বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৯

আহ্‌মদীয়া মুসলিমরা আজও ব্রাত্য

মুসলমানদের মধ্যে যে সুন্নি সম্প্রদায়ের লোকেরা আছেন তাদের মধ্য থেকেই ১৮৮৯ সালে মির্জা গুলাম আহমেদের নেতৃত্বে একটি নতুন গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিল যাদের বলা হয় আহমেদি মুসলিম। আমাদের হিন্দু ধর্মের মধ্য থেকে যেমন ব্রাহ্ম সমাজের জন্ম নিয়েছিল এই আহমেদিরাও তদ্রূপ। শিক্ষাদীক্ষায় এরা অত্যন্ত উন্নত ছিলেন এবং পাকিস্তানে যিনি প্রথম নোবেল পুরষ্কার নিয়ে আসেন সেই আব্দুস সালামও ছিলেন আহমেদি মুসলিম। কিন্তু আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে তাঁকে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় নি কারণ পাকিস্তানে আহমেদিদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না। পৃথিবীর কোন মুসলিম দেশেই আহমেদিদের মুসলমান বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। এই গোষ্ঠীর জন্মলগ্ন থেকেই তারা নানা ধরণের বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন । কিন্তু কেন জানি নিজেদের প্রকৃত মুসলমান দেখানোর একটা তাগিদ অনুভব করতেন এই আহমেদিরা এবং আব্দুস সালামও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি নিজের নামের আগে মহম্মদ লাগিয়ে পাকিস্তানীদের হৃদয় জয়ের চেষ্টা করেন এবং জানান যে পদার্থ বিজ্ঞানে তাঁর আবিষ্কার তিনি করতে পেরেছিলেন কোরান পড়ে। এই নিয়ে আরেক বিজ্ঞানী পারভেজ হুডভয় তাঁর বক্তব্য রেখেছেন এবং দেখিয়ে দিয়েছেন যে এসব সত্যি নয়। এই মুসলমানদের হৃদয়ে নিজেদের স্থান করে নেওয়ার তাগিদেই বোধহয় এই আহমেদিরা দ্বিজাতী তত্ত্বের সমর্থনে মহম্মদ আলি জিন্নার পাশে দাঁড়ান এবং স্বতন্ত্র ইসলামিক রাষ্ট্রের সমর্থন করেন। কিন্তু দেশভাগ ও তৎসঙ্গে পাকিস্তান বনে যাবার পরই তারা বুঝতে পারেন যে এই ইসলামিক রাষ্ট্রে তারা সুখে শান্তিতে থাকবেন বলে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা আসলে হাওয়াই মিঠাই। ১৯৫৩ সালেই আহমেদিদের খতম করার জন্য পাকিস্তানে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। বিশেষত লাহোর শহরে এই দাঙ্গা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তবে নির্বিচারে এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হত্যাকাণ্ডকে দাঙ্গা বলা যায় না। বরং গণহত্যা বললেই ঠিক হবে। এই গণহত্যায় দুশোর বেশি আহমেদি প্রাণ হারান। তাদের ঘরবাড়ি, বিষয় সম্পত্তি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। উপায়ান্তর না পেয়ে গভর্নর গুলাম মহম্মদ পাঞ্জাব প্রভিন্সের সরকারকে বরখাস্ত করে মার্শাল লো চালু করেন। ইসলামিক রাষ্ট্র ও দ্বিজাতি তত্ত্বকে সমর্থন করে এই প্রথম আহমেদিরা নিজেদের ভুল বোঝতে পারেন। পরে অবশ্য পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালীরাও এটা বোঝতে পেরেছিলেন যে দ্বিজাতি তত্ত্ব হলো রঙিন এক ফানুশ।তবে আহমেদিদের উপর অত্যাচার তখনই শেষ হয়ে যায় নি। ১৯৭৪ সালে মজলিশ-ই-আহরের-ই-ইসলাম ও জামাতি ইসলামিয়া নামের দুটি সংগঠন পাকিস্তান থেকে আহমেদিদের নিশ্চিহ্ন করতে দাঙ্গা শুরু করে দেয়। এই দাঙ্গার কারণে বহু সংখ্যক আহমেদিরা প্রাণ হারান। তাদের সম্পত্তি নষ্ট করে দেওয়া হয়। এমন কি তাদের কবরস্থানও ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এরপর এই আহমেদিদের অমুসলমান বলে আখ্যায়িত করার জন্য সরকারের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি হতে থাকে। কারণ মৌলবাদীদের দাবি ছিল যে এই আহমেদিরা অমুসলমান হয়ে নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করেন এবং মুসলিম কায়দায় মসজিদে গিয়ে নমাজ পড়েন, ইত্যাদি। তৎকালীন পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো শেষ পর্যন্ত এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করে পাকিস্তানের সংবিধান সংশোধন করে আহমেদিদের অমুসলমান বলে ঘোষণা করে দেন। আহমেদিদের দুর্ভোগের কাহিনী এখানেই শেষ নয়। ১৯৮৪ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়া উল হক আহমেদিদের সব রকমের ধর্মচর্চার উপর নিষেধাজ্ঞা লাগিয়ে দেন। তাদের মসজিদে যাওয়া, প্রার্থনা করা, নমাজ পড়া ইত্যাদি সব রকমের ধর্মীয় আচরণের জন্য ন্যুনতম তিন বছরের কারাবাসের আইন পাশ হয়ে যায়। এর পর থেকে আহমেদিদের উপর অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ড লাগাতার চলতে থাকে। প্রায় প্রতি বছরই কিছু না কিছু আহমেদিদের হত্যা করা হয় ইসলাম ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার তাগিদে। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর প্রধান টার্গেট হলেন এই আহমেদি মুসলমানরা। এই আহমেদিদের পাকিস্তানের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না। ১৯৯৮ সালের জনগণনার সময় আহমেদিরা এই জনগণনাকে বর্জন করেন। তবে এই সেন্সাস রিপোর্টে বলা হয় পাকিস্তানে আহমেদিদের সংখ্যা ২ লক্ষ ৯১ হাজার। তবে আসল সংখ্যা এটা নয়। পাকিস্তানে আহমেদিদের সংখ্যা অনুমানিক ৪০ লক্ষ। এদের নাগরিকত্ব কিংবা ধর্ম পালনের অধিকার আজও নেই। পাকিস্তানে আহমেদিদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য জিহাদিরা আজও সক্রিয়। আমার মতে আহমেদিরাই পাকিস্তানের সর্বাধিক নির্যাতিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। আহমেদিদের সবচাইতে বড় সমস্যা হলো তারা পাসপোর্ট পান না তাই অন্য দেশে গিয়েও সেটেলড হতে পারেন না। তুলনামূলক ভাবে ভারতে বসবাসকারী আহমেদিরা অনেক সুখী।