বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০২০

আকনবিন্ধীর সোনাপোকা,-- ড (শেষ ) পর্ব

সম্পাদক কথা -- এইটি 'আকনবিন্ধীর সোনাপোকা'র শেষ পর্ব । ভেঙ্গে গেল মিলন বাসর । আকনবিন্ধীর সোনাপোকারা এইবার দলছাড়া গোত্র ছাড়া হয়ে ফিরে যাবে স্ব স্ব ডেরায় । নতুন স্বপ্নে হয়ত গড়ে তুলবে নতুন জগত । সবাই কী প্রতিষ্ঠিত হয় ? সবাই কী পৌঁছাতে পারেছে গন্তব্যে ? কী হল শেষে নাওমির সঙ্গে ? গ্রেস ফিরছে তাঁর ডেরায় ...

(ড)

বিদায় ভোজের আগে আগে গ্ৰেস সবার কাছে বিদায় নিচ্ছে।। আগামীকাল কুয়াশাঘন সকালবেলায় গ্ৰেস ফার্নান্ডেজ গুয়াহাটি হয়ে শ্রীহরিকোটার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে।এই অনুষ্ঠান তার চিরকাল মনে থাকবে।গ্রেস কথা বলতে বলতে মাঝে মধ্যে থমকে যাচ্ছে। প্রসাধনহীন মুখটাসে খালি হাতে মুছছে।তার মুক্তোর মতো উজ্জ্বল দাঁত দুপাটি ঠোঁট দুটিকে কামড়ে ধরেছে।কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এসেছে।এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে অনন্য অভিজ্ঞতা দান করেছে।প্রথম কথা র‍্যাগিংশূন‍্য এই প্রতিষ্ঠান। নেই মানে নেই। ভর্তির সময় একথা শুনে ছিল যদিও সমস্ত নতুন শিক্ষার্থীর মতো সেও মনের মধ্যে তীব্র আশংকা নিয়ে এসেছিল।আশঙ্কা নির্মূল হয়েছে।এত ভদ্রোচিত পরিচিতি পর্বের অভিজ্ঞতায় পৃষ্ট হয়ে সে অবাক হয়ে গেছে। পরিচয়ের আতিশয্য নেই বলে এই শিক্ষানুষ্ঠান কি কোনো বিদ্যার্থীকে বীতশ্রদ্ধ করেছে? না কি সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধতে পুরো পুরোপুরিসমর্থ হয়নি।এই বন্ধন এত সহজাত যে তাকে হারানোর পরে আজ গ্ৰেসের পক্ষে তা মাত্রাধিক ভারী হয়ে পড়েছে। বিদায়সভাকে রুমাল ভেজানো এবং দীর্ঘশ্বাসের অনুষ্ঠানে পরিণত না করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ মায়ার অবস্থাও আজ কাহিল‌। কনিষ্ঠা আবাসিকারা ম্রিয়মাণ।যেনপরিবারের বড় মেয়ের আজ বিয়ে।

আর দ্বিতীয়তঃ?

ড্রেস কিছুক্ষণ বিরতির পরে পুনরায় আরম্ভ করেছে।এখানে এসেই কলেজের বিভিন্নঅনুষ্ঠানগুলোতে সে ঘন ঘন একটি কথা শুনে ছিল। আমরা একটি ঘর।ফীল অ্যাট হোম।সাতটা বছর পার হল। সাত বছরের জল হাওয়া আলো বাতাস এই অনুভবকে প্রগাঢ় করে তোলা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নিশ্চয় প্রথমবারের জন্য একে এক আলংকারিক প্রকাশ বলে ভাববে। কিন্তু দিন যাবার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চয়ই বলতে হবে যে এই ভাবনা অনন্য সহচর। আরও সাত বছরের উপলব্ধি থেকে পুনরায় গ্ৰেস বলতে চায় সেটা কেবল আলংকারিক প্রকাশ মাত্র নয়, আমরা সত্যিকার অর্থে একই ঘর।

আমরা যেখানেই থাকি না কেন এই নিগূঢ় উপ লব্ধির সুগন্ধ বিলিয়ে যাব। যেখানেই পা রাখব এই অনন্য উপলদ্ধিতে একত্র করার সংকল্প গ্রহণ করব। কারণ একটা ভালো ঘরের সদস‍্য সব সময়ই ভালো এবং ইতিবাচক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে।আপন করে নেওয়ার উষ্ণতা এবং উদারতা দেখায়। আর এভাবেই ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে যাব ঘরের সংজ্ঞা। আমরা একা নই, কারণ আমরা কাউকে একা হওয়ার জন্য ছেড়ে দিই না।

ডক্টর ঝুনঝপপাকিছু বলতে গিয়ে ভেঙে পড়েছেন। তার আবেগের এই ধরনের বহিঃপ্রকাশ আবাসিকাদের চোখের জলের ঢল নামিয়েছে।মেয়েরা ঘন ঘন শ্বাস ফেলা এবং রুমাল ভেজানো অনুষ্ঠান করবে না বলে সঙ্কল্প কখন রসাতলে গেছে।

পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রবীন্দর কৌ্রের অনুরোধে বকলিন্দা লাম এস যে ডানকানের মীনসিয়েম বাসিনরেং’এর ইংরেজি অনুবাদ ‘এ ম্যানলি হার্ট’ আবৃত্তি করার জন্য উঠে এসেছে।–

Who says that I am all gone!

Strength lies not in number,

A manly heart will dare and conquer,

Despite hardship, hindrance, malice, envy,

The harder it’s hit, the more hardened it’s spirit,

To win the race,more keenly is it stirred.

When the mind is made up,it idles not

For contentment is victory.

Whoever laughs when he should cry

Whoever is confident though left alone

Recking not though he bleeds and suffers

On such a one will people place their trust.

বিদায়সভার সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরে আজ ডক্টর ঝুনঝাপ্পা হোস্টেল ছেড়েছেন। জ্যেষ্ঠা আবাসিকারা গ্রেস ফার্নান্ডেজের রুমে শেষ বারের জন্য এসে বিদায় এবং শুভরাত্রি জানিয়েছে। কনিষ্ঠা আবাসিকদের দুয়েকজন অভ্যাসবশত টিভি খুলে নিজের প্রিয় সম্প্রচারণেরসন্ধানে চ্যানেল হাতড়ে বেড়াচ্ছে।চ্যানেল খোঁজার সময় গুয়াহাটি দূরদর্শনের খবর সম্প্রসারণের মাঝখানে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়েছে।

‘অসম বন্ধ নাকি?’না। উগ্রপন্থীর খবর…

…মারণাস্ত্র সহ ধরা পরাএকজন উগ্রপন্থীর নাম হল অরুন গগৈ এবং অন্যজন…

টিভির রিমোট আবার প্রিয় সম্প্রচারণের সন্ধানে সরে গেছে।

বিদায় পর্বের পরে আসলে আবাসিকারা কোনো প্রিয় অনুষ্ঠানে মন বসাতে পারেনা।তাতে আবার অসমের খবর। টিভি দেখতে থাকা আবাসিকাদের এক জনও অসমের নয়।

ভোররাতেএকা ঘুম থেকে ওঠা মায়া এবং পদ্মাকে আজসমগ্র আবাসটা সঙ্গ দিয়েছে। বায়োলজিক্যাল ক্লকের নির্দেশ নিশ্চয়। সকালের চা খাবার ঘণ্টাধ্বনি ও যাকে বিছানা ছাড়াতে পারে না সেই ইয়াসি আজ উঠে এসেছে।

সকালে পাইনের পাতা গুলিতে কুয়াশা চাদর মেলেধরেছে।নির্মলা যুবতীর সাত বছরের সম্পর্কের সম্মানার্থে প্রকৃতিও যেন আয়োজন করে চলেছে। আজ ধবলবরণ শীতের চেয়েওআত্মীয়তা বেশি।

ক্ষুদ্র ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রাণীসামনে-পেছনে করে এসে ভিজিটরস পার্লারের কাছে বনানীতেঅপেক্ষা করছে।হোস্টেলের অন্য প্রান্তে ডক্টর ঝুনঝাপ্পাকেদেখা যাচ্ছে।যেন কন্যা বিদায়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা মাতৃদেবী।

তার কাছে আসা মাত্র গ্রেসকে জড়িয়ে ধরেছেন। নিস্তব্ধ এক মুহূর্ত। আজ কারো চোখে জল নেই।নির্মল ভোরবেলার সম্মানার্থে সবাই কেবল ডান হাত বের করেছে।গ্রেস ট্যাক্সিতে উঠেছে। বায়োলজিক্যাল ক্লকের নির্দেশে প্রতিটি আবাসিকা মন্ত্রমুগ্ধের মতো চলমান ট্যাক্সির পেছন পেছন চলেছে। গ্রেস একবার ঘুরে তাকিয়েছে। তার চোখ থেকে দু ফোটা জল উষ্ণ সোয়েটারটা তে পড়ে মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে। একটা শুভ সকালের সম্মানার্থে সে শেষবারের মতো মাথা নত করছে। ওয়ার্ডের ঘরের জানালা দিয়ে ফিরে আসা ল্যান্ডফোনের দীর্ঘ রিংটোন সকালবেলার একাগ্রতা খান খান করে ভেঙ্গে দিয়েছে। আবাসিকারা দেখল কিছুক্ষণ আগের বিষন্নতা বিসর্জন দিয়ে তড়িত্গতিতে ঝুনঝাপ্পা ভিতরে ঢুকে গেছেন।

হোস্টেলে ঢুকে আবাসিকাদের বেশিরভাগেই পুনরায় শিলংয়ের সকালবেলার উষ্ণতাটুকুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য বিছানার নিচে আশ্রয় নিয়েছে।

নতুন প্রিফেক্ট কল্যাণী আচার্যের সেই সৌভাগ্য হয়নি। প্রিফ্রেক্ট কে তক্ষুনি ওয়ার্ডেন ডেকে পাঠিয়েছেন। কলাপী গেল।পনেরো মিনিটের মধ্যে ফিরে এল। ঘরের দরজা খুলে তেজীমালা চমকে উঠল। কোনো সাড়াশব্দ নেই। করিডোরে ওদের দরজার সামনে কলাপী আচার্য। সে তেজীমালাকে খপ করে ধরে করিডোরের দিকে টেনে এনে চুপ করে থাকার ইঙ্গিত দিল। সোনারি থেকে বনশ্রীর বাড়ির মানুষ ডঃঝুনঝাপ্পাকে ফোন করেছেন। বনশ্রীর মা অসুস্থ। বনশ্রীকে আজ যেভাবেই হোক পাঠিয়ে দিতে হবে।

তেজীমালা ঘরের দিকে তাকাল। বনশ্রী সকালের উষ্ণতায় বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে। কলাপী নির্দেশ দিয়েছে বনশ্রী নিজেই উঠুক ক্লাসে যাবার জন্য তৈরি হোক ,খাওয়া-দাওয়া করুক এবং তারপরে তাকে পুলিশ বাজারের বাস আস্থানায় রেখে আসার দায়িত্ব তেজীমালা নিক।ডক্টর ঝুনঝাপ্পা ইতিমধ্যে টেলিফোনে বাসের টিকেট সংগ্রহ করে রেখেছেন।হাসিখুশি তেজিমালারমুখ থেকে খুশির ভাবটা নাই হয়ে গেছে।

বনশ্রীকেবাস আস্থানেরেখে আসার জন্য কেবল তেজীমালাই নয়, মীম, ক্রীন এবং দেবাহুতিও এসেছে।ওদের ট্যাক্সিটা ভরে এসেছে।কিন্তু কারও মুখে কোনো কথা নেই। বনশ্রী যেন ওদের সঙ্গে কখনও ছিল না। সে যেন কাউকে চেনে না। এই ধরনের অভিব্যক্তি তার চোখে-মুখে নিথর হয়ে বসেছে। চারজনই অসহায় বোধ করছে।

সামার হাউসের চায়ের আড্ডা আজও যথারীতি জমে উঠেছে। চোখজুড়ানো পাইনের ফাঁকে ফাঁকে বাতাস শিস দিচ্ছে।ময়ূরভঞ্জেরপূর্ব প্রান্তের বেঞ্চেপড়ে আছে কয়েকটি বন্ধ পৃষ্ঠা। কোনো বায়োলজিক্যাল ক্লকের ইঙ্গিতে আইভি লতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে গৃহস্থের বারান্দার কোণের খুঁটি।আকনবিন্ধির দু-রঙের পাতায় খুব সাবধানে বসেছেকয়েকটি বিপন্ন সোনা পোকা।কাছিমের ঢালু পিঠের মতো তার আবরণের নিচে ছোট্ট এতটুকু প্রাণ।

রৌদ্রস্নাত সামারহাউসে শার্লি,লাথা এবং স্যামসনকেআড্ডা মারতে দেখা গেল। সে থেইচিডরেরজন্য উদ্বিগ্ন বোধ করছে। হঠাৎ চলে গেল। একটা খবর দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না? মিপুন এসে সামার হাউসে ওদের সঙ্গে যোগ দিল। সেও থেইচিডরেরকথাই জানতে চাইল। ক্লাস ক্ষতি করা মেয়ে তো সে নয়।

শার্লি খবরটা দিল।থেইচিডরের ঘরের প্রতিটি সদস্য হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। খবর আর কাকে দেবে, সে নিজেকে কোনো রকমে সামলে সুমলে তাড়াহুড়ো করে চলে গেল। বাড়িতে গিয়ে জানতে পেরেছে, সমগ্র গ্রামটির মানুষের একই লক্ষণ।মারাত্মক পেটের ব্যথা।খাসিরা পরম্পরাগত ভাবে বনৌষধি ব্যবহারে অভ্যস্ত।বনৌষধি কাজ করছে না। ‘গ্ৰামীণ টোটকা’ একেবারে যাদুকরী ওষুধ।এই ধরনের ওষুধ ভূ-ভারতের আর কোথাও নেই। পেটের ব্যথা 'গ্ৰামীণ টোটকা ভালো করতে পারছে না? বৈদ্য বিমূঢ়। দুয়েকজন রোগিকে শিলংয়ের চিকিৎসালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। রোগ শনাক্ত করতে পারছে না। এখন শিলংয়ের প্রায় চিকিৎসককে গ্রামে যেতে হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো গিয়েছে।

নাওমি বুয়ান ?

অবশ্যই নাওমিবুয়ান থেইচিডরের গ্রামে আছে।কথাটা শুনে মুগ্ধ হল।তবে রসিকতা তার ধর্ম।

--আমরা ঘাটে ঘাটে নৌকা বাঁধি। আমাদের নাওমি শিখরে শিখরে বেড়ায়। দার্জিলিং থেকে শিলং ।হৃদয়ে হৃদয়ে ঘর বাঁধে।

--ওর কি হৃদয় আছে? আমার জানা মতে ওর কেবল একটা রিস্টব্যান্ড আছে। সতর্ক প্রহরী হয়েসেটাকেই সে আগলে রাখে।

লাথা বিরক্ত হল। এই ধরনের রসিকতায় অংশ নেওয়ার চেয়ে সে সামার হাউস ছেড়ে দেওয়াই উত্তম বলে বিবেচনা করল।মিপুন তাড়াহুড়ো করে মাফ চেয়ে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এল।

ময়ূরভঞ্জ প্রাসাদের খোলা জায়গাটায় নিঃশব্দে একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। পেছনের দরজা খুলে নাওমি বুয়ান নেমে এল। হৃদয় মিপুনের মুখ কথা ফুটল।

বহু দিন বেঁচে থাকবে নাওমি বুয়ান।

থাকবে তো।

থেইসিড ভালো আছে।পরিস্থিতির আরেকটু উন্নত হলেই সে ক্লাসে ফিরবে।

অসুখটাখাবারের জল থেকেই হচ্ছে?ওদের বাড়িতে চব্বিশ ঘন্টার রানিং ওয়াটার রয়েছে। ঝরনার জল ফালা বাঁশের মধ্য দিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা আছে।চব্বিশ ঘন্টা। ফ্রী অফ কস্ট।

-তাহলে নির্ঘাত মাটি থেকে।দ্বিতীয় বিকল্পের সম্ভাবনা নাকচ করার ধরনে সে দক্ষ হাতে হাতের বাঁধানো খাতায় তবলা বাজাল।

--তুই কীভাবে জানলি?একেবারে যেন বৈজ্ঞানিক।

-- আরে এসব কথা জানতে হলে কি বৈজ্ঞানিক হতে হবে নাকি?নেটিভ ইন্টেলিজেন্স। অভিজ্ঞতাই শেখায়। তুই আমাদের কার্বি আংলং দেখিস নি,কি হল।ওরা জলে বর্ধিত ক্লোরাইড পেতে পেতে মানুষের হাড় মাথা ত্যাড়া বাঁকা হয়ে গেল। এরা খুঁযে পাবে,ওষুধ আনাবে ।অসুখ কি ততদিন বসে থাকবে নাকি?আমি বলছি,এখন যদি সমগ্র গ্রাম ভুগছে এর কারণটা কিন্তু জলে নেই তখন মাটিতে থাকতে হবে। বাতাসে থাকলে আমরা এতদিন বেঁচে থাকতাম না।তাহলে বাকি থাকল কি? আগুনে তো—

-- কে শুনবে তোর কথা? ময়ূর ভঞ্জের সামার হাউসের চায়ের কাপগুলো? একেই বলে চায়ের কাপে তুফান?

স্যামসাং অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে না।নিজের অঞ্চলের মানুষদের আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে সে এই সমস্ত কথায় গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছে। জানা দরকার। বিজনীর বহু গবেষণাপত্রে এই বিষয়ে চর্চিত হয়েছে।ডঃঝুনঝাপ্পার রসায়ন বিভাগের এ্যালাইড বিষয়ের একজন গবেষক মেঘালয়ের কোনো অঞ্চলের মাটিতে এই ধরনের বিপদের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে আজ থেকে ছয় বছর আগেই সতর্ক করেছিলেন। --আমাদের দেশে এটাই হয়। দেরি। গবেষণা গবেষণাপত্রেই থাকে, সেমিনার গুলিতে সমাধানের পরে সমাধানসূত্র বের হল। যার জন্য এত লড়াই,দৌড়ঝাঁপ--গবেষণার ফলাফল,সেমিনারের সমাধানসমূহ-- কার্যকরী হতে হতে তাদের হারে দুব্বো গজায়। এখন তাদের নিয়েই ইতিহাস লিখ।

শিলংয়ের পাহাড়ে পাথর ভেঙ্গে নমুনা সংগ্রহ করে ঘুরে বেড়ানো বৃদ্ধ দম্পতির মতে মেঘালয়ের মাটির গঠন,চুনাপাথরের গুহার বৈশিষ্ট্য তাদেরকে বিস্তৃত অধ্যয়নের সঙ্গে পর্যবেক্ষণের জন্য আগ্রহী করে তুলেছে। আমাদের দেশের মানুষের জন্য অভূতপূর্ব কথা।আশির উর্ধে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের কী তীব্র জ্ঞান স্পৃহা। মাটির গঠন,পাথরের বয়স, চুনাপাথরের প্রকৃতি দেখে তিনি গবেষণা চালাচ্ছেন। নিজের হাতে হাতুড়ি মেরে পাথর ভাঙছেন। সঙ্গে থাকা তার স্ত্রীর কথাটাও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখা দরকার। তিনি ইতিহাসের অধ্যাপিকা। স্বামীর সঙ্গে হাতুড়ি বাটাল দিয়ে পাথর ভাঙছেন আর নোটবুকে টুকে চলেছেন। এখনও তাদের কঅপরিসীম উদ্যম।

নাওমি বুয়ান তার বিদেশি পর্যটক বন্ধুদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে নিজেই অভিভূত হয়ে পড়েন। স্পেন থেকে এসে তার কবি বন্ধুটি চিনে নৃতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাঠক্রম নিয়ে জলপানি নিয়ে আসা ব্রিটিশ ছাত্রদের সম্প্রতি শিলং ভ্রমণ, মিউজিক আর্কাইভের কাজ করার জন্য আসা রেবেকা তার তিব্বতীয় বন্ধুটি—

--নাওমি ফিরে আয়, দেশের মানুষের কথায় ফিরে আয়। জার্মানি থেকে পড়তে আসে চিনে, নমুনা সংগ্রহ করে কার্বিআংলঙে,বন্ধু পাতে তিব্বতে-- তোর বিদেশি বন্ধুদের আমি খুব একটা সুবিধার দেখিনা।

নাওমি বুয়ানকে নিরস্ত করার জন্য নিপুন এবং স্যামসাং যুগ্মভাবে আক্রমণ আরম্ভ করল।নাওমি রিস্টব্যান্ড পাকাতে পাকাতে মাথা নাড়লো।

--ঠিক আছে।দেশেই থাকি। দেশ আবার অঞ্চলগুলোকে নিয়েই হয়।থেইসিডের গ্রামে বিপদ। সেখানে তো কেউ গেলিনা। আর তুই, স্যামসন। মিছামিছি এখানে বসে থেইসিড থেইসিড করতে থাকলে তোর প্রেম জমবে না,বলে রাখলাম। থেইসিড জীবন্ত মেয়ে। সে নিজের মাটি থেকে পৃথক নয়। কং রিম্বাইর উনুনের চা এবং খরাহির জিমবাম খেয়ে সামার হাউসের আড্ডার সামাপ্তি ঘটল। প্রায় বিভাগগুলোতে এখন পূর্ণ গতিতে ক্লাস চলছে। মৌচাকের আকৃতির গ্রন্থাগার নীরব গুঞ্জনে ভরে রয়েছে।

নাওমি এবার বিজনী হোস্টেলের কারো কাছ থেকে বনশ্রীর খবর নেবে। থেইচডির গ্রামে যাওয়ার দিন শুনেছিল বনশ্রীকে তক্ষুনি বাড়িতে যেতে হয়েছে। তার মা নাকি অসুস্থ। এখন পর্যন্ত বোধ হয় সে হোস্টেলে আসেনি।

সামার হাসের সিঁড়ি দিয়ে সে গ্রন্থাগারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকল।মৌচাকের ভিতরে হোস্টেলের কাউকে-না-কাউকে দেখতে পাবে। কী ঠিক। বনশ্রী যদি ফিরে আসে, সে হয়তো সেখানেই থাকবে।

বাঁ দিক দিয়ে নামতে যেতেই নিচের ডান দিকের বনানীর দিকে চোখ গেল। বনানীটা ঘিরে থাকা হাঁটুর সমান উঁচু দেওয়াল থেকে কেউ একজন তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

আরে,মীম। আমি কিছুক্ষণ আগে থেইসিডের গ্রাম থেকে ফিরে এসেছি। তোদের হোস্টেলের কাউকে পাব বলে এদিকে এসেছি। বনশ্রীর কথা জিজ্ঞেস করার জন্য। ইতিমধ্যে সে মিমের কাছে পৌঁছে গেছে।একটা স্বস্তির শ্বাস নিল।

কাঁধ দুটি একটা হেঙারের মতো করে মীম দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আসার পর থেকেই এই কথাটা আমার মনে আসছে। তোরা তো খবর পাবি, কিছু একটা হলে।

পাইনের মধ্য দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের শো শো ধ্বনি ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে।তার উৎপাতে মীম সামান্য নড়চড় করে উঠল।

মীম,আমি জিজ্ঞেস করছি, বনশ্রীর কোনো খবর পেয়েছিস?

জংঘলী জংঘলী খতম।

আচম্বিতে বাতাসের শো শো ধ্বনি বিলাপে পরিণত হল।আনন্দমুখর ময়ূরভঞ্জে এইসব অপরিচিত পাখির কলরব কীসের? বনানীতে ঝকমক করতে থাকা রোদের কি হল?বনানী জুড়ে অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে।রোদ ডানায় ভর করে উড়ে গেল।

রোদ উঠার সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ভীষণভাবে ঘুরে যাওয়ায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল হাজারটি সোনালী পোকার দ‍্যুতি থকা নাওমি।

দেওয়ালের দিকে গড়িয়ে আসা নাওমি বুয়ানের শরীরটা মীম কোনোমতে শেষ মুহূর্তে ধরে রাখল এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে না পেরে বনানীতে ছিটকে পড়ল। পরক্ষণেই সে সভয়ে নাওমির দিকে তাকাল এবং হাঁটু গেড়ে বসে বসে চিৎকার করে উঠল।

মীমের গগনভেদী চিৎকারে চারপাশ চমকে উঠল।

তারপরে দৌড়াদৌড়ি।ময়ূরভঞ্জ হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

ওয়াইডব্লিউসিএ এর মেয়েরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজে লেগে গেল।

হাসপাতাল ।

ডক্টর ।

যাবতীয় নিদান।

নাওমির মস্তিষ্কে একটা টিউমার পাওয়া গেছে।

আকারে ক্ষুদ্র যদিও ইতিমধ্যেই সে তার লক্ষ্যভেদী কালান্তক থাবা মেলে ধরেছে।


সমাপ্ত