শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

একগুচ্ছ আকাশ


আজ কবি ও সম্পাদক ওবায়েদ আকাশের জন্মদিন। অন্যদেশ পরিবার তার এই স্বজনকে জানায় জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও অফুরন্ত শুভকামনা।


নির্বাচিত কলা


সীমান্ত থেকে সীমান্তের দূরত্ব জানা নেই
তবু বন্ধুদের আড্ডায় পাণ্ডিত্য ফলাতে মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে
একটা দূরত্ব নির্ধারণ করে ফেলি

যেমন ছোট্টবেলায় হাটের দিনে
শুকনো পাটের ঝুটি দেখেই বলে দিতে পারতাম
সম্ভাব্য ওজনের পরিমাণ

টেকো মাথায় রাজ্যির রোদ্দুর এসে চিকচিক করে ওঠে
যতটা সম্ভব মক্ষিকার মতো প্রলুব্ধ হয়ে
ছায়া নেমে এলেই কোথায় হারিয়ে যায়

বংশীবাদনের মতো নির্বাচিত কলা
প্রাগৈতিহাসিক সত্যের মতো অনুভবে জাগিয়ে রাখি

অথচ একদিন তার সুরে সুরে ভেসে
আমি বহু দূর থেকে বহু দূর দেশে
রাজকুমারীর আতিথ্য গ্রহণে অবিশ্বাস্য প্রতিশ্রুত থাকি

এ রাজ্যের কলমের ব্যবহার এখনও শিখিনি আমি
অথচ তোমাকে চিঠি লিখবো লিখবো করে যে
অন্ধ হয়ে এ-বাড়ি ও-বাড়ি চেয়েচিন্তে খাই
দিব্যি বলছি আজকাল আমার কিচ্ছু মনে থাকে



বহুমাত্রিক ঘুম


হেই হেই করে ধেয়ে আসছে কিছু শব্দ
যেন বস্ত্রহীন কোন নারী- বেত্রাঘাত শরীরে সয়ে
হেলেদুলে নিথর পাঁজরে হাঁটছে-

তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে
নিজ গাঁয়ের ধুলো,... প্রার্থনাঘরের সমবেত সঙ্গীত

আমি তখন গভীর তন্দ্রার ভিড়ে
শক্ত-সমর্থ কতিপয় ঘুমের কাঁধে ভর করে উঁকি দিয়ে শুধু দেখি

তার শরীরে আঁকা নদীতে একদিন কত-না নৌকাবাইচ, ডুবসাঁতার
কত-না ঘট বুড়িয়ে বুড়িয়ে ঘোমটা টেনে
ঘরে ফিরে গেছেন মা

তার শরীরে আঁকা কালশিটে আর দগদগে ক্ষতে
কত না মাঝি দিনমান ভেসাল ছেড়ে
গাছে গাছে গড়ে তুলত শুটকির বাগান
রাখালেরা বাঁকে* ভর করে মাঠে মাঠে পৌঁছে দিত
হালিয়ার গামছাবাঁধা খাবারের যোগান

এবার আমি নিথর কাতর ঘুমের পাঁয়তারা ছেড়ে
পুব আকাশের সদ্য লাল সূর্যটার দিকে দৌড়াতে থাকি
তখন চারদিকে শান্ত নিস্তব্ধতা
মাঠে ঘাটে পথে কোলাহলমুখর কত না বিচিত্র জীবন

[*বাঁক = একপ্রকার বাঁশের দণ্ড, যার দুই প্রান্তে রশি ঝুলিয়ে কাঁধে করে মালামাল বহন করা যায়]



সিংহাসন


সর্বালঙ্কার পরিয়ে তোমাকে
নিয়ে যাওয়া হলো ফাঁসিমঞ্চে
মৃত্যুর সিংহাসনে

সিংহাসন তোমার প্রিয়
তার জন্যে তোমার মাটির হাঁড়িতে জমানো ঘাম
চাঁদের আলোতে ঝলসানো সাধ
রাজপথ, মিছিল আর নেপথ্য বিপ্লব

আর তারই বিনিময়ে একদিন
ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে পাওয়া
তিলে তিলে সঞ্চিত সর্বালঙ্কার
যা তোমার অঙ্গ জুড়ে খেলছে-দুলছে
যেন মৃত্যুর জন্মদিনে কেক কাটার তুমুল আয়োজন

একদিন ভররাত পাথর ভেঙেছিলে তুমি
অসহ্য ক্ষুধার তাড়নায় মধ্যরাতে ছুঁয়েছিলে সূর্যের থাবা

ক্ষুদিরাম প্রীতিলতা তোমার পরম-পরমা বলে
এ-মতো সিংহাসন কখনও অপ্রিয় ছিল না

চারপাশের ব্যালকনির অট্টহাসি শুনতে পাচ্ছি খুব
ফলে তোমার সিংহাসন ফেলে এক পা-ও এগুতে পারছি না


গৃহবন্দী

মধ্যরাতে কে যেন এসে আমাদের বাড়ির ঘরগুলো
হাত-পা মুড়ে বেঁধে রেখে গেছে এবং
বারান্দাগুলো লুকিয়ে রেখেছে অদৃশ্য ছায়ায়

ভোর হতে না হতেই লোকজন আসছে, চেনাজানা আত্মীয়-পরিজন
তারা চোরের মতো বাড়িটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেউ ফিরে যায়
কেউবা বিস্মিত হয়ে অদৃশ্য ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়লে
পায়ের নিচ থেকে কঁকিয়ে ওঠে লুকানো বারান্দাগুলো

যখন ঘরের দিকে এগিয়ে এসে শক্ত করে বাঁধা
রশিগুলো খুলতে যাচ্ছে, ভেতর থেকে হৈ হৈ করে হাসছে
গৃহবন্দী পরিবারের বাপ-মা, শিশু-যুবা- তাবত মানুষ

তারা ফিঙের মতো ঘর থেকে লাফিয়ে বেরুচ্ছে আনন্দে এবং
ঘরগুলোর যত্রতত্র যেসব ক্ষতে রক্ত ঝরছে
জলে ধুয়ে লাগিয়ে দিচ্ছে কবরেজের দেয়া আরোগ্য-মলম
ব্যক্তিগত ব্যবহৃত ঘরে টেনে তুলে জুড়ে নিচ্ছে শায়িত অলিন্দমালা

আমি শুধু একমাত্র জন ইঁদুরের গর্তে পা আটকে যাওয়ায়
শত চেষ্টাতেও ঘর থেকে বেরুতে পারছি না

বাড়ির মানুষ যে যার কাজে ব্যস্ত হয়েছে, খাচ্ছেদাচ্ছে
ঘুমাচ্ছে-জাগছে- শুধু একই ঘরে থেকে
আমার গগনবিদারি চিৎকার কেউ শুনতে পাচ্ছে না

এ-সংসারের রক্তমাংসের একজন মানুষ আছে কি নেই
কতকাল হলো কারও কিছু মনেই পড়ছে না



বৃষ্টি, বকুল ও আমাদের কথা

তখনও তাকে কিছুই বলিনি, অথচ সে আমার গানের খাতা টেনে নিয়ে
গাইতে শুরু করেছে-
কখনও ইশারা করিনি, অথচ নিতান্ত বৃষ্টিতে
সে আমার ছাতার নিচে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে

আমার সারা শরীর তন্ন তন্ন করে খুঁজে
হলুদ পাঞ্জাবির পকেটে পাওয়া একটা শুকনো চ্যাপ্টা
বকুলফুল তার হাতে দিয়ে বলি:
এতদঞ্চলে বকুলের চারা রোপণে নিষেধাজ্ঞা হেতু
একবার সমুদ্রপারের পুজোঘর থেকে ফুলটি হাতিয়ে নিয়েছিলাম

আলোচ্য ফুলটি তখন ধূসর থেকে সাদা হতে শুরু করল
গন্ধ ছড়াল- আমাদের সঙ্গে
চমৎকার কথপোকথনে গুমোট সময়টা আনন্দে ভরিয়ে তুলল

তখন আমার সান্নিধ্য ছেড়ে অদূরে বটগাছের
শেকড় ধরে ঝুলতে থাকলে
আমার হাতের একমাত্র ছাতা ছুড়ে মারলে শূন্য আকাশে-

ততক্ষণে আমাদের প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে কথপোকথন শুরু হয়ে গেছে
বৃষ্টি নাচল, আমরা দেখলাম
বৃষ্টি হাসল, আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম
বৃষ্টি যখন প্রচ- জ্বরে তপ্তশরীরে হাত-পা ঘামিয়ে
বমি করতে শুরু করল, আমরা দিগি¦দিক পাগলের মতো
ছোটাছুটি করে কাছে-দূরের পাখিদের সাহায্য চাইলাম

তারা বৃষ্টির শরীর থেকে তপ্ত জ্বরকণাগুলো খুঁটে খুঁটে খেল
এবং চারদিকে পালক মেলে দিয়ে সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলে
মিলিয়ে গেল অনন্ত আকাশে-

আমরা আবার বৃষ্টিকে প্রতিরোধ করে
একই ছাতার নিচে মিলিত হলাম



সমুদ্র ও এক-পা-ওয়ালা মেয়েটি

এমন জনাকীর্ণ আলোকায়নে এক-পা-ওয়ালা অপরূপ মেয়েটির নাচ
দেখতে এসে দেখি, প্রায় প্রত্যেকে তাদের
একটি করে পা ছুড়ে দিচ্ছে মেয়েটির দিকে-
ফলে মেয়েটির নাচের মুদ্রা তখন দর্শক সমুদ্রে সাঁতার কাটছে
চালচিত্রে মূর্তিমান হয়ে ঝুলে রয়েছে- নিথর ক্লান্ত দেহ

দেখতে দেখতে ভাংচুর থেকে রক্তারক্তি শুরু হয়ে গেল
যারা বেরুনোর তোড়জোড় করছে, এক-পা নিয়ে কিছুতেই বেরুতে পারছে না

যখন চালচিত্রে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো
মূর্তিমান মেয়েটির নাচ ভিজে-গলে প্রত্যেকের পায়ের নিচে
গড়িয়ে পড়ে রক্তজলে নিজেই সমুদ্র হয়ে
যা কিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল

তবু আজও অবকাশ যাপনের কথা ভাবলেই
সমুদ্রভ্রমণে ঝিনুক কুড়ানোর স্মৃতি কুরে কুরে খায়; এবং
এক-পা-ওয়ালা মানুষের সৈকতে হাঁটার বেদনাই অন্য রকম মনে হয়