগ্ধ জ্যোতি বিলাও।‘

সুরের গুঞ্জন ধ্বনি আমার মন আকাশ ভরে ফেলেছে।স্টেজে দাঁড়িয়ে অপলক চাহনিতে প্রাণের সমস্ত কিছু একত্রিত করে গাইতে থাকা মেয়েটি যেন করবী নয়,মনের আকাশের একটি তারা,আমার মনের আকাশের একটি সুন্দর স্বপ্ন।

করবী মন প্রাণ ঢেলে গান গাইছে।আমাদের দুজনের মাঝখানের বাকি মানুষেরা যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে,কেবল আছে করবী আর আমি,এই সুরের পৃ্থিবীর মধ্যে।স্টেজে বেশি লাইটের আলোর মধ্যে থেকেও যেন করবী জ্বলছে সন্ধ্যে আকাশের দূরান্তের তারার মতো স্নিগ্ধ,পবিত্র,মোহনীয় এক ‘স্বপ্নেনু মায়ানু ,মতিভ্রমেণু’রূপে।জীবন জ্বালানো স্বপ্নে সে গাইছে—

তোমার জ্যোতি যদি দেয়

জীবন জ্বালানো হাসি

সেই হাসিতে আমিও জ্বালাব

নতুন স্বপ্ন রবি।

রবির কিরণ যদি দেয়

এক নতুন জাগৃতি

সেই জাগ্রত শত স্বপ্ন-

আনবে নব সংহতি।‘

আমি জানি না আমার ভালোবাসার জ্যোতি জীবন প্রজ্জ্বলিত করা করবীকে দিতে পারবে কিনা,আমি জানি না সেই হাসির স্পর্শে করবীর জীবনে নতুন স্বপ্ন রবি অঙ্কুরিত হবে কিনা।

আমরা দুজনেই পৃ্থক কক্ষের মানুষ,করবী এবং আমি।আমাদের সম্বন্ধের সত্যিটুকু কেবল সৌরজগতের মহাকর্ষণ শক্তির সম্বন্ধটুকু।সত্যি হবে শুধু আকাশের নীলাভ সৌন্দর্যকে ম্লান করে জ্বলতে থাকা আশার তারাটির অম্লান আলোটুকু।স্বর্গচ্যুত পপীয়া তারার সঙ্গে এই সন্ধ্যার আকাশের সুউজ্জ্বল তারার সম্পর্ক কোথায়?

‘আমার কক্ষের বহু দূরে

তুমি কেবল জ্বলতে থাক

আমার কাছে এস না তুমি

আশার প্রদীপ হয়ে থাক।‘

সত্যিই করবী আমার জীবনের অনেক দূরের কেবল একটি তারা মাত্র,করবী আমার জীবনের নিভু নিভু করে জ্বলতে থাকা কেবল প্রদীপ শিখা।যার আলোর মধ্যে আমি জীবনের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছি,কিন্তু সেই প্রদীপ শিখাকে কি আমি বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে পারব?

Neither do men light a candle, and put it under a bushel, but on a candle stick, and it giveth light unto all that are in the house.

করবীর আলোতে আলোকিত করে তুলুক সমগ্র পৃথিবী,করবীর ভালোবাসা এই পৃথিবীকে হাজার হাসি এনে দিক,কিন্তু এইরকম একটি ভালোবাসার শিখাকে পারব কি বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে?

হয়তো পারব,কিন্তু তার আগে জ্বলতে থাকা শিখাটা আমাকে চিরদিনের জন্য নিভিয়ে ফেলতে হবে,নাহলে সেই শিখা আমাদের দুজনেরই বুক পুড়িয়ে শেষ করার জন্য চিরদিনের জন্য ছেড়ে দিতে হবে।

কিন্তু আমার পক্ষে তো এটাও সম্ভব নয়।আমার জন্য আমি বেঁচে থাকার বাস্তব পৃ্থিবীটা অস্বীকার করা কি সম্ভব?

আমার আর থাকতে ইচ্ছা হল না। পরের অনুষ্ঠান শোনার ধৈর্য আর নেই।ধীরে ধীরে হল থেকে বেরিয়ে এলাম।ছেলেমেয়েদের চিৎকার-চেঁচামিচি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল,সামনে কিছু নেই,আছে কেবল কৃষ্ণপক্ষের এক ঝাঁক অন্ধকার…

‘The long night is before me

I am tired’.

সত্যিই আমার নিজেকে বড় ক্লান্ত মনে হতে লাগল।

চলবে ...