শনিবার, ডিসেম্বর ৫, ২০২০

আকনবিন্ধীর সোনাপোকা,প্রথম অধ্যায় -১

লেখক পরিচিতি – ১৯৬২ সনে শিবসাগরের গড়গাঁওয়ে বন্তি শেনচোয়ার জন্ম হয়। শিলঙের উত্তর পূর্ব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।বর্তমানে গুয়াহাটির রাধা গোবিন্দ কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা। প্রকৃতিপ্রমিক এই লেখিকার প্রকাশিত গল্প গ্রন্থ যথাক্রমে ‘নিষাদ গান্ধার’,’সরলা আরু সুন্দর’,’দুপুরের পার চরাই’এবং ‘মৌ-সরা’। সম্প্রতি প্রকাশিত উপন্যাস ‘আকনবিন্ধীর সোণপরুয়া’। উপন্যাসটিতে নেহুর প্টভুমিকায় সমগ্র উত্তরপূর্বের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র ফুটে উঠেছে ।


5ee59fc8468b2.jpg


।।ক।।

ছাত্রী নিবাসটির সামনের দিকে ফুটে থাকা গোলাপগুলি সদ্যোজাত কোমল গোলাপী রঙের।তুলনায় কলিগুলির রঙ সামান্য ঘন।অর্ধেক পাপড়ি মেলা ফুলগুলি কোমল গোলাপী।ফুলগুলি সম্পূর্ণ ফোটার পরে গোলাপী রঙ আর থাকে না।কোথায় যেন একটা আভাস মাত্র ছড়িয়ে থাকে।

-অফ-হোয়াইট।

মীম বিজ্ঞের মতো মন্তব্য করল।সঙ্গে সঙ্গে ক্রীণ আপত্তি দর্শাল ।এটা কী মন্তব্য হল। এরকম সুন্দর জিনিসের এই ধরনের অশুভ নাম।অফ আবার হোয়াইট।বলেছ আবার বলছ না।একে বলে গোলাপের প্রতি অবিচার।

দেবাহুতি হস্তক্ষেপ করল। তার কথা হল,মীম গোলাপকে অশুভ নামে ডাকেনি।রঙের কথা বলেছে। অফ-হোয়াইট।সাদা থেকে উৎপত্তি। একটা নাম তো থাকতেই হবে,তা গোলাপি হোক বা অন্য কিছু।

মীম,ক্রীণ আর দেবাহুতি অনেকক্ষণ পর্যন্ত একমত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাল না। অবশেষে ক্রীণই ঘোষণা করল যে মতানৈক্য অত্যন্ত জরুরি।মতানৈক্য অচলাবস্থাকে গতি দান করে।শেষ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারা গবেষণাই সার্থক গবেষণা। প্রত্যাহ্বান জানিয়ে পুনরায় গবেষণা চালিয়ে নেওয়া।এই বাক্যকে সত্য প্রমাণিত করার জন্যই নাকি ক্রীন তার নিজের গবেষণা পত্র শেষ করতে পারেনি। শেষ হওয়ার কোনো নাম গন্ধই নেই।নিজের এগোতে না চাওয়া বিষয়টা নিয়ে ক্রীণ রসিকতা করল না সান্ত্বনা লাভ করল দেবাহুতির বুঝতে কষ্ট হল।

ক্রীণ এবং মীমের কাছ থেকে সরে এসে সে পুনরায় ফুলগাছের সামনে দাঁড়াল।আধফোঁটা একটা ফুলে নাকটা ডুবিয়ে দিল। সবগুলি ফুল উপচে পড়ছে।যেন দোকান দেবে বলে পণ করে বসেছে। কিছুটা গন্ধও যদি থাকত।

-ফুল আর গন্ধের মধ্যে সম্পর্কের নাকি কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

–দেবাহুতি জানতে চাইল।মীম তৎক্ষণাত বাধা দিল।গন্ধের উদ্বেগ গোলাপের রূপের বাজারে কোনো তারতম্য এনেছে কি?যেখানে-সেখানে সুগন্ধের সন্ধান করে বেড়ালে মোটের উপর পাওয়া চোখের পরিতৃপ্তিটুকুর পরিসর নিজে নিজে কমিয়ে আনা হবে বলে মনে হয়।

সুন্দর যদি সুন্দর।এক এবং শেষ কথা। আশ মিটিয়ে দেখ।‘কিন্তু কেন যে গন্ধ নেই’জাতীয় অসন্তোষ থাকাই উচিত না।

এই সমস্ত শিল্পীসুলভ অসন্তুষ্টির বিলাস করার মানসিকতা তার নেই। বিকেলের সুন্দর সময়টুকু নষ্ট হবে।প্রতিটি মানুষের পেছনদিকে জ্যোতির চক্র সন্ধান করা যেন কাজ।বাড়ি বাড়ি যীশু বা বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটবে কি?আশা করাটাই যে পর্বতে কাছিমের ডিম খুঁজে বেড়ানোর মতো হতাশাজনক হবে।তারচেয়ে যে যেখানে এবং যেভাবে,সেভাবেই গ্রহণযোগ্য এবং প্রশংসনীয় হয়ে থাকুক।

জলবায়ুরও কিন্তু দেখাদেখি পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। অথবা বলতে পারি যে জলবায়ুর আচরণ বড় বৈষম্যমূলক।অন্তত গোলাপচারা দেখতে দেখতে দেবাহুতির এটাই ধারণা হয়।

-কী সুন্দর দেখ ! আমি তো কত ফুল লাগাই,কই ! আমাদের এখানে এত ফুল ফোটে না।বুঝেছি,আমাদের গাছে ফুল বড় কৃপণ।আর এখানে-

-দেবা,কেন ফুটছে না,জানিস?তুই যে শৈশবে ফুলগুলি বাংলা গডের জন্য ছিঁড়েছিস,সেজন্যই ফুটছে না

-দেবাহুতি জিভ বের করে ডানহাতে নিজের কপাল এবং বুক স্পর্শ করল। তার ‘বাংলা গড’যেন মীম বা ক্রীণের রূঢ় বক্তব্যে যেন দায়-দোষ না ধরে।

পরের মুহূর্তে দেবাহুতি তার রাজহাঁসের মতো দীর্ঘ গলা ঘুরিয়ে ডানহাতের হেলানো রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

বায়োফিজিক্সের সুদর্শন অধ্যাপক পণ্ডিত নেমে আসার সময় হয়ে গেছে।কোনো কারণেই পাঁচ মিনিট সময়ও সে পণ্ডিত দর্শন থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে না।বাঁকটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনায়াসে দীর্ঘ গলা ভাঁজ করে সে পণ্ডিতের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

পণ্ডিতও সময়ের অপচয় করে না। এটাও বোধহয় সেই জলবায়ুর মহিমা।বায়োফিজিক্সের গবেষিকা ছাত্রী সবিতা সিঙের মতে পণ্ডিত বাঘের মতো অধ্যাপক। ক্লাসরুমেই হোক বা ল্যাবরটারিতেই হোক –ছাত্রছাত্রী পণ্ডিতকে বাঘের মতোই মনে করে। নিজের বিভাগের বাঘ কিন্তু সুকুমার কলার দেবাহুতি,রাজনীতি বিজ্ঞানের তন্দ্রা অথবা নৃ্তত্ত্ব বিভাগের ইন্দ্রাণীকে দেখলে হরিণীর মতো দুর্বল আচরণ করে ফেলে। ওদের মতোই সমান কৌ্তূহল এবং কৌ্তুকের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখে।অথচ সবিতা সিং যে ওদের কয়েকজনের সঙ্গে সবসময় উঠা বসা করে,একই হোস্টেলে থাকে-সেটাও জানে।জানলেও সেটা নিয়ে বোধহয় ভ্রূক্ষেপ করে না।

ঘাসগুলিরও একই মাহাত্ম্য।নিয়মিতভাবে ছেঁটে দেবার ফলে ঘাসগুলি সমান আকৃ্তির।পোকামাকড়ের উপদ্রব নেই।থাকার মধ্যে কোথাও কোথাও দুই একটা মিহি বনগুটি।

হোস্টেলের রাঁধুনি কং এবং তাঁর সহকারী বা রনী হেলানো রাস্তা দিয়ে কুকুর-দৌড়ের মতো দৌড়ে নেমে আসছে।সামনের বনানির পাশে পাকা বেঞ্চটাতে দেবাহুতি,ক্রীণ এবং মীমকে পা নাচিয়ে থাকতে দেখে কঙ চিৎকার করে নিজের চিন্তা ব্যক্ত করল।

-অসময়ে যে এখানে পা নাচাচ্ছেন,মেয়েদের পড়াশোনায় মতিগতি নেই নাকি?এসব ভালো কথা নয়।কঙের কথায় উদ্বেগ কম আর মমতা বেশি।ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে আবেগটুকু বহন করায় বিশেষ অসুবিধা হল না।দেবাহুতি কঙের মমতায় ভরা কথার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করল।

-কং,ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে। খালি পেটে কোথায় বিদ্যা ঢুকবে?

কঙ নিজের কাঁধের থলেটা টিপে দেখল।দুটো মাকৈ আছে।এই লম্বা মেয়েটির ক্ষুধা বেশি।হোস্টেলে আসার দিন থেকে কঙ কথাটা ভেবে আসছে।ক্ষুধা পাবারই কথা।পাইন গাছের মতো দ্রুত বেড়ে চলা মেয়ে।গঠনটাই যে লম্বা।আরও একটি কথা।কঙকে দেখলেই সে ক্ষুধাটা বুঝতে পারে।ভাত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায় না।ওর জন্যই কঙ আজকাল নিজের বাগানের দুটো নাসপাতি না হলেও গোটাচারেক মাকৈ ব্যাগটাতে ভরিয়ে নেয়। মেয়েটির খাওয়ার দেখেই কঙে্র সুখ।কখনও বা ঘরে খাবার জন্য বেশ মুখরোচক করে বানানো দুটো বড়াভাজা ঢাকনা লাগিয়ে একটা বাটিতে করে আনে।দেবাহুতিকে তা খেতে দিয়ে কঙ নিজে মুখে একটা কুৱাই (পান) ভরে নেয়।

_য়ু বাম হাতী কিত কুল্যাই।–কঙ খাসি ভাষায় বলে।

-কং কী বলছিস?ইংরেজিতে বল।–দেবাহুতি হিন্দিতে বলে।

-হাতির মতো খাবি,তাহলেই ঘোড়ার মতো খাটতে পারবি।কঙ ইংরেজিতে বলে।যতদিনই এখানে থাকুক না কেন,স্থানীয় ভাষাটা আয়ত্ত করার চেষ্টা মেয়েগুলি কোনোদিনই করে না।কঙ কথাটা লক্ষ্য করেছে।

-ঘোড়ার মতো বোঝা টানার জন্য খাব।পারব না কং।তারচেয়ে দরকার হলে আমি খাবই না।

-পারবি পারবি।তোর লক্ষণ আছে।খাবার প্রতি আকর্ষণ থাকা মানুষের কাজের প্রতিও আগ্রহ থাকে।

দেবাহুতি নামে মেয়েটির মধ্যে বেঁচে থাকার সমস্ত লক্ষণগুলি দেখে কঙে্র মনে ভীষণ সন্তোষ।মা-বাবার স্নেহাঞ্চল ছেড়ে এই শহরে এসেছে।পড়াশোনা করছে।এরকম একটি মেয়েকে ক্ষুধার্ত থাকতে দেখা যায় কি?নিজের মায়ের কাছে করা সমস্ত আবদার মেয়েটি অনায়াসে কঙে্র কাছে করতে পারে,এটা কম ভালোবাসায়?

কলাফুলের ওপরে জেমসেম পরে বেঁটেখাট কঙ থপথপ করে রান্নাঘরের উদ্দ্যেশে ঘাসের ওপর দিয়ে এগিয়ে গেল।তার তেজোদীপ্ত পা দুটিতে বনগুটির খোঁচা লাগলেও সে ভ্রূক্ষেপ করল না।বারণী তার লংপেন্টটাকে বনগুটির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ঘাসের সংক্ষিপ্ত রাস্তা ছেড়ে দীর্ঘ পথটা দিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

কঙ ব্যাগটা থেকে মাকৈ দুটো বের করল।টকটকে লাল হলে কোমল মাকৈ পুড়ে কালো নূন এবং মাদ্রাজি লেবুর প্রলেপ মেখে নিয়ে পাকা বেঞ্চে বসে পা নাচাতে থাকা তিনজনকে দিতে হবে।

দেবাহুতির সত্যিই ক্ষুধা পেয়েছে।হোস্টেলে সকালের খাবার সবসময়ই নিরামিষ।রবিবার আমিষ রান্না হয়।নিরামিষ মানেই দেবাহুতির অরুচি।তার বিভাগের পাশেই কয়েকজন কং চরুতে (মাটির তৈ্রি পাত্র)করে ভাত এবং শুয়োরের মাংস ভাজা বিক্রি করে।গ্রাহকদের ভিড় উপচে পড়ে।দেবাহুতি সংস্কারগত বাধা অনুভব করে।মীম বা ক্রীনই সকাল নটার মধ্যাহ্ন ভোজে পেট পুরে খেতে না পারলে ময়ূরভঞ্জের কঙে্র রান্না হোটেলের ভাত-মাংস ভাজা খেয়ে ঘাটতিটা পূরণ করে সারাদিন বেশ তরতাজা থাকে।মরণ কেবল দেবাহুতির।ভাত-মাংস ভাজা গলা দিয়ে নামতে চায় না,শুকনো বিস্কুট চোখে জল আনে এর নিজে কিছু একটা রান্না করাতেও তার ভীষণ আলস্য।হোস্টেলের তিনটা গ্যাস বার্নার ডাইনিং ঘরের তিনপাশে মেয়েদের জন্য দিনের বেশিরভাগ সময় খোলা থাকে।বোর্ডাররা ইচ্ছা করলে কিছু না কিছু রান্না করতে পারে।বেশিরভাগ বোর্ডারই বার্নারগুলিতে দুধ গরম করে।এক গ্লাস ঘন দুধ খেয়ে সে পেটটাকে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য শান্ত রাখে।

5ee59ff67c564.jpg

পাহাড়িয়া শহরটাতে দুধের যোগান ব্যবস্থাটা খুব সুন্দর।দুধ দিতে আসা দাজুর জগ দুটির পার্থক্য ও দিন রাতের মতো পরিষ্কার।কোন জগ থেকে দুধ নেবে? জল দেওয়া দুধের জগে দুধ দশ টাকা লিটার।জলবিহীন দুধ পনেরো টাকা লিটার।জল দেওয়া দুধ খাবে না জল ছাড়া খাবে এটা তোমাদের ব্যাপার।

বায়োফিজিক্সের গবেষণাগার থেকে ঐ যে সুদর্শন কাশ্মীরি অধ্যাপক পণ্ডিত নেমে আসছে।দেবাহুতি তখুনি নিজের অবস্থান ঠিক করে নিল।এখান থেকে পণ্ডিত চলে না যাওয়া পর্যন্ত ঘাড় বাঁকা না করেই সে চেয়ে থাকবে।ক্রীনরা যদি এখন গোলাপের রঙ নিয়ে বিতর্ক করে থাকে,করুক গিয়ে।সে এখন কাশ্মীরি ব্যক্তির রূপসুধা পান করে নয়ন সার্থক করবে।

বিজনী কমপ্লেক্স মূলত বিজ্ঞান অঞ্চল।এখানকার ছাত্রীনিবাসের বেশিরভাগ ছাত্রীই যদিও বিজ্ঞানের কলাবিভাগের প্রতিটি গবেষক ছাত্রী এবং কলার বিশিষ্ট ছাত্রীরাও থাকে।কলাবিভাগের বাকি ছাত্রীরা গারিখানা হোস্টেল এবং মৌ্লাইর নতুন আবাসে থাকে।বিজনী ছাত্রীনিবাস থেকে বায়োফিজিক্সের বিভাগটা খুব কাছেই।

এত কাছে থাকার সুবাদে বায়োফিজিক্স হোস্টেলটাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে।বায়োফিজিক্সের দুটি ছাত্রী এবং জনপ্রিয় গবেষিকা সবিতা সিং এখানকার আবাসী।সবিতার মারফৎ হোস্টেল নিবাসিনীরা বায়োফিজিক্সের পুরো বিভাগটার ভেতরের খবর বিস্তারিতভাবে জানে।বেশিরভাগই বাকি খবর জানার চেয়ে কাশ্মীরি অধ্যাপক পণ্ডিতর বিষয়ে জানার জন্য ব্যগ্র হয়ে থাকে। সবিতা উর্বর এবং রসাল বক্তব্যের দ্বারা বোর্ডারদের প্রকৃতি বোঝে কাহিনি সরবরাহ করে হোস্টেলের করিডর জীবন্ত করে রাখে।বিভাগটির অন্য এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব হল অধ্যাপিকা ফিলিপস।বিভাগীয় কাজকর্মে উৎসর্গিত প্রাণ। কিছুদিন আগে সুখ্যাতির সঙ্গে গবেষণার কাজ সম্পূর্ণ এবং সম্পন্ন করেছে। করেছে তো করেছে ডঃ খাটিংয়ের মতো সোনার মানুষের তত্ত্বাবধানে।

অতি সম্প্রতি ডঃ ফিলিপ্স করা একটি গবেষণা পত্র হোস্টেলের বোর্ডারদের নতুন শব্দ-অলঙ্করণের জোগান দিয়েছে।।সবিতার মাধ্যমে বোর্ডাররা অর্ধেক বুঝেছে আর অর্ধেক শোনার আগেই ভাবের বুদ্বুদে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে নতুন রসাস্বাদনের সুযোগ গ্রহণ করেছে।গবেষণা পত্রের সম্পর্কিত সবিতা সিঙ যদি এক সারি খবর সরবরাহ করেছে,বোর্ডাররা নিজের সৃজনীর সাহায্যে বাকি নতুন সারি পূরণ করেছে।

ডঃফিলিপ্সের গবেষণা পত্রে কী আছে?

এই যে ভোর হতে চলেছে,পাখিরা কীভাবে জানে?কীসের সংকেতে অ্যালার্ম ক্লক না থাকা মানুষও ঘুমের মধ্যে বুঝতে পারে –এখন মধ্যরাত বা এখন রাত ভোর হতে চলেছে?ফুল কীভাবে বুঝতে পারে যে এখন পাপড়ি মেলার সময় এবং এখন পাপড়ি খসানোর সময় ? কী অপূর্ব তাল মিলিয়ে চলতে থাকে মানুষ,প্রকৃ্তি,দিন-রাত,গ্রীষ্ম-বর্ষা,প্রেম-অপ্রেম,যৌবনের উন্মাদনা এবং প্রৌঢ়ের প্রগাঢ় আবেদন। সমগ্র প্রকৃতি কীভাবে ,কী যাদুতে ঘড়ির কাঁটার মতো সুচারুভাবে চলতে থাকে?কার জন্য দিন দিন এবং রাত রাত।মর্নিং গ্লোরি কীভাবে বুঝতে পারে যে এখন রাত শেষ হওয়ার সময়?গোধূলি গোপালকে কে বলে দেয় যে এখন সন্ধ্যে সমাগত?

ডঃ ফিলিপ্সের গবেষণা বলতে চায় –প্রকৃ্তির প্রতিটি সৃষ্টির কোণে একটা ঘড়ি রাখা আছে। এই ঘড়ি অত্যন্ত স্পর্শকাতর।নির্মোহ তার অনুভব।ঘড়িই।বলা যেতে পারে বায়োলজিকেল ক্লক। এই বায়োলজিকেল ক্লকের অনুভবেই সমগ্র চরাচর চলতে থাকে।

বায়োলজিকেল ক্লক।

ডঃ ফিলিপ্সের গবেষণা পত্র মেয়েদের এই মূল্যবান রেট্যারিকের যোগান দিল।মেয়েরা হোস্টেলে ঢুকতে বেরুতে ,জল ধরে রাখার সময়,জলের বালতি সহ লাইনে দাঁড়ানোর সময়,অবসর সময়ে বনানিতে বসে সোয়েটার বোনার সময়,মাঝে মধ্যে গল্প গুজব করার সময় পাশের রাস্তা দিয়ে ডঃ ফিলিপ্সের সঙ্গে দেখা হয়েই যায়।

সকাল সাড়ে আটটার সময় দুর্লভ জলের বালতিগুলির কাছে পাহাড়া দিতে থাকার সময় বোর্ডাররা দেখে –ঐ যে পাশের রাস্তা দিয়ে দ্রুত আর ছোট ছোট পদক্ষেপে ডঃ ফিলিপ্স ডিপার্টমেন্টে পৌছে গেছেন।

মানুষটার সমগ্র ব্যক্তিত্ব বহন করে আনে এক ধরনের প্রসন্ন আর ব্যস্ত প্রভাত। রেশমি জেমসেম সুচারুভাবে ঢেকে রাখা তাঁর মেদহীন শরীর। বাতাসের সঙ্গে সখিত্ব পাতার জন্য সদাব্যগ্র হয়ে থাকা ঐ যে ফিলিপ্সের রেশমি খোলা চুল।

ডঃ ফিলিপ্স মানেই বায়োলজিকেল ক্লক।

দেরগাঁওয়ের মায়া এবং কর্ণাটকের পদ্মা রুমমেট।

দুজনেরই সন্ধ্যে আটটার সময় ঘুম পায়। পাশে থাকা হোস্টেলের কমন রুমের টিভিতে মেয়েরা ফুল ভলিউমে সিনেমা দেখে।দেওয়ালের ওপারে মায়া এবং কীভাবে ঘুমোয়? বায়োলজিকেল ক্লক।ঘুমোয় যে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কোনোদিন টিভির ভলিউমের দৌরাত্ম নিয়ে ওদের অভিযোগ নেই। দুজনেই কোন ভোরে উঠে।প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বাকি বোর্ডাররা যখন সকালে দাঁতে ব্রাশ নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে ,ততক্ষণে মায়া এবং পদ্মা পড়াশোনা শেষ করে খুশি মনে হোস্টেলের সামনে হাঁটতে শুরু করে।

কিন্তু সেই ভোর রাতে পড়ার নামে কীভাবে উঠে দুজন? বায়োলজিকেল ক্লকের নির্দেশে। আজ বাড়ি থেকে কেউ আসবে বলে মনে হচ্ছে। সত্যি এসে গেল। ক্লক ঠিকই সংকেত দিয়েছিল।

আগামীকাল পরীক্ষা। সকালবেলা এক ঘণ্টা আগে জেগে গেলে ভালো হত।পারবি পারবি। অল দ্য বেস্ট। বায়োলজিকেল ক্লক সাহায্য করবে দেখিস।


চলবে ...।


অনুবাদক পরিচিতি -১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।শৈশব কেটেছে গুয়াহাটি শহরে। ১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষা তত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা চারশো পঞ্চাশটির ও বেশি।NEINAD এর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।মোট প্রকাশিত বই আঠারোটি।