বুধবার, নভেম্বর ২০, ২০১৯

আয় খুকু আয়

বাবার সঙ্গে আরও কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করতে পারলে ভালো হত৷’ স্মৃতির পাতা উল্টে দেখলেন হেমন্ত-কন্যা রাণু মুখোপাধ্যায়৷ আলাপে অভিজিত্‍ সেন


ছোট্ট মেয়েটি স্কুল থেকে ফিরে সুর করে নার্সারি রাইম শোনাচ্ছিল বাবা আর তাঁর বন্ধুকে৷ সুরটা বেশ পছন্দ হল দু’জনের৷ তৈরি হল গান, ‘নানি তেরি মোরনি কো মোর লে গয়ে, বাকি যো বচা থা কালে চোর লে গয়ে৷’

সেই বন্ধু হলেন গীতিকার শৈলেন্দ্র, বাবা সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং ছোট্ট মেয়েটি, হেমন্ত কন্যা রাণু মুখোপাধ্যায়৷ বোম্বাইয়ের তারদেওতে মিনু কাতরাকের রেকর্ডিং স্টুডিওতে গাড়িতে যেতে যেতে মেয়েকে পুরো গানটাই শিখিয়ে দিলেন হেমন্ত৷

বাবার ২৫ বছরের মৃত্যুবার্ষিকীর এক দিন আগে, মুম্বই থেকে ফোনালাপে রাণু পিছিয়ে গেলেন পঞ্চাশ বছর৷ ‘নানি তেরি’র কয়েক বছর পরেই ‘বাদশা’ ছবিতে হেমন্তর সুরে তিনটি গানই সুপারহিট৷ সেই ‘শোন শোন মজার কথা ভাই’, ‘লালঝুঁটি কাকাতুয়া’ এবং ‘পিয়ারিলালের খেলা দেখে যা’৷ ‘সেই স্মৃতি অবশ্য আজ ফিকে হয়ে এসেছে, শুধু মনে আছে টালিগঞ্জের কাছে কোথাও রেকর্ডিং হয়েছিল,’ বললেন রাণু৷

বাবার কাছে গান নিয়ম করে শেখা হয়নি৷ কিন্ত্ত বাড়িতে সারা দিনই গান হতো৷ রাণুর কথায় ‘বাবাও কিন্ত্ত প্রথাগত ভাবে কোথাও গান শেখেননি৷ বাট হি ওয়াজ আ ন্যাচারাল সিঙ্গার৷’

আসল লাভ হত বাবার রেকর্ডিং আর অনুষ্ঠানে গেলে৷ এক সময়, বাবা ও মেয়ে মিলে দেশে বিদেশে বহু অনুষ্ঠান করেছেন৷ রাণুর কথায়, ‘বাবার হিট ডুয়েটের বহু গান লাইভ শোতে গাইতাম আমি৷ এর মধ্যে ছিল ‘ইয়াদ কিয়া দিলনে, ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনি, ছুপা লো ইয়ুঁ দিল’-এর মতো গান৷

রেকর্ডে অবশ্য হেমন্ত-রাণু দ্বৈতকন্ঠে গেয়েছেন ‘অমল ধবল পালে লেগেছে’ আর ‘এ পারে মুখর হল কেকা ওই’-এর মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত৷ রাণুর আপশোশ, ‘বাবার সঙ্গে আরও কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করতে পারলে আরও ভাল হত৷’ ষাটের শেষ আর সত্তরের শুরুতে বাংলা গানে যখন হঠাত্‍ পপ মিউজিকের জোয়ার এল, তখন তার পুরোভাগে দেখা গেল রাণু এবং শ্রাবন্তী মজুমদারকে৷ ‘বুশি বল’, য‘খনই বেড়াই আমি পাইনবনে’, ‘আমি একটা ছোট্ট বাগান করেছি’, তখন লোকের মুখে মুখে ফিরত৷

সেই পর্ব নিয়ে আজ ক্ষোভ ঝরে পড়ে রাণুর গলায়৷ ‘জানেন ওই ধরনের গান গেয়ে আমার গলার ক্ষতিই হয়ে গেল৷ আমি চাইতাম রাগাশ্রয়ী গান গাইতে কিন্ত্ত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্যা বলে বড়ো সহজেই পরপর সুযোগ পেতাম৷ অথচ আমি যে খুব উচ্চাকাঙ্খী ছিলাম তা কিন্ত্ত নয়৷ গৌতমের (স্বামী গৌতম মুখোপাধ্যায়) সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর, তার ভয়েস ট্রেনিংয়ে আমার কন্ঠস্বর আবার স্বাভাবিক হয়৷ এর ফলে বাবাও খুব খুশি হয়েছিলেন৷ গৌতমের সুরে গাওয়া আমার গজল ‘ফির তেরি ইয়াদ’ বাবার বড় প্রিয় ছিল৷’

রাণু মনে করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সেই বিরল মানুষ যিনি সঙ্গীতশিল্পী এবং সুরকার, দু’ক্ষেত্রেই সমান সফল৷ একবার পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের এক জনপ্রিয় সুরকার জুটি হেমন্তকে বলেন, ‘দাদা, সুর করা ছেড়ে শুধু গান করুন, দেখবেন আপনার কাছে অফারের বান ডাকবে৷’ কিন্ত্ত হেমন্ত এই আপসে রাজি হননি৷ তাই আজ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, টিভি চ্যানেলে, এমনকী ব্যক্তিগত আলাপে লতা মঙ্গেশকর, বাণী জয়রাম তাঁদের প্রিয় সুরকারের তালিকায় যখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম উপরের দিকে রাখেন, তখন রাণুর গর্ব হয় যে তাঁর বাবা সঠিক পথেই চলেছিলেন৷

কী ভাবে মনে রাখেন বাবাকে? ‘তিনি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, আমাদের কথোপকথনের অঙ্গ হিসেবে বারবার ফিরে আসেন৷’

রাণুর আক্ষেপ, বর্তমান প্রজন্ম, বিশেষ করে মুম্বইয়ে, হেমন্তকুমারকে মনে রাখেনি৷ হঠাত্‍ প্রশ্ন করলেন, ‘বাংলায় কী অবস্থা?’ নব্বইয়ের দশকে বাংলা গানে বাঁক ঘোরানো এক শিল্পীর কথা ধার করে বলি, অন্য সব গুণ বাদ দিয়ে উচ্চারণ, শুধু উচ্চারণের জন্যই বাংলা আধুনিক গানে দুটি যুগ, হেমন্ত-পূর্ব এবং হেমন্ত-উত্তর৷ বন্ধু গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার কী এমনি এমনি লিখেছিলেন ‘একদিনেতে হইনি আমি তোমাদের এই হেমন্ত’!