মঙ্গলবার, আগস্ট ৪, ২০২০

আকনবিন্ধীর সোনাপোকা,-- ঘ

লেখক পরিচিতি – ১৯৬২ সনে শিবসাগরের গড়গাঁওয়ে বন্তি শেনচোয়ার জন্ম হয়। শিলঙের উত্তর পূর্ব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।বর্তমানে গুয়াহাটির রাধা গোবিন্দ কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা। প্রকৃতিপ্রমিক এই লেখিকার প্রকাশিত গল্প গ্রন্থ যথাক্রমে ‘নিষাদ গান্ধার’,’সরলা আরু সুন্দর’,’দুপুরের পার চরাই’এবং ‘মৌ-সরা’। সম্প্রতি প্রকাশিত উপন্যাস ‘আকনবিন্ধীর সোণপরুয়া’। উপন্যাসটির পটভূমি শিলঙের উত্তর পূর্ব বিশ্ববিদ্যালয়। উপন্যাসটিতে নেহুর প্টভুমিকায় সমগ্র উত্তরপূর্বের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র ফুটে উঠেছে ।

5f0b12a1dae9a.jpg


ও মা ! কবুতরটা কেন এভাবে বুকভাঙ্গা কান্না কাঁদছে ?

কাস্বলিংগগাম নামের কবুতরটার আসলে য়ু রেইনাউ নামের একই জাতের পাখির সঙ্গে প্রগাঢ় ভালোবাসা।দুজন দুজনের কাছে গানের মাধ্যমে হৃদয়ের সম্ভার উজাড় করে দেয়।দুজনের আশা ঘর বাঁধার।কা স্বলিংগগামের পিতামাতা বাস্তব অভিজ্ঞতায় পুষ্ট।ওরা দেখেছে য়ু রেইনাউ রূপবান কিন্তু নিষ্কর্মা। তাই তারা আদরের কন্যা কা স্বলিংগগামকে বিয়েতে বসতে বাধা দেয়।

পিতামাতার বাধ্য সন্তান স্বলিংগগাম য়ু রেউনাউকে তার পিতা-মাতার অসম্মতির কথা জানিয়ে দেয়।একমাত্র মেয়ে হয়ে সে কীভাবে মা-বাবার অবাধ্য হয়? ভগ্ন হৃদয়ে য়ু রেইনাউ বিদায় নেয়। দরকার নেই স্বলিংগগামের মা-বাবাকে কষ্ট দেবার।সে আর কখনও তার জীবনে ফিরে আসবে না।এভাবেই সে চলে যাবে ।

সেদিন থেকে কবুতরের সিক্ত চোখ আর হৃদয় বিদারক বিলাপ একমাত্র সঙ্গী হয়ে রইল। কবুতরের বুক ভাঙ্গা বিলাপের এটাই ইতিহাস।কবুতরের বিলাপে নিঃসঙ্গ মানুষের মর্মর কান্নার ধ্বনি শোনা যায়।

কেনই বা যাবে না? জীব মাত্রই একজন সৃষ্টিকর্তা।সমগ্র ধরিত্রীর মতো জীব মাত্রেরই হৃদয় যে একই উপাদানে গঠিত।একই নিশ্বাস,একই বায়ু।একই হরিষ,একই বিষাদ।ভিন্নতা কেবল কায়িক স্তরের।

খাসি সাহিত্যের বিভিন্ন স্তরে,কবিতায়,গানে এই রূপকথার প্রভাব লক্ষণীয়।

বইটা বন্ধ করে অধ্যাপক গৌতম লাহিড়ী বাইরে বেরোলেন। চোখে দেখা এই সবুজ পাহাড়িয়া প্রদেশের তিনি অন্তরের সন্ধান পেয়েছেন। সেটা রূপকের রাজ্য।সেই রাজ্যের শিকড় থেকেই মাটি ফেটে পরিস্ফুট হচ্ছে গাছ-লতা-বন-বৃক্ষ,হাসি-কান্না,গান-কথা,বরণীয়া মানুষের বিচরণ এবং ইতিহাস।

বিভাগের ঘড়িটা সময় সম্পর্কে সচেতন করে দিল। সেদিকে কান খাড়া করে লাহিড়ী মনটাকে জোর করে রূপকথার জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করলেন। ক্লাস শেষ হতে এখনও আধঘণ্টা বাকি।এই সময় তিনি এক কাপ গরম চা বা কফি খান। তারচেয়েও কাজের কথাটা হল,সেকেণ্ড সেমিস্টারের জন্য মডেলের জোগাড় আজ তাকে নিজেকেই করতে হবে।

স্থানীয় শ্বেমফাঙ্গ চাবঙকে আজ পনেরো দিন আগেই মডেল খুঁজে আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু আজ পর্যন্ত শ্বেমফাঙের কোনো খবর নেই।কখনও কখনও মজুরির আশায় দুই একজন মডেল নিজে থেকেই এসে হাজির হয়।একই ধরনের মডেল দিয়ে যে বারবার তার কাজ হয় না সে কথা বলে বলে লাহিড়ী ক্লান্ত হয়ে পড়েন।ওরা তাঁর ইংরেজি বা বাংলা বোঝেন না,তিনি তাদের দরখাস্তের মৌখিক ভাষাটা বোঝেন না।

বিভাগের সহকারী বাঞ্চুকলীন প্যারিয়টির ছোট ছোট আঙ্গুল উলের শলা দুটির মধ্যে মেসিনের গতিতে চলছে।বাঞ্চুকলীন শিল্পকর্মটিতে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছেন যে বিভাগীয় প্রধান লাহিড়ী পাশ দিয়ে পার হয়ে যাওয়ার কথা জানতেই পারলেন না। সহযোগী ডঃশ্বাভিনা মারবীনের ঘরে হাসির রোল উঠেছে। তার ঘরে একবার উঁকি দিতে গিয়েও লাহিড়ী থেমে গেলেন।শ্বাভিনা বেশ ভালো কথা বলতে পারেন।তার পাল্লায় পড়লে লাহিড়ীর আধঘণ্টাতে একটাও কাজ হবে না।

বিভাগের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময় তিনি দেখলেন দুজন লোক গলায় গরম কাপড় পেছিয়ে আশা নিয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভাস্কর্য বিভাগের কোনো কাজে লেগে যেতে পারে হয়তো। মুখটার ভালোভাবে মাপ-জোক নিয়ে হাতে দুটো টাকা তুলে দেয়। এই সহজলভ্য টাকাগুলির খবরটা ছড়িয়ে পড়তে বেশিদিন লাগল না। বিভাগটা পারিশ্রমিক দেওয়ায় কোনো ধরনের কৃপণতা করে না। খাসি মহিলারা ভীষণ পরিশ্রমী,বিনা শ্রমে টাকা নেবার জন্য কোনো খাসি মহিলা মডেলের লাইনে এসে অন্তহীন অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে না। শুধু পুরুষেরাই আসে।

লাহিড়ী নেমে আসার সময়েই ওদের কাছ থেকে নিরীক্ষণ করে নাকচ করে দিল। তিনি কোন ভাষায় কথা বলবেন?হিন্দি,ইংরেজি বা বাংলা ওরা বোঝে না।ওদের স্থানীয় ভাষা তিনি বোঝেন না।

লাহিড়ীকে নাকচ করতে দেখে ওদের ছোট ছোট চোখগুলি প্রশ্নবোধক হয়ে আরও ছোট হয়ে যায়।লাহিড়ী নিজের গালের হনূ দেখিয়ে বোঝালেন,এইসব যে ওদের নেই। গোল এবং পরিপুষ্ট বোঝানোর জন্য তিনি হাতদুটি মিষ্টিকুমড়োর মতো গোল করে দেখালেন,ওদের এইরকম মুখ।হনূ মাংসের নিচে চাপা পড়ে গেছে।ডানহাতের ঊল্টো দিকটা দেখিয়ে তিনি তাদের এখান থেকে চলে যাবার ইঙ্গিত করলেন।

ঠোঁটের দুপাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পিক মোছার জন্যও ওদের হাতগুলি কাপড়ের উষ্ণতা থেকে বেরিয়ে এলনা। মুখ দিয়ে ভাত উতলানোর মতো ভট ভট শব্দ করে ধীর গতিতে ওরা চলে গেল।লাহিড়ীর ওপরে নিশ্চয় অসন্তুষ্ট হয়েছে।

অবয়বগুলি যেন এক একটি মূর্ত হতাশা।কাঁধের গরম কাপড়ের বোঝাটা বইতে না পেরে যেন তারা ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে পা দুটিকে এগিয়ে নিয়ে চলল।লাহিড়ীকে শাপশাপান্ত করল।

ওপাশ থেকে এগিয়ে আসা ছোট্ট দুটি মেয়ের সঙ্গে লাহিড়ীর টানা হেঁচড়া হল।ওরা রাজকীয় ধরণে লাহিড়ীর দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।

ওদেরই দোষ যদিও লাহিড়ী দোষ স্বীকার করে নিয়ে মাফ চেয়ে নিল। রাজকুমারীর বদান্যতায় মোটোসোটা পুতুল দুটি লাহিড়ীকে মাফ করে দিল।

কিন্তু এখন যে তার মোটাসোটা পুতুল নয়,স্পষ্ট হনূর মডেলের দরকার।হনূ থেকে নাক পর্যন্ত,নাক থেকে কান পর্যন্ত দূরত্ব মেপে এনাটমির ধারণাটা ছাত্র ছাত্রীদের হাতে কলমে দেখাতে হবে।

পৃথিবীতে তার মতো কারোর এভাবে মডেলের অনুসন্ধানে নামার মতো অবস্থা হয়েছে কি?

ময়ূরভঞ্জে্র সবচেয়ে ছোট আর গোলাকার সামার হাউসটিতে লাহিড়ী বসে রইলেন।পাওয়া যাবে। ওপরের বিভাগগুলিতে এই সামার হাউসের সামনে দিয়ে রাস্তাটা উঠে গেছে।কে জানে প্রতিদিন দেখা কারও মুখে দরকারি মাপটা পাওয়া যাবে।ঐ যে,ভূগোল বিভাগের অধ্যাপিকা মিসেস গোস্বামী নেমে আসছেন। দেখতে গেলে কেবল হনূ কেন,প্রত্যেকটি মাপজোকই সঠিক,জোনাক-জোয়ার,ঋতু প্রবাহ মহিলার শরীরে অপরূপ কায়দায় বন্দি হয়ে আছে।মহিমাটা যে কোথায়?লাহিড়ীর দুঃসাহস হবে কি তাকে একবার মডেল হওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার? এই মধ্যবয়সী মহিলা কী যে এক যাদুকাঠি বয়ে বেড়ান।

সেদিন সেমিনার হলে প্রথমবার লাহিড়ী কাছ থেকে দেখেছিলেন। কার্ডিগানের ওপর দিয়ে জড়িয়ে নেওয়া শারির আঁচল ভূ-লুণ্ঠিত।এক ধরনের অমনোযোগী মনোযোগ সাজসজ্জা থেকে ব্যক্তিত্বে সম্প্রসারিত হয়ে থাকে। সমগ্র শরীর সাড়ে চার মিটার কাপড় দিয়ে ঘিরে,লম্বা হাতের কার্ডিগান পরেও শরীরটাকে কীভাবে তীব্র আকর্ষণীয় করে তোলা যায় ,কেউ জানতে চাইলে এই কায়দাটা মিসেস গোস্বামীর কাছ থেকে শিখুক।

পাইনের ঝরা পাতা উড়িয়ে নিতে চাওয়া বাতাস যেন তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে,তার পা দুটি নিচ্ছে না-এভাবে সামার হাউসের সামনে দিয়ে মিসেস গোস্বামী পার হয়ে গেলেন। যথারীতি শালিক পাখিটার মতো তার পাশ দিয়ে পার হয়ে গেলেন ডঃ রিয়াজ।

চায়ের কাপ শেষ করে উঠতে যেতেই লাহিড়ী চমকে উঠলেন।

নিরুপম শর্মা।সামার হাউসের সুদৃশ্য গোলাকার সোফাটিতে নিরূপম পা তুলে বসেছে।বিরক্তিতে লাহিড়ীর নাক কুঁচকে গেল। বসামাত্রই ঘুমিয়ে পড়ল নাকি? যেন গরম চায়ের কাপ মাথায় ঢেলে তাকে বাস্তব জগতে ফিরিয়ে আনবে।

তার প্রাক্তন ছাত্র এবং বন্ধুপুত্র নিরুপমের নেশায় আশক্তির কথা পাহাড়িয়া শহরের প্রায় প্রত্যেকের মুখে মুখে। কেবল সেই নাকি? ব্যাঙের ছাতার মতো এই সংখ্যা বেড়ে চলেছে।ভারত সরকারের প্রশাসনীয় সেবার চাকরিতে অশোক শর্মা এখন দিল্লিতে।সপত্নীক। শিলঙের পৈতৃক ভিটেটা রেখে নিরূপমকে এখানে নেশার জগতে ছেড়ে দিয়ে শর্মা দম্পতি কী সংসার পেতেছে লাহিড়ী বুঝতে পারেন না। হতে পারে অশোক শর্মা হাল ছেড়ে দিয়েছেন।কিন্তু মা?

লাহিড়ী পাখি ডানা ঝাপটানোর মতো ভাবনাটাকে ঝেড়ে ফেললেন। তিনি যা প্রয়োজন বলে ভেবেছেন সেই সমস্ত খবর অশোক কে সময়মতো সরবরাহ করেছেন।সংসার ধর্মের জটিল ঘূর্ণিপাকে তিনি নিজে যখন পা রাখলেন না,তার চরিত্র বোঝা তার পক্ষে সম্ভব হবে না।নিরুপম নামের ছেলেটির প্রতি তিনি পিতৃসুলভ দায়বদ্ধতাও অনুভব করলেন।

প্রাচুর্য ছেলেটির মাথা নষ্ট করেছে।নিরাসক্ত পিতা-মাতা।

নিরুপমকে এনে তিনি বিভাগের নিজের ঘরে বসতে দিলেন। বাধ্য ছেলের মতো সে এল।চেয়ারে পা তুলে নিরুপম পুনরায় দুই হাঁটুর ওপর হাত রেখে বসে পড়ল। বসতে দিয়েছে,বসে আছে।সময়,স্থান বা ব্যক্তিজ্ঞান তার এখন বিলুপ্ত।গাল থেকে হনূ স্পষ্ট,গলার শিরা নীল।মাথার চুল এলোমেলো।

দরজার মুখে প্রভাকর দুইবার উঁকি দিল এবং নাই হয়ে গেল।তৃতীয়বার ইতস্তত করে সে মুখটা দেখাতেই লাহিড়ী তাকে সহজ করার জন্য চোখে চোখে তাকাল।

-হোয়াটস দি ম্যাটার প্রভাকর?

-স্যার,ইফ-

প্রভাকর মাথা নিচু করে নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে তর্জনীর ডগাটা টিপ মেরে ধরে ঘরের বাইরে সরিয়ে আনল।লাহিড়ী বুঝতে পারল,নিরুপম ঘরে থাকার জন্য সে ঘরে ঢুকতে চাইছে না।

চেয়ার থেকে উঠে সে প্রভাকর ইঙ্গিত করা দিকে বেরিয়ে এল।নিরুপমকে রুমে আনিয়ে তিনি বাঞ্চুকুলীনের মাধ্যমে সেমিস্টারের ছাত্র ছাত্রীদের খবর পাঠিয়েছিলেন যে মডেল হেডের ঘরে বসে আছে।ছাত্র-ছাত্রীরা একবারে দুজন করে এসে এনাটমির ধারণার জন্য মাপ-জোক নিয়ে যেতে পারে।

বাইরে বেরিয়ে লাহিড়ী অবাক হল।কেবল প্রভাকরই নয়,সেমিস্টারের সমস্ত ছেলেমেয়েরা করিডরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সেমিস্টারে ছাত্রীর সংখ্যাই বেশি।প্রভাকরকে নিয়ে ছেলেদের সংখ্যা মাত্র তিনজন।

লাহিড়ী প্রশ্নবোধক চাহনিতে সবার চোখের দিকে তাকালেন।মেয়েরা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল।হাত দুটো কচলাতে কচলাতে প্রভাকর টিপিক্যাল প্রতিনিধির ভূমিকা পালন করার জন্য এগিয়ে এল।এবার সবার দিকে ঘুরে তাকিয়ে সে ইংরেজিতে আরম্ভ করল।

-স্যার,এই মডেলের সঙ্গে কাজ করার জন্য ওদের,মানে স্যার মেয়েদের,ভীষণ আপত্তি আছে।

-কেন? নিরুপম ভালো মডেল। এনাটমির সুন্দর ধারণা করতে পারবে।আপত্তির কারণ কি?

-স্যার,মেয়েদের ভীষণ আপত্তি। সবই জানা কথা। নিরুপম শর্মা কতরকমের রিহেবিলিটেশন

ক্যাম্পের নিয়মিত বাসিন্দা। কী বা-

তৎ্মুহূর্তে স্বভাষা এবং স্বমূর্তির আশ্রয় নিলেন লাহিড়ী।বাঁহাতে মেয়েদের দিকে দেখিয়ে তিনি ডানপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রভাকরের দিকে দৌড়ে গেলেন।

-কেন? ওরা কি ওর সঙ্গে অন্য কিছু করবে?

এক লহমার এক নির্ভুল ভাস্কর্য।

কিন্তু কী তার তাৎক্ষণিক প্রভাব।

করিডরটিতে যেন ভূমিকম্প হল।

ডঃলাহিড়ীর রুদ্রমূর্তির কাছে প্রতিটি ছাত্রী হুরহুর করে নিরুপম বসে থাকা ঘরের ভেতর ঢুকল। প্রভাকরের কান দুটি এক নাগাড়ে লাভা বের করছে।আর এই প্রক্রিয়া সমস্ত মানুষগুলিকে এখন পর্যন্ত কাঁপাচ্ছে।ছাত্রীদের প্রতিনিধির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া প্রভাকর অনুভব করছে,পাহাড়িয়া শহরটিতে সমস্ত জিনিস থাকা সত্ত্বেও বিপদে পড়লে এক ফোঁটা জল ও কিন্তু সহজে পাওয়া যায় না।

এক কলস জল কটকট করে কোথায় খাবার জন্য কোথায় পাওয়া যায়?

হুরহুর করে নেমে যাবার সময় তাকে মৃণালের মতো কোমল একটা হাত বাধা দিল।হাতটার চেয়েও কোমল শ্রদ্ধা প্রধানের আন্তরিকতাপূর্ণ ডাক।

-এনিথিং রং,প্রভাকর!

মেয়েটির ডাক প্রভাকরকে শান্ত করল।না,তার কিছু হয়নি।কেবল খুব তেষ্টা পেয়েছে। সে শ্রদ্ধা প্রধানের সঙ্গে সঙ্গে এইবার স্থিরভাবে এগিয়ে চলল।

শ্রদ্ধা প্রধানের কাহিনি অন্য এক অধ্যায়।সিঁদূর আর দুধের মিশ্রণে গড়া হয়েছে দীর্ঘদেহী শ্রদ্ধা প্রধানকে।তার রূপ গুণের বিকিরণ বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত।শ্রদ্ধা তখন পিজির প্রথম সেমিস্টারের ছাত্রী।নেপালি রাজপরিবারের রক্তের ছিটে থাকা,এর সঙ্গে সবার চেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হল ভারতবর্ষের বাণিজ্যের হাল ধরার পথে অগ্রসর হওয়া একজন নায়ক শ্রদ্ধাকে সেমিস্টারের দরজা থেকেই নিয়ে স্বপ্নের দরজায় পৌছাল।

এই রাজকীয় বিয়ে বহুদিন পর্যন্ত ময়ূরভঞ্জে্র সামার হাউসগুলির আলোচনায় গুরুত্ব পেল।সত্যি সত্যি রূপকথার নায়ককে পেয়ে গেল শ্রদ্ধা।

-শ্রদ্ধা বোধহয় এখন হনিমুনে।

-কাম অন!লেটস নট টক এবাউট হার,প্লীজ! কান্ট ইউ সী দ্যাট উই ফীল মিজারেবল।

সুজাতা কয়লা ব্যবসায়ীর মেয়ে।লোকে বলে,সুজাতার পিতা শিলং শহরটা অনায়াসে কিনে নিতে পারে।সুজাতা রূপসী।সপ্রতিভ।বিজনী হোস্টেলের মেয়ে বন্ধের দিনে শিলং শহর ঘোরার মতো সুজাতা বছরে পৃথিবীটার সবগুলি ঈর্ষণীয় জায়গা ঘুরে আসে। তবু শ্রদ্ধা প্রধানের কপাল দেখে সুজাতার মুখ কয়লার রঙ ধারণ করে।

ময়ূরভঞ্জে যেন রূপসীদের ঢল নেমেছে।

এবারের চর্চা শ্যামলী দত্ত।আমেরিকার ছেলে। ছেলে এক সপ্তাহের জন্য ভারতে আসবে।তারই মধ্যে সম্পূর্ণ অসমিয়া নিয়ম-কানুন,রীতি-নীতি মেনে বিয়েটা পাতার ইচ্ছা।জাতে জাতে বিয়া নাম,জল তোলা,মঙ্গলাচরণ-সবকিছু সঠিকভাবে পালন করার জন্য দত্ত পরিবারকে এক সপ্তাহের জন্য গুয়াহাটিতে থেকে যেতে হবে।শ্যামলী তার বিয়ের প্রস্তুতির যাবতীয় খবর বান্ধবীদের প্রতি মুহূর্তে জানিয়ে চলেছে। বা ড’এবং কেমফামও সমান উৎসাহে আড্ডায় ভাগ নিল।গুয়াহাটিতে বিয়ে।এই কথাতেই তারা খুব একটা উৎসাহ বোধ করল না।

-তোর বিয়ের জন্য কি আমাদের সবাইকে গুয়াহাটিতে গিয়ে থাকতে হবে?এই অসহ্য গরমে?

-লাগবেই তো? নাহলে কি জল ওয়ার্ড লেকে তুলবি?আর জলতোলা মহিলাদের দলের সঙ্গে পানের বাটা নিয়ে যাবি তোরা মাকুন্দা ? জাস্ট ইমাজিন!

-শ্যামলী,দ্যাটস নট ফেয়ার!

-শ্যামলী,শ্যামলী!তো্র তো বরের সঙ্গে দেখাই হয়নি।না দেখেই তুই কীভাবে বিয়েতে রাজি হয়ে গেলি!একেবারে মধ্যযুগের কারবার দেখছি।

-জন্মপত্রিকা,ডিয়ার।হরস্কোপ মিলনের বিয়ে।

-আসলে তোরা ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরছিস।আমি এন আর আই হব!

-তাই কি?বেচারা রাজের কী হবে,ইউ নন-রিলায়েবল ইণ্ডিয়ান।শ্যামলী তোর হৃদয় কি পাথরের?

শ্যামলীর মনে পড়ে গেল।রাজের সঙ্গে শীঘ্রই একটা বোঝাপড়াতে আসতে হবে।এই অধ্যায়টাকে সামলে-সুতরে নেওয়ার জন্য হাতে মাত্র দশ দিন আছে।সে ঝুমুরের শরণাপন্ন হল।

-ঝুমুর, রাজকে কোথাও দেখেছিস?

-আমি দেখেছি,শ্যামলী।গ্যারিশন গ্রাউণ্ডে রাজ লীগের আয়োজনে ব্যস্ত।

-মজা করবি না। সিরিয়াসলি।সাহায্য কর,প্লিজ।আমি ওর সঙ্গে কথা-বার্তা বলে নিই।

-বেচারা রাজ।সে গ্যারিশন রোডে ফুটবল খেলার আয়োজন করে থাকতে থাকতে তার বল গিয়ে আমেরিকার কোর্ট পাবে।শ্যামলী,ওর হৃদয় ভাঙতে তোর খারাপ লাগল না।

-রাজ ইজ নট এ সেন্টি ফুল।

-হ্যাঁ।রাজ যে খেলোয়াড়।স্পোর্টস ম্যান স্পিরিট!

কেমফাম বলতে বলতেই পাশ থেকে শ্যামলী দত্তের মুখের পরিবর্তন ও লক্ষ্য করতে থাকল।সেইন্ট অ্যাডভান্স কলেজের ছাত্র রাজ এবং সেইন্ট মেরিজ কলেজের ছাত্রী শ্যামলীর গোটা শিলঙের অলিগলি জুড়ে পরিচিত দৃশ্য।রাজ বলতে শ্যামলী হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ায়।ময়ূরভঞ্জে পিজি করতে এসে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা আরও বেড়েছে। এমন একটা সময়ে শ্যামলীর বিয়ের প্রস্তাব।

কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত থাকা আনন্দের রেখাগুলি শ্যামলীর মুখ থেকে ধীরে ধীরে নাই হয়ে গেছে।সে সামান্য গম্ভীর হয়ে পড়েছে।ঝুমুর হাতে কলমে শ্যামলী উদ্ধার অভিযানে নেমে গেল।সে টেনে হিঁচড়ে বা ড’আর কেমফামকে সেখান থেকে দূরে পাঠিয়ে দিল।

-নাউ ডোন্ট মেক হার ক্রাই,ম্যান!

এর পরের কয়েকদিন ঝুমুরকে বড় ব্যস্ত দেখা গেল।কী যে খামখেয়ালী আবহাওয়া।শ্যামলী দেশান্তরী হওয়ার বেদনায় যেন বিলাপ করছে,বিলাপ করছে।

সেমিস্টারের ক্লাসগুলিতে না এলেও শ্যামলী এখনও সবসময় ময়ূরভঞ্জে আসে।ঝুমুর এবং শ্যামলীকে বাইরে একসঙ্গে দেখলেও ক্লাসরুমে কিন্তু ঝুমুর একাই ঢুকল।সঙ্গে সঙ্গে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আজ রহস্যের উদ্ধার করতেই হবে। সে শ্যামলীকে প্রতিদিন কোথায় ছেড়ে আসে?

-একটু তো বুঝতে চেষ্টা কর।লেটস রাইড টুগেদার। রাজ এবং ওকে এক সঙ্গে ছেড়ে এসেছি।মিউচুয়াল,ইউ নো...

বিরহ না বিচ্ছেদ বোঝানোর জন্য এক সঙ্গে করা হাতদুটি সরিয়ে দেখাল।

শেষের ক্লাসটা করে প্রত্যেকেই যে যার দিকে চলে যাবার পরেও একটা সামার হাউসে ঝুমুর মাথা গুঁজে বসে রইল। অনেকক্ষণ পরে রাজ এবং শ্যামলীকে দেখা গেল।

শ্যামলী আজ একটা লাল ছোট ফ্রক পরেছে।ঝিরঝির বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য একটা ছাতার নিচে রাজ এবং শ্যামলী অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভাবে রয়েছে।শ্যামলী এবং রাজ ভরদ্বাজ বৃষ্টির মধ্যে নংঠুইমার প্রতিটি গাছ,প্রতিটি অলিগলি ঘুরে বেড়িয়েছে।এই সময় যখন আর ফিরে আসবেই না ,কয়েকটি মুহূর্তকে কারারুদ্ধ করা যাক।

বৃষ্টির ঝাঁক দ্বিগুণ উৎসাহে মাদল বাজিয়ে ওদের কথায় সায় দিল।

ঝুমুর দূত চিত্রলেখার ভূমিকায় ব্যস্ত হয়ে রইল।আমেরিকান বর অনিরুদ্ধ কোঁওর স্বপ্রতিষ্ঠিত।আমাদের রাজ যেন দেবদাস হয়ে না যায়।ঝুমুরকে যেন কোনো পক্ষই শাপ শাপান্ত না করে।এই কয়েকদিন রাজের সঙ্গে শ্যামলী যত সুখ এবং প্রেমে মশগুল হয়ে আছে,আমেরিকান বরের সঙ্গেও যেন ততটাই প্রেমময় জীবন কাটাতে পারে।

বৃষ্টি ছাড়ার পরে ঝুমুর শ্যামলীকে বাড়িতে গিয়ে রেখে এল।বিয়ের বন্দোবস্ত হয়ে থাকা মেয়ে বলে শুনে ঝুমুরের ঠাকুরমার কড়া-কড়ি বাড়ল।ঝুমুরের ঠাকুরমার মতে এই কয়েকদিন শ্যামলী ময়ূরভঞ্জে না গেলেই ভালো হয়।পরীক্ষা-টরীক্ষা যখন দেবেই না!

-ঠাকুরমা তুমি কিচ্ছু বোঝ না।–ঝুমুর ঠাকুরমাকে এক কথায় চুপ করিয়ে দেয়।

একটা সেমিস্টারের বিরতির পরে শ্রদ্ধা প্রধানকে হঠাৎ ময়ূরভঞ্জ কমপ্লেক্সে দেখা গেল।সামার হাউসগুলি থেকে দলে দলে ছাত্র ছাত্রী অবাক বিষ্ময়ে শ্রদ্ধার দিকে তাকাল। গম্ভীর পদক্ষেপে শ্রদ্ধা প্রধান ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে এল।সামার হাউসগুলির দিকে এমনকি একবারও মাথা ঘুরিয়ে দেখলই না। কাউকে ড্রপ করতে আসা একটা ক্যাব ডিপার্টমেন্টের বিস্তৃত ঘাসের ঊপর দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে খালি ক্যাবের দিকে সে এগিয়ে গেল।

শ্রদ্ধা প্রধানের পরনে একটা ঘিয়া রঙের পা পর্যন্ত নেমে আসা জামা,হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া ছাই রঙের একটা দীর্ঘ স্কার্ট।তার গায়ের রঙ থেকে যেন সিঁদূরের রঙটা বাস্প হয়ে উড়ে গেছে।তথাপি শ্রদ্ধা প্রধানের গায়ের রঙ সামার হাউসগুলিকে মুগ্ধ করে রাখল।

-ক্যাব,ধানখেতি প্লীজ!

শ্রদ্ধা প্রধানের কথা আগের থেকেও পরিশীলিত হয়েছে।এই যে শ্রদ্ধা ধানখেতিতে থাকা পিতার কাছে এসেছে,ফিরে যাবার জন্য নয়।এক সপ্তাহ পরে কথাটা মুখ ফস্কে ময়ূরভঞ্জ কমপ্লেক্সে বেরিয়ে গেল।বিজনী কমপ্লেক্সের ইন্দ্রানীর সঙ্গে শ্রদ্ধার সেইন্ট মেরিসের দিন থেকেই বন্ধুত্ব।সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে কৌ্তূহলী দুই একজন জিজ্ঞেস করেছে,কেন?ইন্দ্রানী শ্রদ্ধা প্রধানের হয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছে। কারণ-শ্রদ্ধা বাঁদরের সঙ্গে বসবাস করতে পারবে না।

তার মা-বাবা কী বলে? শোনা যায় বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছে।মা দিন-রাত চোখের জল ফেলছে।এত বড় পরিবার,প্রতিষ্ঠিত মানুষ।সমাজ কী বলবে?ছেড়ে দেব বললেই ছেড়ে আসা উচিত কি?

শ্রদ্ধার কথা-বার্তায় রুক্ষতা এসেছে।সাদা কাগজের রঙে পরিণত হওয়া মেয়েটি বেশি কথা বলতে চায় না।

-এই হল আমার জীবন।মানুষের প্রতিক্রিয়ায় আমার কীই বা আসে যায়?

হ্যাঁ । শ্রদ্ধা প্রধানের নিজের জীবন।সিঁদূর বর্ণের সঙ্গে সঙ্গে সে দ্রুত ওজন হারাচ্ছে।রেম্পে যোগ দেওয়ার মতো অবয়ব হয়েছে তার।দীর্ঘদেহী মেয়েটির সঙ্গে আজকাল প্রায়ই সেই ইংকনবা নামের নাগা যুবকটিকে দেখা যায়। সেইন্ট অ্যাডমান্সের ডিগ্রি ক্লাসের ছাত্র ইংকনবার যেন শ্রদ্ধা প্রধান বিসর্জন দিয়ে আসা রাজকীয়ত্বাটুকু চৌকিদারি করার ঠিকা নিয়েছে।

  • এ লাহুরে কাঁহা জান হিড়েঁকো।

বারো মাসে ফুল টিপ্ন পল্কেকো।।


চলবে ...