বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০২০

আকনবিন্ধীর সোনাপোকা,-- ট

(ট)

সামার হাউস ময়ূরভঞ্জের চায়ের কাপ।চায়ের কাপে তুফানও উঠে।নানা মুলুকের,নানা ধরনের।কথা-বার্তায় চৌকশ ঝুমুরের আধিপত্য লক্ষ্য করার মতো।সে যে সামার হাউসে বসে,সেখানে অন্যের বিষয়বস্তু বা প্রাধান্য স্থান পায় না।

আজও তার ব্যতিক্রম হল না।তাকে কেমফাম তার রেজাল্টের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে না খোঁচা মেরেছে তা নিয়ে সে ততটা কর্ণপাত করেনি।সে একটা সূত্র পেয়েছেঃ রেজাল্ট।ব্যস,বকবকানি আরম্ভ।বর বের হক,বিয়ের পিঁড়িতে বসব গিয়ে বলে পথ চেয়ে থাকতে থাকতেই সে একাধারে দুটো সেমিস্টারে প্রথম বিভাগ পেয়েছে।বাকি দুটি সেমিস্টারের জন্য সে জান লড়িয়ে দিতে পারে। কারণটা সেই একই।‘টপার’লেভেলটা যদি কোনোভাবে তার পাত্র জোগাড়ে সহায়ক বা অনুঘটকের কাজ করে,করুক।আজ তাই সোজাসুজি প্রত্যাহ্বান জানিয়েছে,যুদ্ধে কারও যদি কিছুটাও লড়ার মানসিকতা থাকে।

কেউ ঝুমুরকে প্রত্যুত্তর জানায় নি।পণ্ডশ্রম হবে।ঘুরেফিরে সে কেবল নিরর্থক কথা বলতে থাকবে।

ঠিক সেই সময়ে ময়ূরভঞ্জে্র পশ্চিমের সিঁড়ি দিয়ে শ্রদ্ধা প্রধানকে তার কম বয়সী বন্ধুটির সঙ্গে নেমে আসতে দেখা গেল।ঝুমুর শ্রদ্ধাকে চিৎকার করে ডাকল।দুজনেই থমকে দাঁড়াল।শ্রদ্ধা প্রধান সামার হাউসে এল।ইঙকনবা সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেল।

-ইঙকনবা এল না কেন?আশা করি আমরা তোদের অসুবিধায় ফেলিনি!

-কোনো অসুবিধা নেই।ইঙকনবার কী-যেন কাজ আছে।

গোলাকার সোফাটার এক মাথায় কেমফামবসে ছিলই,অন্য প্রান্তে বসে শ্রদ্ধাও ওদের কথায় অংশগ্রহণ করল।শ্রদ্ধার বাবা অবসর নিয়েছে।চব্বিশ ঘন্টাই সাহিত্য চর্চা করবে ভাবছেন।ঠিক সেই সময়ে তাদের বাড়িটা পালটাতে হচ্ছে। কিছু কম ভাড়ার বাড়ি নিতে হবে।দুটো বেডরুমের ঘর হলেও হবে।ঝুমুর তৎক্ষণাত রাজি হয়েছে।দুদিনের ভেতরে সে খবর দিতে পারবে।কেমফাম বেশিক্ষণ ঝুমুর-শ্রদ্ধার আলাপের নীরব শ্রোতা হয়ে থাকতে ভালোবাসল না।

--শ্রদ্ধা,একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারব কি?

-একটা কথা কেন,কেমফাম। তুই আমার বন্ধু।যে কোনো কথাই জিজ্ঞেস করতে পারিস।কর না ।

-নেপাল থেকে তুই কেন চলে এলি?তোর নিজের দেশে ফিরে যাবার সুযোগ পেয়েও কেন তুই ফিরে এলি?

-আমি আমার নিজের দেশে ফিরে এলাম, কেমফাম।তাছাড়া একজন মানুষ একটা দেশকে বিয়ে করতে পারে না,একটা দেশের একজন মানুষকে বিয়ে করে।মানুষ দুটোকে একসঙ্গে থাকতে পারতে হবে,তখন দেশ এর প্রশ্নটা আসবে। মানুষ ,দেশ—একটাও আমার নয়।

-কিন্তু তুইতো নেপালি।বর ও নেপালের।

একটু শুদ্ধ করে দিই?আমি ভারতের।আমার ভাষাটা নেপালি।আমি তোদের কাছে ফিরে আসায় তুই তারমানে খারাপ পেয়েছিস,কেমফাম?

--আরে আমি কেন খারাপ পাব।একটা কথা সোজাসুজি ভাবে জানতে চেয়েছি।ব্যস।বাকি সব জটিল কথা।

--তাই তো।কেমফাম,আমরা ‘মেইন স্ট্রিম’বিধাতা পুরুষের মতো রায় দিতে যাব না। ওরা ভারতবর্ষের চার সীমা জানে না।‘উত্তর পূব’বললে চিন নাকি বলে জিজ্ঞেস করে।কেবল প্রাকৃ্তিক সম্পদ্গুলি শোষণ করার সময়ে ‘আমাদের দেশ আমাদের দেশ’বলে।

-আমি আর ‘মেইন স্ট্রীম’বিধাতার ভাষা কী বলব।আমরা খাসি ছেলেরা সবচেয়ে প্রতারিত জীব।সংখ্যালঘু।

-কীভাবে প্রতারিত হলে?অন্য ধরনে দেখ।তোমার এটা একেবারে আলাদা,একেবারে একক বৈশিষ্ট্য।

-এসব উপরে উপরে বলা কথা।ঘা আমার বুকের ভেতরে।আমার কৈশোর কীভাবে পার হয়েছে কেউ জানে কি?অন্য খাসি ছেলেরা যখন সঙ্গীদের সঙ্গে মালভূমিতে ফুটবল খেলে,যখন গোর্খা কিশোররা অস্ত্রচালনার অভ্যাস করে,যখন আমার কনিষ্ঠা ভগ্নী ব্যাগ থেকে বই পত্র নিয়ে পড়তে বসে,আমার জন্মদাত্রী সেই সময়ে কাপড়ের গামলা তুলে দেয়।জন্মদাত্রীর রক্তস্রাবের দাগ লেগে থাকা সেই কাপড় ধুতে থাকা কিশোরটার কথা কেউ বুঝতে পারবে কি?

--কেমফাম আমাকে বোবা করে দিলি।আমি জোর দিয়ে বলছি,তুই একদিন বিকেন শর্মার মতো বিখ্যাত কবি হবি।

--এই যে,তোরা জানিস না ?এইমাত্র বলা কথাগুলি কেমখামের খাসি কবিতার মূলভাব।সে কবিই।

--কেমফাম,ইংরেজিতেও লেখ,যাতে অনেক পাঠক তোর কথা শুনতে পায়।হ্যাঁ,তুই অবশ্যই খাসি পাঠকদের জন্য তোর নিজের মানুষদের জন্য লিখবি,তারা তোদের বুঝুক।কিন্তু অন্য মানুষেরাও তোর একক এবং বিশেষ স্থিতিকে অনুধাবন করুক।

সামনের সেমিনার হলের বিশাল দরজাটা খুলে গেল।ঐ যে সেমিনার হল থেকে কলাপী দৌড়ে এসে তিন নাম্বার সামার হাউসে পৌছেছে।না দৌড়ে উপায়ও নেই।সেমিনার শেষ হল।হল থেকে বাইরে বের হল,সিঁড়ি পেতেই হঠাৎ বৃষ্টি মাদল বাজাতে আরম্ভ করে দিল।হলে ফিরে যাওয়ার চেয়ে সামার হাউসে দৌড়ে যাওয়া বেশি ভালো।রবীন্দর কৌর এল,হৃদয় মিপুন,পরাগ প্রাধানী।হাউস ফুল।পেট শান্ত।আড্ডা জমে উঠল।

সময় টগবগিয়ে এগিয়ে চলল।অস্তাবল থেকে অস্তাবলে।মল্লিকা বসুমাতারী আজ হলদে দখনা পরেছে। জনগণের অনুরোধে সে একটি স্বরচিত বড়ো কবিতা পাঠ করেছে।উত্তাল হয়ে বাগরুম্বা নাচতে পারা আঁটোসাটো গড়নের মেয়েটির মুখ এই কনকনে ঠাণ্ডাতেও ঘেমে উঠেছে।কবিতা আবৃত্তির মেয়েদের দিকেমল্লিকা বসুমতারী তার দুবাহু মেলে ধরেছে,মাঠ থেকে ভারী ধানের বোঝা তুলে বাড়িমুখো হওয়ার মতো দুই বাহু,ল্যাবরেটারিতে অনায়াসে সিলিণ্ডার তুলে একদিক থেকে অন্যদিকে নিয়ে যাবার মতো শক্ত মজবুত বাহু।মনের মতো করে কালাইডাল দিয়ে মুরগির মাংস রাঁধতে পারার মতো দুইহাত।

সেও কবিতায় তার কল্পনার ডানার কথা বলেছে।তার ভাষা বুঝতে না পারলেও শ্রোতা তার মর্মর প্রকাশ উপলদ্ধি করেছে।সামার হাউসের শ্রোতা ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ এবং তারপরে শিহরিত হয়েছে।

এভাবেই শব্দ বিজলীর মতো সুতো উন্মোচিত করে যায় সত্তা।এমনিই শব্দের মহিমা।

পাশের সামার হাউস থেকে এই ধরনের শব্দের বন্ধন থেকে জোর করে বনশ্রীকে বাইরে বেরোতে হল।বৃষ্টি ছাড়ার কোনো লক্ষণ নেই।সময় বয়ে চলেছে।

ছাতার নিচে কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে সে সামার হাউস থেকে নেমে এল।কাজ আছে।আগামীকাল গ্রেস চলে যাবে।স্নেহশীলা গ্রেস ফার্ণাণ্ডেজ।

সে এসে ময়ূরভঞ্জে্র মূল প্রাসাদের কাছে পৌছে গেল।

-জংঘলী,দাঁড়া দাঁড়া।

মীম।

লাইব্রেরির প্রশস্ত রাস্তা থেকে দৌড়ে এসে সে বনশ্রীর ছাতার নিচে ঢুকে গেল।দুজনে জড়াজড়ি করে নিচে নেমে আসতে লাগল।

জংঘলী তোর বাচ্চা হলে আমাকে ম্যাটারনেল আন্টি ডাকতে শেখাবি না প্যাটারনেল আন্টি ডাকতে শেখাবি?

-আগে বাচ্চা বাপের তো জন্ম হোক,দেখি।

একটা ছাতার নিচে এখন পর্যন্ত একজনও নিরাপদ থাকেনি।ক্যাবটা সামনে এসে দাঁড়াল।ড্রাইভার গলা বের করে দুজনকেই দেখল। হ্যাঁ,দুটো সিট খালি আছে।দ্রুত দুজনেই ক্যাবে উঠে পড়ল।

সন্ধ্যেবেলার ভাত খাবার জন্য মীম,ক্রীন,বনশ্রী এবং আশা সিঙ প্রায়ই এক সঙ্গে বসে।কারণ? খাদ্যাভাসের মিল।দেবাহুতি পারতপক্ষে খাওয়ার সময় নিরাপদ দূরত্বে,নাহলে অন্য সময় আসে।এদের আমিষের লিস্টটাকে সে খুব একটা সুবিধার দেখে না।একটা মিল অবশ্য আছে।চারজনেরই মায়েরা নানা ধরনের বৈয়াম পাঠায়।একে অপরের বৈয়ামের আচারের স্বাদ নিয়ে পরম তৃপ্তির সঙ্গে সন্ধ্যের আহার গ্রহণ করে। বনশ্রীর বাড়ি থেকে বৈয়াম নয়,শুকনো কলাপাতার পুঁটলি আসে।পুঁটলির জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে।

লাইশাকের পুষ্ট গুটি,সাদা সরষের পুষ্ট গুঁটি ভেজে গুঁড়ি করে পাকা থেকেরা দিয়ে মেখে কলাপাতায় বেঁধে পাঠানো ‘পানীটেঙা’।ওদের মতে গন্ধটা ভিক্সের সঙ্গে সমান তালে তুলনীয় হতে পারে।এরকম সুস্বাদু এপিটাইজার।একটু খেলে কান পর্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যায়।এত প্রশংসা শুনে কেউ একজন একবারে অনেকটা খেয়ে ফেলল।কানে তালা লেগে অবস্থা কাহিল।

ফলস্বরূপ পানীটেঙা নতুন নাম পেয়েছে।কানে তালা লাগা চাটনি।চড় মারা চাটনি।আর ও বেশি করে চলতি নামটা হল স্ল্যাপিং চাটনি।

বনশ্রীর জ্যাঠিমাকে খবর পাঠাতে হবে।‘পানীটেঙা’ বেশি করা পাঠাবে।

মীম এবং ক্রীনের আচারের বৈয়ামগুলিতে লঙ্কার উপদ্রব যদিও মুখরোচক।আশা সিঙের আমদানিকৃত আচার কাগজেও বেঁধে আনা যায়,তেল নেই-ই বলা যায়,অথচ অত্যন্ত কোমল এবং উপাদেয়।

ক্রীন’এবং মীম সবগুলি বৈয়াম ডাইনিং রুমে আনে না। বনশ্রী তখন হোস্টেলে নবাগতা।একদিন হঠাৎ ক্রীনের ঘরে গিয়ে ঢুকল। রুমমেট বিহারের আশা সিঙ বিছানায় বসে বৈয়াম থেকে তৃপ্তির সঙ্গে কিছু খেয়ে চলেছে। হাব-ভাব থেকেই বোঝা যায় আশা নিশ্চয় এই বৈয়ামের সুস্বাদুতার কথা আগে থেকে জানে।

--তোরা মনে মনে কী খাচ্ছিস?আমাকে কেন দিচ্ছিস না?

বৈয়াম থেকে কী যে মিষ্টি গন্ধ একটা ছড়িয়ে পড়েছে।কিছুটা পরিচিত,কিছুটা অপরিচিত।

--এই বলতো।জিনিসটা কী?

--একেবারে নির্দোষ পদার্থ।চিনিতে ডুবিয়ে রাখা আমলকী থেকে নির্গত রস মাত্র।সবুজ রঙের,মিষ্টি।

অবশ্যই যথাসম্ভব ব্যখ্যা উপস্থাপিত করে মানে বনশ্রী বৈয়ামে আঙ্গুল ডুবিয়ে চুষে দেখল।তার ভুরু কুঁচকে গেল।স্বাদটা চেখে তার সন্দেহ জাগল।

-কেবল ওইটুকুই?সত্যি কথা বল।

-নাউ! নাউ!ইউ আর প্লেয়িং অ্যা গুচবেরী।

-আই ডোন্ট কেয়ার।

-লুক এট হার।জংঘলী ইজ নো লঙ্গার অ্যা লীনিং টাউয়ার,ফ্রেণ্ডজ!

সেমিস্টার ব্রেকে বাড়িতেগিয়ে চায়ের আড্ডায় বসে সে জ্যেঠিমাকে এই অভিজ্ঞতার কথা না বলে পারল না।মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে না পারা কথাগুলি সে জ্যেঠিমার সঙ্গে বন্ধু্র মতো শেয়ার করে নিতে পারে।এবারই কিন্তু তার হাতের কুঠার পায়ে মারার মতো হল।

জ্যাঠিমারা সবাই ইষ্টদেবতার নাম নিল।

ছেলে অরুণকে যা-তা ভাবে গালিগালাজ করলেন। বাড়ির মেয়ের পড়াশোনার জন্য সে আর জায়গা খুঁজে পেল না। এখন মেয়ে যেসব কথা বলছে,মেয়েরা সেখানে আর বেশিদিন টিকবে না বলেই মনে হচ্ছে।

আমি কোথায় গিয়ে মরব? তোকে নাগিনী মেয়েরা যাদু করেছে নাকি? নেশা করতেও শিখে গেলি।না বলেছি যখন আর যেতে পারবি না।আমি একে,অরুণকে মজা দেখাচ্ছি দাঁড়া। এইসবই পড়াশোনা করেছিস নাকি?

চায়ের আড্ডা শেষ হতে তার মা ঠিক সেই সময়েই চলে এল।সে জ্যাঠিমাকে থামার জন্য ইশারায় জানাল।তৃতীয়পক্ষকে যেন এর মধ্যে ঢুকতে দেওয়া না হয়। এসব দুজনের মধ্যে কথা।জিজ্ঞেস করেও কারও কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে মা পেছনের পাম্পকলটার পারে থালা বাসন নিয়ে মাজতে বসল।বনশ্রী জ্যেঠিমার উদ্দেশ্যে চোখের ইশারা করল।

জ্যেঠিমা এবং তার মধ্যে কাউকেই এই গোপনীয়তার ভাগ বনশ্রী নাকি দিতে চায় না। আর নিজে করা বশ করার মন্ত্র সে কি ভুলে গেছে?পানীটেঙার বশীকরণ!

আজ ডাইনিং টেবিলের চারজনের কাছে দেবাহুতি হাতে থালা নিয়ে উঠে এসেছে।বনশ্রীর দাদা আজ এসেছে যখন উপকরণের কিছু না কিছু ভাগ সেও পাবে।বিশেষ করেস্ল্যাপিং চাটনি বড় উপাদেয়।

--দাদা আর কী কী এনেছে ,পরে রুমে গিয়ে খবর নেব। এখন অল্প স্ল্যাপিং চাটনি একটু দে।

বনশ্রী এতক্ষণে খেয়াল করল দাদার হাতে বাড়ি থেকে আজ কিছুই পাঠাল না দেখছি।জ্যেঠিমা যে কিছু একটা বেঁধে পাঠায় নি সেটা আজই প্রথম হল।

আশা দেবাহুতিকে বিমুখ করল না।চড়মারা চাটনি না পেলেও আশার শুকনো আচারে দেবাহুতি ভাত বেশ স্বাদ করেই খেল।

হাত ধোয়া বেসিনের লাইনটা থেকেই দেবাহুতি চারপাশে তাকাল।কলাপী আছে নাকি? নেই।মুখ ধুতে ধুতেই সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বনশ্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

--তোর দাদা কল্যাণী দিদিদের বয়সের হবে নাকি? এখানেই পড়াশোনা করেছিল নাকি,নেহুতে?

--না,দাদা পিজি করেনি।হ্যাঁ,বোধহয় কল্যাণী দিদিদের বয়সীই হবে।কেন জিজ্ঞেস করলি,দেবাহুতি?

ক্রীন’ই ইতিমধ্যে দেবাহুতিকে টানতে টানতে টিভির ঘরে নিয়ে গেল।মীম’ই চেঁচামিচি শুরু করল।অনেক কাজ বাকি।এখানে আড্ডা মারতে বসলে রাত দুপুর হয়ে যাবে।

--গ্রেস আমাদের একটা কাজ দিয়েছে,ভুলে গেলি!

ভুলি নি।গ্রেস খোঁজ করছে,বোর্ডারদের নাম,স্থায়ী ঠিকানা এবং জন্মদিন।কেউ সংগ্রহ করে দিলে বড় উপকার হয়।গ্রেসের নিজের সময়ের বড় টানাটানি চলছে।ডিপার্টমেন্টেরো অনেক কাজ।এখান থেকে গিয়ে সে বাইরে বাইরে শ্রীহরিকোটাত কনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক হয়ে যোগদান করবে।বনশ্রীরা ছোট মেয়ে।এই নাম ঠিকানাগুলি সংগ্রহ করে দিতে পারবে না কি?সবাইকে মনে থাকবে।সময় বুঝে কারও জুন্মদিনে যাতে শুভেচ্ছা জানিয়ে হোস্টেলের স্মৃতি জাগিয়ে আনন্দ দিতে পারে ,সেইজন্যই গ্রেসের দরকার জন্ম তারিখগুলির।

বনশ্রী এবং মীম’তৎক্ষণাত রাজি হয়ে গেছে।গ্রেস কাজে কর্মেও গ্রেস।তার অনুরোধ কে ফেলতে পারবে।

আর গ্রেস ফার্ণাণ্ডেজ যাওয়া মানেই ডঃঝুনঝাপ্পার মিনিয়েচার ইণ্ডিয়ার খুঁটি নড়বড়ে হয়ে যাওয়া।অন্তত ঝুনঝাপ্পা সেভাবেই বলেন।এইধরনের একজন নিরীহ,কর্মী এবং অনুগত মেয়ে সে কোথাও খুঁজে পাবে না—সেটা ঝুনঝাপ্পা আজকের তারিখে লিখে দিতেও প্রস্তুত।

এই ধরনের মুক্ত পক্ষ্পাতদুষ্ট মন্তব্য হজম করে থাকার সময় বোর্ডাররা সামান্য আহত হয় না যে তা নয়।কিন্তু গ্রেসের বিদায়ের মন খারাপের ভাব সেই বেদনাকে নিষ্প্রভ করেছে।বনশ্রী এবং মীম’ই ক্লাস থেকে আসার সময়েই সুদৃশ্য একটা অটোগ্রাফ কিনে এনেছে। রুমে রুমে গিয়ে দুজনেই বোর্ডারদের নাম ঠিকানা ,জন্ম তারিখ গোটা গোটা অক্ষরে গ্রেসকে দেবার জন্য তাতে লিখে নিচ্ছে।প্রতিটি রুমে বোর্ডাররা গ্রেসকে স্মৃতিস্বরূপ কী দেওয়া যায়,সেই চিন্তায় ব্যস্ত রয়েছে।

কলাপী গ্রেসকে দেবার জন্য একটা ব্লাউজ সেলাই করে এনেছে।মীম’এবং বনশ্রীকে দেখাল।গ্রেসকে মানাবে কি?আজ কলাপী দেখছি দুর্গের মধ্যে নিজেকে বন্দি করে রাখে নি।

বনশ্রীরা নিজেদের কাজের কথায় এল।কলাপীর ঠিকানা চাইল।কল্যাণী হোস্টেলের ঠিকানা দিয়েছে।কেন?দেখা যাক,গ্রেসের চিঠি বা শুভেচ্ছা দেওয়ার অবকাশ থাকা সময় পর্যন্ত কলাপী হোস্টেলেই আছে।আর জন্মদিন?

--আমার নামের নিচে রী-বার্থডে লেখা।বার্থডে নয়।

--কেন কলাপী দিদি,রী-বার্থ ডে মানে কী?

--বিয়ের দিন,বোকা কোথাকার।এখন বার্থ ডে’র চেয়েও রী-বার্থ ডে কে আমাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

মীম’এবং বনশ্রী কলাপীর রুম থেকে বেরিয়ে এল।গ্রেস যেহেতু প্রীফেক্ট ছিলেন,তাছাড়া গবেষণা সম্পন্ন করেই সম্মানিত রিসার্চ সেন্টারে কাজে যোগদান করার আমন্ত্রণও পেয়েছে,বিদায় উৎসবটা হোস্টেলটা অতিশয় আগ্রহের সঙ্গেআয়োজন করবে বলে ঠিক করেছে।ঝুনঝাপ্পা বিদায় ভোজের জোগাড়টা দেবেন।মেয়েরা বিদায় মিটিং এবং ভোজের জন্য ডাইনিং হল এবং মিটিং রুম আধুনিকভাবে সাজাবে।

আবাসিনীরা নাম-ঠিকানা,জমদিন সংগ্রহ করে বনশ্রী রুমে ঢুকল।তেজীমলা বিছানায় শুয়ে শুয়ে পকেট রেডিওটা ঘুরিয়ে চলেছে।বনশ্রী চলে আসায় রেডিও বন্ধ করে কথা বলার জন্য বসে নিল।

করিডরে মীম’কে একা যেতে দেখে দেবাহুতি টিভি রুম থেকেএক দৌড়ে চলে এল।পেছেন পেছন ক্রীন’।তিনজন এক সঙ্গে খেয়ে দ্রুত লেবেল ফ্লোরের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে পৌছাল।দেবাহুতিকে অত্যন্ত উত্তেজিত দেখা গেল।

--আমি শপথ খেয়ে বলছি,ওটা বনশ্রীর দাদা।কলাপীর সঙ্গে একদিন দেখলাম বায়োফিজিক্সের হেলানো রাস্তায়।সেদিন সে বনশ্রীর সঙ্গে দেখা করেনি। দাদা এলে তার আনন্দের সীমা থাকে না।সেদিন আমি ধরতে পারিনি।আজ দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। সেই।আর আজ সে সকালে কেবল বনশ্রীর সঙ্গে দেখা করে গেল।কলাপী তো তখন হোস্টেলে।

সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে দেবাহুতি নিঃশ্বাস ফেলার অবসর না নিয়ে বলে গেল।মীম’এবং ক্রীম’এর মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হল না।জংঘলীকে যে এত ভালোবাসে দাদা আসবে আর তার সঙ্গে দেখা করবে না ? কল্যাণীর সঙ্গে যদি বন্ধুত্ব থেকে থাকে ,থাক।বেশ কথা।কিন্তু আজ সকালবেলা এসে কেবল জংঘলীর সঙ্গেই দেখা করল যে! কলাপী তো বাইরেই বের হল না।মীমের মতো ক্রীন ও ভাবল যদিও কী বলবে ভেবে পেল না।দুজনেই দেবাহুতির কথার নীরব শ্রোতা হয়ে রইল। দেবাহুতি ডাইনিং হলে জংঘলীকে একবার অদ্ভুত কিছু একটা জিজ্ঞেস করছে।বেচারা জংঘলী,আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না।

--সোজাসুজি বনশ্রীকে অদ্ভুত কথাটা বলব নাকি?

উত্তরে এক ধাক্কায় একদিকে মীম’এবং অন্যদিকে ক্রীন’ দেবাহুতিকে ধরে টেনে হিঁচড়ে তাকে নিজের রুমে ঠেলে দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল।দেবাহুতির মুখ বন্ধ করেই দুজনে মুক্তভাবে নিঃশ্বাস নিল। তার দাদা এসেছিল এবং কী বিচিত্র কারণে তার সঙ্গে দেখা করল না—এসব বিচিত্র লুকোচুরির পাক দেখিয়ে বেচারী জংঘলীটাকে চিন্তায় ফেলার কোনো বাসনা নেই মীম বা ক্রীনের।