শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

আকনবিন্ধীর সোনাপোকা,-- জ

(জ)

5f3009f2b8e60.jpg

‘ক্ষুদ্র ভারতবর্ষের’নক্সা নির্মাতা ডঃঝুনঝাপ্পা আজ ‘মাথা গুনতির’পরে সচরাচর করার মতো ঘরগুলিতে অকস্মাৎ উঁকি দিয়ে দেখার লক্ষণ দেখালেন না। প্রদেশ এবং বিভাগকে আধার করে তিনি মানচিত্র ঠিকই তৈ্রি করেন।কিন্তু এদিক ওদিক থেকে খবর পাওয়া মতে মেয়েদের কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে অদল বদল করে নেয়,তাই তাকে আকস্মিকভাবে উঁকি দিয়ে যাওয়ার নিয়ম চালু করতে হয়েছে।ঝুনঝাপ্পার প্রকৃ্তির সঙ্গে পরিচিত হলে আবাসীরা নিশ্চয় এই ধরনের দুঃসাহস করবে না।পাহাড়িয়া রাজ্য কয়েকটির মেয়েদের নিয়ে তার ততটা দুর্ভাবনা নেই। উড়িয়া ছাত্রীদের তিনি দেখেছেন যে এক রুমে থাকতে না দিলে দ্বিতীয় একটা শর্ত তুলে ধরে।যে ফ্লোরে বেশি উড়িয়া মেয়ে আছে তারই একটা রুম দেবেন নাকি ম্যাডাম,প্লীজ! ঝুনঝাপ্পার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়। এই ধরনের মানসিকতা কেন?

অসমের কথাটা আলাদা।বোর্ডার চাক বা না চাক,দুজন অসমিয়া ছাত্রী যাতে যেন একই রুমে থাকতে না পারে সেদিকে ঝুনঝাপ্পার তীক্ষ্ন দৃষ্টি।তিনি শুনেছেন যে অসম আন্দোলনের জন্ম নাকি এই ধরনের ছাত্রাবাসেই।আন্দোলন করে বিদেশিদের তাড়ায় যদি তাড়াক। ঝুনঝাপ্পা খুশিই হবেন।কিন্তু বিদেশি তাড়ানোর যখন তখন অসম বন্ধ দিয়ে স্বদেশের রাস্তাঘাট বন্ধ করে নিজেদের মানুষকে হয়রানি করার অর্থটা তিনি বুঝতে পারেন না।

দেশের এই প্রান্তে ঝুনঝাপ্পার অসুস্থ মা-বাবা থাকেন,শ্বশুর-দেওররা থাকে।যখন তখন তাকে যেতে হয়।চাকরির খাতিরে বাইরে থাকতে না হলে সবাই এক সঙ্গে থাকতেন।সবাই এক সঙ্গে থাকলে,কে জানে—আজ তার ছেলের এই শিশুদের মতো আচরণ দেখতে হত না।বারবার যখন তখন বন্ধ ঘোষনা করে গুয়াহাটিতে যাওয়ার পথ বন্ধ করে অসমের ছাত্র সংন্থা অপদস্থ করে।ঝুনঝাপ্পার তো আর উড়োজাহাজ নেই যে উড়ে গিয়ে দেশের সেই প্রান্তে মা বাবার সঙ্গে একবার দেখা করে আসবেন। যেতে হোক বা না হোক,বন্ধের ঘোষণাগুলি ঝুনঝাপ্পার নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণাকে দ্বিগুণ করে।

এই নিরাপত্তাহীনতাই তাকে আজকাল অসমিয়া ছাত্রীদের বিশেষ দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য করেছে।কী ঠিক,এখানেও যদি কোনো হোস্টেলের রুমের ভেতরে রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে মেতে উঠে।

সুখের কথা যে মেঘালয়ে বন্ধের কোনো ছোঁয়াচে রোগ শুরু হয়নি। বিদেশি তাড়ানোর ঢেউ যে এখানে কাউকে স্পর্শ করে না তা কিন্তু নয়।শিলং শহরে দুয়েকদিন এই ধরনের একটা হইচই সৃষ্টি হয়েছিল।হঠাৎ হুড়মুড় করে দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল।ট্যাক্সিগুলো শহর থেকে উধাও হয়ে গেল।ছাত্রীরা ভেতরের রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে হোস্টেলে এসে পৌছাল।পরের দিন সব কিছু স্বাভাবিক। উড়ো খবর নাকি !পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের একটা বাতাবরণ। শিলং শহরটা স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকে। কিন্তু ভেতরের অঞ্চলগুলোতে উড়ো খবর ছড়ানোয় ভিন্ন রূপ লাভ করে। নন-খাসি লোক দেখলেই নাকি ‘দখার দখার’বলে চিৎকার করে ভিড় করে,আঙ্গুলের ইশারায় দেখিয়ে দেয়।পরম ঘৃণার সঙ্গে ব্যবহার করে।ভদ্রজনোচিত ব্যবহারের জন্য প্রসিদ্ধ খাসিরা এই ধরনের ব্যবহার করতে পারে কি? ডঃঝুনঝাপ্পা ভীষণ উদ্বেগ অনুভব করেন।নন-খাসি মানেই বিদেশি-এই ধরনের ধারণা শিলঙের আশেপাশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

হোস্টেলের আবাসীদের সঙ্গে এই সমস্ত কথা আলোচনা করার আত্মঘাতী প্রবণতা তিনি কখনও দেখান নি। তাঁর বিচারে সবাই সবাইকে জানার সুযোগ লাভ করুক।

সেটা করতে গিয়ে তিনি যে কখনও হোঁচট খাননি তা কিন্তু নয়। শেষের দিকে বনশ্রী নামের আবাসীটি ভি সিকে অভিযোগ করার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।এতখানি পর্যন্ত যাওয়ার মানসিকতার মূলেও তিনি এক ধরনের সংযোগ দেখতে পেয়েছেন।ভি সি ডঃমিরি,সেই কার্যালয়ের অফিসার প্রশান্ত বরুয়া এবং বনশ্রী গগৈ।তিনিও অসমের।

বনশ্রীকে ডেকে নিয়ে তিনি বিষয়টার সেখানেই নিস্পত্তি করে নিলেন।আসলে কাজটা তিনি মোটেই বনশ্রীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য করেন নি। আর মেয়েটিও যে অদল-বদলটুকু অন্যান্য আর দশটি মেয়ের মতো সহজে মেনে নেবে না সেকথা তিনিই বা জানবেন কীভাবে?

ডঃঝুনঝাপ্পা আজ আবাসীদের সঙ্গে নাইট আউট দরখাস্তগুলো দেখতে শুরু করলেন।সকাল থেকে তিনি যেহেতু বিভাগের কাজে ব্যস্ত থাকেন,তাঁর হয়ে দরখাস্তগুলো প্রীফেক্টে রেখে দেওয়াই নিয়ম।সন্ধ্যেবেলা মাথা গুনতির শেষে তিনি কেবল অনুমোদন জানিয়ে ফাইলগুলো গুছিয়ে রাখেন।

আজও গম্ভীর মুখে দরখাস্তগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে ডঃঝুনঝাপ্পা সই করে গেলেন।দরজার সামনে করিডরে দুই একজন এখনও গল্পগুজব করছে।একটা সময়ে তিনি তাদের মধ্য থেকেই কোনো একজনকে য়ীনা ভার্গিজের রুমমেট য়াসীকে ডেকে পাঠাতে বললেন।ডাউন স্টেয়ার থেকে অরুণাচলের ছোটখাট যুবতি য়াসী দৌড়াতে দৌড়াতে ঝুনঝাপ্পার কাছে এসে পৌছাল।

ডঃ ঝুনঝাপ্পা যাসীর উচ্চতার সমান হতে গিয়ে কিছুটা হেলে গেলেন।কণ্ঠস্বরের উচ্চতা এবং স্বরাগম কিন্তু বিন্দুমাত্র কমালেন না।

-তোমাকে কানে কানে একটা কথা বলি,য়াসী।কালকে য়ীনা ভার্গিজকে বল,যে মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হোস্টেলের আত্মীয়ের সঙ্গে সে রাতে থাকতে গেছে,সেই মেডিকেল কলেজের আধারশিলা এখনও স্থাপিত হয়নি।রুমমেট হিসেবে এইটুকু সাহায্য তুমি য়ীনাকে নিশ্চয় করে দেবে।

বিনাদোষে য়াসী অপ্রস্তুত হয়েছে।তার বিকারের দিকে কটাক্ষ না করে ফাইল গুছিয়ে গম্ভীর পদক্ষেপে ওয়ার্ডেন চলে গেছেন।অঙ্কশাস্ত্রে মেডেলের পরে মেডেল জয় করা বরোদার মেধাবী ছাত্রী নাইট আউটের দরখাস্তটির কয়েকটি সারির অঙ্কে এত ব্যাপক ভাবে রদবদল করতে পারে বলে বেচারী য়াসী কীভাবে জানবে?

য়াসী নিজের কপালে একটা থাপ্পড় কষিয়ে নিজের হতাশা ব্যক্ত করল।

বরোদা থেকে জিনিসপত্র সহ প্রথমবারের জন্য শিলং এবং হোস্টেলে আসা য়ীনা ভার্গিজের এখানে আজ পঞ্চম রাত।গণিত শাস্ত্রের কনিষ্ঠা গবেষিকা হিসেবে যোগদান করা আজ তৃতীয় দিন। য়াসীর সঙ্গে এখনও ভালোভাবে কথাই হয়নি।তারমধ্যে য়ীনা জোর করে বরোদার প্রেমিকটি তার পেছন পেছন শিলং এসে পৌছানোর খবরটি সকালবেলা য়াসীর কাছে সরবরাহ করেছিল।ময়ূরভঞ্জ চৌহদে ক্লাসে যাওয়ার দৌড়াদৌড়িতে সময়ও পায়নি ,পরিবেশও পায়নি।য়ীনা নাইট আউট লিখে দিয়ে ততক্ষণে বেরিয়ে পড়েছে,য়াসী ক্লাস থেকে ফিরে এসে কেবল এতটুকুই জানতে পারল।

করিডরের শেষ প্রান্তে প্রিয়া কুলকার্নি ওয়ার্ডেনের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে। সে যে কীভাবে অভিযোগ করবে ,ভাবতে গিয়ে হয়রান হয়ে উঠেছে।তার সমস্যা তাঁর রুমমেট বিন্নী সিং।

বিন্নির বিছানার নিচে চারটার মতো গামলায় সবসময়েই কাপড় ভেজানো থাকে।তা থেকে পচা গন্ধ বের হয়। টেবিলে,বইয়ে মাকড়সার জাল একপাশে বাসি খাবার জিনিসের পচা গন্ধ। হোস্টেলে পা রাখার আজ চার বছর হয়েছে। একটা দিনও এরকম যায়নি যে বিন্নি কাপড় ধোয় নি। চার বছরের মধ্যে এক রাত ও এমন হয়নি যে বিন্নি বিছানার নিচে কাপড় ভিজিয়ে রাখেনি। দুটো হাত অনবরত লেডি ম্যাকবেথের স্টাইলে সাবান মাখায় ব্যস্ত।রিসার্চের কাজ চার বছর ধরে এক জায়গাতেই স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। আরশোলা তার প্রিয় প্রাণী। নিজের মাথার চুলের বেণীটার কার্যকাল এক সপ্তাহ।প্রতি রবিবার খোলে আর বেঁধে রাখে।

‘মাথা গুনতি’র সময়ও সে ওয়ার্ডেনের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে হাত দুটোর ফেনা নিয়ে ব্যস্ত ছিল,আজো।ওয়ার্ডেন কি জানেন না,দেখেন না ? প্রিয়ার ধারণা –সে যেভাবে বিন্নিকে পরিবর্তিত করতে না পেরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ,ওয়ার্ডেনেরও নিশ্চয় সেই একই দশা।

তার হাত এবং বেণী নিয়ে বিন্নি যা করার করুক।কিন্তু বিছানার নিচের খোলা গামলার জলের প্রকোপে ঘরটা বিকৃতভাবে ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে।প্রিয়া আর পারছে না।সে একটা পথ আবিষ্কার করেছে।বিন্নী সিং হাতে ফেনা মেখে হোস্টেলের করিডরে আড্ডা মারার সময় কংদের মাধ্যমে গামলা সহ কাপড় চোপড় আবর্জনা যেখানে ফেলা হয় সেখানে বিসর্জন দেবে।তা করার জন্য ওয়ার্ডেন ঝুনঝাপ্পার সহায়তাই কেবল নয়,অনুমোদনও লাগবে।

ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রীরা কখনও কখনও বিন্নীকে লেডি ম্যাকবেথ আবার কখনও ডিকেন্সের উপন্যাসের মিস হেভিশম নামকরণ করেছেন।নন্দিনীর মতে সে একটা ‘ফ্ল্যাট’চরিত্র।

তাহলে ‘রাউণ্ড’চরিত্র কোনটি?

হোস্টেলের রুমগুলিতে,ডাউন স্টেয়ারের করিডরে,মিটিং রুমের টিভির সামনে আজ সোয়েটার বোনার মাঝে মধ্যে য়ীনা ভার্গিজের নাম উচ্চারিত হল।

ব্যতিক্রম কেবল মায়া এবং পদ্মা।অন্যদিনের মতো আজও মাথা গুণতির পরে দাঁত মেজে তারা রুমের মধ্যে প্রবেশ করল। লাইট বন্ধ।

বিজলিবাতির খরচ কমানোর জন্য কখনও যদি পুরস্কার ঘোষণা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে এই রুমমেট দুটি দাবীদার হতে পারবে।ভোররাতে উঠে দুজনেই ধ্যানমগ্ন যোগীর মতো নিজে নিজের কাজ শুরু করে।পাখির মতো আহার করে।একটি মাত্র কাজেই দুজনের মধ্যে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। বিকেলে ডন এলে দুজনেই তার সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে যায়।পদ্মা হাই এবং বাই করে ফিরে আসে।মায়া ডণের সঙ্গে ঘাসে বসে পড়ে।

পরের দিন য়ীনা ভার্গিজ হোস্টেলে ফিরে এল।‘মাথা গুণতি’র পরে ওয়ার্ডেন গতকালের কোনো প্রসঙ্গ উল্লেখ করাতো দূরের কথা মনে থাকারও কোনো লক্ষণ দেখালেন না।য়াসী দরজা বন্ধ করে য়ীনাকে ধমকাল না তিরস্কার করল না মুখে কাপড় চাপা দিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ল ,কেউ জানতে পারল না।

পূব থেকে পশ্চিমে,উত্তর থেকে দক্ষিণে ভারতবর্ষকে প্রতিনিধিত্ব করা ডঃঝুনঝাপ্পার হোস্টেল এভাবে কখনও সজীব,কখনও নির্জীব ,কখনও সরস,কখনও বিমর্ষ হয়ে থাকল।

তিন তলার বিশাল হোস্টেল ঘরটার একটা তলা ডাউন স্টেয়ারে।বাকি দুটো লেভেল এবং আপস্টেয়ার । বিশাল ঘরটা ভারতের প্রতিটি প্রান্ত থেকে আসা কনিষ্ঠা এবং জ্যেষ্ঠা গবেষিকা দখল করে থাকে।বাকি থাকা রুমগুলিতে স্নাতকোত্তর ছাত্রীরা জায়গা পায়।বিজনী হোস্টেলে মূলত যে গবেষিকাদের হোস্টেল সে কথা বারবার মনে করিয়ে দেওয়াটা ঝুনঝাপ্পার কার্যসূচির মধ্যে পড়ে। তাই পিজির ছাত্রীদের ওজর আপত্তিকে তিনি খুব একটা গুরুত্ব দেন না। সেটা প্রিয়া কুলকার্নির তিক্ত-কষাই হোক বা বনশ্রী গগৈর লটিঘটিই হোক।

গবেষিকাদের সঙ্গে ঝুনঝাপ্পার ঘরোয়া সম্পর্ক গড়ে উঠাই স্বাভাবিক। স্নাতকোত্তরের ছাত্রী দুইবছরের জন্য আসে। গবেষিকাদের সঙ্গে তাঁদের সুদীর্ঘ দিনের স্থায়ী অবস্থান।হাতে সাবান মাখতে থাকলে কী হল,বিন্নীর মতো কোমল হৃদয়ের মেয়ে কতজন আছে? হোস্টেলের কোনো ছাত্রী আর্থিক অসুবিধার কথা শোনা মাত্র সাহায্য করার জন্য বিন্নী সিং দৌড়ে যাবে। গবেষণা কেন সময় মতো শেষ হচ্ছে না,সেটা বিন্নী এবং তার গাইডের কথা।প্রতিটি বিভাগের ভেতরের কথা জানার জন্য ঝুনঝাপ্পার সময়ও নেই,আগ্রহ ও নেই।

রাঁধুনি কং কিন্তু গবেষিকাদের কাজ-কর্মের ধরন ধারন জানতে আগ্রহী। চারবছর কাছ থেকে দেখে দেখে জানতে চাইনা বললেও অনেক কথা জানা হয়ে যায়। কোন গবেষিকা মনের মতো চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত এখানেই স্কলারশিপটা নিয়ে যাচ্ছে,কার কাছে পিএইচডি চাকরির জন্য অপরিহার্য, গবেষণায় কার নেশা রয়েছে-সবই কঙের জানা কথা।

গবেষণা শেষ করে মায়া জার্মানি যাবে। সে যাওয়ার আগেই ডন সিয়েম যাবে।পদ্মা মহীশূরে যাবে।গোয়ার বর্ষা যে কোনো মুহূর্তে গবেষণা ছাড়ার জন্য প্রস্তুত। অ্যান্থনী কুয়েত থেকে আসবে,তাকে নিয়ে যাবে।সে ফিরে আসার ওপরে নির্ভর করছে বর্ষার পড়াশোনা। গোয়ার রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নিয়ে পড়াশোনা করে প্রেম বিবাহ করার জন্য পথ চেয়ে থাকা বর্ষা।তার নিচে আরও দুই বোন।তার প্রেম মা-বাবার জন্য চিন্তার কারণ হওয়া অনুমান করে মাসি তাকে শিলঙে নিয়ে এসেছিল।এন্থনী কুয়েত থাকা আসা পর্যন্ত বর্ষা এখানেই থাকুক।ইতিমধ্যে যদি বাকি দুজনের কিছু সম্বন্ধ আসে হয়ে যাক।মেয়ে পড়ায় খারাপ ছিল না।এমনিতে খবরাখবর নেওয়ার অছিলায় তাকে শিলঙে গবেষণার ক্ষেত্রে নিয়ে এসেছিল।এভাবেই থাকতে থাকতে যদি গবেষণায় নেশা ধরে যায়,যাক। ভীষণ আবেগিক মেয়ে।মাসির সন্দেহ হয়-এন্থনীর সদিচ্ছা এবং আবেগ বর্ষার সমান নাকি? বর্ষার কপালে কী আছে কে জানে? সত্যিই এন্থনি কি আসবে তাকে নিয়ে যেতে? জলীয় সোনায় বন্দি মানুষটা বর্ষার পথ চাওয়ার মর্ম কতটুকু বুঝবে?

কলাপী আচার্যের ইতিহাস এই হোস্টেলে বেশ দীর্ঘ।পিজি করার সময়ও এই হোস্টেলের বাসিন্দা ছিল।থার্ড সেমিস্টারের শেষের দিকে বিয়েতে বসল। ছেলের বাড়িতে নাকি মেয়েমানুষ নেই-ই,বড় তাড়াহুড়ো করে বিয়ে।ফোর্থ সেমিস্টারে মাঝেমধ্যে ক্লাস করে পরীক্ষায় বসল কলাপী।রেজাল্ট বের হল। আর সবাইকে অবাক করে সঙ্গে সঙ্গে কলাপী এম ফিলে নাম লিখিয়ে বিজনী হোস্টেলের রুম দখল করল। এম ফিলের পরে এখন পিএইচডির কাজে কল্যাণী আচার্য একনাগাড়ে লেগে আছে।তাহলে বাড়ির মহিলার খালি জায়গাটার কী ব্যবস্থা হল?

কঙ ভাবে।কারও ব্যক্তিগত খণ্ডে অনধিকার প্রবেশের কৌতূহল দেখায় না।শিবানী দিদির কথা আলাদা।কঙকে ডেকে নিয়ে উপযাচক হয়ে কথার ফোয়ারা ছোটায়,যেন সহপাঠীর সঙ্গে মনের ভাব বিনিময় করছে।মণিপুরের যুবতি লুসি অত্যন্ত হিসেবি।হাসিটা পর্যন্ত।মুখ বন্ধ করে রাখাটা আবার মিজোরামের ধর্ম।তাই টাইট লিপড আইরিনের মনোজগতের তল পাওয়া কঠিন। রুমমেট শিবানী সম্পূর্ণ উল্টো।পুরো মানুষটাই একটা খোলা বই।

আইরিন কার্যত বিরক্ত হয়,শিবানীর খোলামেলা ব্যক্তিত্বের জন্য।শিবানীর মাটিতে ছেঁচড়ে যাওয়া শাড়ির আঁচল আইরিন সেফটী পিন দিয়ে সামলে নেয়।ফাটা চুলের আগাটা শিবানী ঘুমিয়ে পড়লেই মনে মনে কেটে নিয়ে গর্তে ফেলার সুযোগ খুঁজে। শিবানীর মাথায় মাখানো লক্ষ্মী্বিলাস তেল না কুসুম তেলের গন্ধ আইরিনকে বিরক্ত করে।

ওদের লেবেল ফ্লোরের দুজনের ঘর।রুমের দুপাশের দরজা্র ভেতর দিকে বিচিত্র শোভা-কাম-বৈপরীত্য।শিবানীর খাটের দিকের দরজায় একটা মাকালীর ফোটো।আইরিনের দিকের পাটে হাতে তোলা সুন্দর কাপড়ের জুতোর পকেট।দুজনেই চিন্তাভাবনা করে নিজের নিজের দিকের সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করে, ঐকান্তিকভাবে স্পর্শ করে।বোর্ডাররা এই দরজাকে ধর্মনিরপেক্ষতার চূড়ান্ত নিদর্শন বলে ঘোষণা করে।আইরিন বা শিবানীর এই নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই।

-বাড়ির খবর কি কং? কেমন আছ? শিবানী কঙকে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করে।

-ফাইন শিবানী।হাউ ইজ ইয়োর টাইগার রাইডিং?কঙ সমান আন্তরিকতার সঙ্গে শিবানীর সংসারের কথা জিজ্ঞেস করে।

রান্নাঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দুজনেই কিছু সময় পরস্পরের টাইগার রাইডিং অর্থাৎ সংসার যাত্রার বৃত্তান্ত অন্তরঙ্গতার সঙ্গে শুনতে থাকে।শিলচরের শিবানী কিছুদিন আগে বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে।শাশুড়ি খুবই অসন্তুষ্ট। বৌমা যে পণ্ডিতগিরি করে শিলঙে আরামে দিন কাটাচ্ছে,এদিকে তাঁর ছেলের সংসারের হাল ধরে কে?ছেলে চাকরি করছে,সাত বছরের মেয়েটিকে লালন পালন করছে। বৌমা যে সমস্ত কাজ করার কথা সে সবই ছেলে সামলাচ্ছে।এসব দেখে শুনে শাশুড়ি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়েছেন।একটা সময়ে বৌমা বাড়ির সামনে কলেজে চাকরি করে পাকঘর ও সামলাত। এখন স্বামীর সেবা আর মেয়েকে দেখাশোনা করা উচিত ছিল। ডক্টরেট না হয়ে অদরকারী কাজের সঙ্গী হল। তার ছেলের কপালে কি এটাই লেখা ছিল? মানুষের ছেলেরা যৌতুকে কি পায় আর আমার ছেলে এই পেল।

মা আবোল তাবোল বকতে থাকলেও দেবু মুখ দিয়ে টু শব্দ করে না।সেই সময়ে সে যেন মায়ের ছেলে নয়,শিবানীর স্বামীও নয়।

আর কঙের খবর?আফিঙখোর সেলিম ঠিক আছে তো?

ঠিকই আছে।মেয়ে বিদাবুন বড় হয়েছে।যা দেখা যাচ্ছে ডনবকল্যাং নামের যুবকটি শীঘ্রই বিদাবুনকে আপন করে নেবে।সে মোটর পার্টস এর দোকানে কাজ করে । খ্রিস্টান ছেলে। সেলিম ঈদে যায়।কঙ?কঙ হিন্দু।বিদাবুন কী করবে? সে সব যে কী হবে। মোটকথা সেলিম আবার আফিঙের নেশা না ধরলেই হয়।তার কাঠের দোকানটা,কঙের হোস্টেলের রাঁধুনির চাকরি,বিদাবুনের বিউটি পার্লারের কাজ যদি ঠিকঠাক চলতে থাকে কঙের জন্য সেটাই বড় সৌভাগ্য বলে বিবেচিত হবে।পেটের দুমুঠো ভাত জোগাড় করার চেয়ে বড় ধর্ম কঙের চাই না।

তার মাঝখানে একটা কথা নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।এক নাম্বার চৌহদের মতো যদি বিজনী চৌহদ উমছিঙে চলে যায়? কঙের খুব অসুবিধা হয়ে যাবে না।ছেলে শ্যেন স্কেলেমের পড়াশোনায় এখন পর্যন্ত মতিগতি ঠিকই আছে। স্থায়ী চৌহদে কঙকে চলে যেতে হলে তারও সঙ্গী সাথীদের মধ্যে পরিবর্তন আসবে। এটাই ভয়ের। মোটের ওপরে বাইরে বাইরে ঠিক বলে বললেও ভেতরে শান্তি কোথায়?

কথায় অংশগ্রহণ করার জন্য ডাইনিং হলের বার্নারে চায়ের জল বসিয়ে দিয়ে কলাপী ওদের কাছে এসে দাঁড়াল। কঙ এবং শিবানীর বিশ্বাস এই সমস্ত কথা কলাপী বুঝতে পারবে না। এখন হাঁটু পর্যন্ত জলের আভাসটা কেবল পেয়েছে।সারা শরীরের কাপড় ভিজলে টের পাবে বোঝা কতটা ভারী।

ঝাল লাগাটাই লঙ্কার ধর্ম,মহিলারা।মাত্র কোনোটা বেশি ঝাল,কোনোটা কম ঝাল।লঙ্কা থেকে ঝালকে দূরে রাখা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার পক্ষেও সম্ভব নয়। এই নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা এবং শুকনো বালি ভেজানো একই কথা।

পুরুষ সম্পর্কে এই ধরনের ব্যাখায় কঙ বেশ মজা পেল।আনন্দে হাঁচটি খুলে দুজনকেই একটা করে কুবাই উপহার দিল।গ্যাস বার্ণারটা বন্ধ করার সময় কলাপী নিজের বলা কথাগুলোই আবার মনে মনে আলোচনা করল।কখনও কখনও মুখ দিয়ে এই সমস্ত কথা হঠাৎ বের হয়ে যায়,যার তাৎপর্য পরে উপলদ্ধি করা যায়।

শিবানী কিছু মনে করেনি তো!

করিডরে আঁচল লুটিয়ে শিবানী নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।কারও ব্যক্তিগত খণ্ডে বিচরণ করলেও মন্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকাই সু-সম্পর্ক বজায় রাখার গুপ্ত রহস্য।কং বা কল্যাণী দুজনেই জানে।

এর মধ্যে কলাপীর কথাগুলো শিবানীর বড় যথাযথ বলে মনে হল।

-আসলে শিবানী,বন্ধন এবং দাসত্ব একই সুরের।স্বীকার করা বা না করার ওপরে তার কার্যকারিতা নির্ভর করে।

শিবানী নিজের বিছানায় বসল।মেয়ে টুকি এখন নিজের কাজকর্ম গুলো করে নিতে পারার মতো হয়েছে।দেবুর সত্যিই ঘর-দুয়ার সামলানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে নাকি? সে যখন পিএইচডির কাজে গুয়াহাটিতে মাকোঁর মতো যাওয়া আসা করছিল ,তখন টুকি একেবারেই ছোট,তিন বছরের শিশু মাত্র।সেই সময়ে চাকরি,সংসার এবং শাশুড়ির সেবা সবই তাকে করতে হয়েছিল।অত্যন্ত সহজ কথা। তাকে অবসর দিলে তবেই সে কাজটা তাড়াতাড়ি করতে পারবে।সেই সময়ে দেবুর মনে এই ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল কি? শাশুড়ি নিজের ছেলের কষ্ট দেখে তার উচ্চাকাঙ্খাকে দায়ী করেছে। তাই শাশুড়ির কথা হয়তো ধরল না। কিন্তু তবু শিবানীর এরকম মনে হয় –সে যেন দেবুর মৌন সহযোগিতাটুকুও পায় নি। মায়ের অগোচরে হলেও সে তো একদিন বলতে পারত আমি সংসার দেখব,তুমি আগে তোমার গবেষণাটা শেষ কর,শিবানী।

ঘর-সংসার,চাকরি-বাকরি,গবেষণা সব জট পাকিয়ে যায়।মাথার চুলের জন্য নয়,সে তালু শান্ত রাখার জন্য লক্ষ্নী্বিলাস তেলের বোতলটার দিকে হাত বাড়াল।

চিন্তা নেই,আইরিন এই অসময়ে ঘুমে বিভোর।

ধীরে ধীরে রুমের দরজাটা খুলে গেল।

হাতের চায়ের কাপটা কল্যাণী তাকে বিছানাতেই দিয়ে গেল।

চায়ের কাপে চুমুক দিল যদিও কঙের প্রশ্নটাই শিবানীর কানের পর্দায় পুনরায় ধ্বনিত হলঃ হাউ ইজ ইয়োর টাইগার রাইডিং?


চলবে ...