মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯

একজন হারবার্টকে কী পাওয়া যাবে না?

আজ ২ জুলাই অন্যদেশ স্বজন কবি হিন্দোল ভট্টাচার্যের জন্মদিন। অন্যদেশ পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।



মেঘে ঢাকা তারা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে এসে গেছিল রাজনৈতিক ছবির প্রসঙ্গ। কিন্তু যে রাজনীতি আমরা খবর কাগজে পড়ি, টিভি চানেল এ দেখি, রাজনীতির শিকড় তার চেয়ে আরো গভীরে। এই প্রসঙ্গে আমার দেখা একটি নাটকের কথা এখানে বলতেই হয় আর তা সেই বিখ্যাত তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত। সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এই নাটকে একটি রাজবংশী মানুষের ‘আমার কুনো পার্টি নাই’ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে সর্বত্র। আমরা ক্রমশ বুঝতে পারি এবং অনুভব করতে পারি কীভাবে সেই দলিত রাজবংশী আমাদের সকলের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। অনেকে বলবেন হয়ত, বা বলাই উচিত, যে, কলকাতা শহরের এক পেটি মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে সমাজের মার্জিনে পড়ে থাকা, জাতিসত্তা যাদের অবহেলিত থাকে, তাদের অস্তিত্বের সংকটকে কীভাবে আমি আমার মত করে অনুভব করব? আমার শ্রেণী-ই আমাকে সেই দলিত সমাজের আর্তনাদ এবং অস্তিত্ব সংকটকে অনুভব করতে দেবে না। বা, অনুভব করলেও সেই অনুভব থেকে যাবে আমাদের উষ্ণ আলোচনায়। স্বীকার করতে লজ্জা নেই আমার নাটকের উপস্থাপনা অসামান্য লাগলেও সেই সময়ে আমি নিজেকে নাটকটির সঙ্গে ভাবনা গত জায়গায় একাত্ম অনুভব করতে পারছিলাম না। এর কারণ আমি পরে খতিয়ে দেখেছি। নিজের ভাবনার বৃত্তে আবদ্ধ থাকলে কখনই অন্য কোনো বৃত্তকে অনুভব করা যায় না এবং সব কিছুকে একই দার্শনিক অভিযানের মধ্যে বুঝতে পারা যায় না। এই যে একবগ্গা ভাব আমাদের সাংস্কৃতিক এবং শ্রেণীগত অস্তিত্বের জগতে বদ্ধ জলাশয় তৈরী করতে পেরেছিল তখন , তার অন্যতম কারণ সেই সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে অস্তিত্বের সংকট কি, তা তখন অনুভব করার জায়গায় আসিনি আমি।

পরে আরও একজনের নাটক দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তখন মনে এই কথাগুলোই রাজনৈতিক। কারণ তখন ক্রমশ আমাদের সমাজটা ভাঙছে। আমরা তখন একটি তথাকথিত কমিউনিস্ট নামধারী ফ্যাসিস্ট প্রশাসকের প্রশাসনে অস্থির। কিন্তু কোনো রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কারণ মানুষের লড়াই তখন শুরু হয়নি। অনেক মানুষের মুখোশ তখন খুলে যায় নি। ব্রাত্য বসুর উইঙ্কল টুইনকিল নাটকের একটি জায়গায় আছে – পক্ষ নাও, পক্ষ না নিলে তোমার অবস্থা হবে রিপ ভ্যান উইঙ্কল-এর মত। তুমি স্রেফ মুছে যাবে। সব্যসাচী সেন এর সেই চরিত্রটিকে খুব আপনজন মনে হচ্ছিল তার অন্যতম কারণ ওই নাটক ছিল ভীষণ ভাবে নাগরিক। এখনও আমি বিশ্বাস করি বাংলায় গত দশকে যে যে নাটক হয়েছে সেগুলির মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য সুমন মুখোপাধ্যায় -এর তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত, ব্রাত্য বসুর উইঙ্কল টুইনকিল, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়-এর ফ্যাতারু এবং অর্পিতা ঘোষ এর পশুখামার। কিন্তু সব যেন পাল্টে গেল ১৪ মার্চ এর নন্দীগ্রাম হত্যাকান্ডের পর। সে সময়ে আমরা কয়েকজন মাইল গঠন করলাম সহনাগরিক দের মুক্তমঞ্চ। প্রতি শনিবার সারা শহরের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের সভা হত। কে আসেননি সে সময়ে? আমরা একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। সে স্বপ্নের মধ্যে শুধু সিপিএম এর পতন ছিল না, ছিল এক সামগ্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন সমাজ গঠনের। বিপ্লবের। ১৪ নভেম্বর মহামিছিলের পর আমাদের সেই আন্দোলন চূড়ান্ত জায়গায় যেতে পারত।

কিন্তু লোভী কুকুরের মত আন্দোলনের ক্ষীর খেতে শুরু করলো তৃণমূল। আমি সরে এলাম। নন্দীগ্রাম, সাতেঙ্গা বাড়িতে তখন আমরা দেখে এসেছি কীভাবে মানুষের আন্দোলন রূপ নিচ্ছে। আমার মনে আছে আমাকে তখন কবীরদা বলেছিলেন- আমরা শহুরে মানুষগুলো আসলে কিছুই করতে পারি না। আমরা আগুনে হাওয়া দিয়ে যেতে পারি। যে যার নিজের মত করে। কারণ লড়াই তারাই করে যাদের পিঠ ঠেকে গেছে। আমাদের পিঠ ঠেকে যায়নি।

আমরা আগুনে হাওয়া দিতে শুরু করলাম। কিন্তু এই কাজ আমার চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল এটা বোঝার পর যে আমাদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় বসাচ্ছে একটি এমন এক রাজনৈতিক গোষ্ঠিকে, যারা বিপ্লব দূরের কথা, বরং নিয়ে আসবে আরও অনেক বেশি অপশাসন। আমার বন্ধুরা আমার কাছ থেকে সরে গেলেন। আমি একা হয়ে পড়লাম। দেখলাম আমার অগ্রজ কবি সাহিত্যিক নাট্যকারের কীভাবে বিকিয়ে যাচ্ছেন। আর তখন আমার মুখে একটাই কথা ছিল – আমি বাঘারু হতে পছন্দ করি। আমি সত্যি কোনও পার্টির নই অসংখ্য মানুষের মত, অসংখ্য দলিত শ্রমজীবি মানুষের মত। তো তার পর থেকে আমি একা একাই আমার ভাবনার আন্দোলন চালিয়ে গেলাম। আমার মত করে কথা বলে গেলাম। দেখলাম আমার মত এমন অনেক মানুষ আছেন যারা কোনো পতাকার তলায় নেই। যাদের কোনও নির্দিষ্ট আনুগত্য নেই।

যাদের কোনও নির্দিষ্ট কিছু হারাবার ভয় নেই। যারা আর যাই হোক ভাবনায় এক এবং জীবনে আরেক নন। আমি বুঝতে পারলাম আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই আসলে আছে বাঘারু, কিন্তু তাকে আবিষ্কার করতে হয়। তাকে খুঁজে পেতে হয়। আর এটার নাম রাজনীতি। বা সুমনদার ভাষায় এটার নাম লোকনীতি। এক-ই ভাবনার ছায়া আমি দেখতে পেলাম সুমন মুখোপাধ্যায়-এর পরিচালিত হার্বার্ট সিনেমায়। এটা এমন এক রাজনৈতিক সিনেমা, যা এক নিশ্বাসে আমাদের পৌঁছে দেয় সেই সময়ের কাছে এবং একটি মানবিক অভিযাত্রার কাছে। এই সিনেমা আমাদের আক্রান্ত করে। আমাদের তলিয়ে দেয় সেই যুদ্ধ উপত্যকায় যেখানে দ্নাড়িয়ে আমরা প্রশ্ন করতে পারি। অপেক্ষা করে আছি সুমনদার পরবর্তী সিনেমার দিকে যা নিয়ে অনেক বিতর্ক হলো কাঙ্গাল মালসাট।

চারদিকের সময়ের দিকে তাকালে কি মনে হয়? এই সময় আমাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে যেখানে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রতি নিজেদের শ্রদ্ধাও আর হয় না। মনে হয় আমরা কেন এই সময়কে সহ্য করছি? কেন এই সময়ের প্রতি আমরা ছুঁড়ে দিতে পারছি না সেই প্রতিবাদ যা আমাদের ক্রমমুক্তি এনে দিতে পারে। আমাদের কী এমনি অবস্থা যে আমরা প্রশ্ন করলে প্রতিবাদ করলে মাওবাদী হবার ছাপ পড়ার ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে রাখব? আমরা প্রশ্নই করব না? আমরা সহ্য করে যাব? এই কাল পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন কামদুনিতে তাঁকে মারবার ষরযন্ত্র করেছিল সিপিএম কংগ্রেস মাওবাদী এবং আনন্দবাজার পত্রিকা!!!! এর মত উন্মত্ত মুখ্যমন্ত্রীকে আমরা সহ্য করছি কেন? কেন তৃণমূল না করার অপরাধে সুমন মুখোপাধ্যায় -এর নাটক বন্ধ থাকবে মিনার্ভাতে? কেন? কেন কোনো কবিকে উপযুক্ত স্বীকৃতি দেওয়া হবে না সে তৃনমূল নয় বলে? এটা কী ভয় পাওয়ানো নয়? এটা কী ফ্যাসিজম নয়? এখনও আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব? পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ, জঙ্গলমহলে সি আর পি এফ এর হানা, গ্রামে গ্রামে , নৈরাজ্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কোনো প্রশ্ন করলেই তার মাওবাদী হয়ে যাওয়া এগুলোর বিরুদ্ধে আমরা কোনো কথা বলব না?

গণতন্ত্রের নাম আমরা এক একনায়কতান্ত্রিক রাজ্যে বসবাস করছি। এবং আরও বড় করলে ভাবলে এই একনায়কতন্ত্র কিন্তু চলছে সারা ভারতবর্ষেই। কিন্তু আমরা হাত গুটিয়ে বসে আছি। আমরা আমাদের ভাবনাগুলোকে গুটিয়ে বসে আছি। কেন? এই প্রশ্ন করা মানে যদি মাওবাদী হতে হয়, তাহলে আমি মাওবাদী।

মুক্তাঞ্চল যদি গড়েই তুলতে হয়, তাহলে আমাদের শহরেও মুক্তাঞ্চল হোক। সাংস্কৃতিক মুক্তাঞ্চল হোক। সেখানে কোনও শাসকের কোনও কথা বলার থাকবে না। সেখানে মানুষ কথা বলবে। আমরা যারা এখনও কোনও পক্ষের নয়, আমাদের, যাদের কোনও পতাকা নেই, আসুন একসঙ্গে হই। গড়ে তুলি নিজেদের প্রশাসনে চলে নিজেদের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র। সেখানে নাটক কবিতা সিনেমা হোক। সেখান থেকে আমরা ছড়িয়ে দিই আমাদের ভাবনাগুলো সারা বাংলাদেশে, এমনকী সারা ভারতবর্ষে। ধর্ষণ এবং অন্যান্য পচে যাওয়া অবক্ষয়ী সামাজিক বৈশিষ্ট গুলির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াইছাড়া আমি আর অন্য কোনও পথ দেখছি না। কামদুনীর মানুষ দেখিয়েছেন নন্দীগ্রামের মত তারা লড়াই করতে জানেন। সমস্ত রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জানেন। তাহলে আমরা কেন চুপ করে বসে থাকব?

হার্বার্ট এর পরিচালক, তিস্তা পারের বৃত্তান্ত এর পরিচালক সুমন, কৌশিক সেন, কবীর সুমন, এরকম আরো অনেক মানুষ আছেন আমাদের সঙ্গে। গণআন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষ আছেন যারা চান এক হতে। অনেক তরুণ আছেন যারা চান এক মুক্ত হাওয়া। বিশ্বাস উঠে গেছে তাদের। কিন্তু লড়াই করতে হলে সে ভাবেই করা উচিত, যা এই সময় চায়। সময়ের কাছে বিশ্বাসঘাতক হলে ভবিষ্যতে সময় বিশ্বাসঘাতকতা করবে। মুছে যাবে ভন্ড হাতে রাজ অনুচর। এ সময়টা সত্যি যুদ্ধ পরিস্থিতির সময়। একজন হারবার্টকে কী পাওয়া যাবে না?