রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

অসমে জাতীয় নাগরিক পঞ্জির খসড়া, সংগতি -বিসংগতি

মায়ান্মার থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে বৈধ কাগজপত্র নিয়ে নাগরিকপঞ্জিতে নাম নথিভুক্ত রোহিঙ্গা আলম হুসেন মজুমদারের । তথ্যে প্রকাশ ধৃত ব্যক্তি আই এস জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গেও সম্পর্ক যুক্ত । শুধু এন আর সি-রনথি নয় , ভারতের ভোটার পরিচয় পত্র , প্যান কার্ড, জন্মের সার্টিফিকেট, বাঙ্কের পাশবুক ও জমির দলিল ও রয়েছে ওই ব্যক্তির । অপর দিকে গৌহাটির বাসিন্দা , একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রের বর্ষীয়ান ৮০ উর্ত্তীণ সাংবাদিক কাগজপত্র থাকা সত্বেও খসড়া পত্রে নাম উঠাতে ব্যর্থ হয়ে হার্টফেল হয় ।

এই ঘটনা প্রকাশ্য হতেই অসমে এন এর সি-র অফিসার কর্মীদের কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ও আঙুল উঠেছে । প্রশ্ন উঠেছে নিরপেক্ষতার । শাসক দলের এক বিধায়ক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন NRC কর্মকর্তাদের উপর । যেখানে সৎ বৈধ নাগরিকের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে প্রমাণ সংগ্রহ করতে , সেইস্থানে বর্ডার অঞ্চলে , ধুবুরী গোয়ালপাড়া,করিমগঞ্জ , মানকাছাড় ইত্যাদি অঞ্চলে স্বয়ং কর্মীই কাগজ বানাতে সাহায্য করছে বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের ! এই সব বিসংগতি অসমের এন আর সি-র প্রক্রিয়াকেই হাস্যস্কর করে তুলেছে ।প্রথম খসড়া থেকেই বেশ কিছু বিদেশির নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে , যারা বিদেশী ট্রাইব্যুনালের বিচারের বিদেশি বলে ঘোষিত সব ব্যক্তির নাম কী করে খসড়ায় উঠে এলো ! অথচ ভিটে মাটি ছেড়ে প্রাণ ও মান নিয়ে এক বস্ত্রে যাঁরা দেশত্যাগী হয়ে ছিলেন তিন পুরুষ আগেতাঁরা আজ পুনরায় অস্তিত্বের সংকটের মুখে পড়ে দিশেহারা ।

এইটি একটি উদাহরণ মাত্র । এই ধরণের অসংখ্য বিসংগতিতে ভরা অসমের NRC –র স্বচ্ছতা আজ প্রশ্নের মুখে । ৩১ জুলাই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা । কিন্তু প্রতীক হাজরিকা রি- ভ্যারিফিকেশনের দাবি তুলে সুপ্রিম কোর্টে আরো একমাস সময় চেয়েছেন । সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে কেন্দ্ররাজ্য দাবি তুলেছে সীমান্তবর্তী অঞ্চল গুলিতে আরো দশভাগ রি- ভ্যারিফিকেশন দরকার । সরকারের সন্দেহ ওই সব অঞ্চলে বহু সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম ঢুকে পড়েছে । তাদের নামসহ এন আর সি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করলে বিদেশি মুক্ত অসমের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে । অসমে নাগরিক পঞ্জিরপ্রাথমিক খসড়া প্রকাশিত হয় ২০১৮ এর৩০ জুলাই । রি-ভেরিফিকেশনের পর চূড়ান্ত তালিকাও প্রায় প্রস্তুত । ৩১ জুলাই , ২০১৯ সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট । কিন্তু অসমের প্রলয়ঙ্কর বন্যা পরিস্থিতি, এবং সীমান্ত অঞ্চলের সন্দেহজনক তালিকার জন্য সরকার চাচ্ছে কিছুদিন পিছিয়ে দিতে । অথচ সুপ্রিম কোর্ট অটল ৩১ শের মধ্যেই তালিকা প্রকাশের জন্য । এন আরসির এর মুখ্যকার্যকর্তা হাজেলা চাইছেন , আরো একমাস পিছিয়ে দেওয়া হোক । প্রায় প্রতিদিন-ই এন আর সি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা জারি হচ্ছে ।

রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জি ( NRC ) এই মুহূর্তে অসম তথা সারা ভারতে একটি বিতর্কিত বিষয় । বিষয়টিতে প্রবেশের আগে জেনে নেওয়া দরকার রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জিজিনিসটি কী?

এক কথা বলা যায় ভারতীয় নাগরিকদের নামের তালিকাই হল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জি। ইংরেজিতে National Register of Citizens of India বা NRC .
অসমে১৯৫৫ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বৈধ ভারতীয় বাছাই এর কাজ আরম্ভ হয়২০১৫ সালে ।
১৯৭৯ খ্রীষ্টাব্দে All Assam Student Union তথা আসু ও অসম গণ পরিষদ ( অগপ ) আসামে বসবাসকারী অবৈধ শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীর বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল । ৬ বছর আন্দোলনের পর তদানীন্তন ভারত সরকারের সঙ্গে আসুর ঐতিহাসিক Assam Accord অসমচুক্তি হয় । সেই চুক্তি অনুযায়ী ১৯৫১ সালের রাষ্ট্রপঞ্জিও ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের মধ্যরাত্রি ভিত্তিবর্ষ ধরে অসমে ভারতীয় নাগরিক পঞ্জির ভিত্তি বর্ষ ধরা হয় । ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ প্রতিবেশি বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ।

প্রাথমিক খসড়া প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশ জুড়ে হৈ চৈ শুরু হয় । ৪০ লাখ রাষ্ট্রহীন মানুষের একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছিল অসম সরকার । কোনও ব্যক্তি বা তাঁর পূর্বপুরুষ যে সত্যিই ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের আগে থেকে আসামে বসবাস করছেন, তা প্রমাণের জন্য ১৯৫১ সালের নাগরিক পঞ্জি যেমন দেখা হচ্ছে, তেমনই ১৪-১৫টি নথি চাওয়া হচ্ছে। নথি যুক্ত করতে হবে ।

তথ্য মেলানো হয়েছে ভোটার তালিকার সঙ্গেও। পুরানো ভোটার তালিকা ধরে তৈরি হয়েছে 'লিগ্যাসি ডেটা' আর বংশবৃক্ষ।এরইসঙ্গে রয়েছে ভোটার তালিকায় যাদের 'ডি-ভোটার' বা সন্দেহজনক ভোটার বলে চিহ্নিত করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।

একটা সময়ে যদিও অসমীয়া জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলি দাবী করত যে রাজ্যে লক্ষ লক্ষ অবৈধ বাংলাদেশী বসবাস করছেন, এবং ভোটার তালিকায় নামও তুলে ফেলেছেন।

১৯৯৭ সাল থেকে শুরু হয় 'ডি-ভোটার' চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া ।

তাদের নামের তালিকা সীমান্ত পুলিশকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং মামলা রুজু হয় 'ফরেনার্স ট্রাইবুনাল' বা বিদেশী চিহ্নিতকরণের ট্রাইবুনালে।

সেখানে নিজেকেই তথ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে তিনি সত্যিই বৈধ ভারতীয় নাগরিক। এন আর সির খসড়া প্রকাশের পর দেখাগেল বৃহৎ সংখ্যক হিন্দু বাঙালির নাম-ই কর্তন গেছে । উপযুক্ত প্রমাণ দর্শাতে পারে নি বলে স্থায়ী বাসিন্দাদের নামও প্রথম খসড়ায় নাম ওঠেনি ।এন আর সি-র আবেদন প্রক্রিয়া ২০১৫ সালের মে মাসে শুরু হয়েছিল। সারা আসাম জুড়ে ৬৮.২৭ লক্ষ পরিবারে কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছিল ৬.৫ কোটি নথি।

যাই হোক , প্রথম খসড়াতালিকা প্রকাশিত হতেই যে আশংকা অসম ও সারা ভারতে তুমুল বিতর্কেরসৃষ্টি হয় । তা হচ্ছে নাগরিকপঞ্জি থেকে কারো নাম বাদ যাওয়ার অর্থ, তাদের অদূর ভবিষ্যতে বিদেশী বলে চিহ্নিত করা হবে।ভারতীয় নাগরিকত্ব হারিয়ে তারা অচিরেই পরিণত হবেন রাষ্ট্রবিহীন মানুষে।

ইতিমধ্যেই বিদেশী বলে বহু মানুষকে চিহ্নিত করেছে আসামের ফরেনার্স ট্রাইবুনালগুলি। প্রায় নয়শো মানুষ আটক রয়েছেন বন্দী শিবিরে।নাগরিক পঞ্জির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ নিয়ে বাংলাভাষী মানুষরা যেখানে বিদেশী বলে চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছেন । বাঙালি হিন্দু স্বভাবত ঘরপোড়া । সিঁদুরে মেঘে ঝড়ের পূর্বাবাস দেখে । ধর্মের ভিত্তিতে যখন দেশ ভাগ হয়েছিল তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল হিন্দু বাঙালি । পূর্ব পাকিস্থান থেকেই হিন্দু বাঙালির কার্যত অনিশ্চিত জীবন শুরু হয় । ‘শরণার্থী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দ দুটি নিয়েহিন্দুবাঙালি ভিতর বাইরেজেরবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ।

অথচ ভারত পাকিস্তানের মধ্যেচুক্তি রয়েছে এ সংক্রান্ত। নেহরু-লিয়াকত চুক্তি

স্বাক্ষরিত হয়েছিল ৮ এপ্রিল ১৯৫০ সালে। পরবর্তী কালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুনের মধ্যে নেহরু-নুন চুক্তি হয়েছিল। দুটি চুক্তিতেই বলা হয়েছিল স্ব স্ব দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা অত্যাচারিত হলে যে দেশে তাঁরা প্রবেশ করবেন সেই দেশে তাঁদের শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়া হবে। সেই অনুযায়ী, পূর্ববাংলা থেকে অত্যাচারিত হয়ে ভারতে আসা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষদের শরণার্থী হিসাবে গণ্য করতে হবে। অথচজনস্ফূর্তিবলছে অসমে যত না হিন্দুর সংখ্যা বেড়েছে , তারচেয়ে অধিক বেড়েছে মুসলিম অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ।

কিন্তু পূর্ববাংলা থেকে কোনও মুসলমান ধর্মীয় অত্যাচারের কারণে তো ভারতে আসেননি, এসেছেন অন্য কারণে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ অথবা উপরোক্ত দুটি চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ভারতে আগত মুসলমানরা তাই অনুপ্রবেশকারী। দেশভাগের পর লক্ষ লক্ষ হিন্দুবাঙালিউদ্বাস্তু হয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে ভারতে এসেছেন।তাঁরাঅসম ছাড়াও বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে ছড়িয়ে পড়েছেনদেশের নানা অঞ্চলে, প্রধানত পশ্চিমবঙ্গে। দ্বিতীয়ত ত্রিপুরায়, তৃতীয়ত বরাক উপত্যকায়, চতুর্থত তখনকার পূর্ববঙ্গ–‌লাগোয়া বিভিন্ন রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের বসবাস আর পুনর্বাসন হয়েছে নেহরু–‌লিয়াকত চুক্তিমতে । স্বীকৃতনাগরিকত্ব। কিন্তু অধিকাংশের কাছেই দলিল কাগজ ছিল না । দরিদ্র , অল্প শিক্ষিত মানুষ আজকের মতো কাগজ সচেতনও ছিল না । যে মাঠে ঘাটে খেতে খামারে কাজ করে জীবন নির্বাহ করছে bank account তাদের কল্পনার ও অতীত । পাশাপাশি একটা পরিসংখ্যান দেখা যাক প্রতিবেশি রাজ্যের ।

বাংলাদেশে ১৯৪১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল শতকরা ২৮ ভাগ। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের অব্যবহিত পরে তা শতকরা ২২ ভাগে এসে দাঁড়ায়। এরপর থেকেই সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমাগত অত্যাচার এবং নিপীড়নের ধারাবাহিকতায় দেশটিতে ক্রমশ হিন্দুদের সংখ্যা কমতে থাকে। ১৯৬১ সালে ১৮.৫%, ১৯৭৪ সালে কমে দাঁড়ায় ১৩.৫%, ১৯৮১ সালে ১২.১%, এবং ১৯৯১ সালে ১০%-এ এসে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে হিন্দুদের শতকরা হার কমে ৮ ভগের নিচে নেমে এসেছে বলে অনুমিত হয়। ২০১১ সালে পরিচালিত জরিপ বলছে, ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ হিন্দু বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে।

অভিযোগ উঠেছে অসমে এন আর সি-র সঙ্গে যুক্ত কর্মচারিগণ উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে হিন্দ্যুদের নাম-ই বেশি কেটে দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা জাতীয়তাবাদী না হয়ে , হওয়া উচিত ছিল মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি । কিন্তু বর্ডার অঞ্চলের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোই হয়েছে । কারণ বর্ডার এরিয়ায় যেমন মান কাছাড় , ধুবুরী , করিমগঞ্জ গোয়ালপাড়াতে বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তি হয়েছ । অথচ ওইদিকেই বিপুল ঘটেছে অনুপ্রবেশ । সমগ্র ব্যাপারটি প্রথম ধরতে পারে নি সরকার । যখন বুঝতে পেরেছে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে । এর পর্যায়েদেখা যায় অসমের সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলি নামকর্তনের সংখ্যা অন্যান্য জেলাগুলি থেকে কম । যা হওয়া উচিত ছিল বেশি । আজ হাজেলা থেকে জেনারেল সলিসিটর মেহেতা সকলেই এই বিসঙ্গতি কার্যত মেনে নিয়েছেন ।

এ খসড়া নিয়ে আপত্তি তুলেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এ নিয়ে সবচেয়ে সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের অভিযোগ, এই এন আর সি-র মাধ্যমে মুসলমানদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে।

এন আর সি তালিকায় ৪০ লক্ষ নাম বাদ পড়ার দরুন দেশ জুড়ে রাজনৈতিক চাপান উতোর শুরু হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ, অসম থেকে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে তাড়ানোর জন্য এই এন আর সি প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে। সারা দেশের মধ্যে বাংলাদেশী সমস্যায় জৰ্জরিত রাজ্য হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের পরেই অসমের স্থান।

আবার বিজেপির সভাপতি ও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন , “আমরা আসামকে আরেকটা কাশ্মীর হতে দেব না। সে কারণেই আমরা এনআরসি এনেছি।

অসমের রাজনীতিতে বহিরাগত বা বিদেশী সমস্যা কোন নতুন বিষয় নয় । আসুর নেতৃত্বে যতবারআন্দোলন হয়েছে অসমে , তার প্রেক্ষাপটে অতি প্রব্রজনন বিষয়টি ঘুরে ফিরে এসেছে । অসমের তিনভাগএ-ই রয়েছে বাংলাদেশ । ১৯৭১ মার্চের পরে অনুপ্রবেশ বিপুলভাবে ঘটেছে বলে আসুর দাবি । সেই দাবির মুলে অসমীয়া ভাষাভাষীর উদ্বেগের কারণ বাংলা মূলের হিন্দু মুসলমানের অবিরত ভারতের সীমানা লঙ্ঘন করে অসমে প্রবেশের ফলে স্বভুমেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া আশংঙ্খা রয়েছে । বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীর বিরুদ্ধে তাই আসুর দীর্ঘ দিনের সংগ্রামের প্রতিফলন এন আর সি বললে ভুল হবে না । সরকারের ধারণা এন আর সি রূপায়ন মাধ্যমেই বিদেশী অনুপ্রবেশের সমস্যা অন্ত পড়বে । প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্যসনোয়াল নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার অসমে ক্ষমতাসীন হয়েই প্ৰথম দিনই জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর কাৰ্যালয়ে গিয়ে এন আর সির কাজ কৰ্ম পৰ্যালোচনা করেন। ১৯৮৫ সালে অসম চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, সেই চুক্তির অন্যতম শৰ্ত ছিল অসম বাংলাদেশ ২৬৩ কিঃমিঃ জল ও স্থল সীমান্ত সীল করতে হবে। খিলঞ্জীয়া বা -ভূমিপুত্ৰের প্ৰকৃত সংজ্ঞা নিৰ্ণয় করতে হবে। সেই সংজ্ঞা মেনে অসমীয়া খিলঞ্জীয়া-ভূমিপুত্ৰদের ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অধিকার এবং রাজ্যের ভূমির ওপর অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।

জনসংখ্যার নিরিখেআসামের থেকে প্রায় তিনগুণ বড় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, তবে এদুটো পড়শি রাজ্য, আর দুটোতেই দেশভাগের পরের সময়ে ব্যাপক হারে প্রব্রজন হয়েছে। তুলনা করলে প্রব্রজনসংক্রান্ত পশ্চিমবঙ্গের জনস্ফূর্তি ঘটিয়ে চলছে বিপুল হারে । কারণ অসমে নাগাল্যান্ড মনিপুর মেঘালয়ে কাঁটাতারের কাজ সম্পূর্ণ হলেও পশ্চিম বঙ্গের বিস্তৃণ অঞ্চল এখনও উন্মুক্ত রয়েছে । NRC চাই পশ্চিমবঙ্গেও, দাবি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের, । বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বক্তব্য অসম রাজ্য থেকেও বেশি অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে । বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দল গুলির মদত পুষ্ট হয়ে বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা থেকে আগতপ্রব্রজণনকারীরা দফায় দফায় পশ্চিম বঙ্গে চলে এসেছে এবং আসছে । মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের ভোটের স্বার্থে ব্যবহার কারীদের কাছে দেশ থেকেও বড় দল ও ক্ষমতা । ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য বামপন্থী , কংগ্রেস ও তৃণমূল মুসলিম ভোট ব্যাংককেই করছে পাখির চোখ । পশিমবঙ্গে ও এন আর চি করা দরকার । আসামের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে । কারণ এন আর চির কাজে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক ঠিক রাখার জন্য যেন কর্মীদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে । তাতে করে এন আর সি র উদ্দেশ্যই বানচালহয়ে যাতে পারে ।

সরকার দেশছুট ভিটে মাটিহারা হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান শরনার্তিদের জন্য সিটিজেনশিপ বিল আনতে বদ্ধ পরিকর । অমিত শাহ বলেছেন ,

“এ বিল শুধুমাত্র উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির জন্যই নয়, পুরো ভারতের জন্যই। যে ভাবে আসামের জনতত্ত্ব বদলে যাচ্ছে, তাতে নাগরিকত্ব বিল না প্রয়োগ হলে এ রাজ্যের বাসিন্দারা ঘোর বিপদের মধ্যে পড়বেন।”

রাজ্যসভায় সংখ্যা অল্পতার জন্য গতবছর বিল পাশ করাতে পারে নি । এইবার বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি সরকার কেন্দ্রে এসেছে । রাজ্যেও রয়েছে বিজেপি সরকার । মানুষ রয়েছে আশায় বুকবেঁধে । প্রশ্ন রয়েছে এখানেও

যারা সিটিজেনশিপের আওতা ভুক্ত হবেন তাদের পুনর্বাসনের কী হবে ? কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যেন ওই দিকটিও বিবেচনা করে দেখেন । সেই সঙ্গে দেখতে হবে অসমের উপরে যাতে অতিরিক্ত বোঝা না পড়ে । আর ভুমিপুত্রদের স্বার্থ যাতে বিঘ্নিত না হয় । বাঙালি হিন্দুর বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে মানবিক দৃষ্টি কোন থেকে । কারণ প্রাণের ভয়ে বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় নির্যাতনের বলি হয়ে যারা এসেছেন তারা জমি মাটি সম্পত্তি ফেলেএকবস্ত্রে এসেছেন বিনা নথিতেই ।