শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

আকনবিন্ধীর সোনাপোকা,-- ছ

(ছ)

এক নাম্বার চৌহদের মনের মিল থাকা কয়েকটি বিভাগ আজ এক সঙ্গে বনভোজের আয়োজন করেছে।পাহাড়িয়া শহরটি থেকে দূরের বিস্তীর্ণ সবুজের মধ্যে সারা দিনের জন্য ওরা আজ আনন্দের হাট বসাবে।মাঠের পাশে ছবির মতো মনে হওয়া সুন্দর বনানিতে তেজপুরের স্মৃতি নরবেক এবং পঞ্জাবের রবিন্দর কৌর দুই মাথায় ধরে বিছানার চাদরটা বিছিয়ে দিল।

বাস থেকে রান্নার সরঞ্জামগুলি হাতে হাতে নামাতে থাকা দলটাকে গোলাঘাটের মিরাণ্ডা ভার্গিজ ইচ্ছেমতো অশ্লীল কথা-বার্তা বলে নিষিদ্ধ মনোরঞ্জন জুগিয়ে চলেছে।

দূরের ঝর্ণাটার বিশাল পাথরটায় বসে বনিতা গোস্বামী মাছগুলি ধুতে ধুতে সাদা কাগজের মতো করে ফেলেছে।তাকে কাটা মাছের পেট পরিষ্কার করতে দেখে মিজো যুবক ডিউক এবং শিলচরের মৃগাঙ্ক তার দেহের বন্দনা করছে।বনিতা গুরুত্ব দিচ্ছে না।গোটা ব্যাপারটাতে বনিতার চেয়ে বেশি রসাস্বাদন করছে এলি আহমেদ।

ঠিক তখনই রাজস্থানী কাজ করা পাটকাপড়ের দীর্ঘ স্কার্ট নাড়িয়ে আঙ্গীরা এক লাফে ঝর্ণার মাঝখানে এসে উপস্থিত হল।

তা দেখে ডিউকের বনিতা ধ্যান ভাঙল।সে তখনই আঙ্গীরার দিকে ঘুরে বসল।শিলঙ থেকে এখানে আসার পুরো রাস্তাটাই সে গিলতে গিলতে এসেছে।এখন পর্যন্ত যে কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থায় রয়েছে,সেটাই আশ্চর্য।

আঙ্গীরা অপরিচিত মানুষ দেখার মতো তাঁর দিকে তাকাল।মুখে কিছুই বলল না।তার পাশ দিয়েই মাছের ডোলাটা নিয়ে পার হয়ে যাবার সময় তার মি’রের কাজ করা স্কার্টটার আলো তার মুখে পড়ল।রাজস্থানী আয়নার শিল্পের এই ধরনের মহিমা যে চোখ দুটি বন্ধ করে নিল।

ঋজুদেহী আঙ্গীরাকে সবাই ক্লাসিক বিউটি বলে ডাকে।একেবারে গ্রিক ভাস্কর্যের মতো দেখতে।মুখাবয়বে শান্ত অভিব্যক্তি।সে আজ রেশমি কালো চুলে মুখটাকে সামান্য আড়াল করে রেখেছে।

উনুনের পাশে মাছটা রেখে সে পুনরায় ঝর্ণাটার দিকে এগিয়ে গেল।এইবার ডিউকরা যেদিকে বসেছিল সেদিকে না গিয়ে সামান্য এগিয়ে গেল।মাছের গন্ধ দূর করার জন্য ফেনিল হাত দুটো বারবার ধুয়ে নিল।ফিরে আসার সময় সে পাথরে পাথরে আরও দু পা এগিয়ে গেল।বিকেন শর্মা,মিপুন এবং আরও দুজন সেখানে বসে সিগারেট টানছে।খালি পায়ে পাথর টপকে টপকে এসে সে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল।

কোনদিক দিয়ে গেলে সহজ হবে?

বিকেন শর্মা আঙ্গীরাকে সাহায্য করার জন্য তার হাতটা এগিয়ে দিল।ইতিমধ্যে সে তীরে পৌছে গেছে,কোনো দরকারই ছিল না,তবু আঙ্গীরা বিকেনের হাতটা খামচে ধরেছে।এই ধরনের এক নিবেদনের ভঙ্গিমাটিতে ত্বরান্বিত হয়েছে যেন তার হাত ধরেই এতদিন সে পথ হেঁটেছে।

বিকেন শর্মা সামান্য অবাক হয়েছে।সে ভদ্রোচিত সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল।সে অবলম্বনের মতো তাকে মান্যতা প্রদান করেছে।কথাটা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে অবাক হওয়ার চেয়ে বেশি কৃ্তার্থ হয়েছে। আঙ্গীরা তার হাত ধরে আরও একটা লাফ দিয়ে তার চেয়ে এগিয়ে গিয়ে চলে গেল।একবার তার দিকে ফিরে তাকাল।শান্ত এবং প্রগাঢ় তার মুখশ্রী।

গ্রিক দেবীর আজ কি মৌ্নব্রত?সে মুখ দিয়ে ধন্যবাদ সূচক একটা শব্দও উচ্চারণ করল না।কিছুই খারাপ হয়নি।তারচেয়ে এই যে সে একবার ঘুরে তাকাল,হাতটা সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টায় বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে তার হাতের তালুতে ভর দয়ে চলে গেল-কোনো শব্দের সেই মহিমা প্রকাশের ক্ষমতা আছে কি?শব্দের পূজারী বিকেন শর্মা শব্দের দুর্বলতা আবিষ্কার করতে শুরু করল কি?

দূরের বনানি,একপাশের ঝর্ণা,ঝর্ণার ওপারের গভীর অরণ্য,অরণ্যের ওপারে ঢেউ খেলা ছবির মতো উঁচু-নিচু আরও অনেক অরণ্যানি,তার শেষে ছবির মতো নীল আকাশ।

এই একটি জীবন্ত পটভূমিতে কয়েকটি সচল বিন্দুর মতো বনভোজের দলটির সদস্যরা টগবগিয়ে এদিক ওদিক করতে থাকল।

একটি ব্যাপক ক্যানভাস।এত রঙের সমারোহ।এত সচল চঞ্চল ছবি।

বিশাল বিছানার চাদরটিতে সত্তরের দশকের হিন্দি সিনেমার নায়কের স্টাইলে অর্ধেক গড়িয়ে বসে ঐ যে অধ্যাপক গৌতম লাহিড়ী।হাতে রঙীণ পানীয়।তাকে সঙ্গ দানের জন্য বর্ষীয়ান ডঃ চৌধু্রী নাচতে নাচতে এগিয়ে এলেন।

মিউজিক সিস্টেমতাতে পাহাড়িয়া নদীর চেয়ে খরস্রোতা কী গান বাজছে?

উনুনের পাশে রুমি লস্কর ডালার চালগুলো নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে।একবার ডালাটা তুলতে চেয়ে,একবার চালগুলো মুঠো করে ধরে সে অসহায়ভাবে এদিকে ওদিকে তাকাল।ডালা নামে পদার্থটা নিয়ে এখন সে কী করবে?

উনুনের কাছ থেকে ডঃপ্রীতু লেগীচ ঘটনাটা আড়চোখে লক্ষ্য করছিলেন।তিনি বেশ মজা পেলেন।উনুন ছেড়ে ডালাটির দিকে ডাইনে-বাঁয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে এগিয়ে এলেন।ইতিমধ্যে আঙ্গীরা এসে ডালার পাশে দাঁড়ালেন।সে ডালাতে হাত না দিয়ে চালগুলির মধ্যে বিদেশি দ্রব্যের সন্ধান করতে শুরু করেছে।রুমী তাঁর বাস্তব বুদ্ধির প্রশংসা করল।

-শোন,রূপসি মেয়েরা।এই ধরনের কোমল হাত ডালার জন্য জন্ম হয়নি।দাও,এই কাজটা আমিই করতে পারব।আঙ্গুল দিয়ে খুঁজে খুঁজে তুষ ছাড়ানো যাবে না।

ডঃলেগীচ আঙ্গীরাদের সঙ্গে বসে পড়লেন।মহিলা একটা দাকমাণ্ডা এবং ছোট হাতার মুগারঙের জামা পরেছেন।বাহুর রঙ থেকে মুগার জামাটার রঙ পৃ্থক করাই মুশকিল।দুটিই সোনালি রঙের।বয়স যেন রঙের কারুকার্য দেখে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।

-ম্যাডাম,চাল কী কায়দায় ঝাড়তে হয় আপনি তাও জানেন?-রুমী দোষী দোষী ভাবে বলল।

-জানি মানে?সারা জীবনে বোধহয় আমি এই কাজের বাইরে কোনও কাজই সফলভাবে করতে পারিনি।

ডঃলেগীস ধপাস ধপাস করে চাল ঝাড়তে শুরু করে দিলেন।ছন্দের তালে তালে চালগুলি উপরে উঠল,নিচে পড়ল।মুগা জামাটা বেঁধে রাখতে না পারা লেগীসের শরীরের সুষমা ছন্দোবদ্ধ হয়ে নেচে উঠল।আঙ্গীরা তন্ময় হয়ে দেখতে থাকল।

-সুন্দরী মেয়েটি!আজ এত চুপচাপ!কোনো কথা আছে কি,আঙ্গীরা?

-না,কোনো কথা নেই,এমনিতেই।

-বেশ।রূমী বল।তোমাকে ডিপার্টমেন্টে দেখেছি বলে মনেই পড়ে না।তুমি কী করছ?

-কথাটা সত্যি।পিজি নয়,এয়ারওয়েজ আমার লক্ষ্য।যতদিন পর্যন্ত এয়ার ওয়েজের সংস্থাপন হবে না,পিজির সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করব না। আমি যাতে পরীক্ষা দিতে পারি সেভাবে স্যারের অনুমতি নেওয়া আছে।

-তোমরা আজকের মেয়েরা নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে সুস্থির এবং স্পষ্ট।আমরা কী করব না করব ভাবতে ভাবতেই সময় পার হয়ে গেল।না হলাম ঘরের,না বাইরের।

-একথা কেন বলছেন মেম।আপনি কতজনের কাছে উদাহরণ স্বরূপ।আপনার কোনো দুর্বলতা আমরা কল্পনাই করতে পারি না।

-জানি।পিউপিল ডু নট রেসপেক্ট উইকনেস।আঙ্গীরা,তুমি নিশ্চয় স্কুলজীবনটা কোনও মেথডিকেল হেডমাস্টারের বোর্ডিং স্কুলে কাটিয়ে এসেছ?

-মেম,আপনি কীভাবে জানলেন?

-যাদুমন্ত্র।অভিজ্ঞতার।বুঝেছ,এই বয়সে উপনীত হয়ে উপলদ্ধি করছি যে গন আর দি ডেইজ অফ অলরাউণ্ডার।আমরা অলরাউণ্ডার হওয়ার চেষ্টা করতে করতে সময় পার হয়ে গেল।অল রাউণ্ডার মীনস স্পেসিয়াল ইন নাথিং।

-কিন্তু আপনি তো অলরা্উণ্ডারই।

-মায়েরা,একসেপ্ট ঝারায়িং দি চাল,আমার আর জীবনে কিছুই ভালো করে করা হল না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লেগীস উঠে গেলেন।চাল সামলে রাখলেন।পরের মুহূর্তেই চোখের পলকে সতেজ পদক্ষেপে উনুনের কাছে গিয়ে পৌছালেন। কিছুক্ষণ আগে দেখানো হতাশা অথবা দীর্ঘশ্বাসের বেস্টনি থেকে মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিলেন।

এই সূচক কার্যকে নিশ্চয় ব্যবস্থাপনা শাস্ত্র এনার্জি কাট বলে নামকরণ করেছে।

মেম লেগীসের সঙ্গে একদল গবেষকের জন্মকুণ্ডলি জড়িয়ে রয়েছে।তাঁর বাড়িটাকে প্রতিবেশীরা অনাথালয় বলে নামকরণ করেছে।ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা-ভক্তি করে।সমাজ জীবনে মহিলা একাই একশো জনের সমান।

পাণ্ডিত্য তাকে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় খুচরা পয়সা সন্ধান করার দায়িত্ব দিয়ে সমাজ বিচ্ছিন্ন করেনি।ডঃলেগীস জনপ্রিয়,প্রাণোচ্ছল।সহকর্মীদের মতে ‘বোল্ড এণ্ড বিউটিফুল’।বিরামহীনভাবে তিনি কেবল আদর করেছেন,সামলেছেন,নিজেকে বিলিয়েছেন।

অথচ জীবনে কী করা হল না মেম লেগীসের?

সোনালি বর্ণের মানুষটার কীসের আশা অপূর্ণ থেকে গেল?বিলিয়ে শেষ করতে না পারাও কি এক প্রকারের অপূর্ণ বেদনা?

মহিলাটি পটু এবং অভ্যস্থ হাতে চালটা ধুয়ে নিয়েছেন।নিচের গামলাতে পড়ে থাকা চাল ধোয়া জলটা ফেলার জন্য তিনি এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন।

এই সার থাকা জলটা তিনি কি পাথরের ওপর ফেলতে পারেন?

পেন্সিল হিলের ওপরে মেম লেগীসের আটোঁশাটো শরীরটা এবার ক্ষিপ্র গতিতে বেশ দূরের উইপীং উইলো ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল।দুই হাতে ধরে নেওয়া গামলাটার চাল ধোয়া জল পরম মমতার সঙ্গে তিনি উইপীং উইলো ঝোপের উপরে ঢেলে দিলেন।

মিউজিক সিস্টেমতাতে সিনক্রোনাইজ করে থাকতে থাকতেই গৌতম লাহিড়ি দৃশ্যটা প্রত্যক্ষ করলেন।তিনি ইকবাল আহমেদকে দেখালেন এবং আহমেদ সেই দৃশ্যের দিকে ডঃচৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।হাতে পানীয়ের গ্লাস নিয়ে বর্ষীয়ান চৌধুরী দূর থেকেই সম্মান জানানোর ভঙ্গি করলেন।

ডঃলেগীসে ছাড়া পৃথিবীর কোনো প্রাণী অন্তত পিকনিকে এসে এই ধরনের কাজ করে না।ধন্য,উইপীং উইলো।

বনশ্রী একটা চুলোয় একান্তমনে মুরগির মাংস ভাজতে শুরু করেছে।নোলা সালাডের জোগাড় করছে।বনভোজ তো কী হল?সবগুলি খুব যত্ন করে তৈ্রি করতে হবে।এক এক করে সালাড পাতাগুলি সে বড় কাঁসার পাত্রটিতে রাখতে লাগল।তার ওপরে সাজিয়ে গেল কাঁটা চামচ দিয়ে শশার গোল টুকরো।লম্বা করে কাঁটা গাজর।এরপরে ছিটিয়ে দিল মাখন মাখানো সিদ্ধ আলুর টুকরো,লাল বিট,ভিজিয়ে রাখা গোলাপি ছোলা,আদার টুকরো এবং পদ্মের পাপড়ির মতো অর্ধস্ফূট কাটা পেঁয়াজ।সূঁচলো কাঁচা লঙ্কা গুলি সে শেষ পর্যন্ত ফালা ফালা করে কেটে সালাডের পাত্রটার ওপরে ছিটিয়ে দিল।

কড়াইয়ের নিচে মাংস লেগে যাওয়ার গন্ধটা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।সঙ্গে সঙ্গে খরগোসের মতো দুই লাফে ডঃ জর্জ এসে বনশ্রীর কাছে পৌছাল।কড়াইতে লেগে যাওয়া মাংস নাকি তার খুব প্রিয়।একটু একটু করে তিনি কড়াইর মাংস উদ্ধারের কাজে লেগে গেলেন।বনশ্রী প্লেট জাতীয় কিছু জোগাড় করতে করতে ডঃজর্জ নিজের হাতটাকেই পারলে প্লেটে পরিণত করে নেন।অপেক্ষা করার মতো তার আর ধৈ্র্য নেই।এত সুন্দর গন্ধ!

-জাস্ট ডোন্ট বার্ন ইউর ফিঙ্গার,স্যার।

নোলা ডঃ জর্জকে ছোট বাচ্চার মতো শাসন করল।ক্ষেত্র বিশেষে আনুগত্য।সেকেণ্ড সেমিস্টারের এইটুকু মেয়ের সতর্কীকরণে ডঃজর্জ বাধ্য স্কুলের ছাত্রের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।বনশ্রীর প্লেট উদ্ধার কার্যের অপেক্ষা না করে একটা সালাড পাতায় ডঃজর্জকে কড়াইতে লেগে থাকা মাংস টেস্ট করে দেখার জন্য দিল।

একটা সময়ে বিছানার চাদরে বসে থাকা থেকে ডঃচৌধুরীও উঠে এলেন।দূপুরের আহারাদির কাজের সময় হয়ে আসছে।তিনি কল্যাণীর দিকে লক্ষ্য রেখেছেন। কথা বলছেন কিন্তু ছোট্ট সলোনি,বনিতা এবং কথা বার্তায় চৌকশ ঝুমুর দেবের সঙ্গে।দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটি সেমিনারে যোগ দিয়ে গতরাতে মাত্র ফিরে এসেছেন তিনি

--এসেছি মাত্র।আর আজ সকাল বেলাতেই তোমরা আমাকে কিডন্যাপ করলেই। এসে কিন্তু সত্যিই বড় আনন্দ পেয়েছি।কাল ফেরার সময় গুয়াহাটিতে দেখে আসা একটা দৃশ্য মনটাকে এখন পর্যন্ত বিষাদগ্রস্ত করে রেখেছে

গুয়াহাটি শব্দটা শুনেই কল্যাণীর হাতের কাজ থমকে গেল। প্রত্যেকেই উৎকর্ণ যদিও কল্যাণীর অস্থিরতা চোখে পড়ার মতো।ডঃচৌধুরী কথা বাড়ালেন না।ঝুমুর দেব বেশিক্ষণ চুপ করে বসে থাকার প্রাণী নন। সবার হয়ে সেই জিজ্ঞেস করার জন্য এগিয়ে এল।

--কী দেখলেন স্যার?কোনো দুর্ঘটনা?

- প্রাকৃ্তিক দুর্যোগ বলতে পার।পল্টন বাজারে এক হাঁটু জল।ওটা যখন তখন ঘটা ঘটনা।তবে সেই একটু খানি জলে পড়ে মানুষকে হতবুদ্ধি হতে দেখে এলাম।বেচারা।তোমাদের কাছ থেকে আর গোপন করব না।সেই লোকটি আমাদের প্রত্যেকেরই পরিচিত।বিজনী চৌহদের আবাসে থাকা নবপরিণীতা স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য সপ্তাহের প্রতি শনিবার তিনি গুয়াহাটি আসেন।

সবার সঙ্গে কল্যাণীও সশব্দে হেসে ফেললেন।ডঃচৌধুরী তাহলে তার বিমর্ষ মনটার ভাষা পড়তে পেরেছেন।আজ শনিবার।বনভোজটার আয়োজনের কথা শুনে গত সপ্তাহে এসেই জগদীশ আজ আসবে না বলে স্থির করেছিল।সে তো সবসময়ই আসে।এই সপ্তাহে সে সবার সঙ্গে যাক না।একটা নতুন অভিজ্ঞতা,একটু আলাদা ধরনের একটা শনিবার উপভোগ করার মতো।

ডঃচৌধুরী ইতিমধ্যে বিছানার চাদরের কার্পেটে ফিরে গেছেন।কল্যাণীর নাম ভর্তি করার জন্য এসে মানুষটা তাকে বলে গিয়েছিল তাকে দেখার জন্য।সুদীর্ঘ অধ্যাপনার জীবনে অনেক পিতা মাতা তাকে নিজের ছেলে মেয়ে সমঝে দিয়ে গেছেন।একপ্রকারের আলংকারিক প্রকাশ।কিন্তু স্বামী নবপরিণীতা স্ত্রীকে দেখার জন্য বলে যাওয়া এই প্রথম।ডঃচৌধুরী আশ্চর্য রকম দায়িত্ব অনুভব করেন।নিজের তিন মেয়েও বিদেশে।পুত্র সন্তান তার নেই।যদি থাকত।কল্যাণীর মতো পুত্রবধূ হলে কী অনুভব করতেন।আজ সকাল থেকে মেয়েটিকে সে অন্যমনস্ক দেখছেন বলে মনে হচ্ছে।ডঃচৌধুরী সরে গেলেন আর ঝুমুর দেব কল্যাণীর পেছনে লেগে গেলেন।

তাইতো।আজ তুই বেশি করছিস।কেউ বনভোজনে এসে এভাবে মন খারাপ করে থাকে নাকি?আগামী সপ্তাহে মানুষটার সঙ্গে তো দেখা হবেই।আমি কি তোর কাছে কিছুই নই?

--দূর পাগলী।তুই কী বুঝবি?ঝুমুর,আই মিছ হিম।-

হায়।এত সুন্দরভাবে বললে আমারও কিন্তু খারাপ লেগে যাবে।কল্যাণী,নিশ্চয় তুই নিশ্চয় আমাদের কাছ থেকে কিছু লুকোচ্ছিস।আমাদের বলে দে।মন ভালো হয়ে যাবে।

-- কী লুকিয়ে রেখেছি,তুই বলে দে।

-দেখ,অসমিয়াতে বলে ‘ধানের ক্ষেত আর ছেলে ধারণ করা পেট’-লুকিয়ে রাখা যায় না।’

সবাই হেসে উঠল।কল্যাণী লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।ঝুমুরের কোনো বিকার দেখা গেল না।সে একই কথা বলে যেতে লাগল।কল্যাণী অতিষ্ঠ হল।

-ঝুমুর,প্লীজ! অসমিয়ায় এই ধরনের কোনো কথাই নেই।আর থাকলেও তোকে তার দোহাই দিতে হবে না।এই ধরনের কথা শুনে থাকাই যন্ত্রণা।যা বলার তুই বরং বাংলায় বল।আমরা বুঝতে পারব।

-এসব তোদের আত্মঘাতী কারবার।কোথায় তোদের ভাষাটা বলার জন্য উৎসাহিত করবি,মুখ বন্ধ করে রাখার জন্য সাবধান করছিস।স্ব-ভাষা বিরোধী অভিযান আর কাকে বলে? কল্যাণী সত্যি কথাটা বল তো ,আর ইউ প্রেগন্যান্ট?

কোথা থেকে ছিটকে আসার মতো যুবানিতা য়ার এসে হাজির হল।প্রেগন্যান্ট বোঝানোর জন্য অসমিয়াতে কী কী প্রকাশভঙ্গি আছে?গা-নরিয়া,গা-ভারী ইত্যাদি ইত্যাদি।ডঃয়ার পরম উৎসাহের সঙ্গে শুনলেন,নোটবুকে ইংরেজি সমার্থক প্রকাশভঙ্গি গুলি লিখে নিলেন।

খাসি ভাষায় গর্ভবতীকে বলা হয় ডাবল-বডি।সুন্দর এবং যথার্থ প্রকাশ তাই না?

সবাই সায় দিল-সত্যিই খুব সুন্দর প্রকাশ।

ডিউকদের দলটা গুহায় যাবার জন্য এবার বেরোল।ওরা নাকি চেরাপুঞ্জীর গুহায় ‘পেসেজ টু ইণ্ডিয়া’ মঞ্চস্থ করবে।বিকেন শর্মা ভিড়ের শেষে থেকে গেল।সে আঙ্গীরাকে কিছু একটা বলতে যেতেই মনজিৎ তাকে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে গেল।‘পেসেজ টু ইণ্ডিয়া’মঞ্চস্থ করার জন্য আঙ্গীরা যাবে না,নাযাক।কিন্তু বিকেনকেও তাঁর সঙ্গেসবুজ সমতলে দ্বৈত গান গাওয়ার সুযোগ মনজিৎ নাকি দেবে না। আঙ্গীরা থাকুক বাতাসের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে।বাধ্য হয়ে বিকেন ওদের সঙ্গে গুহাগুলির দিকে এগিয়ে গেল।

বাতাস নয়,বা ড’পেছন থেকে এসে তাকে চমকে দিল।তা দেখে আজ আঙ্গীরা আনন্দ ঢেকে রাখতে পারল না।

-ইউ আর গডসেণ্ড।

-আঃ!পৃথিবীটা এতই বেরসিক হয়ে গেছে যে আমার আদরের বান্ধবীটাকে সঙ্গ দেবার জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।

-বা ড’তোর সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।

-মরেছি।তুই কি আবার প্রপোজ করবি নাকি?আমাকে একজন কবেই পার্টিতে শুয়োরের মাংস রান্না হবে বলে কবেই কথা দিয়ে রেখেছে।সে যদি তোর কথা শুনে ঝাড়ু দিয়ে কোপাবে।বলে রাখলাম কিন্তু তোকে।

-চুপ।এখন কোনো রকম ফাজলামি করবি না।

-বায়োলজিকেল ক্লক আমাকে ঠিকই নির্দেশ দিয়েছে বা ড’তুই যা।আঙ্গীরা নামের মেয়েটি দ্বিধায় পড়েছে।কারণ একটি নিরীহ যুবককে তার মনে ধরেছে।তবে তার সরলতার সুযোগ নিয়ে অন্য কয়েকজন অনবরত তার পিঠে উঠে ঘুরে বেড়ায়।তা দেখে আমাদের আঙ্গীরার কলজে শুকিয়ে গেছে।তুই যা।পারিস যদি একটা সেতু বেঁধে দে।না পারলেও কুয়াশা দূর কর-যাতে আঙ্গীরা পরিষ্কার দেখতে পায়,বাস্তব কি?

আঙ্গীরা সত্যিই লজ্জা পাচ্ছে।বা ড’ই দেখল মেয়েটির গালে অপূর্ব আভা ফুটে উঠেছে।প্রেম মানুষকে এভাবে সৌন্দর্য প্রদান করে?স্বর্গীয় সৌন্দর্য মানে এক ক্ষণে রঙ বদলে যাওয়া এই মেয়েটিই নয় কি?এখানেই প্রেম কেন থমকে দাঁড়ায় না?প্রেম পরিণতি চায়।এই সুন্দর থেকে আরও সুন্দর কিছু।আর কী আশ্চর্য,এই সুন্দরের পাশে পাশেই ওটা ঈর্ষা ,অবিশ্বাস না দ্বন্দ্বের ছায়া?

আয়তলোচনা আঙ্গীরা তার দীর্ঘ চুল সামলে পেছনে একটা খোঁপা বাঁধল।তার দীর্ঘ হালকা আঙ্গুল দশটা চিরুণির কাজ করছে।বা ড’র কাছে মনের কথা বলার জন্য সে যেন মনে মনে বাক্য সাজাচ্ছে।মুখটা মেলতে গিয়ে সে ফুস করে একটা শব্দ করে বন্ধ করে রাখল।হাতের তালুতে থুতনি রেখে সে কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইল।

এমনিতেই তো ট্র্যাজেডির মতো এথনিক শব্দের আজকাল বড় খাপছাড়া এবং জলীয় প্রয়োগ হয়।কিন্তু এই মুহূর্তে আঙ্গীরাকে দেখে বা ড’এথনিক শব্দের অর্থ ভালোভাবে বুঝতে পারল।তাকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে দেখতে দেখে আঙ্গীরা হাসবে হাসবে করছে।গ্রিক দেবীও এভাবে হাসে নাকি?

-আকারটার মতোই তোর নিরাকার মনটাও নিশ্চয় এত সরল এবং সুন্দর।দ্বিধা প্রেমের পথের সহজাত কন্টক,আঙ্গীরা।দেখিস,সব ঠিক হয়ে যাবে।একটা জয়ন্তীয়া লোকগীত শোন।তোর অবস্থার সঙ্গে মিলে যাবে।

A handful rope of gold is wast’d

the night is over long

Beat not about the bush,my friend

by you,who have a wife

A handful of bunch of cut broom–sticks

force of Pangoline hole

with what she baited you,I know

with some old unsold bread

-কথা বলবি না।এটা কীভাবে জয়ন্তীয়া গীত হল।

-ঠিক আছে,জয়ন্তীয়ায় গেয়ে দিচ্ছি তাহলে,বুঝতে পারবি তখন?তুই আমাকে সবচেয়ে ভালো বন্ধু বলে আজীবন মানতে পারিস,তবু আমার ভাষাটা জানার জন্য ইচ্ছা করবি?সেইজন্যই জয়ন্তীয়া গীতের এই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে করা ইংরেজি অনুবাদই শুনে নে।একটি মেয়ে জয়ন্তীয়া যুবককে উদ্দেশ করে বিয়েতে গাওয়া গান এটা।

ছাত্রীদের মধ্যে বসে মৌ-রাণী হয়ে লেগীস নিজের জন্মশহর কোহিমার কথা বলছে।তেজপুরে স্কুলের শিক্ষা এবং কলেজ ইউনিভার্সিটি দিল্লি।চাকরিটাই কেবল শিলঙে।এখান থেকে ওখানে যেতে যেতে এখন শিলঙই ঠিকানা।

-সবচেয়ে নিজের বলে মনে হওয়া জায়গা কোনটা?

-ও,ভাবতে হবে।বোধহয় যা ভালবাসতে চাই তাই।যেখানেই নোঙর ফেলবে সেই জায়গাকেই নিজের বলে আপন করে নেবে।ছেড়ে আসা জায়গার প্রতি মায়া থাকবেই,তা বলে নতুন কে যেন বঞ্চিত কর না।টিপস,গার্লস।

এতক্ষণ ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এদিকে ওদিকে পায়চারি করতে থাকা প্রত্যেকেই বাসগুলির সামনে এসে দাঁড়াল।বনভোজ সমাপ্ত করার সময়।এতক্ষণে সবার চোখে পড়ল যে অখিল পাণিগ্রাহী সপ্তম স্বর্গে বিচরণ করছে।তার আশেপাশে যারা ছিল তারা পাশ কাটাতে শুরু করেছে।তারা আগেভাগে গিয়ে বাসের পেছনের সিটগুলি দখল করে বসল।কল্যাণী আছন্ন অবস্থায় জিনিস পত্রগুলি সামলে সুমলে নিয়ে তদারকি করছে।পাণিগ্রাহী তাকে বারবার উড়ন্ত চুমা দিয়ে যাচ্ছে।কল্যাণী ঘুণাক্ষরেও তার কোনো আভাস পায়নি।তার বায়োলজিকেল ক্লক এই মুহূর্তে নিশ্চয় বিকল হয়ে পড়েছে।

মৌ্নতাকে সম্মতির লক্ষণ ধরে নিয়ে পাণিগ্রাহী চারপেয়ে হয়ে এগিয়ে এল এবং হাঁটুর উচ্চতায় তাকে জাপটে ধরল।

অভাবনীয় পরিস্থিতি।কল্যাণী চিৎকার করে উঠল না বাকি দুজন চিৎকার করে উঠল ,সে পড়ে যাচ্ছিল বলে না কি সে হামাগুড়ি দিয়ে পড়েছিল বলে অন্য কেউ একজন তাকে চট করে ধরে নিয়ে সরিয়ে নিল।

বাসের জানালা দিয়ে ডিউক দেখল যে গুহার অন্ধকারে মঞ্চস্থ না হওয়া ‘পেসেজ টু ইণ্ডিয়া’এখন মুক্ত মঞ্চে অভিনীত হতে চলেছে বলে মনে হল।ছিঃ।সে বড় দুঃখিত অনুভব করল।দুই লাফে সে বাস থেকে নেমে এল।এটা দর্শকের ভূমিকা নিয়ে বসে থাকার সময় নয়।পরিস্থিতি সামলাতে হবে,ফর গুড।

কল্যাণী ঝাঁকা দিয়ে ফেলে দিল না কারও চিৎকারে ছিটকে পড়ল পাণিগ্রাহী?কেউ তাকে তুলে নিতে চাইল না প্রকারান্তরে ফেলে দিল কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।ডিউক এসে তার কাছে পৌছানো পর্যন্ত কেউ একজন জল দিয়ে পাণিগ্রাহীর মাথা আর মুখটা ধুইয়ে দিয়েছে।

এই সময়েতো,তার মাতৃভাষা উড়িয়াতে নিশ্চয় ,সে কল্যাণীর দিকে তাকিয়ে কীসব বলছে। সে ছাড়া এই ভাষা বুঝতে পারার মতো দ্বিতীয় কেউ আছে কি?সবাই জানার চেষ্টা করল।নেই।পাণিগ্রাহীকে ডিউক দাঁড় করানোর চেষ্টা করল।

নৌকা উঠার সময় ডুবে এবং নামার সময় ডুবে।দিনটা সুন্দরভাবে শেষ হতে গিয়েও শেষ হবে না নাকি?

ইতিমধ্যে বিবর্ণ কল্যাণীকে ডঃলেগেসী নিজের পাশে বসিয়ে নিয়েছে।বিপদে,বন্যার গন্ধ পাওয়া পীপড়ার মতো মহিলারা এক জায়গায় এসে জমায়েত হয়েছে।ডঃলেগেসী বিশুদ্ধ অসমিয়ায় একটু মজা করে পরিবেশটা হালকা করতে চেষ্টা করল।মেমের মুখের অসমিয়া শুনে কল্যাণী অবাক হল।

কী কথাটা ঠিক বলছি না কল্যাণী?আঁচলে ধরে থাকলে ধরুক।নোঙরা হয়েছে বলে মনে হলে ধুয়ে নিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো মানে নেই,কী বল মেয়েরা? এমনিতে তো কত নিরীহ ছেলে পাণিগ্রাহী ? উপাধিটা খেয়াল কর। পাণি অর্থাৎ জলের প্রতি যার আগ্রহ!!পাণিগ্রাহী!জলের প্রতি বেশি আগ্রহ থাকলে কিছুটা ওলোট পালট তো হবেই।

অসমিয়া যারা বুঝতে পারে ব্যাখ্যাটা তাদের কাছে কতটা শুদ্ধ বা অশুদ্ধ হল –হল।অসমিয়া বুঝতে না পারা উত্তর প্রদেশের ডঃগুপ্তার বোধকরি ব্যখ্যাটার কিছু অংশ বোধগম্য হল।

এতক্ষণ ডঃচৌধুরীকে শান্ত করে রাখার জন্য চেষ্টা করতে থাকা প্রফেসর গুপ্তা পাণিগ্রাহীর দিকে এগিয়ে এলেন।ডঃগুপ্তা পাণিগ্রাহীর গাইড।এগিয়ে আসার সময় বাসের কাছ থেকে পাঁচ লিটারের জ্যেরিকেন নিয়ে এল।

পাণিগ্রাহীর হাতে জ্যেরিকেনটা তুলে দিয়ে ঝর্ণাটার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।সেখান থেকে তাকে এটার মুখ পর্যন্ত ভর্তি করে জল আনতে হবে।এখনই।দ্রুত।

ডিউক অসহায় ভাবে ঝর্ণার দিকে তাকাল।কিছুক্ষণ আগেই চঞ্চলা হয়ে থাকা পাহাড়িয়া ঝর্ণাটিকে এখন অত্যন্ত বিপদ সঙ্কুল বলে মনে হচ্ছে।পাণিগ্রাহী পারবে তো ? সে ডঃগুপ্তাকে কিছু একটা বলতে যেতেই তিনি নিজের মুখে তর্জনী দিয়ে একদম মনে মনে থাকার জন্য নির্দেশ দিলেন।

দুঃসহ স্বপ্নের মধ্যেও মানুষের কতগুলি আনুগত্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও জাগিয়ে রাখতে হয়। গাইডের আদেশ শিরোধার্য করে পাণিগ্রাহী দুপায়ে ভারসাম্য আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে ঝর্ণাটার দিকে এগিয়ে গেল।

মহিলা মণ্ডল আতঙ্কে উঠে দাঁড়াল।এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে কল্যাণী ডঃগুপ্তার কাছে দাঁড়াল। যা হয়েছে,হয়েছে।সে পাণিগ্রাহীকে মাফ করে দেবে।সাউৎ করে ডানহাতটা তরোয়ালের মতো তুলে ডঃগুপ্তা তাকে বাধা দিল।তিনি কারও কথাই শুনেন না।শেষ কথা তিনিই যা বলার বলবেন।

পাণিগ্রাহী কেসের রায়দান দেওয়া হয়ে গেছে।

পেখম সামলে হাইডরী পার্কের মৃত পাখিটা এখনও নিশ্চয় দুঃখিত মনে খাঁচাটার ভেতরে ঢুকে গেছে।মারাওয়ারের গুহার রহস্য উদ্ঘাটন করতে যাওয়া বনভোজের শেষের দলটা এসে ইতিমধ্যে বাসে উঠেছে।দক্ষ ড্রাইভারের হাতে বাকিটুকু রাস্তার দায়িত্ব সমঝে দিয়ে প্রাণীগুলি শিলং অভিমুখে এঁকে বেঁকে দুরন্ত গতিতে নেমে আসতে থাকল।মায়াবী উদার শহরটা বাস যাত্রীদের একবার ডানদিক থেকে এবং একবার বাঁদিক থেকে চোখের ইশারায় ডাকতে লাগল।

নেমে আস। নেমে আস।

সাবধান করে দিচ্ছি।তাড়াতাড়ি নেমে আস।

কেন?

কেননা,সাতটার সময় আমরা কিন্তু বার্নিস করা কাঠের দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে দেব।রঙীণ শহর কোলাপসেবল গ্রীলগুলি টেনে রাখবে।তার আগে শহর পাওয়ার মতো করে নেমে আস। দেরি করলে তুমি কাউকে বাইরে দেখতে পাবে না।

ঠাণ্ডা লাগা মেয়ের মতো সন্ধ্যেবেলা পড়ার টেবিলে বসবে।পড়া হোক বা না হোক নিজের ফ্রকের বগলের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে শরীরটাকে গরম করে নেবে। হাতে ঠাণ্ডা লাগলে আর কোথায় শরীর গরম হবে?হাতের মতোই তখন তোমার শরীরও ঠাণ্ডায় জমে যাবে।তার আগেই নেমে আস। নেমে আস।রাতের বেলা মন খারাপ করে গাদীর মতো শক্ত রাস্তার ওপরে জ্বলতে থাকা বিজলিবাতিগুলি পাতলা কাপড় নিয়ে ঘোমটা দেবে।পাইন গাছগুলিকে পাহারা দেবার জন্য উজাগরে থাকবে কেবল কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে খসখসে কুকুরের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকবে একটা হতাশা।কখনও আত্মঘাতী হয়ে পড়বে ঠাণ্ডা উপশম করা নিজের দেহের আব্রু।তাহলে ঠাণ্ডায় বরফ হোক সবাই।টিলা থেকে টিলা।চূড়া থেকে চূড়া।

রাতটুকু পর্যন্ত মাত্র।

ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার পাইনের গান। উদার হাতে বাঁধা পথগুলিতে সরীসৃ্পের দেহের ভাঁজ,ময়ূরের চাল এবং বায়োলজিকেল ক্লকের শুভ সংকেত।পাইনের ফাঁক দিয়ে ছিটকে আসবে সোনালি রোদ।

তবু রাত।

পাহাড়,তুমি কেন এত উঁচু? বাতাস,তোমার কিসের এত দৌড়াদৌড়ি? দুর্বল হতাশা একটা প্রশ্নের কেবল ব্যর্থ আখড়া করে।

সন্ধ্যেবেলা রঙীণ শহরটার পরিচ্ছন্ন রাজপথ ডাং দিয়ে রাখে।ঠাণ্ডার চেয়ে বেশি তীব্র কিছু এক্টার আগমন প্রতিহত করার জন্য সূর্যাস্তের সময় খাঁচাটার ভেতরে হাত-পা ভরে নিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে থাকে।অজানা কোনো মুলুক থেকে একটা ভয়ঙ্কর পথ দিয়ে সন্ধ্যে থেকে ভোর রাত পর্যন্ত পা টিপে টিপে যেন খোঁজ করে কেউ।নিঃশব্দ পদক্ষেপ। সতর্ক দৃষ্টি।

ভারী মালবাহী ট্রাকগুলির ক্রমশ উর্ধ্মুখী চাপের এক সুরের সতর্কবাণী রাতটার একমাত্র সহযাত্রী।

চলবে ...